মহামারী পুরনো ধারণাগুলো সত্য হিসেবে প্রমাণ করে
jugantor
মহামারী পুরনো ধারণাগুলো সত্য হিসেবে প্রমাণ করে
সাক্ষাৎকারে অমিতাভ ঘোষ

  যুগান্তর ডেস্ক  

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মহামারী পুরনো ধারণাগুলো সত্য হিসেবে প্রমাণ করে

অমিতাভ ঘোষ (জন্ম ১৯৫৬) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা ঘোষ দিল্লি এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৯ সালে অমিতাভ সিটি ইউনিভার্সিটি অভ নিউইয়র্কের কুইন্স কলেজে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এ ছাড়া তিনি ২০০৫ সাল থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন খণ্ডকালীন অধ্যাপক। অমিতাভ ঘোষ এ পর্যন্ত ৬টি উপন্যাস লিখেছেন। সর্বশেষ সি অভ পপিজ উপন্যাসটি ব্রিটিশ-চীনের আফিম যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। ২০০৪ সালে প্রকাশিত দ্য হাংগ্রি টাইড সুন্দরবনের পটভূমিকাতে লেখা।

১৯৯০ সালে রচিত দ্য শ্যাডো লাইন উপন্যাসের জন্য অমিতাভ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে রচিত ক্যালকাটা ক্রোমোজোমের জন্য পান আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার।

২০০৭ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১৮ সালে তিনি ৫৪তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৯ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো নির্বাচিত হন।

একটি ইতালীয় সংবাদপত্রকে সাম্প্রতিক সময়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে লেখক কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন এবং এ সংকটকালে সাহিত্য ঠিক কীভাবে এ পরিবর্তিত বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে সম্পর্কে বিষদ বলেছেন। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং ‘হতাশজনক রাজনীতি’, এ বিশ্ব-ব্যবস্থাগুলো আমাদের এই সংকটময় সময়কে প্রভাবিত করছে কি? জলবায়ু সংকট, মহামারী এবং অভিবাসন সংকট এ তিনটি ক্ষেত্রে কোনো মিল আছে কি? এসব বাস্তবতার চিত্রে সাহিত্যের ভূমিকা কতটুকু?

অমিতাভ ঘোষ এ সাক্ষাৎকারে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো এবং আরও অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ঘোষের সর্বশেষ উপন্যাস, গান আইল্যান্ড ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অস্থিতিশীল বাস্তবতা, জলবায়ুর বিঘ্নতা এবং বাধ্যতামূলক অভিবাসনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারীর আলোকে এ বাস্তবতাগুলো একে অপরের সঙ্গে যে সংযুক্ত তা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

ইতালিয়ান সংস্করণ ইল ম্যানিফেস্টো পত্রিকায় প্রকাশিত এই

সাক্ষাৎকারটির বাংলায়ন করেছেন মুসাররাত নওশাবা।

আপনার সর্বশেষ উপন্যাস ‘গান আইল্যান্ড’-এর গল্পে বিশ্বের জলবায়ুর সমস্যা ও বর্ধমান স্থানচ্যুতির ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্য বর্তমানে পরিণত হয়। অতীতে, আপনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় যেভাবে সাহিত্যের মাত্রায় তুলে এনেছেন, সেটা শেষ পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, ম্যাজিক বা রহস্যজাতীয় গল্পে পরিণত হয়েছে।

যদিও বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা নিয়ে শিল্পমাধ্যমে কাজের অভাব কেন? কার্যত এ বিষয়টা এক সময় ভবিষ্যৎ চিন্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এটাই আমাদের বর্তমান অবস্থা নয় কি? আপনি কি মনে করেন যে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করা হবে? বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো সাহিত্যে অনুল্লিখিত থেকে যাওয়াই কি তার পরিণতি হবে?

: আমি ‘গান আইল্যান্ড’কে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কিত বই বলে মনে করি। আমি মনে করি এখানে আসল প্রশ্নটা হল, কেন এ বাস্তবতা আমাদের অনেকের জন্য অনুমোদিত?

সাধারণত, লেখকদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে ভবিষ্যৎ পরিণতির সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে আমি অতীতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি। আমার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এমন কিছু না যেটা কেবল গত ত্রিশ বছরের মধ্যেই ঘটেছে। এ ঘটনার একটা দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যা আমাদের অতীতের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। ‘গান আইল্যান্ড’ লেখার সময় আমি এ প্রসঙ্গটা নিয়ে চিন্তা করেছি।

এই মহামারীর ক্ষেত্রে, আমি মনে করি না যে এটা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সাহিত্যের বিষয় থেকে সরে যাবে। হারিকেন স্যান্ডি সম্পর্কে খুব কম গল্প-উপন্যাস আছে যেটা ২০১২ সালে নিউইয়র্কে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং এ ঘটনা সম্পর্কে এ পর্যন্ত মোটেও কিছু জানা যায়নি যেমনটা জানা যায়নি হারিকেন হার্ভে সম্পর্কে যেটা হিউস্টনকে ২০১৩ সালে বিধ্বস্ত করেছিল।

তবে আমার ধারণা যে এবার উপন্যাসের ঢেউ উঠবে এ মহামারী সম্পর্কে ঠিক যেমন ৯/১১-এর পর ছিল। ইতিহাসের হিসাবে মহামারীতে প্রচুর লেখনী সৃষ্টি হয়েছে। ইতালি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ইতালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্মগুলোর দুটি মহামারীর সময়েই লেখা হয়, বোকাসিয়রের ‘দ্য ডেকামেরন’ আর মানজোনির ‘দ্য বিট্রোথড’।

বিজ্ঞান ও সাহিত্য এক সময় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। বর্তমানে এত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল কেন? এদের পূণর্মিলনের কোনো উপায় আছে কি? আপনি কি বিশ্বাস করেন যে এটা বর্তমান সংকটকালে জনমনে কার্যকর প্রভাব ফেলবে?

: এটা ঠিক যে সাহিত্য যে কোনো সংকট নিয়ে জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে আমি মনে করি না যে কোনো লেখককে শুধু এ ব্যাপারটা মাথায় রেখেই লেখা শুরু করা উচিত। তাহলে তা অনেকটা প্রচারণার মনে হবে, যেটা কার্যকর হবে বলে মনে করি না। মানুষকে শুধু শিক্ষিত করার জন্য বা তাদের মত বদলানোর উদ্দেশ্যে কিছু লিখলে সেটা বিভ্রান্তিকর হয়। প্রকৃত ঘটনাই যদি কারোর চিন্তার পরিবর্তন না ঘটাতে পারে, কোন উপন্যাস কীভাবে সেই পরিবর্তন আনবে?

অন্যদিকে, আমি অনুভব করি লেখার মাধ্যমে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো উচিত। এ ধারণার অধীনে আমি আরও মনে করি যে, অবশ্যই আমাদের সম্মিলিত সংকটগুলো নিয়ে লিখতে হবে, তবে সেটা মানুষের মত পরিবর্তন বা শুধু প্রচারণামূলক লেখনী তৈরির প্রয়াসে নয়, সে চেষ্টা আদতে নিরর্থক হবে।

জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়গুলোর একটি হল একে প্রযুক্তিগত- বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এ সম্বন্ধে আমরা যা কিছু পড়ি তার প্রায় সবই বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে। অথচ কেবল বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাই যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা লক্ষ্য করছেন তা কিন্তু নয়।

বিশ্বের যে কোনো দেশের কৃষক ও জেলেদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করলে আপনি জানতে পারবেন যে তারাও লক্ষ্য করছে এ জলবায়ুর পরিবর্তন, তারাও চিন্তা করছে এ বিষয় নিয়ে। এসব কৃষক, জেলে বা যে সব মহিলারা জল আনতে রোজ পাঁচ মাইল পথ হাঁটে তাদের কথা না শুনে আমরা বিজ্ঞানীদের কথা বেশি শুনি কারণ তারা তাদের ভাষ্য গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে না।

অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা একটা শক্ত কাঠামোর অংশ হিসেবে আছেন এবং তাদের ভাষ্যগুলো বিশেষজ্ঞের মতামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমার মনে কেবল বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরাই যে প্রকৃতি নিয়ে ভাবে না সেটা অনুভব করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যক্রমে উপন্যাসিকেরা যখন প্রাকৃতিক জগৎ নিয়ে লেখেন তাদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে।

আপনার ‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’ বইয়ে লিখেছেন যে জলবায়ু সংকট এক ধরনের সংস্কৃতির সংকট সেই সঙ্গে চিন্তার সংকটও। মহামারীর ক্ষেত্রেও এটা কি সত্য? আপনি কি মনে করেন যে জলবায়ু সংকট, সংস্কৃতির সংকট ও মহামারী উদ্ভূত সংকট এরা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত?

: এ সংকটগুলোর সঙ্গে আমি আরও একটা নাম যুক্ত করতে চাই তা হল ‘অভিবাসন সংকট’, এরা সবাই সংযুক্ত, যদিও তাদের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। এগুলো সবই গত ত্রিশ বছরে ঘটে যাওয়া উন্নয়নের বিপ্লবের ফলাফল। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে আছে তার অর্ধেকেরও কম ছিল ১৯৯০ সালে (Washington Consensus-এ সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর)।

এই সময়টাকে ‘এ reat Acceleration’ বা ‘উন্নয়নের বিপ্লব’ বলা হলেও এই নামকরণটা উপযুক্ত নয় বলেই মনে করি, এই যে সব সংকটের উদ্ভব, তা সবই এ বিপ্লবের ফসল বা প্রভাব- জলবায়ুর পরিবর্তন, অভিবাসন সংকট এবং পরোক্ষ অর্থে এ করোনাভাইরাস মহামারীও।

পুঁজিবাদকে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান সঞ্চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আপনার ‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’ বইটিতে অন্য আরেক চালককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন: সাম্রাজ্য ও সাম্রাজ্যবাদ। এ সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে বর্তমান সংকটগুলো সৃষ্টি করছে? মহামারীর ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব আছে?

: আমার দৃষ্টিতে সাম্রাজ্য, বৈশ্বিক শক্তির ক্যালকুলাসে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের বিধি নির্ধারক হয়ে আছে। এটা বলা যৌক্তিক যে, জীবাশ্ম জ্বালানি- নিষ্কাশন ও পরিবহন-বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর কেন্দ্রস্থল। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির রূপান্তর কেবল সম্ভাব্যই নয় বরং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেও কার্যকরী, এটা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত মত। তবে একটা পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সাধারণভাবে কিছু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা ছিনিয়ে নেবে যেগুলো বিশ্বব্যাপী তেল রপ্তানির (নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার) মাধ্যমে তারা অর্জন করেছিল।

এ মহামারী এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কীভাবে বিশ্বশক্তি কাজ করে। উদাহরণ স্বরূপ, ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো কোভিড-১৯ পরীক্ষা ও হাসপাতালের সরঞ্জাম জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিল অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলো সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

একইভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনী ও বিখ্যাত ব্যক্তিরা রোগ পরীক্ষার জন্য কোনো সমস্যার সম্মুখিন হয়নি যদিও তুলনামূলকভাবে সাধারণ মানুষ বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভূতরা এ মহামারী দ্বারা ভয়ঙ্কর রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু শহরে তো ক্ষতির পরিমাণ বিস্ময়করভাবে বেশি।

‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’-এ আপনি যে ‘হতাশামূলক রাজনীতি’র কথা উল্লেখ করেছেন, তা কি এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে দরিদ্র দেশগুলোর জনগোষ্ঠী (এবং ওই দেশগুলোর দরিদ্রতম গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তগণ) কষ্টে অভ্যস্থ, তারা যে কোনো বড় ধাক্কা ও নিষ্পেষণ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে যেটা ধনী দেশগুলোর জনগোষ্ঠীকে পঙ্গু করে দিতে পারে, দরিদ্রদের হারানোর তেমন কিছু নেই তা না হলে ধনী, তথাকথিত এলিট সমাজ যে তাদের পরনের বস্ত্র কেড়ে নিচ্ছে আর তাদের গায়ে চড়াচ্ছে, বর্তমান সংকটই কি এর প্রমাণ? সাহিত্য-সংস্কৃতি কি এ সিস্টেমের কোনো রূপান্তর ঘটাতে পারে?

: এই মহামারীর মতো সংকটগুলো পুরনো ধারণাগুলো নতুন করে সত্য হিসেবে প্রমাণ করে দেয়। এ মহামারী খুব বাজেভাবে দরিদ্রদের ওপর ও নানা বর্ণের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে। আমার দৃষ্টিতে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ডারউইনবাদের ধারাটি যে বিদ্যমান ছিল সেটা দৃঢ়তর করেছে।

আমি অনেক তরুণ সাদা মানুষদের (বিশেষত পুরুষ) মহামারী বিষয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছি ‘আমি তরুণ, সুস্থ এবং আমার কোনো রোগের উপসর্গ নেই, সুতরাং আমার কোভিড-১৯ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই’। যে কথাটা স্পষ্ট বলা হয়নি তা হল ‘শুধু তাদেরই চিন্তিত হওয়া উচিত যারা রুগ্ন, বয়স্ক এবং দুর্বল শরীরের অধিকারী’। এ মনোভাব কতিপয় ট্রাম্প সমর্থকরা পোষণ করে যারা চলমান লকডাউনকে অসমর্থন করে। এমনকি প্রথম দিকে বরিস জনসন এবং ম্যাক্রন সমর্থকেরাও এ অবস্থানে ছিলেন।

লকডাউনের প্রথম সময়ে, ব্রুকলিনে, যেখানে আমি থাকি, সেখানে বেশিরভাগ সাদা চামড়ার তরুণেরা মাস্ক ছাড়াই উদ্দেশ্যহীনভাবে বাইরে ঘুরে বেড়াত যেটা আমাকে বেশ শঙ্কায় ফেলে দেয়।

ওরা হয়তো ভেবেছিল তাদের মহামারী সম্পর্কে চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয়, এ ধরনের আত্মবিশ্বাস চূড়ান্তভাবে তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে, বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদের ইতিহাসে রোগগুলো এমন এক একটা অস্ত্র ছিল যার সাহায্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে, আদিবাসীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় আঘাত হেনে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা ইউরোপীয় জৈবিক শ্রেষ্ঠত্বের গভীর ধারণাগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে এবং অদম্যতার বোধকে দৃঢ় করে। অনেক পশ্চিমারা মনে করেন যে এ রোগটা একটা এশিয়ান রোগ এবং তাদের দেশ এর দ্বারা প্রভাবিত হবে না, আক্রান্ত হওয়ার পরও তারা চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেছিল সেগুলো অনুসরণ করেনি, কারন তারা ভেবেছিল এশীয় পদ্ধতি অনুসরণ করলে তারা নিচু পর্যায়ে চলে যাবে।

বর্ণবাদ এ মহামারী বিবর্ধনে এক অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে। হাস্যকরভাবে, এ মহামারীও স্পষ্টভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে পশ্চিমা দেশগুলো আর সুশাসন বা সেরা শাসন অনুশীলনের উদাহরণ না।

মহামারী পুরনো ধারণাগুলো সত্য হিসেবে প্রমাণ করে

সাক্ষাৎকারে অমিতাভ ঘোষ
 যুগান্তর ডেস্ক 
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
মহামারী পুরনো ধারণাগুলো সত্য হিসেবে প্রমাণ করে
সাক্ষাৎকারে অমিতাভ ঘোষ

অমিতাভ ঘোষ (জন্ম ১৯৫৬) একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা ঘোষ দিল্লি এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৯ সালে অমিতাভ সিটি ইউনিভার্সিটি অভ নিউইয়র্কের কুইন্স কলেজে তুলনামূলক সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এ ছাড়া তিনি ২০০৫ সাল থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন খণ্ডকালীন অধ্যাপক। অমিতাভ ঘোষ এ পর্যন্ত ৬টি উপন্যাস লিখেছেন। সর্বশেষ সি অভ পপিজ উপন্যাসটি ব্রিটিশ-চীনের আফিম যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত। ২০০৪ সালে প্রকাশিত দ্য হাংগ্রি টাইড সুন্দরবনের পটভূমিকাতে লেখা।

১৯৯০ সালে রচিত দ্য শ্যাডো লাইন উপন্যাসের জন্য অমিতাভ সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে রচিত ক্যালকাটা ক্রোমোজোমের জন্য পান আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কার।

২০০৭ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১৮ সালে তিনি ৫৪তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার সম্মানে ভূষিত হন। ২০০৯ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচারের ফেলো নির্বাচিত হন।

একটি ইতালীয় সংবাদপত্রকে সাম্প্রতিক সময়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে লেখক কোভিড-১৯, জলবায়ু পরিবর্তন এবং এ সংকটকালে সাহিত্য ঠিক কীভাবে এ পরিবর্তিত বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে সম্পর্কে বিষদ বলেছেন। পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং ‘হতাশজনক রাজনীতি’, এ বিশ্ব-ব্যবস্থাগুলো আমাদের এই সংকটময় সময়কে প্রভাবিত করছে কি? জলবায়ু সংকট, মহামারী এবং অভিবাসন সংকট এ তিনটি ক্ষেত্রে কোনো মিল আছে কি? এসব বাস্তবতার চিত্রে সাহিত্যের ভূমিকা কতটুকু?

অমিতাভ ঘোষ এ সাক্ষাৎকারে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলো এবং আরও অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। ঘোষের সর্বশেষ উপন্যাস, গান আইল্যান্ড ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসের কাহিনীতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অস্থিতিশীল বাস্তবতা, জলবায়ুর বিঘ্নতা এবং বাধ্যতামূলক অভিবাসনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান করোনাভাইরাস মহামারীর আলোকে এ বাস্তবতাগুলো একে অপরের সঙ্গে যে সংযুক্ত তা আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।

ইতালিয়ান সংস্করণ ইল ম্যানিফেস্টো পত্রিকায় প্রকাশিত এই

সাক্ষাৎকারটির বাংলায়ন করেছেন মুসাররাত নওশাবা।

আপনার সর্বশেষ উপন্যাস ‘গান আইল্যান্ড’-এর গল্পে বিশ্বের জলবায়ুর সমস্যা ও বর্ধমান স্থানচ্যুতির ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। সাহিত্য বর্তমানে পরিণত হয়। অতীতে, আপনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় যেভাবে সাহিত্যের মাত্রায় তুলে এনেছেন, সেটা শেষ পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, ম্যাজিক বা রহস্যজাতীয় গল্পে পরিণত হয়েছে।

যদিও বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, তারপরও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা নিয়ে শিল্পমাধ্যমে কাজের অভাব কেন? কার্যত এ বিষয়টা এক সময় ভবিষ্যৎ চিন্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও এটাই আমাদের বর্তমান অবস্থা নয় কি? আপনি কি মনে করেন যে করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে একই নিয়ম অনুসরণ করা হবে? বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো সাহিত্যে অনুল্লিখিত থেকে যাওয়াই কি তার পরিণতি হবে?

: আমি ‘গান আইল্যান্ড’কে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কিত বই বলে মনে করি। আমি মনে করি এখানে আসল প্রশ্নটা হল, কেন এ বাস্তবতা আমাদের অনেকের জন্য অনুমোদিত?

সাধারণত, লেখকদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে ভবিষ্যৎ পরিণতির সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে আমি অতীতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ভাবি। আমার কাছে জলবায়ু পরিবর্তন এমন কিছু না যেটা কেবল গত ত্রিশ বছরের মধ্যেই ঘটেছে। এ ঘটনার একটা দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যা আমাদের অতীতের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। ‘গান আইল্যান্ড’ লেখার সময় আমি এ প্রসঙ্গটা নিয়ে চিন্তা করেছি।

এই মহামারীর ক্ষেত্রে, আমি মনে করি না যে এটা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সাহিত্যের বিষয় থেকে সরে যাবে। হারিকেন স্যান্ডি সম্পর্কে খুব কম গল্প-উপন্যাস আছে যেটা ২০১২ সালে নিউইয়র্কে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং এ ঘটনা সম্পর্কে এ পর্যন্ত মোটেও কিছু জানা যায়নি যেমনটা জানা যায়নি হারিকেন হার্ভে সম্পর্কে যেটা হিউস্টনকে ২০১৩ সালে বিধ্বস্ত করেছিল।

তবে আমার ধারণা যে এবার উপন্যাসের ঢেউ উঠবে এ মহামারী সম্পর্কে ঠিক যেমন ৯/১১-এর পর ছিল। ইতিহাসের হিসাবে মহামারীতে প্রচুর লেখনী সৃষ্টি হয়েছে। ইতালি তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। ইতালির সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্য কর্মগুলোর দুটি মহামারীর সময়েই লেখা হয়, বোকাসিয়রের ‘দ্য ডেকামেরন’ আর মানজোনির ‘দ্য বিট্রোথড’।

বিজ্ঞান ও সাহিত্য এক সময় ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। বর্তমানে এত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল কেন? এদের পূণর্মিলনের কোনো উপায় আছে কি? আপনি কি বিশ্বাস করেন যে এটা বর্তমান সংকটকালে জনমনে কার্যকর প্রভাব ফেলবে?

: এটা ঠিক যে সাহিত্য যে কোনো সংকট নিয়ে জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে, তবে আমি মনে করি না যে কোনো লেখককে শুধু এ ব্যাপারটা মাথায় রেখেই লেখা শুরু করা উচিত। তাহলে তা অনেকটা প্রচারণার মনে হবে, যেটা কার্যকর হবে বলে মনে করি না। মানুষকে শুধু শিক্ষিত করার জন্য বা তাদের মত বদলানোর উদ্দেশ্যে কিছু লিখলে সেটা বিভ্রান্তিকর হয়। প্রকৃত ঘটনাই যদি কারোর চিন্তার পরিবর্তন না ঘটাতে পারে, কোন উপন্যাস কীভাবে সেই পরিবর্তন আনবে?

অন্যদিকে, আমি অনুভব করি লেখার মাধ্যমে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো উচিত। এ ধারণার অধীনে আমি আরও মনে করি যে, অবশ্যই আমাদের সম্মিলিত সংকটগুলো নিয়ে লিখতে হবে, তবে সেটা মানুষের মত পরিবর্তন বা শুধু প্রচারণামূলক লেখনী তৈরির প্রয়াসে নয়, সে চেষ্টা আদতে নিরর্থক হবে।

জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে দুর্ভাগ্যজনক বিষয়গুলোর একটি হল একে প্রযুক্তিগত- বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ এ সম্বন্ধে আমরা যা কিছু পড়ি তার প্রায় সবই বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে। অথচ কেবল বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরাই যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টা লক্ষ্য করছেন তা কিন্তু নয়।

বিশ্বের যে কোনো দেশের কৃষক ও জেলেদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করলে আপনি জানতে পারবেন যে তারাও লক্ষ্য করছে এ জলবায়ুর পরিবর্তন, তারাও চিন্তা করছে এ বিষয় নিয়ে। এসব কৃষক, জেলে বা যে সব মহিলারা জল আনতে রোজ পাঁচ মাইল পথ হাঁটে তাদের কথা না শুনে আমরা বিজ্ঞানীদের কথা বেশি শুনি কারণ তারা তাদের ভাষ্য গোটা বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারে না।

অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা একটা শক্ত কাঠামোর অংশ হিসেবে আছেন এবং তাদের ভাষ্যগুলো বিশেষজ্ঞের মতামত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমার মনে কেবল বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীরাই যে প্রকৃতি নিয়ে ভাবে না সেটা অনুভব করা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যক্রমে উপন্যাসিকেরা যখন প্রাকৃতিক জগৎ নিয়ে লেখেন তাদের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে।

আপনার ‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’ বইয়ে লিখেছেন যে জলবায়ু সংকট এক ধরনের সংস্কৃতির সংকট সেই সঙ্গে চিন্তার সংকটও। মহামারীর ক্ষেত্রেও এটা কি সত্য? আপনি কি মনে করেন যে জলবায়ু সংকট, সংস্কৃতির সংকট ও মহামারী উদ্ভূত সংকট এরা একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত?

: এ সংকটগুলোর সঙ্গে আমি আরও একটা নাম যুক্ত করতে চাই তা হল ‘অভিবাসন সংকট’, এরা সবাই সংযুক্ত, যদিও তাদের মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র নেই। এগুলো সবই গত ত্রিশ বছরে ঘটে যাওয়া উন্নয়নের বিপ্লবের ফলাফল। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বর্তমানে বায়ুমণ্ডলে আছে তার অর্ধেকেরও কম ছিল ১৯৯০ সালে (Washington Consensus-এ সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর)।

এই সময়টাকে ‘এ reat Acceleration’ বা ‘উন্নয়নের বিপ্লব’ বলা হলেও এই নামকরণটা উপযুক্ত নয় বলেই মনে করি, এই যে সব সংকটের উদ্ভব, তা সবই এ বিপ্লবের ফসল বা প্রভাব- জলবায়ুর পরিবর্তন, অভিবাসন সংকট এবং পরোক্ষ অর্থে এ করোনাভাইরাস মহামারীও।

পুঁজিবাদকে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান সঞ্চালক হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আপনার ‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’ বইটিতে অন্য আরেক চালককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন: সাম্রাজ্য ও সাম্রাজ্যবাদ। এ সাম্রাজ্যবাদ কীভাবে বর্তমান সংকটগুলো সৃষ্টি করছে? মহামারীর ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব আছে?

: আমার দৃষ্টিতে সাম্রাজ্য, বৈশ্বিক শক্তির ক্যালকুলাসে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের বিধি নির্ধারক হয়ে আছে। এটা বলা যৌক্তিক যে, জীবাশ্ম জ্বালানি- নিষ্কাশন ও পরিবহন-বৈশ্বিক শক্তি কাঠামোর কেন্দ্রস্থল। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তির রূপান্তর কেবল সম্ভাব্যই নয় বরং অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রেও কার্যকরী, এটা বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত মত। তবে একটা পরিবর্তন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে সাধারণভাবে কিছু অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা ছিনিয়ে নেবে যেগুলো বিশ্বব্যাপী তেল রপ্তানির (নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার) মাধ্যমে তারা অর্জন করেছিল।

এ মহামারী এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কীভাবে বিশ্বশক্তি কাজ করে। উদাহরণ স্বরূপ, ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো কোভিড-১৯ পরীক্ষা ও হাসপাতালের সরঞ্জাম জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছিল অন্যদিকে দরিদ্র দেশগুলো সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

একইভাবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধনী ও বিখ্যাত ব্যক্তিরা রোগ পরীক্ষার জন্য কোনো সমস্যার সম্মুখিন হয়নি যদিও তুলনামূলকভাবে সাধারণ মানুষ বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভূতরা এ মহামারী দ্বারা ভয়ঙ্কর রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু শহরে তো ক্ষতির পরিমাণ বিস্ময়করভাবে বেশি।

‘দ্য গ্রেট ডেরেঞ্জমেন্ট’-এ আপনি যে ‘হতাশামূলক রাজনীতি’র কথা উল্লেখ করেছেন, তা কি এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে দরিদ্র দেশগুলোর জনগোষ্ঠী (এবং ওই দেশগুলোর দরিদ্রতম গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তগণ) কষ্টে অভ্যস্থ, তারা যে কোনো বড় ধাক্কা ও নিষ্পেষণ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে যেটা ধনী দেশগুলোর জনগোষ্ঠীকে পঙ্গু করে দিতে পারে, দরিদ্রদের হারানোর তেমন কিছু নেই তা না হলে ধনী, তথাকথিত এলিট সমাজ যে তাদের পরনের বস্ত্র কেড়ে নিচ্ছে আর তাদের গায়ে চড়াচ্ছে, বর্তমান সংকটই কি এর প্রমাণ? সাহিত্য-সংস্কৃতি কি এ সিস্টেমের কোনো রূপান্তর ঘটাতে পারে?

: এই মহামারীর মতো সংকটগুলো পুরনো ধারণাগুলো নতুন করে সত্য হিসেবে প্রমাণ করে দেয়। এ মহামারী খুব বাজেভাবে দরিদ্রদের ওপর ও নানা বর্ণের মানুষের ওপর প্রভাব ফেলেছে। আমার দৃষ্টিতে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ডারউইনবাদের ধারাটি যে বিদ্যমান ছিল সেটা দৃঢ়তর করেছে।

আমি অনেক তরুণ সাদা মানুষদের (বিশেষত পুরুষ) মহামারী বিষয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছি ‘আমি তরুণ, সুস্থ এবং আমার কোনো রোগের উপসর্গ নেই, সুতরাং আমার কোভিড-১৯ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই’। যে কথাটা স্পষ্ট বলা হয়নি তা হল ‘শুধু তাদেরই চিন্তিত হওয়া উচিত যারা রুগ্ন, বয়স্ক এবং দুর্বল শরীরের অধিকারী’। এ মনোভাব কতিপয় ট্রাম্প সমর্থকরা পোষণ করে যারা চলমান লকডাউনকে অসমর্থন করে। এমনকি প্রথম দিকে বরিস জনসন এবং ম্যাক্রন সমর্থকেরাও এ অবস্থানে ছিলেন।

লকডাউনের প্রথম সময়ে, ব্রুকলিনে, যেখানে আমি থাকি, সেখানে বেশিরভাগ সাদা চামড়ার তরুণেরা মাস্ক ছাড়াই উদ্দেশ্যহীনভাবে বাইরে ঘুরে বেড়াত যেটা আমাকে বেশ শঙ্কায় ফেলে দেয়।

ওরা হয়তো ভেবেছিল তাদের মহামারী সম্পর্কে চিন্তা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার মনে হয়, এ ধরনের আত্মবিশ্বাস চূড়ান্তভাবে তাদের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে, বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশবাদের ইতিহাসে রোগগুলো এমন এক একটা অস্ত্র ছিল যার সাহায্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে, আদিবাসীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় আঘাত হেনে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুর্বলতা ইউরোপীয় জৈবিক শ্রেষ্ঠত্বের গভীর ধারণাগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে এবং অদম্যতার বোধকে দৃঢ় করে। অনেক পশ্চিমারা মনে করেন যে এ রোগটা একটা এশিয়ান রোগ এবং তাদের দেশ এর দ্বারা প্রভাবিত হবে না, আক্রান্ত হওয়ার পরও তারা চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান যে পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করেছিল সেগুলো অনুসরণ করেনি, কারন তারা ভেবেছিল এশীয় পদ্ধতি অনুসরণ করলে তারা নিচু পর্যায়ে চলে যাবে।

বর্ণবাদ এ মহামারী বিবর্ধনে এক অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে। হাস্যকরভাবে, এ মহামারীও স্পষ্টভাবে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে যে পশ্চিমা দেশগুলো আর সুশাসন বা সেরা শাসন অনুশীলনের উদাহরণ না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন