বজ্রকণ্ঠে পরশপাথর ছোঁয়া
jugantor
বজ্রকণ্ঠে পরশপাথর ছোঁয়া

  মোসা. সেলিনা আকতার  

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘এ নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন মহান শাশ্বত সাবলীল মোহাচ্ছন্ন উক্তি যার কণ্ঠে নিঃসৃত হয় তার হৃদয় কতটা বিশাল আর সে হৃদয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কতটা অপরিমেয় ভালোবাসা থাকে তা নিঃসন্দেহে অনুমেয়।

জেলা প্রশাসন পটুয়াখালীর মহতী উদ্যোগে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উত্তাল মার্চে প্রকাশিত হয় ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলনটি। বইটির মোড়ক উন্মোচন হয় শোকাবহ আগস্টে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে। এ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল আগামী প্রজন্মের হাতে বইটি তুলে দেয়া।

‘বজ্রকণ্ঠ’ বইটিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রসহ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণের ১০টি সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিটি ভাষণের প্রেক্ষাপট ও তেজোদীপ্ততা অনন্য। প্রতিটি ভাষণে বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি ভাষণই শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করার অশ্রু। এর মাধ্যমে ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন হয়েছে, রাজনীতির পটপরিবর্তন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের সঙ্গে মিশে আছে বজ্রের ধ্বনি, আলোকের দ্যোতি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো নিজেকে তেজোদীপ্ত করার সৌম্যহনী শক্তি। বজ্রের আকাশ বিদারী শব্দে যেমন সব জীবমণ্ডল প্রকম্পিত হয় তেমনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণে আন্দোলিত হতো মানুষের অন্তরাত্মা।

বিশেষ করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে উজ্জীবিত করার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি শব্দে রয়েছে এক ঐন্দ্রজালিক শক্তি। রেসকোর্স ময়দানে সেদিন ১০ লাখ লোক আনন্দ উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও ৯ মাসে সেই অসম যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে অস্ত্রপাতি-গোলাবারুদ আর প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা তো ছিলই।

কিন্তু এসব কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল কখনও নষ্ট হয়নি। ওই কঠিন সময়ে মনোবলের টনিক হিসেবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ, ৭ মার্চের ভাষণ। সে যে কী অবিনাশী শিহরণ আর উত্তেজনা শরীর মনে সৃষ্টি হতো তা কেবলই প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার নিরন্তর মনের বীণায় বাজে। যুগের পরিক্রমায় সে শিহরণ এখনও চির নবীন, চির অম্লান। এ যেন বজ্রকণ্ঠ! তাই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ সংকলন বইটির নামকরণ ‘বজ্রকণ্ঠ’ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সার্থক হয়েছে। ভেতরের মহান মানুষটির তেজোদীপ্ত স্বকীয়তা আর তার নাম ভূমিকার সঙ্গে প্রচ্ছদে ৭ মার্চের অঙ্গুলিহেলনির ছবি সংযোজন বইটির নামকরণের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।

‘এই উদযাপনের লক্ষ্যে দ্যোতনায় দ্রোহে-শিল্প-সংগ্রামে-দায়িত্ব পালনে জাতির পিতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চার করে’- বইটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী পটুয়াখালী জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরীর বইটিতে দেয়া তার বাণীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে লেখা এ লাইনে বইটি প্রকাশের অভিপ্রায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন জাতির পিতার সেই আদর্শ পৌঁছে দিতে হবে সর্বস্তরের জনগণের মাঝে। বইটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এখানে সংকলিত প্রতিটি ভাষণ ডান পৃষ্ঠা থেকে প্রকাশনা শুরু করা হয়েছে এবং ঐতিহাসিক কালজয়ী প্রতিটি ভাষণ প্রকাশের পূর্বে ভাষণটির পটভূমি চৌম্বক পয়েন্টে তুলে ধরা হয়েছে; যা পাঠককে বইটি পড়ার ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দেয়, পাঠকের তথ্য ভাণ্ডারকে করে আরও সমৃদ্ধ।

বইটির যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে, তাহল প্রতিটি পাতায় পরম মমতায় শ্রদ্ধেয় পিতার জলছাপ। সুমসৃণ গ্লোসি পাতায় প্রিয় পিতার জলছাপের ছবি দেখে বার বার পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় হাত বুলানোর ইচ্ছে আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে আর অবুঝমন যেন বলে উঠে-

পিতার এ ছবি,/এ তো কোন ছবি নয়!

এ যেনো অবিরত, মোর সাথে কথা কয়!

বইটিতে বঙ্গবন্ধুর অমর কথাশৈলীর কালজয়ী হাজারও ভাষণের মধ্য থেকে ১০টি নির্ধারণ এবং তাদের সন্নিবেশনের ক্রমবিন্যাসে নিপুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদনা পর্ষদ। প্রচ্ছদ ও মুদ্রণে বরিশালের মাস্টার গ্রাফিক্স শৈল্পিক ও আন্তরিকতার ছাপ রেখেছে প্রতিটি পাতায় পাতায়। পরিমিত কলেবরে সুন্দর বিন্যাস বইটিকে করেছে আকর্ষণীয়। তবে আমি মনে করি, বইটির আকার আরেকটু বড় হলে আরও বেশি দৃষ্টিনন্দন ও আরও বেশি গুরুত্ব বহন করত।

বইটির সম্মুখ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের লোগো সন্নিবেশন বইটিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। ইতঃপূর্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ লাখ ছাত্রছাত্রীর মাঝে ১০ লাখ বৃক্ষের চারা বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে জেলা প্রশাসন কর্তৃক একটি ঝকঝকে স্মরণিকা ‘বঙ্গবন্ধুর স্মরণে, সবুজের শরণে’ প্রকাশ করার এমন ব্যতিক্রমধর্মী মহতী উদ্যোগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

তখন আমার মনে হয়েছিল এ যেন চারা নয়, এ যেন জাতির পিতার ১০ লক্ষ মেসেজ পৌঁছে গেল ৫ লাখ বাড়ির আঙ্গিনায়। পিতার আদর্শের এ চারা গাছটি একদিন পত্র-পল্লবে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে মহিরুহে পরিণত হবে প্রতিটি পরিবারের আঙ্গিনায়। প্রত্যেক মহান মানুষই তার প্রতিচ্ছবি দেখতে চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে। সেই সঙ্গে তার বাসনা থাকে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার। প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে এ কথা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করেন বইটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী। তার চেতনায় আর মননে রয়েছে জাতির পিতার আদর্শ।

তিনি উপলব্ধি করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। কেবল যাদের মাধ্যমে পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কেননা আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের ভবিষ্যৎ; যাদের মনে এখনও কোনো কলুষতা আসেনি। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথার প্রতি আগ্রহ সহকারে ঝুঁকছে। তারা জানতে চায় এত বড় কঠিন ও দীর্ঘ সংগ্রামের মহান নেতা কে ছিলেন?

তারা আরও জানতে চায় কী সে দর্শন, আদর্শ ও চেতনা; যা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। জানতে চায় সেই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি গৌরবগাথার উজ্জ্বল কাহিনী। তাই নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলতে জেলা প্রশাসন, পটুয়াখালী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘বজ্রকণ্ঠ’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলন বইটি উৎসর্গ করেন। যাতে মুজিবের রক্তস্নাত বাংলার মাটিতে আগামী প্রজন্ম ছুঁয়ে থাকুক পরশপাথর। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির কাছে যেন পরশপাথর হিসেবে উদ্ভাসিত।

এ শোষিত-বঞ্চিত জাতির ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয় এ পরশপাথরের ছোঁয়ায়। আর সেই মহান পরশপাথরের স্পর্শে প্রতিটি তেজোদীপ্ত তারুণ্য শক্তি আরও শানিত হোক, নিজেকে গড়ে তুলুক আলোকিত মানুষ হিসেবে, নিয়োজিত হোক সোনার বাংলা গড়ার মহান ব্রতে। এমন মহান অভিপ্রায়ে ‘বজ্রকণ্ঠ’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলনটি প্রকাশ করায় জেলা প্রশাসন, পটুয়াখালীর প্রতি জানাই আন্তরিক মোবারকবাদসহ সীমাহীন কৃতজ্ঞতা।

বজ্রকণ্ঠে পরশপাথর ছোঁয়া

 মোসা. সেলিনা আকতার 
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘এ নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালোবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে’- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এমন মহান শাশ্বত সাবলীল মোহাচ্ছন্ন উক্তি যার কণ্ঠে নিঃসৃত হয় তার হৃদয় কতটা বিশাল আর সে হৃদয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কতটা অপরিমেয় ভালোবাসা থাকে তা নিঃসন্দেহে অনুমেয়।

জেলা প্রশাসন পটুয়াখালীর মহতী উদ্যোগে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উত্তাল মার্চে প্রকাশিত হয় ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলনটি। বইটির মোড়ক উন্মোচন হয় শোকাবহ আগস্টে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে। এ অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল আগামী প্রজন্মের হাতে বইটি তুলে দেয়া।

‘বজ্রকণ্ঠ’ বইটিতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রসহ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণের ১০টি সংযোজন করা হয়েছে। প্রতিটি ভাষণের প্রেক্ষাপট ও তেজোদীপ্ততা অনন্য। প্রতিটি ভাষণে বাঙালির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস মূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে। প্রতিটি ভাষণই শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করার অশ্রু। এর মাধ্যমে ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন হয়েছে, রাজনীতির পটপরিবর্তন হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠের সঙ্গে মিশে আছে বজ্রের ধ্বনি, আলোকের দ্যোতি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো নিজেকে তেজোদীপ্ত করার সৌম্যহনী শক্তি। বজ্রের আকাশ বিদারী শব্দে যেমন সব জীবমণ্ডল প্রকম্পিত হয় তেমনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণে আন্দোলিত হতো মানুষের অন্তরাত্মা।

বিশেষ করে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্রে উজ্জীবিত করার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রতিটি শব্দে রয়েছে এক ঐন্দ্রজালিক শক্তি। রেসকোর্স ময়দানে সেদিন ১০ লাখ লোক আনন্দ উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠেছিল। মুক্তিযোদ্ধারা শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও ৯ মাসে সেই অসম যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার সঙ্গে অস্ত্রপাতি-গোলাবারুদ আর প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা তো ছিলই।

কিন্তু এসব কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল কখনও নষ্ট হয়নি। ওই কঠিন সময়ে মনোবলের টনিক হিসেবে কাজ করেছে বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ, ৭ মার্চের ভাষণ। সে যে কী অবিনাশী শিহরণ আর উত্তেজনা শরীর মনে সৃষ্টি হতো তা কেবলই প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার নিরন্তর মনের বীণায় বাজে। যুগের পরিক্রমায় সে শিহরণ এখনও চির নবীন, চির অম্লান। এ যেন বজ্রকণ্ঠ! তাই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক কালজয়ী ভাষণ সংকলন বইটির নামকরণ ‘বজ্রকণ্ঠ’ অত্যন্ত যৌক্তিক ও সার্থক হয়েছে। ভেতরের মহান মানুষটির তেজোদীপ্ত স্বকীয়তা আর তার নাম ভূমিকার সঙ্গে প্রচ্ছদে ৭ মার্চের অঙ্গুলিহেলনির ছবি সংযোজন বইটির নামকরণের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার।

‘এই উদযাপনের লক্ষ্যে দ্যোতনায় দ্রোহে-শিল্প-সংগ্রামে-দায়িত্ব পালনে জাতির পিতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চার করে’- বইটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী পটুয়াখালী জেলার সুযোগ্য জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরীর বইটিতে দেয়া তার বাণীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে লেখা এ লাইনে বইটি প্রকাশের অভিপ্রায় সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

তিনি অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেন জাতির পিতার সেই আদর্শ পৌঁছে দিতে হবে সর্বস্তরের জনগণের মাঝে। বইটির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল এখানে সংকলিত প্রতিটি ভাষণ ডান পৃষ্ঠা থেকে প্রকাশনা শুরু করা হয়েছে এবং ঐতিহাসিক কালজয়ী প্রতিটি ভাষণ প্রকাশের পূর্বে ভাষণটির পটভূমি চৌম্বক পয়েন্টে তুলে ধরা হয়েছে; যা পাঠককে বইটি পড়ার ক্ষুধা আরও বাড়িয়ে দেয়, পাঠকের তথ্য ভাণ্ডারকে করে আরও সমৃদ্ধ।

বইটির যে দিকটি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে, তাহল প্রতিটি পাতায় পরম মমতায় শ্রদ্ধেয় পিতার জলছাপ। সুমসৃণ গ্লোসি পাতায় প্রিয় পিতার জলছাপের ছবি দেখে বার বার পরম শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় হাত বুলানোর ইচ্ছে আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে আর অবুঝমন যেন বলে উঠে-

পিতার এ ছবি,/এ তো কোন ছবি নয়!

এ যেনো অবিরত, মোর সাথে কথা কয়!

বইটিতে বঙ্গবন্ধুর অমর কথাশৈলীর কালজয়ী হাজারও ভাষণের মধ্য থেকে ১০টি নির্ধারণ এবং তাদের সন্নিবেশনের ক্রমবিন্যাসে নিপুণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সম্পাদনা পর্ষদ। প্রচ্ছদ ও মুদ্রণে বরিশালের মাস্টার গ্রাফিক্স শৈল্পিক ও আন্তরিকতার ছাপ রেখেছে প্রতিটি পাতায় পাতায়। পরিমিত কলেবরে সুন্দর বিন্যাস বইটিকে করেছে আকর্ষণীয়। তবে আমি মনে করি, বইটির আকার আরেকটু বড় হলে আরও বেশি দৃষ্টিনন্দন ও আরও বেশি গুরুত্ব বহন করত।

বইটির সম্মুখ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের লোগো সন্নিবেশন বইটিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। ইতঃপূর্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ লাখ ছাত্রছাত্রীর মাঝে ১০ লাখ বৃক্ষের চারা বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে জেলা প্রশাসন কর্তৃক একটি ঝকঝকে স্মরণিকা ‘বঙ্গবন্ধুর স্মরণে, সবুজের শরণে’ প্রকাশ করার এমন ব্যতিক্রমধর্মী মহতী উদ্যোগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।

তখন আমার মনে হয়েছিল এ যেন চারা নয়, এ যেন জাতির পিতার ১০ লক্ষ মেসেজ পৌঁছে গেল ৫ লাখ বাড়ির আঙ্গিনায়। পিতার আদর্শের এ চারা গাছটি একদিন পত্র-পল্লবে ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে মহিরুহে পরিণত হবে প্রতিটি পরিবারের আঙ্গিনায়। প্রত্যেক মহান মানুষই তার প্রতিচ্ছবি দেখতে চায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মাঝে। সেই সঙ্গে তার বাসনা থাকে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার। বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার। প্রজাতন্ত্রের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হয়ে এ কথা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করেন বইটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নকারী জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী। তার চেতনায় আর মননে রয়েছে জাতির পিতার আদর্শ।

তিনি উপলব্ধি করেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা। কেবল যাদের মাধ্যমে পিতার আদর্শ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কেননা আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের ভবিষ্যৎ; যাদের মনে এখনও কোনো কলুষতা আসেনি। এছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম মুক্তি সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথার প্রতি আগ্রহ সহকারে ঝুঁকছে। তারা জানতে চায় এত বড় কঠিন ও দীর্ঘ সংগ্রামের মহান নেতা কে ছিলেন?

তারা আরও জানতে চায় কী সে দর্শন, আদর্শ ও চেতনা; যা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। জানতে চায় সেই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি গৌরবগাথার উজ্জ্বল কাহিনী। তাই নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে, তাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলতে জেলা প্রশাসন, পটুয়াখালী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘বজ্রকণ্ঠ’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলন বইটি উৎসর্গ করেন। যাতে মুজিবের রক্তস্নাত বাংলার মাটিতে আগামী প্রজন্ম ছুঁয়ে থাকুক পরশপাথর। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির কাছে যেন পরশপাথর হিসেবে উদ্ভাসিত।

এ শোষিত-বঞ্চিত জাতির ভাগ্যাকাশে স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হয় এ পরশপাথরের ছোঁয়ায়। আর সেই মহান পরশপাথরের স্পর্শে প্রতিটি তেজোদীপ্ত তারুণ্য শক্তি আরও শানিত হোক, নিজেকে গড়ে তুলুক আলোকিত মানুষ হিসেবে, নিয়োজিত হোক সোনার বাংলা গড়ার মহান ব্রতে। এমন মহান অভিপ্রায়ে ‘বজ্রকণ্ঠ’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সংকলনটি প্রকাশ করায় জেলা প্রশাসন, পটুয়াখালীর প্রতি জানাই আন্তরিক মোবারকবাদসহ সীমাহীন কৃতজ্ঞতা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন