বড় মনের মানুষ রাহাত খান
jugantor
বড় মনের মানুষ রাহাত খান

  আতাহার খান  

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ করেই ঘটে রাহাত খানের সঙ্গে আমার পরিচয়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে, একটি ঘটনার মাধ্যমে আমাদের প্রথম আলাপ। ঢাকা শহরে তখন আমাদের সাহিত্য আড্ডার প্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি ছিল সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকার অফিস।

তিনি মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে পত্রিকাটি বেরোয় হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায়, সম্ভবত ১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে। তার প্রথম সংখ্যায় ‘চেয়ার’ শিরোনামে দুই পৃষ্ঠাব্যাপী আমার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়।

কবিতাটির রচনাকাল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর (সেপ্টম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে)। এটি প্রকাশিত হওয়ার বেশ ক’দিন বাদে আমি ডিআইটি রোডে অবস্থিত সমকাল অফিসে আসি। সেখানে চলছিল আড্ডা। সে-আড্ডার মধ্যমণি হাসান হাফিজুর রহমান আমাকে দেখে বলে উঠলেন, আতাহার, তুমি অমুক দিন (তারিখটির কথা এ মুহূর্তে মনে নেই) এখানে এসো। খোন্দকার মোহম্মদ ইলিয়াস আসবেন। তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। তোমার সঙ্গে তিনি কথাও বলবেন।

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের নাম শুনে আমি চমকে উঠি। চল্লিশের দশকের কথাসাহিত্যিক। বড় কলেবরে লেখা ‘কতো ছবি কতো গান’ উপন্যাসের লেখক তিনি। এর আগে বেরোয় তার আরও একটি বিখ্যাত বই ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’।

সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে লেখা এ ভ্রমণ কাহিনীতে তিনি গুরুত্বসহ তুলে ধরেন মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ইউরোপে থাকাকালীন বিচিত্র অভিজ্ঞতা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত মোকাবেলায় বিশ্বশান্তি আন্দোলনের ভূমিকার কথা। দুটি বই-ই পাকিস্তান সরকার বাজায়াপ্ত করে। সেই লেখকের সঙ্গে কিনা আমার দেখা হবে। বুকের ভেতরে উত্তেজনার পারদ ধাই ধাই করে ওপরে উঠতে থাকে।

নির্দিষ্ট দিনে সমকাল অফিসে পোঁছাই। দেখি হাসান হাফিজুর রহমানকে ঘিরে গাল-গপ্প জমে উঠেছে। তার টেবিলের অন্য প্রান্তে মুখোমুখি বসা শিল্পী জাহাঙ্গীর, কবি সিকদার আমিনুল হক এবং আরও বেশ ক’জন। আর উদয়ন ভাই অর্থাৎ উদয়ন চৌধুরী বসেছিলেন হাসান ভাইয়ের বামে চেয়ার-টেবিলে। আমি সেখানে একটা খালি চেয়ার টেনে বসার পর বুঝতে পারি, আলোচনার বিষয় ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে।

কখনও রাজনীতি, কখনও কবিতা, কখনও কথাসাহিত্য- নানা বিষয় উঠে আসছিল আলোচনায়। সময় বিকাল পাঁচটা হবে সম্ভবত। হঠাৎ খেয়াল করি, হাসান হাফিজুর রহমান নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে হাসি এনে আমাকে দেখিয়ে বললেন, আপনার আসামিকে বসিয়ে রেখেছি। বুঝলাম খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস এসে গেছেন। আমি উঠে কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন। দু’গালে চুমু খান।

তারপর পরম স্নেহের হাত কাঁধে রেখে বললেন, চট্টগ্রামের দুটি সেমিনারে আমি তোমার ‘চেয়ার’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছি। দুটি সেমিনারেই, অডিয়েন্স কবিতার কথাগুলোর সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। উপস্থিত সবাই উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তাই তোমাকে দেখার ইচ্ছা করছিল আমার। আমার কাঁধে হালকা চাপ দিয়ে তিনি আরও জিজ্ঞেস করলেন, এখন কী করছ?

বললাম, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করছিলাম। সেটি ছেড়ে দিয়েছি। নতুন একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের পরিকল্পনা করে রেখেছি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তহিক দেশের মতো হবে অনেকটা। যদি বিনিয়োগকারী পাই তাহলে সেটি প্রকাশের উদ্যোগ নেব। মুখের কথা শেষ না-হতেই খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের সঙ্গে আসা ভদ্রলোকটি, আমাকে উদ্দেশ করে বলেন, পত্রিকার ডামি কী রেডি করা আছে?

প্রশ্নটা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম! কে এই ভদ্রলোক? কথার মাঝখানে ঢুকে পড়েছেন। শার্ট ইন করে পরা। তার জুতার হিলটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি উঁচু। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বললেন, ওকে চেন না, ও রাহাত খান, কথাসাহিত্যিক। আমি কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়ি।

বললাম, জি, ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই, কিন্তু আমি তার লেখার সঙ্গে পরিচিত। আমার বিশ্বাস, তার ‘ইমান আলীর মৃত্যু’, ‘বিষবৃক্ষ’ গল্প দুটি বাংলা ভাষার সেরা গল্পগুলোর অন্যতম। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস মাথা হেলে আমার কথায় সায় দেন।

রাহাত খানকে বললাম, হ্যাঁ, ম্যাগাজিনের খসড়া ডামি তৈরি আছে।

তথ্যটি জেনে বেশ উচ্ছ্বসিত হন তিনি। রাগ-ঢাক না করেই তিনি আমাকে বলেন, তুমি ওটি কাল আমার অফিস ইত্তেফাকে নিয়ে এসো। আজ থেকে ৪২ বছর আগে, রাহাত খানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এভাবেই ঘটে। পরের দিন সেই ডামি নিয়ে উপস্থিত হই ইত্তেফাক অফিসে। ৬৪ পৃষ্ঠার ডামি হাতে নিয়ে রাহাত খান পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে মনোযোগসহ দেখেন। শেষে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন, ভালো হয়েছে। বেশ ভালো। তবে কিছু বিষয় যোগ করতে হবে এখানে। তারপর গলার স্বর আর্দ্র করে বলেন, জানো, আমার স্বপ্ন ছিল এ ধরনের একটি পত্রিকা প্রকাশ করার। তোমাকে নিয়ে আমি আমাদের স্বপ্ন যৌথভাবে বাস্তবে রূপ দেব।

একদিনের ব্যবধানে লোকটিকে মনে হল, তিনি আমার অনেকদিনের চেনা। পরের দিন আমাকে নিয়ে রাহাত ভাই ছুটলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বাসায়। কাকরাইলের মোড়ের কাছে তার বাসা। খসড়া ডামি দেখে তিনিও মহাখুশি। তবে একটি শর্ত জুড়ে দেন। আমাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি ডিক্লারেশন বের করে আনতে পারেন তাহলে আমি সার্বিক দায়িত্ব নিতে রাজি আছি।

শুরু হল আমাদের নতুন এক যুদ্ধ। রাহাত খান সঙ্গে সঙ্গেই কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের শরণাপন্ন হলেন। সে সময় তিনি সম্ভবত যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া সচিবদের মধ্যে যারা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত তারাও পত্রিকাটি যাতে আলোর মুখ দেখতে পারে সে ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। রাহাত খান ছিলেন বলেই এ রকম অনুকূল একটা পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।

এই যে কয়েক মাস উঠা-বসা করতে গিয়ে আমি লোকটিকে ঠিকই চিনেছি- তিনি অতিশয় ভদ্র ও অমায়িক, স্পষ্টবাদী, কুসংস্কারমুক্ত একজন জ্বলজ্যান্ত আধুনিক মানুষ। দেখতে খুবই সাধারণ এ মানুষের হৃদয়টা ছিল বিশাল। বসতাম রাহাত খানের রুমের এক কোণে। আমি তখনও বেতনের আওতায় আসিনি। অথচ আমার পুরো খরচ নির্দ্বিধায় বহন করতেন রাহাত খান। এভাবে চার-পাঁচ মাস পকেটের টাকা দিয়ে তিনি আমাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেননি, সাংবাদিকতাকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিতে সাহায্যও করেছেন। এ রকম মানুষ কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে?

শেষ পর্যন্ত পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যার দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়। ইত্তেফাকের তৃতীয় তলায় পত্রিকার অফিস। যোগ দেন রফিক আজাদ, অসীম সাহা, কাজি হাসান হাবিব, ইমদাদুল হক মিলন, সেলিম নজরুল হক। নতুন উদ্যমে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ।

আরও পরে পর্যায়ক্রমে জড়িত হন আবু করিম, নাদিরা মজুমদার, তাপস মজুমদার, শেখ মহিউদ্দিন, সামিউল আহমদ খান, আলিমুজ্জামান। আর প্রথম সংখ্যা থেকে পত্রিকার নিয়মিত লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আরশাদ আজিজ, ফরহাদ খান, ফারুক মেহেদি, কৌশক আহমেদ, আলিমুজ্জামান, ইত্তেফাকের শফিকুল কবির, খায়রুল আনাম, মোহাম্মদ শাহজাহান, নাজিমুদ্দিন মোস্তান ও সৈয়দ তোসারফ আলী। রাহাত খানই পরিচালনা করতেন এ পুরো পরিবার। আর হ্যাঁ, পত্রিকার নাম আমারই দেয়া, ‘রোববার’।

বড় মনের মানুষ রাহাত খান

 আতাহার খান 
০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ করেই ঘটে রাহাত খানের সঙ্গে আমার পরিচয়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে, একটি ঘটনার মাধ্যমে আমাদের প্রথম আলাপ। ঢাকা শহরে তখন আমাদের সাহিত্য আড্ডার প্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি ছিল সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকার অফিস।

তিনি মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে পত্রিকাটি বেরোয় হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায়, সম্ভবত ১৯৭৮ সালের শুরুর দিকে। তার প্রথম সংখ্যায় ‘চেয়ার’ শিরোনামে দুই পৃষ্ঠাব্যাপী আমার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়।

কবিতাটির রচনাকাল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর (সেপ্টম্বর থেকে অক্টোবরের মধ্যে)। এটি প্রকাশিত হওয়ার বেশ ক’দিন বাদে আমি ডিআইটি রোডে অবস্থিত সমকাল অফিসে আসি। সেখানে চলছিল আড্ডা। সে-আড্ডার মধ্যমণি হাসান হাফিজুর রহমান আমাকে দেখে বলে উঠলেন, আতাহার, তুমি অমুক দিন (তারিখটির কথা এ মুহূর্তে মনে নেই) এখানে এসো। খোন্দকার মোহম্মদ ইলিয়াস আসবেন। তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। তোমার সঙ্গে তিনি কথাও বলবেন।

খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের নাম শুনে আমি চমকে উঠি। চল্লিশের দশকের কথাসাহিত্যিক। বড় কলেবরে লেখা ‘কতো ছবি কতো গান’ উপন্যাসের লেখক তিনি। এর আগে বেরোয় তার আরও একটি বিখ্যাত বই ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’।

সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে লেখা এ ভ্রমণ কাহিনীতে তিনি গুরুত্বসহ তুলে ধরেন মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ইউরোপে থাকাকালীন বিচিত্র অভিজ্ঞতা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত মোকাবেলায় বিশ্বশান্তি আন্দোলনের ভূমিকার কথা। দুটি বই-ই পাকিস্তান সরকার বাজায়াপ্ত করে। সেই লেখকের সঙ্গে কিনা আমার দেখা হবে। বুকের ভেতরে উত্তেজনার পারদ ধাই ধাই করে ওপরে উঠতে থাকে।

নির্দিষ্ট দিনে সমকাল অফিসে পোঁছাই। দেখি হাসান হাফিজুর রহমানকে ঘিরে গাল-গপ্প জমে উঠেছে। তার টেবিলের অন্য প্রান্তে মুখোমুখি বসা শিল্পী জাহাঙ্গীর, কবি সিকদার আমিনুল হক এবং আরও বেশ ক’জন। আর উদয়ন ভাই অর্থাৎ উদয়ন চৌধুরী বসেছিলেন হাসান ভাইয়ের বামে চেয়ার-টেবিলে। আমি সেখানে একটা খালি চেয়ার টেনে বসার পর বুঝতে পারি, আলোচনার বিষয় ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছে।

কখনও রাজনীতি, কখনও কবিতা, কখনও কথাসাহিত্য- নানা বিষয় উঠে আসছিল আলোচনায়। সময় বিকাল পাঁচটা হবে সম্ভবত। হঠাৎ খেয়াল করি, হাসান হাফিজুর রহমান নড়েচড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে হাসি এনে আমাকে দেখিয়ে বললেন, আপনার আসামিকে বসিয়ে রেখেছি। বুঝলাম খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস এসে গেছেন। আমি উঠে কাছে এগিয়ে যেতেই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন। দু’গালে চুমু খান।

তারপর পরম স্নেহের হাত কাঁধে রেখে বললেন, চট্টগ্রামের দুটি সেমিনারে আমি তোমার ‘চেয়ার’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছি। দুটি সেমিনারেই, অডিয়েন্স কবিতার কথাগুলোর সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। উপস্থিত সবাই উদ্বেলিত হয়ে ওঠেন। তাই তোমাকে দেখার ইচ্ছা করছিল আমার। আমার কাঁধে হালকা চাপ দিয়ে তিনি আরও জিজ্ঞেস করলেন, এখন কী করছ?

বললাম, একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করছিলাম। সেটি ছেড়ে দিয়েছি। নতুন একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের পরিকল্পনা করে রেখেছি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তহিক দেশের মতো হবে অনেকটা। যদি বিনিয়োগকারী পাই তাহলে সেটি প্রকাশের উদ্যোগ নেব। মুখের কথা শেষ না-হতেই খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের সঙ্গে আসা ভদ্রলোকটি, আমাকে উদ্দেশ করে বলেন, পত্রিকার ডামি কী রেডি করা আছে?

প্রশ্নটা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম! কে এই ভদ্রলোক? কথার মাঝখানে ঢুকে পড়েছেন। শার্ট ইন করে পরা। তার জুতার হিলটা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি উঁচু। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস বললেন, ওকে চেন না, ও রাহাত খান, কথাসাহিত্যিক। আমি কিছুটা লজ্জিত হয়ে পড়ি।

বললাম, জি, ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই, কিন্তু আমি তার লেখার সঙ্গে পরিচিত। আমার বিশ্বাস, তার ‘ইমান আলীর মৃত্যু’, ‘বিষবৃক্ষ’ গল্প দুটি বাংলা ভাষার সেরা গল্পগুলোর অন্যতম। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস মাথা হেলে আমার কথায় সায় দেন।

রাহাত খানকে বললাম, হ্যাঁ, ম্যাগাজিনের খসড়া ডামি তৈরি আছে।

তথ্যটি জেনে বেশ উচ্ছ্বসিত হন তিনি। রাগ-ঢাক না করেই তিনি আমাকে বলেন, তুমি ওটি কাল আমার অফিস ইত্তেফাকে নিয়ে এসো। আজ থেকে ৪২ বছর আগে, রাহাত খানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এভাবেই ঘটে। পরের দিন সেই ডামি নিয়ে উপস্থিত হই ইত্তেফাক অফিসে। ৬৪ পৃষ্ঠার ডামি হাতে নিয়ে রাহাত খান পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে মনোযোগসহ দেখেন। শেষে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলেন, ভালো হয়েছে। বেশ ভালো। তবে কিছু বিষয় যোগ করতে হবে এখানে। তারপর গলার স্বর আর্দ্র করে বলেন, জানো, আমার স্বপ্ন ছিল এ ধরনের একটি পত্রিকা প্রকাশ করার। তোমাকে নিয়ে আমি আমাদের স্বপ্ন যৌথভাবে বাস্তবে রূপ দেব।

একদিনের ব্যবধানে লোকটিকে মনে হল, তিনি আমার অনেকদিনের চেনা। পরের দিন আমাকে নিয়ে রাহাত ভাই ছুটলেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বাসায়। কাকরাইলের মোড়ের কাছে তার বাসা। খসড়া ডামি দেখে তিনিও মহাখুশি। তবে একটি শর্ত জুড়ে দেন। আমাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি ডিক্লারেশন বের করে আনতে পারেন তাহলে আমি সার্বিক দায়িত্ব নিতে রাজি আছি।

শুরু হল আমাদের নতুন এক যুদ্ধ। রাহাত খান সঙ্গে সঙ্গেই কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের শরণাপন্ন হলেন। সে সময় তিনি সম্ভবত যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। এ ছাড়া সচিবদের মধ্যে যারা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত তারাও পত্রিকাটি যাতে আলোর মুখ দেখতে পারে সে ব্যাপারে সহযোগিতা করেন। রাহাত খান ছিলেন বলেই এ রকম অনুকূল একটা পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।

এই যে কয়েক মাস উঠা-বসা করতে গিয়ে আমি লোকটিকে ঠিকই চিনেছি- তিনি অতিশয় ভদ্র ও অমায়িক, স্পষ্টবাদী, কুসংস্কারমুক্ত একজন জ্বলজ্যান্ত আধুনিক মানুষ। দেখতে খুবই সাধারণ এ মানুষের হৃদয়টা ছিল বিশাল। বসতাম রাহাত খানের রুমের এক কোণে। আমি তখনও বেতনের আওতায় আসিনি। অথচ আমার পুরো খরচ নির্দ্বিধায় বহন করতেন রাহাত খান। এভাবে চার-পাঁচ মাস পকেটের টাকা দিয়ে তিনি আমাকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেননি, সাংবাদিকতাকে একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নিতে সাহায্যও করেছেন। এ রকম মানুষ কি আর খুঁজে পাওয়া যাবে?

শেষ পর্যন্ত পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যার দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়। ইত্তেফাকের তৃতীয় তলায় পত্রিকার অফিস। যোগ দেন রফিক আজাদ, অসীম সাহা, কাজি হাসান হাবিব, ইমদাদুল হক মিলন, সেলিম নজরুল হক। নতুন উদ্যমে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ।

আরও পরে পর্যায়ক্রমে জড়িত হন আবু করিম, নাদিরা মজুমদার, তাপস মজুমদার, শেখ মহিউদ্দিন, সামিউল আহমদ খান, আলিমুজ্জামান। আর প্রথম সংখ্যা থেকে পত্রিকার নিয়মিত লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আরশাদ আজিজ, ফরহাদ খান, ফারুক মেহেদি, কৌশক আহমেদ, আলিমুজ্জামান, ইত্তেফাকের শফিকুল কবির, খায়রুল আনাম, মোহাম্মদ শাহজাহান, নাজিমুদ্দিন মোস্তান ও সৈয়দ তোসারফ আলী। রাহাত খানই পরিচালনা করতেন এ পুরো পরিবার। আর হ্যাঁ, পত্রিকার নাম আমারই দেয়া, ‘রোববার’।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন