মহামারী নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো আমাদের যে শিক্ষা দেয়
jugantor
মহামারী নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো আমাদের যে শিক্ষা দেয়

  ওরহান পামুক  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯০১ সালে ঘটে যাওয়া মহামারীর পটভূমি নিয়ে গত চার বছর ধরে আমি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছিলাম। বিশ্বব্যাপী যা তৃতীয় প্লেগ মহামারী নামে পরিচিত। প্রদাহযুক্ত এ প্লেগের প্রাদুর্ভাবে এশিয়ায় লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

তবে এশিয়ার তুলনায় ইউরোপে খুব বেশি একটা প্রাণহানি হয়নি। বিগত সময়গুলোতে বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, সম্পাদক ও সাংবাদিকরা আমার নতুন উপন্যাস ‘নাইটস অফ প্লেগ’ ও মহামারী নিয়ে আমাকে অজস্র প্রশ্ন করেছেন। তারা মূলত বর্তমান সময়ের আলোচিত করোনাভাইরাস ও ঐতিহাসিক মহামারী প্লেগ/কলেরার সঙ্গে অনেক মিল দেখতে পেয়েছেন।

মানব সভ্যতা ও সাহিত্যের বর্ণনা অনুসারে সে মহামারী জীবাণু কিংবা ভাইরাস যে কারণেই হোক না কেন আমাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কিন্তু সব সময় একই রকম হয়ে থাকে। মহামারী কিংবা প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সব সময়ই অস্বীকৃত।

অতীতের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারগুলো এ ক্ষেত্রে সব সময় দেরি করে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রাদুর্ভাবের অস্তিত্ব অস্বীকার করার জন্য তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নেয়। রিপোর্টার ড্যানিয়েল ডিফোর রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৬৬৪ সালে লন্ডনে প্লেগের কারণে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল সেখানে সেই সংখ্যাটি অন্যান্য রোগের কারণে মৃত্যু সংখ্যার চেয়ে কম দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছিল।

১৮২৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্যা ব্যাথ্রয়েড’ উপন্যাসটি সম্ভবত প্লেগের প্রকোপ নিয়ে রচিত সবচেয়ে বাস্তবধর্মী উপন্যাস। ১৬৩০ সালে ঘটে যাওয়া প্লেগের সময় ইটালিয়ান লেখক আলেসান্দ্রো মানজোনি সে কথা স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন এবং সরকারি প্রতিক্রিয়ার বিপক্ষে জনগণের ক্রোধকে সমর্থন দিয়েছেন। যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিলান সরকার এ রোগ দ্বারা সৃষ্ট হুমকির কথা অস্বীকার করেন এবং সে সময় স্থানীয় রাজপুত্রের অনুষ্ঠিতব্য এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানও বাতিল করা থেকে বিরত থাকেন। মানজোনি দেখিয়েছেন অপর্যাপ্ত বিধিনিষেধের কারণে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও এর প্রতিকারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে মনোযোগ দেননি।

প্লেগ ও মহামারী নিয়ে লেখা বেশিরভাগ সাহিত্যে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের অসতর্কতা, অযোগ্যতা ও স্বার্থপরতা জনগণের কাছে ক্রোধের প্ররোচক হিসেবে কাজ করেছে।

তবে ডিফো ও ক্যামাসের মতো প্রখ্যাত লেখকরা পাঠকদের কাছে ক্রোধের তরঙ্গ তলে থাকা রাজনীতি ছাড়াও আরও অনেক কিছু দেখায় যাতে মানুষের প্রকৃত অবস্থার অভ্যন্তরীণ চিত্র ফুটে ওঠে। মানবতার অন্যান্য সার্বজনীন এবং অব্যয়িত প্রতিক্রিয়া হল মহামারী সম্পর্কে আপাতদৃষ্টিতে সর্বদা গুজব সৃষ্টি করা এবং অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দেয়া। অতীতের মহামারীগুলোতে দেখা গেছে ছড়িয়ে পড়া গুজবগুলো মূলত ভুল তথ্য দেয় এবং সঠিক চিত্র দেখার সম্ভাবনাকে আড়াল করে দেয়।

ডিফো ও মানজোনি লিখেছেন মহামারীর সময়ে লোকজন রাস্তায় চলার সময় একে অন্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখত। তবে বিভিন্নজনের কাছ থেকে রোগের গোটা চিত্রটা জানার চেষ্টা করত। যাতে তারা মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারে এবং আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ জায়গার সন্ধান করতে পারে।

সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটবিহীন বিশ্বে নিরক্ষর সংখ্যাগরিষ্ঠরাই কেবল কল্পনা করতে সক্ষম হয়েছিল যে, এ বিপদটি সবার মাঝে অদৃশ্য হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এর যন্ত্রণা কতটা তীব্র! প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর আরেকটি আলোচিত গুজব ছিল কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে ছড়িয়েছে এ রোগ! অশুভ শক্তির মতোই প্লেগকে এমনভাবে চিত্রিত করা হতো যা কিনা বাইরে থেকে আসে।

এটা অন্য কোথাও আঘাত হেনেছিল এবং সেখানে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে এখানে এসেছে। সে সময় অ্যাথেন্সে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর মিসর ও ইথিওপিয়া গ্রিস থেকে দূরে সরে গিয়েছিল বলে অনেকের ধারণা। রোগটি বিদেশি এবং দুষিত অভিপ্রায় নিয়ে আসে। অনুমানভিত্তিক রটনা সব সময় খুব বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হয়ে থাকে এটাই তার প্রমাণ।

‘দ্যা ব্যাথ্রয়েড’ উপন্যাসে মানজোরি এমন একটি চিত্র বর্ণনা করেছিলেন যা ছিল মধ্যযুগ থেকেই প্লেগের প্রচলিত কল্পনাগুলোর মধ্যে একটি।

এ অনাচারী দানবীয় উপস্থিতি সম্পর্কে প্রতিদিন গুজব ছড়িয়ে পড়ত। যারা অন্ধকারে দুর্গন্ধময় প্লেগের প্রকোপে পড়েছিল তারা কোনো তরল ও ফোয়ারার পানি পান করেছিল। অথবা কোনো ক্লান্ত বৃদ্ধা যিনি গির্জার অভ্যন্তরে মেঝেতে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন তার বিরুদ্ধে এ রোগ ছড়ানোর জন্য অভিযোগ করা হয়।

রেনেসাঁর পর থেকে প্লেগ মহামারীর ক্ষেত্রে হিংস্রতা, আতঙ্ক ও বিদ্রোহের নিয়ন্ত্রণহীন এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মার্ক্স অরেলিয়াস রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিস্টানদের দোষারোপ করেছিলেন। কারণ তারা রোমান দেবতাদের অনুগ্রহ করার জন্য কোনো আচার অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।

এবং পরবর্তী বিপর্যয়ের সময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্য এবং ইউরোপের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দিকে অভিযোগ আনা হয়েছিল।

প্লেগের ইতিহাস নিয়ে লেখা সাহিত্য আমাদের কষ্ট, দুর্দশা ও মৃত্যুর ভয়ঙ্কর দিক দেখায়। রূপক ভয় ও জনগণের দ্বারা অনুভব করা ক্রোধ রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। সেই পুরনো মহামারীর মতো ভিত্তিহীন গুজব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয়, জাতিগত এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আনা অভিযোগগুলো করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময় অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডানপন্থী মিডিয়াগুলো মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আজকের দিনে আমরা যে মহামারীতে বাস করছি এবং তা থেকে যে তথ্য পেয়েছি তা আগেকার সময়ের কোনো মহামারীতে ছিল না। এটা এতটাই শক্তিশালী ও যুক্তিসঙ্গত যে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমাদের ভয় হল যদি গুজবনির্ভর ও সঠিক তথ্য আড়াল করে আমাদের কাছে সংবাদ পরিবেশন করা হয় সেটা নিয়ে!

যখন আমরা বিশ্বের মানচিত্রে লাল বিন্দুগুলো দেখতে পাই তখন বুঝতে পারি যে পালানোর আর কোনো পথ নেই। কতটা দুঃসময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে! আমরা ইটালিয়ান শহরে সেনাবাহিনীর ট্রাকে মৃতদেহ বহনকারী ভিডিওগুলো দেখি আর মনে হয় আমরা যেন আমাদের নিজস্ব জানাজার শোভাযাত্রা দেখছি। থাইল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত মানবতা কীভাবে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রোসারি থেকে আমরা যে খাবারটি কিনছি ওটা কতটা নিরাপদ, কতটা স্বাস্থ্যসম্মত সে বিষয়কে বিচ্ছিন্ন ভাবার কোনো কারণ নেই। তবুও এখন আমরা আর আমাদের ভয়ে শঙ্কিত হই না। পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যে একটি সাহসী মানবতার বন্ধন সৃষ্টির চেষ্টা করি।

আমি যখন টিভিতে বিশ্বের বৃহত্তম হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করা মানুষদের দেখি তখন দেখতে পাই আমাদের সন্ত্রাসবাদ মানবতার সঙ্গে কীভাবে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তখন আর নিজেকে একা মনে হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয় সম্পর্কে লজ্জাবোধ সংকুচিত হয়ে যায় এবং ক্রমবর্ধমানভাবে এটাকে সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাই। মহামারী সম্পর্কে সেই উক্তিটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় তা হল যারা ভয় পায় এ পৃথিবী তাদের জন্য নয় তারা এখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। এক সময় আমি বুঝতে পারি যে ভয় আমার মধ্যে এবং সম্ভবত আমাদের সবার মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কখনও এটি আমাদের একাকিত্ব এবং নীরবতার দিকে নিয়ে যায় আবার কখনও এটি আমাদের মধ্যে নম্রতা ও সংহতির অনুশীলন শিক্ষা দেয়।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমি প্রথম প্লেগ নিয়ে উপন্যাস লেখার স্বপ্ন দেখেছিলাম। প্রাথমিক পর্যায়ে আমার দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল মৃত্যু ভয় নিয়ে। ১৫৬১ সালে লেখক ওজিয়ার গিসিলিন ডি বুসবেক- তিনি ছিলেন হ্যাপসবার্গে অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান সুলেমানের রাষ্ট্রদূত। প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইস্তাম্বুল থেকে ছয় ঘণ্টা পথপরিক্রমায় তিনি প্রিনকিপো দ্বীপে আশ্রয় নিয়ে মহামারী থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন অপর্যাপ্ত নিয়মকানুন ও পৃথকীকরণের অভাবে এবং ধর্মীয় কারণে এ রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল। প্রায় দেড় শতাব্দী পর মনীষী ডিফো তার উপন্যাসে লন্ডনের প্লেগ নিয়ে লিখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তুর্কিরা এবং অটোম্যানরা তাদের নিজস্ব ধারণার কথা বলে বাদ সেধেছিল এবং এতে প্রতিটি মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি পূর্বনির্ধারিত ছিল। আমার প্লেগ উপন্যাস ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে মুসলিম ধর্ম প্রাণঘাতী কিনা এটা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করবে।

ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টানদের তুলনায় মহামারী চলাকালীন পৃথক পৃথক ব্যবস্থা মেনে চলার কথা মুসলমানদের বোঝানো সর্বদা কঠিন ছিল। বিশেষত অটোমান সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতে। ধর্মীয় ও পারিবারিক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ জটিল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। উনিশ শতকের শুরুতে মুসলিম সম্প্রদায়গুলো মুসলিম ডাক্তারদের দাবি করেছিল, কারণ অটোম্যান সাম্রাজ্যে বেশিরভাগ চিকিৎসকই খ্রিস্টান ছিলেন। ১৮৫০-এর দশক থেকে স্টিমবোটের মাধ্যমে ভ্রমণ যেমন সহজলভ্য হয়েছিল তেমনিভাবে মক্কা ও মদিনার মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে ভ্রমণকারীরা সংক্রামক রোগের বিস্তারও ঘটিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মক্কা ও মদিনায় এবং তাদের দেশে ফিরে আসা তীর্থযাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশরা মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পৃথক পৃথক অফিস স্থাপন করেছিল।

এ ঐতিহাসিক সংক্রমণগুলো কেবল মুসলিমদের প্রাণহানি নয় বরং এশিয়ার অন্য মানুষদেরও সংক্রামক ব্যাধির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দস্তয়ভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’ শেষে যখন উপন্যাসের নায়ক রসক্লানিকোভ বলেন- তিনি কল্পনা করছেন পুরো বিশ্ব একটি বিভীষিকাময় নতুন রোগ প্লেগে আক্রান্ত এবং যা এশিয়া থেকে সৃষ্টি হয়ে ইউরোপ অবধি এসেছিল।

ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, বড় বড় মহামারী চলাকালীন ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলোতে জানাজা পড়ানো হয়েছিল। শোক প্রকাশকারীরা একে অপরের সান্নিধ্য গিয়েছিল। এ রোগটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে তা নিয়ে ভাবার পরিবর্তে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে কার জানাজা হবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ত।

আমাদের মৃত্যু ভয় যতটা বড় বুদ্ধিমত্তাও ততটা বিস্তৃত হওয়া উচিত। তাই এ মহামারী শেষ হলে একটি সুন্দর পৃথিবীর লক্ষ্যে মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সবার মাঝে সৌহার্দপূর্ণ ও সংহতিময় মনোভাব বজায় রাখতে হবে।

সম্প্রতি The Nwe York Times-এ প্রকাশিত ২০০৬ সালে

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত তুরস্কের লেখক ওরহান পামুকের What the great Pandemic Novels Teach Us শিরোনামের মূল প্রবন্ধটির বাংলায়ন করেছেন আকেল হায়দার।

মহামারী নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলো আমাদের যে শিক্ষা দেয়

 ওরহান পামুক 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯০১ সালে ঘটে যাওয়া মহামারীর পটভূমি নিয়ে গত চার বছর ধরে আমি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখছিলাম। বিশ্বব্যাপী যা তৃতীয় প্লেগ মহামারী নামে পরিচিত। প্রদাহযুক্ত এ প্লেগের প্রাদুর্ভাবে এশিয়ায় লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।

তবে এশিয়ার তুলনায় ইউরোপে খুব বেশি একটা প্রাণহানি হয়নি। বিগত সময়গুলোতে বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, সম্পাদক ও সাংবাদিকরা আমার নতুন উপন্যাস ‘নাইটস অফ প্লেগ’ ও মহামারী নিয়ে আমাকে অজস্র প্রশ্ন করেছেন। তারা মূলত বর্তমান সময়ের আলোচিত করোনাভাইরাস ও ঐতিহাসিক মহামারী প্লেগ/কলেরার সঙ্গে অনেক মিল দেখতে পেয়েছেন।

মানব সভ্যতা ও সাহিত্যের বর্ণনা অনুসারে সে মহামারী জীবাণু কিংবা ভাইরাস যে কারণেই হোক না কেন আমাদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কিন্তু সব সময় একই রকম হয়ে থাকে। মহামারী কিংবা প্রাদুর্ভাবের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সব সময়ই অস্বীকৃত।

অতীতের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারগুলো এ ক্ষেত্রে সব সময় দেরি করে তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় এবং প্রাদুর্ভাবের অস্তিত্ব অস্বীকার করার জন্য তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নেয়। রিপোর্টার ড্যানিয়েল ডিফোর রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ১৬৬৪ সালে লন্ডনে প্লেগের কারণে যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল সেখানে সেই সংখ্যাটি অন্যান্য রোগের কারণে মৃত্যু সংখ্যার চেয়ে কম দেখিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছিল।

১৮২৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্যা ব্যাথ্রয়েড’ উপন্যাসটি সম্ভবত প্লেগের প্রকোপ নিয়ে রচিত সবচেয়ে বাস্তবধর্মী উপন্যাস। ১৬৩০ সালে ঘটে যাওয়া প্লেগের সময় ইটালিয়ান লেখক আলেসান্দ্রো মানজোনি সে কথা স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন এবং সরকারি প্রতিক্রিয়ার বিপক্ষে জনগণের ক্রোধকে সমর্থন দিয়েছেন। যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিলান সরকার এ রোগ দ্বারা সৃষ্ট হুমকির কথা অস্বীকার করেন এবং সে সময় স্থানীয় রাজপুত্রের অনুষ্ঠিতব্য এক জন্মদিনের অনুষ্ঠানও বাতিল করা থেকে বিরত থাকেন। মানজোনি দেখিয়েছেন অপর্যাপ্ত বিধিনিষেধের কারণে রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে প্রশাসনের তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও এর প্রতিকারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে মনোযোগ দেননি।

প্লেগ ও মহামারী নিয়ে লেখা বেশিরভাগ সাহিত্যে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের অসতর্কতা, অযোগ্যতা ও স্বার্থপরতা জনগণের কাছে ক্রোধের প্ররোচক হিসেবে কাজ করেছে।

তবে ডিফো ও ক্যামাসের মতো প্রখ্যাত লেখকরা পাঠকদের কাছে ক্রোধের তরঙ্গ তলে থাকা রাজনীতি ছাড়াও আরও অনেক কিছু দেখায় যাতে মানুষের প্রকৃত অবস্থার অভ্যন্তরীণ চিত্র ফুটে ওঠে। মানবতার অন্যান্য সার্বজনীন এবং অব্যয়িত প্রতিক্রিয়া হল মহামারী সম্পর্কে আপাতদৃষ্টিতে সর্বদা গুজব সৃষ্টি করা এবং অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দেয়া। অতীতের মহামারীগুলোতে দেখা গেছে ছড়িয়ে পড়া গুজবগুলো মূলত ভুল তথ্য দেয় এবং সঠিক চিত্র দেখার সম্ভাবনাকে আড়াল করে দেয়।

ডিফো ও মানজোনি লিখেছেন মহামারীর সময়ে লোকজন রাস্তায় চলার সময় একে অন্যের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখত। তবে বিভিন্নজনের কাছ থেকে রোগের গোটা চিত্রটা জানার চেষ্টা করত। যাতে তারা মৃত্যু থেকে বাঁচতে পারে এবং আশ্রয়ের জন্য নিরাপদ জায়গার সন্ধান করতে পারে।

সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন ও ইন্টারনেটবিহীন বিশ্বে নিরক্ষর সংখ্যাগরিষ্ঠরাই কেবল কল্পনা করতে সক্ষম হয়েছিল যে, এ বিপদটি সবার মাঝে অদৃশ্য হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এর যন্ত্রণা কতটা তীব্র! প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর আরেকটি আলোচিত গুজব ছিল কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে ছড়িয়েছে এ রোগ! অশুভ শক্তির মতোই প্লেগকে এমনভাবে চিত্রিত করা হতো যা কিনা বাইরে থেকে আসে।

এটা অন্য কোথাও আঘাত হেনেছিল এবং সেখানে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পেরে এখানে এসেছে। সে সময় অ্যাথেন্সে প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার পর মিসর ও ইথিওপিয়া গ্রিস থেকে দূরে সরে গিয়েছিল বলে অনেকের ধারণা। রোগটি বিদেশি এবং দুষিত অভিপ্রায় নিয়ে আসে। অনুমানভিত্তিক রটনা সব সময় খুব বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হয়ে থাকে এটাই তার প্রমাণ।

‘দ্যা ব্যাথ্রয়েড’ উপন্যাসে মানজোরি এমন একটি চিত্র বর্ণনা করেছিলেন যা ছিল মধ্যযুগ থেকেই প্লেগের প্রচলিত কল্পনাগুলোর মধ্যে একটি।

এ অনাচারী দানবীয় উপস্থিতি সম্পর্কে প্রতিদিন গুজব ছড়িয়ে পড়ত। যারা অন্ধকারে দুর্গন্ধময় প্লেগের প্রকোপে পড়েছিল তারা কোনো তরল ও ফোয়ারার পানি পান করেছিল। অথবা কোনো ক্লান্ত বৃদ্ধা যিনি গির্জার অভ্যন্তরে মেঝেতে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন তার বিরুদ্ধে এ রোগ ছড়ানোর জন্য অভিযোগ করা হয়।

রেনেসাঁর পর থেকে প্লেগ মহামারীর ক্ষেত্রে হিংস্রতা, আতঙ্ক ও বিদ্রোহের নিয়ন্ত্রণহীন এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মার্ক্স অরেলিয়াস রোমান সাম্রাজ্যের খ্রিস্টানদের দোষারোপ করেছিলেন। কারণ তারা রোমান দেবতাদের অনুগ্রহ করার জন্য কোনো আচার অনুষ্ঠানে যোগ দেননি।

এবং পরবর্তী বিপর্যয়ের সময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে অটোম্যান সাম্রাজ্য এবং ইউরোপের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দিকে অভিযোগ আনা হয়েছিল।

প্লেগের ইতিহাস নিয়ে লেখা সাহিত্য আমাদের কষ্ট, দুর্দশা ও মৃত্যুর ভয়ঙ্কর দিক দেখায়। রূপক ভয় ও জনগণের দ্বারা অনুভব করা ক্রোধ রাজনৈতিক অসন্তোষের জন্ম দেয়। সেই পুরনো মহামারীর মতো ভিত্তিহীন গুজব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয়, জাতিগত এবং আঞ্চলিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে আনা অভিযোগগুলো করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সময় অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডানপন্থী মিডিয়াগুলো মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আজকের দিনে আমরা যে মহামারীতে বাস করছি এবং তা থেকে যে তথ্য পেয়েছি তা আগেকার সময়ের কোনো মহামারীতে ছিল না। এটা এতটাই শক্তিশালী ও যুক্তিসঙ্গত যে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। আমাদের ভয় হল যদি গুজবনির্ভর ও সঠিক তথ্য আড়াল করে আমাদের কাছে সংবাদ পরিবেশন করা হয় সেটা নিয়ে!

যখন আমরা বিশ্বের মানচিত্রে লাল বিন্দুগুলো দেখতে পাই তখন বুঝতে পারি যে পালানোর আর কোনো পথ নেই। কতটা দুঃসময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে! আমরা ইটালিয়ান শহরে সেনাবাহিনীর ট্রাকে মৃতদেহ বহনকারী ভিডিওগুলো দেখি আর মনে হয় আমরা যেন আমাদের নিজস্ব জানাজার শোভাযাত্রা দেখছি। থাইল্যান্ড থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত মানবতা কীভাবে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্রোসারি থেকে আমরা যে খাবারটি কিনছি ওটা কতটা নিরাপদ, কতটা স্বাস্থ্যসম্মত সে বিষয়কে বিচ্ছিন্ন ভাবার কোনো কারণ নেই। তবুও এখন আমরা আর আমাদের ভয়ে শঙ্কিত হই না। পারস্পরিক সমঝোতার মধ্যে একটি সাহসী মানবতার বন্ধন সৃষ্টির চেষ্টা করি।

আমি যখন টিভিতে বিশ্বের বৃহত্তম হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষা করা মানুষদের দেখি তখন দেখতে পাই আমাদের সন্ত্রাসবাদ মানবতার সঙ্গে কীভাবে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। তখন আর নিজেকে একা মনে হয় না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয় সম্পর্কে লজ্জাবোধ সংকুচিত হয়ে যায় এবং ক্রমবর্ধমানভাবে এটাকে সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাই। মহামারী সম্পর্কে সেই উক্তিটি আমাকে মনে করিয়ে দেয় তা হল যারা ভয় পায় এ পৃথিবী তাদের জন্য নয় তারা এখানে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। এক সময় আমি বুঝতে পারি যে ভয় আমার মধ্যে এবং সম্ভবত আমাদের সবার মধ্যে দুটি স্বতন্ত্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কখনও এটি আমাদের একাকিত্ব এবং নীরবতার দিকে নিয়ে যায় আবার কখনও এটি আমাদের মধ্যে নম্রতা ও সংহতির অনুশীলন শিক্ষা দেয়।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আমি প্রথম প্লেগ নিয়ে উপন্যাস লেখার স্বপ্ন দেখেছিলাম। প্রাথমিক পর্যায়ে আমার দৃষ্টি নিবন্ধ ছিল মৃত্যু ভয় নিয়ে। ১৫৬১ সালে লেখক ওজিয়ার গিসিলিন ডি বুসবেক- তিনি ছিলেন হ্যাপসবার্গে অটোম্যান সাম্রাজ্যের সুলতান সুলেমানের রাষ্ট্রদূত। প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইস্তাম্বুল থেকে ছয় ঘণ্টা পথপরিক্রমায় তিনি প্রিনকিপো দ্বীপে আশ্রয় নিয়ে মহামারী থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন অপর্যাপ্ত নিয়মকানুন ও পৃথকীকরণের অভাবে এবং ধর্মীয় কারণে এ রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল। প্রায় দেড় শতাব্দী পর মনীষী ডিফো তার উপন্যাসে লন্ডনের প্লেগ নিয়ে লিখেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে তুর্কিরা এবং অটোম্যানরা তাদের নিজস্ব ধারণার কথা বলে বাদ সেধেছিল এবং এতে প্রতিটি মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি পূর্বনির্ধারিত ছিল। আমার প্লেগ উপন্যাস ধর্মনিরপেক্ষতা ও আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে মুসলিম ধর্ম প্রাণঘাতী কিনা এটা নিয়ে ভাবতে সাহায্য করবে।

ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টানদের তুলনায় মহামারী চলাকালীন পৃথক পৃথক ব্যবস্থা মেনে চলার কথা মুসলমানদের বোঝানো সর্বদা কঠিন ছিল। বিশেষত অটোমান সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতে। ধর্মীয় ও পারিবারিক সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ জটিল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। উনিশ শতকের শুরুতে মুসলিম সম্প্রদায়গুলো মুসলিম ডাক্তারদের দাবি করেছিল, কারণ অটোম্যান সাম্রাজ্যে বেশিরভাগ চিকিৎসকই খ্রিস্টান ছিলেন। ১৮৫০-এর দশক থেকে স্টিমবোটের মাধ্যমে ভ্রমণ যেমন সহজলভ্য হয়েছিল তেমনিভাবে মক্কা ও মদিনার মুসলিম ভূখণ্ডগুলোতে ভ্রমণকারীরা সংক্রামক রোগের বিস্তারও ঘটিয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মক্কা ও মদিনায় এবং তাদের দেশে ফিরে আসা তীর্থযাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্রিটিশরা মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় পৃথক পৃথক অফিস স্থাপন করেছিল।

এ ঐতিহাসিক সংক্রমণগুলো কেবল মুসলিমদের প্রাণহানি নয় বরং এশিয়ার অন্য মানুষদেরও সংক্রামক ব্যাধির কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দস্তয়ভস্কির ‘অপরাধ ও শাস্তি’ শেষে যখন উপন্যাসের নায়ক রসক্লানিকোভ বলেন- তিনি কল্পনা করছেন পুরো বিশ্ব একটি বিভীষিকাময় নতুন রোগ প্লেগে আক্রান্ত এবং যা এশিয়া থেকে সৃষ্টি হয়ে ইউরোপ অবধি এসেছিল।

ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, বড় বড় মহামারী চলাকালীন ইস্তাম্বুলের মসজিদগুলোতে জানাজা পড়ানো হয়েছিল। শোক প্রকাশকারীরা একে অপরের সান্নিধ্য গিয়েছিল। এ রোগটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এসেছে তা নিয়ে ভাবার পরিবর্তে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল এবং পরবর্তীতে কার জানাজা হবে তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ত।

আমাদের মৃত্যু ভয় যতটা বড় বুদ্ধিমত্তাও ততটা বিস্তৃত হওয়া উচিত। তাই এ মহামারী শেষ হলে একটি সুন্দর পৃথিবীর লক্ষ্যে মানবিক মূল্যবোধ বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের সবার মাঝে সৌহার্দপূর্ণ ও সংহতিময় মনোভাব বজায় রাখতে হবে।

 

সম্প্রতি The Nwe York Times-এ প্রকাশিত ২০০৬ সালে

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত তুরস্কের লেখক ওরহান পামুকের What the great Pandemic Novels Teach Us শিরোনামের মূল প্রবন্ধটির বাংলায়ন করেছেন আকেল হায়দার।