গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস নির্বাসিত জীবনের গল্প

  এমরান হোসেন ২৬ জুন ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গত একুশে গ্রন্থমেলায় সুরাইয়া ফারজানা হাসান অনূদিত ‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তিন দশকের গল্প’ বইটি হাতে আসে। গ্রন্থটিতে মার্কেসের বাইশটি গল্প তিন দশকের মোড়কে বাঙালি বিশেষ করে বাংলাদেশি পাঠক দরবারে পেশ করেছিলেন তিনি। তার অনূদিত গল্পগ্রন্থটি কেমন ছিল সেটা আলাদা করে না বলে আজকের বই আলোচনায় তার ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করব। যাই হোক, প্রথম বইটা পড়ে আঁচ করে নিয়েছিলাম তিনি মার্কেসের গল্পসমগ্র তৈরি করতে যাচ্ছেন। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তার জীবদ্দশায় ঊনচল্লিশটি গল্প লিখেছিলেন। সুরাইয়া ফারজানা হাসান ‘তিন দশকের গল্পে’ তার বাইশটি গল্প অনুবাদ করেছিলেন, আর এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০’তে প্রকাশিত ‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নির্বাসিত জীবনের গল্প’তে অনুবাদ করেছেন বাকি সতেরোটি। অর্থাৎ দুটি গল্প সংকলনের মাধ্যমে তিনি মার্কেসের গল্পসমগ্র প্রকাশ করে ফেলেছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তিনি মার্কেস বিষয়ে আটঘাট বেঁধে নেমেছেন। এতদিন বাঙালি পাঠক মার্কেস বলতে মূলত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাটিকেই দেখেছে বা পড়েছে। উপন্যাসটি বাজারে চার-পাঁচজন অনুবাদকের হাত ধরে এসেছে। এ ক্ষেত্রে সুরাইয়া ফারজানা হাসান ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। তিনি লেখকের গতানুগতিক জনপ্রিয় উপন্যাসের জায়গায় বেছে নিয়েছেন মার্কেসের কিছু অজানা গল্প ও উপন্যাসিকা।

অনুবাদক সুরাইয়া ফারজানা হাসান বরাবরই মূল গল্পের প্রতি অনুগত এবং বিশ্বস্ত। প্রথম বইটি বাজারে প্রচলিত অনুবাদের তুলনায় মানোত্তীর্ণ হলেও এবার তার অনুবাদে যোগ হয়েছে এক বিশেষ উৎকৃষ্টতা যা নিয়ে একটু পরে বলছি। অনুবাদের ব্যাপারে বইটির ভূমিকায় সুরাইয়া ফারজানা হাসান কৈফিয়ত দিয়েছেন, ভাষাগত দক্ষতার অভাবে তিনি মূল স্প্যানিশের জায়গায় পেঙ্গুইন পাবলিকেশন প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদ থেকে গল্পগুলো ভাষান্তর করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে তিনি প্রতিটা শব্দ এমনকি যতিচিহ্ন পর্যন্ত হুবহু গ্রহণ করেছেন। এতে কোথাও কোথাও ছন্দপতনের সুর বেজে উঠলেও, তিনি সহজাত ভাষার দক্ষতা দিয়ে ভালোভাবেই সামাল দিয়েছেন।

সুরাইয়া ফারজানা হাসানের অনুবাদের বৈশিষ্ট্য হল, তিনি বাংলাভাষার প্রয়োগের ব্যাপারটা মোটামুটি জিরো টলারেন্স পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সচেতনভাবে চেষ্টা করেছেন বাংলা শব্দের সফল প্রয়োগ এবং অহেতুক ইংরেজি শব্দের অপব্যবহার থেকে মুক্ত থাকতে। ভাষার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সুরাইয়া ফারজানা হাসান ভীষণভাবে সমকালীন হলেও কোথাও কোথাও ভাষার প্রাচীন রূপের আশ্রয় নিয়েছে। তাই তার লেখনীতে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে সুরুয়া, পানশালা, শয়নকক্ষ, বিশ্রামকক্ষ, আরাম কেদারা এমনকি কোমরবন্ধ পর্যন্ত। এতে পাঠক সাময়িকভাবে একটু ধাক্কা খেলেও গল্পগুলোর সময়-কাল বিবেচনায় পরবর্তী পাঠে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। অনুবাদে শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে নান্দনিকতার পাশাপাশি পরিমিতবোধ তার ভাষান্তরের প্রধান শক্তি বলে আমার মনে হয়েছে। অনুবাদকের এ নিজস্বতার কারণে তার লেখনীকে সমসাময়িক অন্যান্য লেখকের অনুবাদ থেকে আলাদা করা যায়। তার অনুবাদে মার্কেস হারিয়ে যান না বরং বিপুলভাবে বঙ্গীয় সাহিত্যে ফিরে আসেন। অর্থাৎ বইটি মার্কেসের গল্পের অনুবাদ হলেও, সুরাইয়া ফারজানার নিজস্ব স্বর অনুপস্থিত নয়।

এবার নির্বাসিত জীবনের কিছু গল্পে ফিরে আসি। গ্রন্থের সূচনা গল্পটি যাত্রা শুভ হোক, মাননীয় রাষ্ট্রপতি একজন ক্ষমতাচ্যুত, নির্বাসিত লাতিন আমেরিকার শাসকের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিদারুণ দুঃখ যন্ত্রণার মাধ্যমে দিনাতিপাতের কাহিনী। গল্পের ঠাসবুনন কাহিনী পাঠককে, ব্যথিত আচ্ছন্ন করে রাখে। দ্বিতীয় গল্প ‘সন্ত’তে আন্দিজ অঞ্চল থেকে আগত মার্গারিতোকে, মৃত কন্যার ‘সন্ত’ হিসেবে পোপের আখ্যা পাওয়ার আশায় রোম শহরের অলিতে গলিতে বাইশটি বছর ঘুরে ফিরতে দেখি। কন্যার স্বীকৃতি আদায়ে তার এ নিরলস প্রচেষ্টা দেখে মনে হবে সে বুঝি নিজেই সন্ত বনে গেছে। চতুর্থ গল্প ‘আমি স্বপ্ন বেচে ফিরি’ গল্পে আছে এক বিশেষ চমক। গল্পটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভিয়েনায় বসবাসরত এক পেশাদার স্বপ্নচারী লাতিন নারী ফ্রাউফিডার স্বপ্নের মাধ্যমে ভবিষ্যদ্বাণী করে জীবিকা নির্বাহ, সমাজে প্রতিপত্তি লাভ ও নির্মম পরিণতির কাহিনী হলেও, সেখানে এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে চিলের রাজনীতিবিদ ও কবি পাবলো নেরুদাকে পাওয়া যায়। গল্পটিকে মার্কেসের সঙ্গে নেরুদার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ধরা যেতে পারে। এভাবে নির্বাসিত জীবনের গল্পগুলো এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে এসে যায়, মার্কেসের বিখ্যাত উপন্যাসিকা ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লিখেনি’। গল্পটি যুদ্ধ ফেরত এক কর্নেলের অবসর ভাতার চিঠির অপেক্ষায় দরিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধের এক নিরন্তর প্রচেষ্টার কাহিনী।

সবশেষে, সুরাইয়া ফারজানা হাসান অনূদিত বইটির পাঠতৃপ্তির ব্যাপারে অতি উচ্ছ্বাস প্রকাশনা করে, পাঠে যে স্বস্তি পেয়েছি তাতে বলব, গ্রন্থটি মনে রাখার মতো, সংগ্রহে রাখার মতো।

এমরান হোসেন

নির্বাসিত জীবনের গল্প

ভাষান্তর সুরাইয়া ফারজানা হাসান

প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ প্রকাশক সময় প্রকাশন

মূল্য ৪৮০ টাকা

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত