একটি বিড়াল কথা

  মাহবুব হাসান শাহীন ২৬ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিড়ালটি হারিয়ে সুমনের ভীষণ মন খারাপ। জানালায় মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে আছে। বর্ষার কান্না ঝরছে ছোটবোন সুহারও। দশ বছরের সুমন আর আট বছরের সুহা বয়সে পিঠাপিঠি হওয়ায় সম্পর্কও বেশ অম্লমধুর। দু’জনের মিলও যেমন, ঝগড়াটাও কোনো অংশে কম নয়। তাই বিড়ালটির ভাগাভাগি নিয়ে তাদের সম্পর্ক সেই পর্যায়েরই। বলে রাখা দরকার, বিড়ালটির নাম ক্যাটরিনা। নামটি অবশ্য মা-ই রেখে দিয়েছে। ক্যাটরিনাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচতলায় বসবাস হওয়ায় ক্যাটরিনা প্রায়ই ছাদে বেড়াতে যায়। সেদিন হয়তো ভুলক্রমে ওকে বাইরে রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। সুমনও একটু সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়েছিল। অন্য কেউ আর খোঁজ নেয়নি ক্যাটরিনা ঘরে আছে কিনা। ফলে দায়ভার তার বাবা হাসান সাহেবেরই। এ বিশ্ব সংসারে স্বজন-শুভার্থীর স্নেহ-মায়াবঞ্চিত কত মানবসন্তান এখানে-ওখানে পড়ে রাত কাটায়- কেউ খোঁজ রাখে না আর ক্যাটরিনা তো পশু প্রজাতির সামান্য বিড়াল মাত্র। ক্যাটরিনার কথা যখন মনে পড়ে তখন ভোরের সূর্যালোক বাড়ির ছাদ ঘেঁষে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করছে। ঘরের সব জায়গা-ছাদ এমনকি আবাসিক এলাকার পুরো ক্যাম্পাস তন্নতন্ন করে খুঁজেছেন হাসান সাহেব। কোথাও নেই ক্যাটরিনা। ছেলেমেয়ের অবস্থা অনুধাবন করে হাসান সাহেবের মনটাও কেমন জানি মেঘে ঢেকে গেল। ভেতরে ভেতরে কিছুটা জল জমে উঠেছে কিন্তু বুঝতে দিচ্ছে না কাউকে। কী হতে পারে, বিড়ালটি কেউ চুরি করে নিয়ে যেতে পারে? একটা সুরক্ষিত আবাসিক এলাকায় তা কী করে সম্ভব? তাছাড়া কভিড-১৯-এর এ মহামারীতে বিড়াল চুরি করা তো দূরের কথা, কাছে এলে কাছেই ভিড়তে দিবে না। রাজ্যের যত এলোমেলো চিন্তা এসে ভিড় করছে হাসান সাহেবের মনে। তিনি নানাভাবে মনকে ব্যর্থ সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। একবার ভাবেন, ভালোই হয়েছে বিড়ালটি হারিয়ে গেছে। এখন করোনাকাল। কত কী ঘটতে পারে! বিড়ালের মাধ্যমে যে ভাইরাস ছড়াবে না- তা তো নিশ্চিত করে বলা যায় না। করোনা প্রসঙ্গ আসতেই সুমন বলে উঠে, করোনার কারণে লকডাউন চলছে সবখানে। বাইরে যেতে পারি না, খেলতে পারি না। ক্যাটরিনাই তো ছিল খেলার সাথী। বাসায় ওর সঙ্গে ছোটাছুটি করতাম, লুকোচুরি খেলতাম। তাছাড়া ক্যাটরিনা থাকাতেই বাসায় ইঁদুর আসে না, তেলাপোকা আসে না এমনকি মশাকেও শিকার করতে পারদর্শী। কেমন জানি এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে সুমনের মনে। কথাতেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা। বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, তুমি যে অস্ট্রেলিয়া-আমেরিকা থেকে ফাঁদ এনেছিলে কই একটি ইঁদুরও তো ধরা পড়ল না। ক্যাটরিনা-ই সব দমন করল। ছেলের অকাট্য যুক্তির সামনে বাবা কেমন জানি একটু আড়ষ্ট হয়ে যায়। স্মার্টফোনের যুগে যতটা সম্ভব সাইবার জগৎ থেকে দূরে রাখার জন্য এ বিড়ালটির অবদান অনেক। তবুও বুঝানোর চেষ্টা করে দু’ভাইবোনকে। যতই বুঝাতে চায় ততই দু’ভাইবোন স্মৃতিকাতর হয়ে যায়। কান্নাভেজা কণ্ঠে একের পর এক খুলে দেয় স্মৃতির দুয়ার। কীভাবে খেত, তাদের পড়ার টেবিলে কীভাবে বসে থাকত, ইঁদুর বা তেলাপোকা দেখলে কী ভঙ্গি নিত, স্মৃতি থেকে কিছুই বাদ যায় না। সুমন বা সুহার মন খারাপ থাকলে দৌড়ে এসে কোলে বসে আনন্দ দিত।

ছেলেমেয়ের কান্না দেখে মায়ের চোখ দুটিও কেমন ছলছল করছে। কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছে না হাসান সাহেব। অগত্যা যদি কোনো সমাধান বের হয়- কিঞ্চিত আশা নিয়ে আবাসিক এলাকার ফেসবুক গ্রুপে একটি সচিত্র বিজ্ঞপ্তি দেয়। কয়েকজন সমবেদনা জানিয়ে সাড়াও দিয়েছেন। কাজের কাজ কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। সারা দিন কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে যায় দু’ভাইবোন। হাসান সাহেব ভাবে, বাচ্চাদের মনের মতো যদি হতো মানুষের মন! সমাজে তবে মানবিক বোধের বিকাশ হতো প্রস্ফুটিত ফুলের মতো। কী বিচিত্র মানবপ্রজাতি। একটি প্রাণীর জন্য দুটি অবুজ শিশুর প্রাণের কী আকুলতা, কী ভালোবাসা! নস্টালজিয়া অন্য কোনো প্রাণীর আছে বলে মনে হয় না। হাসান সাহেবের পদায়ন ছিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে একটি প্রত্যন্ত উপজেলায়। চরভদ্রাসন উপজেলায় একজন সজ্জন মানবিক মানুষ হিসেবে যোগদানের পরপরই তার পরিচয় ঘটে যায়। বাচ্চা দুটিও বোধ হয় বাবার মানবিকবোধে প্রভাবিত হয়েছে। মাত্র এক বছর কাজ করার পর যখন চরভদ্রাসন থেকে বদলি হয় তখনও ওরা কেঁদেছিল ভীষণভাবে। সেখানের খেলার সাথীদের ছেড়ে চলে যেতে হবে- এটি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিল না বিশেষ করে উপজেলা অফিসের এক স্টাফের বাচ্চা যে কিনা সব সময় তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত, তার জন্য সুমনের কান্না কিছুতেই থামছিল না। যদিও যে উপজেলায় বদলির আদেশ হয়েছে সে উপজেলা চরভদ্রাসনের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত, অনেক বেশি আলোকিত। তা হোক, কিন্তু এখানের স্টাফ ও অন্যান্য মানুষজনের সঙ্গে এক নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়ে গেছেন তিনি এবং তার স্ত্রী-সন্তান। মায়ার বন্ধন বড় কঠিন। সহজে ছেঁড়া যায় না। তারপরও ছিঁড়তে হয়, গোপন রক্তক্ষরণ গোপনে রেখেই। চরভদ্রাসন ছায়া সুনিবিড়। গাড়ি-ঘোড়ার তেমন কোনো দপদপানি নেই। এখানের মানুষের মন প্রকৃতির পেলবতায় কুসুমিত। হাসান সাহেবও এ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল। বারবার ভাবছিল তার পদ্মার তীরে বিকেলের সময় কাটানো কিংবা ইউএনও বাংলোর সামনে গোল ঘরটায় বসে সহকর্মীদের সঙ্গে গল্প করার সুযোগ হয়তো আর হবে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম না হওয়ায় এবং কিছুটা প্রান্তিক উপজেলার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসার ও কর্মচারীবৃন্দ ক্যাম্পাসেই বসবাস করেন। ফলে তাদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করার বিষয়টি হয়তো কোনোদিন ভোলা সম্ভব নয়।

রাত গত হলেও সুমনের মাথা থেকে কিছুতেই নামছে না ক্যাটরিনার চিন্তা। বাবা যতই বুঝানোর চেষ্টা করেন এবং আরেকটি নতুন বিড়াল এনে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, সুমন ততই ক্যাটরিনার কথাই বলে। সুমনের এক কথা, নতুন বিড়াল তার ভাষা বুঝবে না, ক্যাটরিনার মতো এত সুন্দর হবে না। ক্যাটরিনা না খেয়ে আছে হয়তো বৃষ্টিতেও ভিজেছে। গতরাতে বৃষ্টি হয়েছে বলতে বলতে সুমন আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল। আবার রাতেই হাসান সাহেব বিড়াল খুঁজতে নিচতলায় যেতেই যেন স্বপ্ন দেখার মতো অবস্থা। বিড়ালটি তাকে দেখেই মিউ মিউ করে এগিয়ে আসে। এক নিঃশ্বাসে পাঁচতলায় উঠে চিৎকার করে বলে, ক্যাটরিনা চলে এসেছে। বাবার কণ্ঠ শুনে সুমন ও সুহা দৌড়ে দরজা খুলে দিলে আফসোস করছে যে, করোনা স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য তাকে গোসল না করানো পর্যন্ত স্পর্শ করা যাবে না। অপেক্ষার প্রহর গুনছে। সুমন ও সুহার চোখে কী সুন্দর আনন্দের ঝিলিক। হাসান সাহেবের স্ত্রী তার জন্য দুধ নিয়ে এল। ক্যাটরিনাকে এটি খাওয়ায়-ওটি খাওয়ায়। কে কোলে নিবে কাড়াকাড়ি। বিড়ালটি যদি আবার চলে যায় তাহলে সুমন ও সুহা দু’জনই নতুন করে কষ্ট পাবে। হাসান সাহেব তাই ছেলেমেয়েকে বুঝায়, যতই আদর কর তোমরা কিন্তু তার ভাষা বুঝ না, প্রাণীরা তাদের একদলে থাকতে চায়। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে- আছে স্বতন্ত্র অনুভূতি। সুতরাং তাকে তার মতো থাকতে দেয়া উচিত। সুমন ও সুহার কাছে বাবার কথা যৌক্তিক মনে হল। দু’জনে সিদ্ধান্ত নিল, ক্যাটরিনাকে অবমুক্ত করে দিবে। যদি চলে যেতে চায় তাহলে তারা আর তাকে আটকিয়ে রাখবে না। ক্যাটরিনা সুখে থাকলেই যেন তাদের সুখ। সন্তানের এরূপ সিদ্ধান্তে হাসান সাহেবের কেন জানি তার মায়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল। যেদিন থেকে তার ভাইয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি থেকে বের হোন, সেদিন থেকে মা আর তাদের কাছে পায়নি, যতটা কাছে পেলে অন্তত মায়ের অতৃপ্ত আত্মা তৃপ্ত হতে পারে। মায়ের মনে একটা হাহাকার বোধ যেন সবসময় ঘুরে বেড়াত। একদিন তো বলেই ফেললেন, কেন যে তোদের লেখাপড়া করাতে গেলাম। বাবারে তোরা কাছে না থাকলে বুকটা খাঁখাঁ করে। হাসান সাহেবের বড় ভাই যখন চাকরি নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমায় তখন মায়ের কান্নায় তাদের বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে যেত। সুমন ও সুহাও তো একদিন জীবনের প্রয়োজনে বাবা-মা’র কাছ থেকে দূরে চলে যাবে, তখন কী করে সইবে সন্তান বিরহের যাতনা! হাসান সাহেব অন্যদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মনে হয় একবার চোখ মুছে নেয়। ইচ্ছা করছে এখনি দু’সন্তানকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে। আসন্ন ব্যথাবোধ চেপে রেখে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি।

ক্যাটরিনাকে ছেড়ে দিল তারা। দেখতে দেখতে ক্যাটরিনা অদৃশ্য হল। যাওয়ার সময় বিড়ালটি একবার তাকালও না। সুমনের মন আবার বেদনায় ভারী হয়ে উঠল। হাসান সাহেব ও তার স্ত্রী সুমনকে নিয়ে অন্য গল্প শোনায়। সুমনের যেন কিছুই ভালো লাগে না। সুমনকে যখন জিজ্ঞেস করল, যেহেতু ক্যাটরিনাকে এত মিস করছ তাহলে ছাড়তে গেলে কেন। অনেকক্ষণ সামলে নিয়ে বলল, বাবা আমি ওকে ভালোবাসি। ওর এখানে থাকতে মন চায়নি তাই ওকে আর জোর করিনি। সুমন আগের মতো কাঁদে না- শুধু ভাবে আমি তো ওকে আদর করেছি, ভালোবাসি- তাহলে সে কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল। তার বাবা বলল, দেখ বাবা এটি একটি শিক্ষা- কাউকে এত ভালোবাসতে হয় না। এত ভালোবাসলে বেশি কষ্ট পেতে হয়। সুমনের খাওয়ার প্রতি কেমন জানি আগ্রহ কমে গেছে। তবে আগের মতো সে আর কাঁদে না। সুহাকে উদ্দেশ্য করে সুমন বলে, মন খারাপ করে থেকো না। দেখ, ক্যাটরিনা ঠিক চলে আসবে। যাওয়ার সময় সিঁড়ি শুকে নিয়েছিল মানে বাসাটা চিনে। হাসান সাহেব বাচ্চাদের নিয়ে পুরো ক্যাম্পাস খোঁজাখুঁজি করল কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়নি। ক্যাটরিনা আর দশটা বিড়াল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন দেখতে তেমনি আচরণে। কোনো সময় খাবারের জন্য ডাইনিং টেবিলে উঠেনি কিংবা রান্নাঘরের কোনো হাঁড়ির ঢাকনা সরায়নি। তিন দিন হয়ে গেল কিন্তু কোথায় যেতে পারে! প্রথমবারের বিচ্ছিন্ন হওয়া আর দ্বিতীয়বারের বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাঝে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রথমবার হয়তো বা হাসান সাহেবের দায়ভার ছিল কিন্তু পরের বার কেন স্বাধীনতা দিল। ছেড়ে দিয়ে আবার পেতে চাওয়ার কী অর্থ! এসব চিন্তা করতে করতে হাসান সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়। ফজরের নামাজ পড়ার পর দরজা খুলতেই হাসান সাহেব অবাক! বিড়ালটি আবার বাসা চিনে ঠিক চলে এল। এত ভবন একই ধরনের হওয়ার পরেও এ ভবনের পাঁচতলা কীভাবে চিনতে পারল। পৃথিবীতে তাহলে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাই জয়ী হয়? কোত্থেকে যেন এরূপ প্রশ্নের বারবার প্রতিধ্বনি উঠছে। হাসান সাহেব কান পেতে আছেন তার উত্তর শোনার অপেক্ষায়।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত