মকবুলা মঞ্জুর

চেনা জীবনের অচেনা আদল

  আহমেদ বাসার ১০ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের জীবনালেখ্যকেন্দ্রিক উপন্যাস ‘কালের মন্দিরা’র জন্য আলোচিত হলেও মকবুলা মঞ্জুর বাংলা সাহিত্যের একজন বহুমাত্রিক নির্মাণ কুশলী। সাহিত্যিক জীবনের সূচনা মূলত কবিতা দিয়ে। মাত্র আট বছর বয়সে দৈনিক আজাদে প্রকাশিত হয় তার ছড়া ও কবিতা। ঠিক যখন অষ্টাদশী তখন গদ্য সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে ওঠেন। যার প্রেম ও পরিচর্যায় আমৃত্যু নিমগ্ন ছিলেন। গল্প-উপন্যাস-শিশুসাহিত্য এমনকি চিরায়ত সাহিত্যের সাবলীল রূপায়ণে তার দক্ষতা অনস্বীকার্য। কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন আমাদের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বিরূপ বাস্তবতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের নব নব উত্থান। নারীর সমস্যাসঙ্কুল জীবনবাস্তবতার এক রক্তক্ষত আদল দৃশ্যমান হতে থাকে তার সৃষ্টিবিশ্বে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো নারীর জন্য নির্মাণ করেছে অন্য বাস্তবতা। এডওয়ার্ড সাঈদ কথিত প্রাচ্যের প্রতি পাশ্চাত্যের দৃষ্টিতে আদার হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর মতো নারীও আমাদের সমাজে অনেকটা ভিন্ন বাস্তবতায় বেড়ে ওঠে। ক্ষমতাকাঠামোর বিভিন্ন কেন্দ্রে নারীর অবস্থান সত্ত্বেও সাধারণ নারীর জীবনবাস্তবতায় বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। মকবুলা মঞ্জুর তার সৃজনবিশ্বে তুলে আনেন সেসব নারীর আর্তি ও আর্তনাদ। ‘ওরা কাজ করে’ গ্রন্থে রাবু ও তার মা রহিমার জীবন সংগ্রাম আমাদের মর্মমূলে নাড়া দেয়। লেখকের ভাষায়- ‘এইসব গরিব ঘরের ঝি বউদের খাটুনির কোন হিসাব-নিকাশ নাই। তারা ঘরে খাটে তবু সেটা নিজের সংসার। কিন্তু তালুকদার বাড়ি অথবা সরকার বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালেই তারা বান্দী তারা কামের বেটি। সেখানে তাদের মান-ইজ্জত দূরে থাক কোনো মায়া মহব্বৎও নেই তাদের জন্য’।

এ বাস্তবতায় বেড়ে ওঠা রাবু ‘তার শৈশব থেকেই উপলব্ধি করে ফেলেছে গরিব বাপমায়ের সংসারে কলমি শাকের তরকারি দিয়ে আধপেটা ভাত খেয়েও রাবুর ষোড়শী শরীরটা যেমন সদ্যফোটা কলমি লতার মতো লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে তেমনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তার ঘন কালো চোখজোড়া।’ রাবুর চূড়ান্ত স্বপ্ন কোনো দয়াবান মানুষের চোখে মূল্যবান হয়ে ধরা দেয়া। অধিকাংশ নিুবিত্ত অসহায় নারীর স্বপ্নও হয়তো তাই। যদিও সেটি অনেক ক্ষেত্রে অধরাই থেকে যায়।

মকবুলা মঞ্জুরের গল্পে নিত্যদিনের চেনা জীবনের গল্প এক অচেনা আদল নিয়ে জেগে ওঠে। দৈনন্দিন জরাজীর্ণ জীবন সোঁদা ঘ্রাণ নিয়ে প্রলেপবিহীন আকৃতিতে এখানে রোরুদ্যমান। ‘এখানে রাত্রির গান’ গল্পে জসীমের জীবনবাস্তবতা এভাবে উঠে আসে- ‘খাওয়া নিয়ে জসীম আহমেদের কোন বাছ-বিচার নেই। থাকার কথাও নয়। জীবনের চারভাগের একভাগ যার স্থায়ী ঠিকানা ছিল হয় কেন্দ্রীয় কারাগার, না হয় নিষিদ্ধ গোপন আস্তানা তার খাদ্য বিলাসী হবার সুযোগই বা হলো কখন?’

শিশুসাহিত্যে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘ছোটদের মহাভারত’ এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। মহাকাব্য ‘মহাভারত’ শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে অনেকেই রচনা করেছেন। কিন্তু অন্যরা যেখানে সাধু ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন, মকবুলা মঞ্জুর সেখানে চলিত ভাষায় সহজবোধ্য শব্দের সাহায্যে ছোটদের জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তুলেছেন। তার রচিত কিশোর উপন্যাস ‘ডানপিঠে ছেলে’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র।

রেডিও-টেলিভিশনের জন্য তিনি বেশ কিছু নাটকও লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ- শিয়রে নিয়ত সূর্য, অচেনা নক্ষত্র, এই পথ এই প্রেম, মাতৃঋণ, প্রমত্ত প্রহর, গল্প পঞ্চাশৎ, নদীতে অন্ধকার, একটাই জীবন, কিশোরসমগ্র প্রভৃতি। প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রন্থের এ রচয়িতা লাভ করেছেন বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। বাংলা একাডেমি পুরস্কার(২০০৫), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার(২০০৭), জাতীয় আর্কাইভ ও গ্রন্থাগার শ্রেষ্ঠগ্রন্থ পুরস্কার(১৯৯৭) ও বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার(১৯৮৪) প্রভৃতি।

ব্যাংকার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তার স্বপ্ন ছিল শিক্ষকতার। তাই ব্যাংকের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে প্রায় অর্ধেক বেতনে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে দ্বিধা করেননি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রায় পঁচিশ বছর তিনি বেগম পত্রিকার ফিচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া দৈনিক আজাদ পত্রিকার ফিচার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছিলেন। পারিবারিকভাবেও তিনি লেখালেখির একটি চমৎকার পরিবেশ পেয়েছিলেন। তার বাবা মিজানুর রহমান লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অন্যান্য ভাইবোনদের মধ্যে মোখলেসুর রহমান ও আজিজ মেহের ছিলেন প্রাবন্ধিক। আর ভাই ইবনে মিজান আলোচিত চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন। কিশোরী বয়সে তিনি নাটকে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। বিখ্যাত চিত্রকর কামরুল হাসান প্রতিষ্ঠিত মুকুল ফৌজের সঙ্গেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন।

বাংলাভাষার প্রতি তার অপরিসীম দরদ ছাত্রজীবন থেকেই দৃশ্যমান। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তখন তিনি বিন্দুবাসিনী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী। থাকতেন স্কুল হোস্টেলে। স্কুলের গেট ভেঙে অন্যদের সঙ্গে তিনি মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। মিছিল থেকে ফিরে আসার পর তাদের আর স্কুলে ঢুকতে দেয়া হয়নি।

প্রগতিশীল ও দৃঢ়চেতা মানসিকতা, বিচিত্র সৃষ্টিকর্ম এবং ভাষাসৌকর্যের জন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন- একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত