কলাভৃৎ

  সাইফুর রহমান ০৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কমলা রঙা রোদ সদর রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বৃহৎ ছাতিম গাছটার মগডাল ছুঁয়ে সবেই অস্ত গেছে। ঠিক তখনই ‘সংবাদ প্রতিদিন’ পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে সদর রাস্তায় এসে দাঁড়ায় দানিয়েল।

তার দৃষ্টি তখন যাত্রীবিহীন ধাবমান যে কোনো একটি রিকশার প্রতি। হঠাৎ করেই প্রাইভেট কারটি বিগড়ে গেল এভাবে! ভাবতেই পারছে না দানিয়েল। ড্রাইভার বেচারা বেশ কয়েকবার স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল বটে কিন্তু প্রতিবারই গাড়িটা গোঁ গোঁ শব্দ তুলে মৃগী রোগীর মতো কেঁপে কেঁপে থেমে গেল। সে জানে জীবনে নিরবচ্ছিন্ন সুখ বলে কিছু নেই। চলার পথে নানা রকম সুবিধা অসুবিধা অতিক্রম করেই মানুষকে এগোতে হয়। বাঁধা বিপত্তি আছে, থাকবে কিন্তু তাই বলে কী গাড়িটাকে আজই নষ্ট হতে হবে। সময় পেল না আর। নতুন গাড়ি। বছর দুয়েক আগেই কেনা।

দানিয়েল ভাবে- ড্রাইভার ব্যাটার কারসাজি নয়তো? ড্রাইভারটি নতুন, মাসখানেক ধরে চালাচ্ছে। স্বভাব চরিত্র যে কেমন? কিছুই জানা নেই তার। বারবার হাতঘড়ি দেখে দানিয়েল। চ্যানেল ফাইভে ঠিক সাতটার রেকর্ডিং। আল্লাহই জানে কী আছে আজ কপালে। ঈষৎ দূরে একটি খালি রিকশা গোচরীভূত হতেই সেটাকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করে সে।

রিকশাওয়ালা কাছে এসে দানিয়েলকে উদ্দেশ করে বলল- কোথায় যাবেন ভাই? দানিয়েল অস্ফুট কণ্ঠে বলল- ভাই! চ্যানেল ফাইভে যাব, যাবেন? রিকশাওয়ালার চটপট জবাব- যাব, উঠে বসুন। দরদস্তুর করতে ইচ্ছা করল না দানিয়েলের। কত নেবে জিজ্ঞেস করলেই রিকশাওয়ালা হয়তো এমন ভাড়া হাঁকবে শুনে মাথায় রক্ত উঠে যাবে। টাকার জন্য নয় বরং অন্যায্য দাবির জন্য।

মাথায় রক্ত বরং গন্তব্যে পৌঁছে উঠুক। রিকশাওয়ালা তাকে ভাই বলে কেন সম্বোধন করল, বুকের ভেতর খচখচ করতে লাগল দানিয়েলের। বিলেত ফেরত ব্যারিস্টার সে, প্র্যাকটিস করে সুপ্রিম কোর্টে। সেটা না হয় বাদ থাক। শরীরে তো আর লেখা থাকে না কে জজ আর কে ব্যারিস্টার। রিকশাওয়ালার সেটা জানারও কথা নয়। পোশাক আশাকে সবসময় ধোপাদুরস্ত একজন মানুষ সে, আজ পরেছে অ্যাশ কালারের ওপর হালকা কালো স্ট্রাইপ করা জমকালো একটি স্যুট, স্যুটের পকেটে সুদৃশ্য স্কয়ার। শরীরে মেখেছে ফরাসি এসেন্স।

আধ মাইল দূর পর্যন্ত যার সুগন্ধ ভুর ভুর করে ভেসে যায়। তারপরও রিকশাওয়ালার মন ভরল না, স্যারের বদলে ভাই! কেমন যেন এক ধরনের স্নায়বিক অস্বস্তি হতে লাগল দানিয়েলের। যদিও সে একজন সাম্যবাদী মানুষ। কলেজ জীবনে ছাত্র ইউনিয়ন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মার্কসবাদ লেলিনবাদ দর্শনে। তখন মনে হতো মার্কসবাদ ও লেলিনবাদেই নিহিত আছে নীপিড়িত মানুষের চূড়ান্ত মুক্তি। পরিণত বয়সে সে দর্শনে অবশ্য চিড় ধরলেও এ জগতের সব মানুষ যে সমান সে বিষয়ে তার বিশ্বাস এখনও হিমালয়ের মতোই উত্তুঙ্গ ও দৃঢ়।

মানুষজন তাকে ভাই বলল না স্যার বলল এসব বিষয় সে একেবারেই গায়ে মাখে না। অন্য সময় হলে এ রকম তুচ্ছ বিষয় হয়তো তার কান অনায়াসে এড়িয়ে যেত। সে নিজেও ব্যক্তিগতভাবে ছোট বড় সবাইকে প্রথমে আপনি করে সম্বোধন করে। কিন্তু আজ তার মেজাজটাই বিগড়ে দিয়েছে সংবাদ প্রতিদিনের সাহিত্য সম্পাদক। দিন চারেক পর পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী । তিন দিনের মধ্যে একটি লেখা লিখে দিতে হবে সে উপলক্ষে।

সম্ভ্রমের সঙ্গে দানিয়েল সাহিত্য সম্পাদককে অনুরোধ করেছিল লেখাটি অন্য কাউকে দিয়ে লেখাতে। কিন্তু মাসুদ মনসুর বিপন্ন কণ্ঠে বলল- ‘যথার্থ লোক পাওয়া যাচ্ছে না ভাই। তা না হলে আপনাকে এমন করে অনুরোধ করতাম না। আপনিই এখন শেষ ভরসা।’ অনুরোধে ঢেঁকি গিলতে হল ঠিকই কিন্তু এখন সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। মাত্র দু’দিনে যে কীভাবে লেখাটা তৈরি করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। সমস্যা হল ভেবেচিন্তে ছাড়া কোনো লেখাই লিখতে পারে না দানিয়েল। কোনো লেখা শুরুর আগে দু-চার দিন শুধু ব্রেইন স্টোর্মিং করতে হয় তাকে। আধাসেদ্ধ, আধপোড়া লেখা কিছুতেই নিতে চায় না সে পাঠকের পাতে। সে যত কষ্টই হোক তার। এসব চিন্তা করতে গিয়ে দানিয়েলের মনে পড়ল সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর কিছু কথা। তিনি তার এক লেখায় আক্ষেপ করে লিখেছেন- ‘ভাগ্যিস সাহিত্যের বাজারে পুলিশ, হোমগার্ডের দৌরাত্ম্য নেই। তাহলে ভেজাল সাহিত্য পরিবেশনের দায়ে কত লোককে যে জেল খাটতে হতো কে জানে?’

তার অনুভূতিতে সূক্ষ্ম এই আঘাতপ্রাপ্তির ক্ষেত্রটি যেন আগেই তৈরি করে দিয়েছে মাসুদ মনসুর। সে যাক, তবে দানিয়েল কিন্তু খুবই আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করল রিকশাওয়ালা ছেলেটি কথা বলছে শুদ্ধ বাংলা ও প্রমিত উচ্চারণে। তার কণ্ঠস্বর মার্জিত ও উচ্চারণ স্পষ্ট। শুধু কথাবার্তাতেই নয় ছেলেটির পোশাক পরিচ্ছেদও অন্যান্য রিকশাওয়ালাদের তুলনায় ভিন্ন। বেশিরভাগ রিকশাওয়ালা সাধারণত লুঙ্গি পরে রিকশা চালায়। কিন্তু এ ছেলেটি পরেছে খাটো একটি প্যান্ট। হালজামানার ছেলেপুলে যাকে ‘থ্রি কোয়ার্টার’ বলে সে রকম কিছু। ঊর্ধাঙ্গে কুচকুচে কালো রঙের হুডিওয়ালা সোয়েটশার্ট।

হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বলে মাথাটি হুডি দিয়ে ঢাকা। রিকশাওয়ালা রিকশা চালাচ্ছে আস্তে আস্তে। জোরে প্যাডেল চালালে রিকশাওয়ালা বেচারার শীতও কম লাগত সেই সঙ্গে গন্তব্যেও দ্রুত পৌঁছানো যেত। রিকশা চালাতে চালাতে রিকশাওয়ালা দানিয়েলকে জিজ্ঞেস করল- ভাই, আপনি কি সাংবাদিক? দানিয়েল বলল- না, রিকশাওয়ালা ঈষৎ দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল- ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো চাকরি করেন সংবাদ প্রতিদিন পত্রিকায়।’ দানিয়েল সহাস্যে বলল- ‘আমি সাংবাদিক নই, তবে লেখালেখি করি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।’

দানিয়েল রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করল- আপনার কী নাম? দীর্ঘ জ্যামের সারিতে রিকশার গতি স্লথ হতেই মাথাটি ঈষৎ ঘুরিয়ে সন্তর্পণে হুডিটা মাথা থেকে ঘাড়ে ফেলে দানিয়েলকে উদ্দেশ করে রিকশাওয়ালা বলল- ‘আমার নাম সোহরাব।’ দানিয়েল এই প্রথম রিকশাওয়ালার মুখাবয়বটি দেখতে পেল। লম্বাটে ধরনের মুখ। বয়স মেরেকেটে পঁচিশ। এই এক অদ্ভুত বিষয়, মানুষের মুখ না দেখে বয়স আন্দাজ করা বেশ দুষ্কর। চুল ধূসরায়মান ও ঈষৎ বিস্তৃত। মুখের ছাদ তাম্রাভ হলেও দৃষ্টি উজ্জ্বল। বাহ্ বেশ সুন্দর নাম তোমার সোহরাব। অর্থবহ নাম। তোমাকে তুমি করে বললাম, কিছু মনে করো না। তুমি বয়সে আমার অনেক ছোট হবে। কণ্ঠে হাসি ফুটিয়ে সোহরাব বলল- কী যে বলেন ভাই, আমাদের মতো মানুষদের বেশিরভাগ মানুষই তো তুই করে বলে। আপনি তো তবুও শুরুতে আপনি করে বলেছেন। তা ছাড়া বয়সে আমি তো আপনার অনেক ছোটই হব। আমার বয়স এখন বাইশ।

চলার পথে, হাট-বাজারে, ডাক্তার, সেলুন কিংবা অফিসের অভ্যর্থনা কেন্দ্রে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে অর্থহীন সংলাপ দানিয়েলের বিশেষ পছন্দ নয়। জনস্রোতের মধ্যেও দানিয়েলের সময় কাটে নিরিবিলি, চিন্তামগ্ন। অধিকাংশ সময়ই তার আপনমনে শব্দহীনভাবে ব্যাপৃত। কিন্তু সোহরাব নামের এ ছেলেটি প্রথম থেকেই আজ তার দৃষ্টি আকর্ষিত করেছে। আচরণে কোথাও জড়তা নেই। নেই এতটুকু আরষ্টতা।

রিকশা ধীরগতিতে চললেও মৃদুবাতাসে শরীর শিহরিত হচ্ছে। চারদিকে গাঢ় শীতের আমেজ। ফুটপাতগুলোতে সারি সারি ফ্লুরোসেন্টের বাতি জ্বেলে শীতবস্ত্র বিক্রি করছে দোকানি। কয়েকটা নেড়িকুকুর মাথা ঘষছে রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপে। কিছুটা উষ্ণতা পেতে দানিয়েল হাতে হাত ঘষল কয়েকদফা। পান্থপথ পৌঁছে রিকশাটি যখন ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে তখনই মাঝবয়সী এক মহিলা সামনে এসে হাত পাতল দানিয়েলের সামনে। কোলে ছোট্ট একটি শিশু। দানিয়েল বেশ ভালো করেই জানে এদের মধ্যে সিংহভাগ-ই স্বেচ্ছাভিক্ষুক।

আবেগী মানুষের সহমর্মিতা পেতে এরা কোলে কাঁকালে তপঃক্লিষ্ট, শীর্ণদেহ, অনাহারক্লিষ্ট, অসহায় ও উলঙ্গ শিশু নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। দানশীল হিসেবে তার সুখ্যাতি না থাকলেও উচ্চকণ্ঠে ভিখারিদের শাপ-শাপান্ত করে একটি পয়সাও ভিক্ষা দেন না দানিয়েল সেসব মানুষের দলে পড়ে না। খিস্তি খেউড় তার মুখে আসে না। সম্ভ্রমের সঙ্গে সেসব ভিক্ষুকদের ফিরিয়ে দেয় দানিয়েল। অন্ধ, খঞ্জ ও বিকলাঙ্গ ভিক্ষুক ছাড়া দানিয়েল কাউকে ভিক্ষা দেন না।

মহিলাটিকে হাত দিয়ে ইশারা করে অন্য দিকে যেতে বলল। রিকশাটি চলতে শুরু করতেই দানিয়েল টের পেল কুয়াশায় ভিজে যাচ্ছে তার মাথার কেশ। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল দানিয়েল। নিকষ কালো অন্ধকার। কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয়া কিংবা তৃতীয়া হবে হয়তো। তারাগুলো জ্বলছে মিটমিট করে। হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা আকাশ, এ জন্যই হয়তো তারাগুলোকে মলিন দেখাচ্ছে আজ। দানিয়েল জানে গ্রীষ্মকালে আকাশ ভর্তি অসংখ্য নক্ষত্র-ই কীভাবে অন্ধকারে রঙমশালের আলোর মতো ধিকধিক করে জ্বলে। দানিয়েলের গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গে।

কত অজস্র রজনী কেটেছে বাঙোবাড়ির ছাদে আকাশের দিকে মুখ করে। নক্ষত্ররাজির সে কি রূপ! দানিয়েল আকাশে ধ্রুবতারাটা খুঁজতে লাগল। দানিয়েল জানে এপ্রিল-মে’র দিকে ধ্রুবতারাটা উত্তর আকাশের শেষ প্রান্ত হতে নেমে আসে বেশ কিছুটা নিচের দিকে। কিন্তু ডিসেম্বরে সেই ধ্রুবতারা-ই উঠে যায় উত্তর আকাশের একেবারে ওপরে। সব তারা সব মাসে এক জায়গায় থাকে না। একেক মাসে তারাদের আকাশের একেক স্থানে দেখা যায়। দানিয়েল ভেবে অবাক হয় পৃথিবীর সব মানুষ সূর্য ও চন্দ্র একসঙ্গে দেখতে পেলেও সব নক্ষত্র সবাই দেখতে পায় না। যেমন উত্তর গোলার্ধের মানুষ ধ্রুবতারা বছরের সব সময়-ই দেখতে পায়, এ জন্যই এটা ধ্রুবতারা। কিন্তু দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষ বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ ধ্রুবতারা দেখতে পায় না। ধ্রুবতারার আরেকটু নিচে উত্তর পশ্চিমে সপ্তর্ষিমণ্ডলের অবস্থান। সপ্তর্ষিমণ্ডলের তারাগুলোকেও দেখতে পায় না দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষ। আবার দক্ষিণ গোলার্ধের, দক্ষিণ কীরিট মণ্ডলের নক্ষত্রগুলো উত্তর গোলার্ধের মানুষ দেখতে পায় না। কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের অবস্থান বিষুবরেখা বরাবর বলে এ তারাদের উত্তর ও দক্ষিণ উভয় গোলার্ধের মানুষই সমানভাবে দেখতে পায়। কালপুরুষের কথা মনে হতেই দানিয়েলের মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের কথা। একবার রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রবীন্দ্রনাথকে ডেকে বললেন- ‘আজকাল তুমি নাকি আর শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে থাকছো না।’

রবীন্দ্রনাথ ঈষৎ আড়ষ্ট কণ্ঠে বললেন- ‘বাবামশাই, কুঠিবাড়ির চেয়ে আমার পদ্মাবোটেই থাকতে বেশি ভালো লাগে। রাতের অন্ধকারে আকাশ ভর্তি হাজার হাজার তারার মেলা বসে। তাদের সে কী সৌন্দর্য! আপনাকে কী করে বোঝাই।’ দেবেন্দ্রনাথ বললেন- ‘কেন, তুমি যখন ছোট ছিলে তখন সেই যে মৌসুরীর পাহাড়ে বসে আমিও তো তোমাকে তারা দেখাতাম। তোমার কী মনে নেই?’ রবীন্দ্রনাথ সহাস্য কণ্ঠে বললেন- ‘থাকবে না আবার, বেশ মনে আছে। আপনিই তো আমাকে কালপুরুষ চিনিয়েছিলেন।’

দেবেন্দ্রনাথ বললেন- ‘ওটার একটা ইংরেজি নামও তোমাকে শিখিয়েছিলাম, মনে আছে? রবীন্দ্রনাথ বললেন- মনে আছে, অরিয়ন (Orion)। দেবেন্দ্রনাথ এবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন- ‘তবে কালপুরুষ নিয়ে যে মিথটা চালু আছে সেটা ভেবেই আমি ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কালপুরুষের প্রভাব যার ওপর পড়ে সে নাকি গৃহত্যাগী হয়। সেটাই তো আমার ভয়।

তবে রবীন্দ্রনাথ দেশান্তরী কিংবা সন্ন্যাসী কোনোটাই হননি। দানিয়েল লক্ষ করেছে অরিয়ন নামে ঢাকায় বেশ কয়েকটা জুতার আউটলেট আছে। তাহলে কি অরিয়ন কোম্পানির জুতা পরে মানুষ গৃহত্যাগী হবে? দানিয়েল ভাবে সপ্তর্ষিমণ্ডলের ইংরেজি নামটিও তো বেশ অদ্ভুদ ‘সেভেন বিয়ার্স’ অর্থাৎ সপ্তভাল্লুক। অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে ওঠে দানিয়েলের ঠোঁটে। এই সেভেন বিয়ার্স নামকরণটাও হয়েছিল অদ্ভুদভাবে। ভারতবর্ষে এই সপ্তর্ষিমণ্ডল সাতটি ঋষির নামে অঙ্কিত। দানিয়েল তারাগুলোর নাম মনে করার চেষ্টা করল। ক্রতু, পুলহ, অত্রি, বশিষ্ঠ, মরীচি। আর দুটো যেন কী..! অনেক চেষ্টা করেও দুটো নাম কিছুতেই মনে করতে পারল না।

তবে ঋষি বশিষ্ট কে চিনতে পারল দানিয়েল। এত নিশ্চয়ই সেই বিখ্যাত ঋষি বশিষ্ট যার কাছে রামায়ণের রাজা দশরথ তার চার ছেলে রাম, লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘ্নদের শিক্ষা নেয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। সে যা হোক, প্রাচীন ভারতে এদের বলা হতো ঋক্ষ। ঋক্ষ শব্দ থেকেই পরে ঋখি এবং তা থেকে ঋষি শব্দটি এসেছে। ঋক্ষ শব্দের মানে তারা হয়, আবার ভল্লুকও হয়। বিশেষ করে দীনেশচন্দ্রের কথা মনে পড়ল দানিয়েলের।

দীনেশচন্দ্র সেনের মতে- ঋষি শব্দটি হিন্দি ভাষাভাষিরা ‘ঋখি’ বলে উচ্চারণ করে। সেই প্রাচীন যুগে আরব গ্রন্থকারেরা হিন্দু জ্যোতিষবিদ্যার বই অনুবাদ করার সময় ঋখি শব্দ নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়লেন। তারা অভিধান খুলে দেখলেন ‘ঋক্ষ’ শব্দের অর্থ ভল্লুক। সুতরাং, তাদের তর্জমায় সপ্তর্ষিমণ্ডল সপ্তভল্লুকে পরিণত হল। ক্রমে আরব থেকে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল সপ্তভল্লুক কাহিনী।

শীতের প্রকোপটাকে অগ্রাহ্য করতেই হয়তো সোহরাব গুনগুন করে গান গাইতে লাগল- আমার সারা দেহ খেও গো মাটি...। দানিয়েল বিস্মিত কণ্ঠে বলল- বাহ! অপূর্ব সুন্দর গায়কী কণ্ঠ তোমার সোহরাব। সত্যি সত্যি বেশ অভিভূত হল দানিয়েল। আস্কারা পেয়ে সোহরাব বলল- আচ্ছা তাহলে আরেকটা শোনাই। সে এবার কণ্ঠ ছাড়ল আরও জোরে- আকাশের হাজার তারার ভিড়ে আমি কোথাও খুঁজে পেলাম না তোকে...। আহা কী মিষ্টি কণ্ঠ। লব্ধ প্রতিষ্ঠিত শিল্পীকেও যেন হার মানায়। সোহরাব হঠাৎ কেন এ তারার গানটিই গাইল। তবে কি দানিয়েল আকাশে যখন তারা দেখছিল সোহরাব লক্ষ করেছে সেটা। ‘তোমার তো দেখছি দারুণ প্রতিভা সোহরাব’- অনেকটা অভিভূত কণ্ঠে বলল দানিয়েল। সোহরাব পুলকিত গলায় বলল- ‘রিকশা চালানোর পাশাপাশি আমি অনেক স্টেজ প্রোগ্রামও করি। তবে ঢাকায় না, আমার দেশের বাড়ি জামালপুরে।

এখন তো শীতকাল, মফস্বল শহরে ওয়াজ-জলসা-ই বেশি হয়। তবে হঠাৎ হঠাৎ ফোন আসে জামালপুর থেকে, তখন চলে যাই। অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরে আসি ঢাকায়।’ কৌতূহলী হয়ে দানিয়েল জিজ্ঞেস করল- ‘সম্মানী পাও না কিছু?’ ‘অল্প কিছু পাই। মফস্বল শহর তো হাজার, দু’হাজার যে যেমন পারে দেয়। ইউটিউবেও আমার নিজের চ্যানেল আছে। সোহরাব হোসেন নামে সার্চ করলেই পাবেন।’

স্মার্ট ফোনে সার্চ করতে গিয়ে সোহরাবের ফেসবুক ও ইউটিউব দুটোই পাওয়া গেল। ওরেব্বাস!!! তোমার গানে তো দেখছি লাখ লাখ ভিউ। ফেসবুক খুলে দেখা গেল সোহরাব হোসেন নামের এই রিকশাচালক ছেলেটির বিভিন্ন গানের পোস্টে টু’কে, থ্রি’কে লাইক। শত শত মন্তব্য। দানিয়েল বিস্ফারিত নেত্রে বলল- ‘আরে, তুমিতো দেখছি অনেক বড় সেলিব্রেটি। লোকে বলে আমি নাকি মোটামুটি ভালোই লিখি। তারপরও কোনো লেখা ফেসবুকে পোস্ট করলে এক-দেড়শ’র বেশি লাইক পাওয়া যায় না। আর মন্তব্য হয়তো কুড়িয়ে বাড়িয়ে গোটা কয়েক, এই আমার সম্বল। তুমি তো দেখছি অনেক বড় স্টার। অনেক বড় কলাকার।’ সোহরাব হোসেন বলল- ভাই, আপনি তো একজন লেখক। আমাকে নিয়ে লেখেন না কিছু। কথা বলতে বলতে গন্তব্যে এসে পৌঁছানো গেল। দানিয়েল জিজ্ঞেস করল- ভাড়া কত দেব বল।

সোহরাব স্মিত হেসে বলল- ভাড়া তো হয় একশত টাকা। আপনি একজন লেখক আমিও একজন গায়ক। আপনাকে তো একটু ডিসকাউন্ট দিতেই হয়। আপনি আশি টাকা দিন। সোহরাবের কথায় ভ্রমান্ধ ঘটে দানিয়েলের। তাই তো! সত্যিই তো!! তারা দু’জনেই তো কলাভৃৎ। সোহরাব বরং যতটা তার প্রাপ্য তার চেয়ে কম পেয়েও সে দানিয়েলের চেয়ে ঢের বেশি জনপ্রিয়। সে তো ডিসকাউন্ট পাওয়ার যোগ্য হকদার-ই বটে।

ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে দানিয়েল পা বাড়ায় মূল ফটকের দিকে। সোহরাব পেছন দিক থেকে দানিয়েলকে উদ্দেশ করে বলল- সত্যি আমাকে নিয়ে লিখবেন তো ভাই। দানিয়েল মুখ ফিরিয়ে ঈষৎ হেসে বলল- আকাশের তারা নিয়ে এত এত লেখা হয় আর জমিনের তারা নিয়ে লিখব না, তা কী হয়। অবশ্যই লিখব।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত