যতীন সরকারের নজরুল
jugantor
যতীন সরকারের নজরুল

  রাজীব সরকার  

২৮ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্যয়ী প্রাবন্ধিক ও মেধাবী সাহিত্যসমালোচক হিসেবে মননশীল পাঠকদের কাছে যতীন সরকার খ্যাতিমান। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাদের সম্পর্কে তার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী প্রবন্ধগুলো আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে রচিত ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’ গ্রন্থটি ইতোমধ্যেই দুই বাংলায় প্রশংসা অর্জন করেছে। এই ধারায় তার সাম্প্রতিকতম সংযোজন ‘আমার নজরুল অবলোকন।’

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সাহিত্য সাধনায় নজরুলকে নিয়ে রচিত ষোলোটি প্রবন্ধের সমাহার এ সংকলন। ‘নজরুল চর্চায় বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসের প্রয়োগ: কতিপয় প্রস্তাব’ প্রবন্ধটিতে নজরুল-সমালোচকদের সংস্কারগ্রস্ত মানসিকতার স্বরূপ উদঘাটন করেছেন যতীন সরকার। ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, নন্দনতাত্ত্বিক নানা ধরনের কুসংস্কার নজরুলের প্রকৃত মূল্যায়নে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। এমনকি মার্কসবাদী সমালোচকরাও নজরুলের উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে পারেনি। পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানের মূল সূত্রটি ব্যাখ্যা করে তিনি সুষ্ঠু নজরুল চর্চার জন্য তিনটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। অখণ্ড বাঙালি ঐতিহ্যকে ধারণ করার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জনকারী নজরুল সম্পর্কে সমালোচকদের অনুদার দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরেছেন লেখক।

‘কথক মনীষী বিনয় সরকারের নজরুল মূল্যায়ন’ প্রবন্ধটিতে নজরুল সম্পর্কে অলোকসামান্য মূল্যায়নের পরিচয় মেলে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও বহুশাস্ত্রবিদ বিনয় সরকার তার বিখ্যাত সাহিত্য আড্ডাগুলোতে প্রখর অন্তর্দৃষ্টিময় কথা বলেছেন বছরের পর বছর ধরে। তার সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথকরূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘বিনয় সরকারের বৈঠকে’ নামক দুই খণ্ডের বইয়ে। নজরুল প্রতিভার প্রকৃত স্বরূপ এ মনীষী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। যতীন সরকার সেই মনীষীরই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন-

‘বিনয় সরকার বাঙালিদের ভেতর কোনো খাঁটি হিন্দু, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি মুসলমান বা খাঁটি খ্রিস্টানের সন্ধান পাননি। তার মতে, বাঙালি হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রিস্টান-সবার আসল ধর্ম হল ‘বাঙালি ধর্ম’। এ বাঙালি ধর্মেরই পরিচয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কবি নজরুলের মধ্যেও। নজরুলের রচনায় যে হিন্দু-মুসলমান পৌরাণিক ঐতিহ্যের অনায়াস ও ঐকত্রিক উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায় সেটি বাঙালি ধর্মেরই অনুসৃতির পরিচায়ক।’

‘অখণ্ড নজরুলের খণ্ডীকরণ’ প্রবন্ধে যতীন সরকার বলেছেন-

‘নজরুলের কবিতার ‘ঈশান বিষাণের ওঙ্কার’টি যাদের পরিচিত, ‘ইস্রাফিলের শিঙার মহাহুঙ্কার’ তাদের কাছে একান্তই তাৎপর্যহীন। ‘রক্তাম্বর ধারিণী মা’র প্রশস্তি কিংবা ‘আনন্দময়ী’র প্রতি নিবেদিত পঙ্ক্তিমালা তাদের আনন্দিত করলেও ‘ফাহেতা-ই-দোয়াজ-দহন’ কিংবা ‘কোরবানী’র মতো কবিতা তেমনভাবে তাদের চিত্তস্পর্শী হতে পারেনি। নজরুলের শ্যামাসংগীত বা বৈষ্ণবভাবাশ্রিত গানগুলো যাদের প্রীত করেছে, তার হামদ নাত বা ইসলামী সংগীতগুলোকে যে তারা তেমন আপন ভাবতে পারেনি, সে কথাও মিথ্যা নয়।

আবার হিন্দুদের তুলনায় অনেক বিলম্ব উদ্ভূত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের মানস প্রতিবদ্ধ সৃষ্টি হয়েছে অন্যদিক থেকে। তাদের কাছে সমন্বয়ী বাঙালিত্বের চেয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য-চেতনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে কারণেই নজরুলের কাছে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ‘মুসলিম সাহিত্য’ দাবি করেছে, তার কবিতায় হিন্দুপুরাণের ব্যবহারকে তারা ভালো চোখে দেখেনি। রক্ষণশীল ও গোঁড়া মুসলমানদের দৃষ্টিতে তো তিনি ‘কাফের’ই হয়ে উঠেছেন। তাই, শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত হিন্দুর মতো স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলমানরাও নজরুলের খণ্ডীকরণেই প্রবৃত্ত হলেন, তার সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাঙালি সত্তাটিকে আড়াল করে তাকে ‘মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি’ বলে প্রতিনিয়ত প্রচার করে চললেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে যাদের অবস্থান, সেই বামপন্থীরাও নজরুলের অখণ্ডরূপটি অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী নজরুলের গুণগ্রাহী অবশ্যই। কিন্তু তার রচনায় ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহারটির সঠিক তাৎপর্য তারা বুঝে উঠতে পারেনি। তারই ফলে বামপন্থী সমালোচকদের হাতেও ঘটে নজরুলের আরেক রকম খণ্ডীকরণ।’

‘নজরুল ও সমাজতন্ত্র’ প্রবন্ধে যতীন সরকার দেখিয়েছেন ইসলামী ও হিন্দু উভয় ঐতিহ্য থেকে নজরুল সাম্যের বাণী গ্রহণ করেছেন। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে নজরুলের জীবনদর্শনের এই একাত্মতা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে লেখক নজরুল মূল্যায়নে অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘নজরুলের চৈতন্যে আইন, বিচার ও রাষ্ট্রনীতি।’ বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাবলগ্ন থেকেই নজরুল স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। কবিতায়, সংবাদপত্রের বারুদগন্ধী নিবন্ধে তিনি মুক্তির মন্ত্রে উদ্দীপিত করেছেন পাঠকদের। গণবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। সাম্প্রদায়িক কোনো রাষ্ট্রবিধান নয়, নজরুলের কাম্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। উপমহাদেশের দুই বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানদের উৎসব নিয়ে নজরুল যুগান্তকারী কবিতা লিখেছেন। উৎসব মানে নিছক ভোগবিলাস নয়, উৎসবের মূল কথা হচ্ছে সম্মিলন-মানুষে মানুষে সম্মিলন। ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে নজরুলের কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যতীন সরকার দেখিয়েছেন যে অত্যাচারীদের উৎখাত করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই উৎসবের লক্ষ্য। এভাবেই উৎসবে বিপ্লবী শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছেন নজরুল। সংবিধানে গৃহীত মূলনীতিগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপূরক। সেই নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নজরুলের স্বপ্ন যে অপূর্ণই রয়ে যাবে তা যৌক্তিক ব্যাখ্যাসহ লেখক উপস্থাপন করেছেন ‘মানবজমিনে চাষাবাদ, কবি নজরুল ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে।

গতানুগতিক নজরুল সমালোচনার বাইরে ‘আমার নজরুল অবলোকন’ নজরুল মূল্যায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় বইটি এদেশে সুষ্ঠু নজরুল চর্চার ধারাকে বেগবান করবে।

যতীন সরকারের নজরুল

 রাজীব সরকার 
২৮ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্যয়ী প্রাবন্ধিক ও মেধাবী সাহিত্যসমালোচক হিসেবে মননশীল পাঠকদের কাছে যতীন সরকার খ্যাতিমান। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্রষ্টাদের সম্পর্কে তার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী প্রবন্ধগুলো আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় সৃষ্টিসম্ভার নিয়ে রচিত ‘আমার রবীন্দ্র অবলোকন’ গ্রন্থটি ইতোমধ্যেই দুই বাংলায় প্রশংসা অর্জন করেছে। এই ধারায় তার সাম্প্রতিকতম সংযোজন ‘আমার নজরুল অবলোকন।’

পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের সাহিত্য সাধনায় নজরুলকে নিয়ে রচিত ষোলোটি প্রবন্ধের সমাহার এ সংকলন। ‘নজরুল চর্চায় বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসের প্রয়োগ: কতিপয় প্রস্তাব’ প্রবন্ধটিতে নজরুল-সমালোচকদের সংস্কারগ্রস্ত মানসিকতার স্বরূপ উদঘাটন করেছেন যতীন সরকার। ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, নন্দনতাত্ত্বিক নানা ধরনের কুসংস্কার নজরুলের প্রকৃত মূল্যায়নে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। এমনকি মার্কসবাদী সমালোচকরাও নজরুলের উপযুক্ত মূল্যায়ন করতে পারেনি। পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানের মূল সূত্রটি ব্যাখ্যা করে তিনি সুষ্ঠু নজরুল চর্চার জন্য তিনটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। অখণ্ড বাঙালি ঐতিহ্যকে ধারণ করার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জনকারী নজরুল সম্পর্কে সমালোচকদের অনুদার দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরেছেন লেখক।

‘কথক মনীষী বিনয় সরকারের নজরুল মূল্যায়ন’ প্রবন্ধটিতে নজরুল সম্পর্কে অলোকসামান্য মূল্যায়নের পরিচয় মেলে। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও বহুশাস্ত্রবিদ বিনয় সরকার তার বিখ্যাত সাহিত্য আড্ডাগুলোতে প্রখর অন্তর্দৃষ্টিময় কথা বলেছেন বছরের পর বছর ধরে। তার সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী কথকরূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘বিনয় সরকারের বৈঠকে’ নামক দুই খণ্ডের বইয়ে। নজরুল প্রতিভার প্রকৃত স্বরূপ এ মনীষী অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। যতীন সরকার সেই মনীষীরই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেছেন-

‘বিনয় সরকার বাঙালিদের ভেতর কোনো খাঁটি হিন্দু, খাঁটি বৌদ্ধ, খাঁটি মুসলমান বা খাঁটি খ্রিস্টানের সন্ধান পাননি। তার মতে, বাঙালি হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-খ্রিস্টান-সবার আসল ধর্ম হল ‘বাঙালি ধর্ম’। এ বাঙালি ধর্মেরই পরিচয় তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কবি নজরুলের মধ্যেও। নজরুলের রচনায় যে হিন্দু-মুসলমান পৌরাণিক ঐতিহ্যের অনায়াস ও ঐকত্রিক উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায় সেটি বাঙালি ধর্মেরই অনুসৃতির পরিচায়ক।’

‘অখণ্ড নজরুলের খণ্ডীকরণ’ প্রবন্ধে যতীন সরকার বলেছেন-

‘নজরুলের কবিতার ‘ঈশান বিষাণের ওঙ্কার’টি যাদের পরিচিত, ‘ইস্রাফিলের শিঙার মহাহুঙ্কার’ তাদের কাছে একান্তই তাৎপর্যহীন। ‘রক্তাম্বর ধারিণী মা’র প্রশস্তি কিংবা ‘আনন্দময়ী’র প্রতি নিবেদিত পঙ্ক্তিমালা তাদের আনন্দিত করলেও ‘ফাহেতা-ই-দোয়াজ-দহন’ কিংবা ‘কোরবানী’র মতো কবিতা তেমনভাবে তাদের চিত্তস্পর্শী হতে পারেনি। নজরুলের শ্যামাসংগীত বা বৈষ্ণবভাবাশ্রিত গানগুলো যাদের প্রীত করেছে, তার হামদ নাত বা ইসলামী সংগীতগুলোকে যে তারা তেমন আপন ভাবতে পারেনি, সে কথাও মিথ্যা নয়।

আবার হিন্দুদের তুলনায় অনেক বিলম্ব উদ্ভূত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের মানস প্রতিবদ্ধ সৃষ্টি হয়েছে অন্যদিক থেকে। তাদের কাছে সমন্বয়ী বাঙালিত্বের চেয়ে মুসলিম স্বাতন্ত্র্য-চেতনাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সে কারণেই নজরুলের কাছে শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত ‘মুসলিম সাহিত্য’ দাবি করেছে, তার কবিতায় হিন্দুপুরাণের ব্যবহারকে তারা ভালো চোখে দেখেনি। রক্ষণশীল ও গোঁড়া মুসলমানদের দৃষ্টিতে তো তিনি ‘কাফের’ই হয়ে উঠেছেন। তাই, শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত হিন্দুর মতো স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলমানরাও নজরুলের খণ্ডীকরণেই প্রবৃত্ত হলেন, তার সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাঙালি সত্তাটিকে আড়াল করে তাকে ‘মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি’ বলে প্রতিনিয়ত প্রচার করে চললেন। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে যাদের অবস্থান, সেই বামপন্থীরাও নজরুলের অখণ্ডরূপটি অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা বিদ্রোহী ও সাম্যবাদী নজরুলের গুণগ্রাহী অবশ্যই। কিন্তু তার রচনায় ধর্মীয় অনুষঙ্গের ব্যবহারটির সঠিক তাৎপর্য তারা বুঝে উঠতে পারেনি। তারই ফলে বামপন্থী সমালোচকদের হাতেও ঘটে নজরুলের আরেক রকম খণ্ডীকরণ।’

‘নজরুল ও সমাজতন্ত্র’ প্রবন্ধে যতীন সরকার দেখিয়েছেন ইসলামী ও হিন্দু উভয় ঐতিহ্য থেকে নজরুল সাম্যের বাণী গ্রহণ করেছেন। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে নজরুলের জীবনদর্শনের এই একাত্মতা উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে লেখক নজরুল মূল্যায়নে অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

এ বইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘নজরুলের চৈতন্যে আইন, বিচার ও রাষ্ট্রনীতি।’ বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাবলগ্ন থেকেই নজরুল স্বাধীনতার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন। কবিতায়, সংবাদপত্রের বারুদগন্ধী নিবন্ধে তিনি মুক্তির মন্ত্রে উদ্দীপিত করেছেন পাঠকদের। গণবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রতন্ত্রের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন তিনি। সাম্প্রদায়িক কোনো রাষ্ট্রবিধান নয়, নজরুলের কাম্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র। উপমহাদেশের দুই বৃহৎ ধর্মীয় সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানদের উৎসব নিয়ে নজরুল যুগান্তকারী কবিতা লিখেছেন। উৎসব মানে নিছক ভোগবিলাস নয়, উৎসবের মূল কথা হচ্ছে সম্মিলন-মানুষে মানুষে সম্মিলন। ধর্মীয় উৎসব সম্পর্কে নজরুলের কবিতার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে যতীন সরকার দেখিয়েছেন যে অত্যাচারীদের উৎখাত করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই উৎসবের লক্ষ্য। এভাবেই উৎসবে বিপ্লবী শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছেন নজরুল। সংবিধানে গৃহীত মূলনীতিগুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপূরক। সেই নীতির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নজরুলের স্বপ্ন যে অপূর্ণই রয়ে যাবে তা যৌক্তিক ব্যাখ্যাসহ লেখক উপস্থাপন করেছেন ‘মানবজমিনে চাষাবাদ, কবি নজরুল ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে।

গতানুগতিক নজরুল সমালোচনার বাইরে ‘আমার নজরুল অবলোকন’ নজরুল মূল্যায়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নিঃসন্দেহে বলা যায় বইটি এদেশে সুষ্ঠু নজরুল চর্চার ধারাকে বেগবান করবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন