রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর
jugantor
রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর

  রাজীব সরকার  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশায় ও পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। উনিশ শতকীয় নবজাগরণের অন্য কোনো মনীষীকে নিয়ে এত চর্চা হয়নি। যে কয়জন লেখক অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যাসাগরকে উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে থাকবে রবীন্দ্রনাথের নাম।

একটি চতুর্দশপদী কবিতা, চারটি প্রবন্ধ এবং বিদ্যাসাগর কলেজ পত্রিকায় বিদ্যাসাগর স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মণিমুক্তা খচিত এ শ্রদ্ধার্ঘ্য সম্পর্কে আলোচনার আগে ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশবে। মাটির প্রতিমায় চক্ষুদান করেন পুরোহিত। বঙ্গ প্রতিমায় ‘চক্ষুদান’ করেছিল বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’। এই মহামূল্যবান বইয়ের সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিল- “কেবল মনে পড়ে, জল পড়ে পাতা নড়ে তখন ‘কর’ ‘খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটাইয়া সবেমাত্র কূল পাইয়াছি। আমার জীবনের এইটেই আদি কবির প্রথম কবিতা।”

‘তিনি (রামসর্বস্ব পণ্ডিত) একদিন আমার ম্যাকবেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাহার কাছে লইয়া গেলেন। তখন তাহার কাছে রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বসিয়া ছিলেন। পুস্তকে ভরা তাহার ঘরের মধ্যে ঢুকিতে আমার বুক দুরুদুরু করিতেছিল; তাহার মুখচ্ছবি দেখিয়া যে আমার সাহসবৃদ্ধি হইল তাহা বলিতে পারি না। ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মতো শ্রোতা আমি তো পাই নাই; অতএব, এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম।’

বহুমাত্রিক বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তিনি রেনেসাঁস মানব। ইহজাগতিকতা, যুক্তিবাদী শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নারীশিক্ষার প্রসার, নতুন গদ্যরীতি, সমাজসংস্কার, বিধবাবিবাহ, পাঠ্যসূচি থেকে অলৌকিকতার বিলুপ্তি, জ্যোতিষশ্রাস্ত্রের পরিবর্তে জ্যোতির্বিদ্যার শিক্ষা, চারিত্রিকদৃঢ়তা, মানবমুখিনতার মতো বৈশিষ্ট্য যা ইউরোপীয় নেরেসাঁসকে তুলে ধরেছিল- বিদ্যাসাগর তার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ এমন একটি বিরল প্রবন্ধ যার প্রতিটি বাক্য পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তিনি শুরুতেই বিদ্যাসাগরের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন’। জড়ত্বকে ভেদ করে, দারিদ্র্যকে জয় করে এগিয়ে গেছেন বিদ্যাসাগর। সেই অগ্রযাত্রা ‘হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে।’

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নির্মাণ। তার অসামান্য বিশ্লেষণ-

‘বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্যসাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ...গ্রাম্য পাণ্ডিত্য এবং গ্রাম্য বর্বরতা, উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযোগী আর্যভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপূর্বে বাংলা গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষা গঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টিক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।’

অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু তিনি যে প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন এর মূলে ছিল তার চারিত্রিক শ্রেষ্ঠতা। রবীন্দ্রনাথের মতে প্রতিভা নয়, চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের গুণেই বিদ্যাসাগর বাংলার ইতিহাসে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্বের বিরল পরিচয় দিয়েছেন। তার চারিত্রিক মহত্বের প্রসঙ্গে রামমোহনকেও স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। নবজাগরণের এ দুই মহানায়কের সাদৃশ্য উল্লেখ করে বলেছেন-

‘একদিকে যেমন তাহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপরদিকে ইউরোপীয় প্রকৃতির সহিত তাহাদের চরিত্রের বিস্তর নিকটসাদৃশ্য দেখতে পাই। অথচ তাহা অনুকরণগত সাদৃশ্য নহে। বেশভূষায় আচারে ব্যবহারে তাহারা সম্পূর্ণ বাঙালি ছিলেন; স্বজাতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে তাহাদের সমতুল্য কেহ ছিল না; স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূলপত্তন তাহারাই করিয়া গিয়াছেন; অথচ নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাহারা বিশেষরূপে ইউরোপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন। ইউরোপীয়দের তুচ্ছ বাহ্য অনুকরণের প্রতি তাহারা যে অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতেও তাহাদের ইউরোপীয় সুলভ গভীর আত্মসম্মানবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ইউরোপীয় কেন, সরল সত্যপ্রিয় সাঁওতালেরাও যে অংশে মনুষ্যত্বে ভূষিত সেই অংশে বিদ্যাসাগর তাহার স্বজাতীয় বাঙালির অপেক্ষা সাঁওতালের সহিত আপনার অন্তরের যথার্থ ঐক্য অনুভব করিতেন।’

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর যথার্থ মনুষ্যত্বের জাজ্বল্যমান প্রতীক। তাদের তুলনায় আমাদের ক্ষুদ্রতাকে লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি-

‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’

বিদ্যাসাগরের মাতা ভগবতী দেবী এক দয়াময়ী নারী ছিলেন। শোকার্ত, রোগার্ত, ক্ষুধার্তকে সেবা করেছেন আজীবন। তাকে বিদ্যাসাগর জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বছরে একদিন পূজা করে ছয় সাতশত টাকা ব্যয় করা ভালো না গ্রামের নিরূপায় অসহায় মানুষকে ওই টাকা থেকে মাসে মাসে সাহায্য করা ভালো। ভগবতী দেবী বলেছিলেন, গ্রামের দরিদ্র নিরূপায় মানুষ প্রতিদিন খেতে পারলে পূজা করার প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ‘মনুষ্যের সেবাই যথার্থ দেবতার পূজা’- এই উপলব্ধি গ্রামের এক সাধারণ নারী কীভাবে করলেন! বিদ্যাসাগর যে সংস্কারমুক্ত মানবিক মূল্যবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, এর মূলে ছিল তার মায়ের মহৎ আদর্শ।

বিদ্যাসাগরের তেজস্বিতা ও লড়াকু মানসিকতা, প্রতিকূলতাকে জয় করার অদম্য স্পৃহা রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছে। সংগ্রামবিমুখ, অল্পে ভেঙে পড়া বাঙালির বিপরীতে বিদ্যাসাগর চির উন্নত রেখেছেন শির-

“তাহার জীবনে প্রথম হইতে ইহাই দেখা যায় যে, তাহার চরিত্র সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগতই যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিয়াছে। তাহার মতো অবস্থাপন্ন ছাত্রের পক্ষে বিদ্যালাভ করা পরম দুঃসাধ্য, কিন্তু এই গ্রাম্য বালক শীর্ণ খর্ব দেহ এবং প্রকাণ্ড মাথা লইয়া আশ্চর্য অল্পকালের মধ্যে বিদ্যাসাগর উপাধিপ্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহার মতো দরিদ্রাবস্থার লোকের পক্ষে দান করা, দয়া করা বড় কঠিন; কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন নিজের কোনো প্রকার অসচ্ছলতায় তাহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহিশ্চার্যশালী রাজা রায় বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন।”

রবীন্দ্রনাথের মতে এই দয়া স্ত্রীলোকের দয়া বা বাঙালিসুলভ দয়া ছিল না। ‘প্রকৃত দয়া যথার্থ পুরুষেরই ধর্ম’। নারী জাতিকে বিদ্যাসগর করুণা করেননি। স্নেহ ও ভক্তি করেছেন। মনুষ্যত্বের দায় থেকেই তিনি বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ বোধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নারী শিক্ষা সূচনা ও বিস্তারেও তার ভূমিকা পথিকৃতের। সংস্কৃত কলেজে অচলায়তন ভেঙে তিনি অব্রাহ্মণ শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের অন্যতম কীর্তি মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা। দুটি কারণে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত ‘বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম।’ দ্বিতীয়ত এরই মাধ্যমে ‘আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল।’ অসামান্য মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথের-

‘যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃতি বিদ্যায় যাহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না তিনিই ইংরেজি বিদ্যাকে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।’

বিদ্যাসাগর একক ও নিঃসঙ্গ ছিলেন। এ দেশের মাটিতে তার আবির্ভাব অবিশ্বাস্য। বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

‘আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না। কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন।’

বাঙালি জাতির ক্ষুদ্রতা দুর্বলতা ও হৃদয়হীনতার প্রতি বিদ্যাসাগরের ধিক্কার ছিল। মৃত্যুর পরও বিদ্যাসাগর জ্বলজ্বল করে বেঁচে আছেন, কারণ ‘তাহার মহৎ চরিত্রের যে অক্ষয়বট তিনি বঙ্গভূমিতে রোপণ করিয়া গিয়াছেন তাহার তলদেশ সমস্ত বাঙালি জাতির তীর্থস্থান হইয়াছে।’ এই অপূর্ব প্রবন্ধটির উপসংহারে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তা বিদ্যাসাগর মূল্যায়নে দিকনির্দেশক হয়ে আছে-

‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাহার অজেয় পৌরুষ, তাহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম ও ‘বিদ্যাসাগর চরিত্র।’ শিবনাথ শাস্ত্রীর উক্তিকে স্মরণ করে তিনি বলেছেন, ‘সেই প্রকৃতরূপে জীবিত যে মননের দ্বারা জীবিত থাকে।’ বাল্যবিধবাদের দুঃখ আমাদের মনে ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আমরা গতানুগতিক, তাই তাদের দুঃখ আমাদের জীবনকে স্পর্শ করে না। বিদ্যাসাগর আর যাহাই হউন, গতানুগতিক ছিলেন না। তাই তাদের দুঃখ তার হৃদয়কে স্পর্শ করে। বিদ্যাসাগর ‘আপনার প্রাণের জোরে, কেবল আপনার বেদনার উত্তাপে একাকী আপন কাজ করিয়া গিয়াছেন।’ এই প্রবন্ধে আধুনিক ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ মনীষী স্যামুয়েল জনসনের সঙ্গে বিদ্যাসগরের তুলনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

তৃতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বিদ্যাসাগর’। অনেকেই বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু তার দয়া দাক্ষিণ্যের কথাই বেশি করে বলেন। তারা বিদ্যাসাগরের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করতে চান। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, তিনি দেশাচারের দাস নন। তিনি যে কুসংস্কার ও দেশাচারের দুর্গে আঘাত হেনে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিদ্যাসাগরের বিদ্যাদর্শন সম্পর্কে বলেছেন-

‘তিনি যা কিছু পাশ্চাত্য তাকে অশুচি বলে অপমান করেননি। তিনি জানতেন বিদ্যার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের দিগবিরোধ নেই।’

বিদ্যাসাগর পাশ্চাত্যের নিত্য নতুন বিদ্যা আয়ত্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে মুক্ত চিন্তা ও ইহজাগতিকতার বিকাশ ঘটানোর জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সংস্কার করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তিনিই বর্তমান ইউরোপীয় বিদ্যার অভিমুখে ছাত্রদের অগ্রসর করবার প্রধান উদ্যোগী হয়েছিলেন।’

বাংলার রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অগণিত লেখক ও গবেষক লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশই রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন স্মরণ করেছেন। এটি মোটেও কাকতালীয় নয়। বাংলার রেনেসাঁসের সর্বোত্তম ফসল রবীন্দ্রনাথ। তার পক্ষেই সম্ভব ছিল রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষের চারিত্রিক মাহাত্ম্যকে সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।

রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর

 রাজীব সরকার 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যাসাগরের জীবদ্দশায় ও পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে অসংখ্য লেখালেখি হয়েছে। উনিশ শতকীয় নবজাগরণের অন্য কোনো মনীষীকে নিয়ে এত চর্চা হয়নি। যে কয়জন লেখক অসাধারণ নৈপুণ্যে বিদ্যাসাগরকে উপস্থাপন করেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে থাকবে রবীন্দ্রনাথের নাম।

একটি চতুর্দশপদী কবিতা, চারটি প্রবন্ধ এবং বিদ্যাসাগর কলেজ পত্রিকায় বিদ্যাসাগর স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মণিমুক্তা খচিত এ শ্রদ্ধার্ঘ্য সম্পর্কে আলোচনার আগে ফিরে যেতে হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশবে। মাটির প্রতিমায় চক্ষুদান করেন পুরোহিত। বঙ্গ প্রতিমায় ‘চক্ষুদান’ করেছিল বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’। এই মহামূল্যবান বইয়ের সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের শৈশবকে রাঙিয়ে দিয়েছিল- “কেবল মনে পড়ে, জল পড়ে পাতা নড়ে তখন ‘কর’ ‘খল’ প্রভৃতি বানানের তুফান কাটাইয়া সবেমাত্র কূল পাইয়াছি। আমার জীবনের এইটেই আদি কবির প্রথম কবিতা।”

‘তিনি (রামসর্বস্ব পণ্ডিত) একদিন আমার ম্যাকবেথের তর্জমা বিদ্যাসাগর মহাশয়কে শুনাইতে হইবে বলিয়া আমাকে তাহার কাছে লইয়া গেলেন। তখন তাহার কাছে রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বসিয়া ছিলেন। পুস্তকে ভরা তাহার ঘরের মধ্যে ঢুকিতে আমার বুক দুরুদুরু করিতেছিল; তাহার মুখচ্ছবি দেখিয়া যে আমার সাহসবৃদ্ধি হইল তাহা বলিতে পারি না। ইহার পূর্বে বিদ্যাসাগরের মতো শ্রোতা আমি তো পাই নাই; অতএব, এখান হইতে খ্যাতি পাইবার লোভটা মনের মধ্যে খুব প্রবল ছিল। বোধ করি কিছু উৎসাহ সঞ্চয় করিয়া ফিরিয়াছিলাম।’

বহুমাত্রিক বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তিনি রেনেসাঁস মানব। ইহজাগতিকতা, যুক্তিবাদী শিক্ষা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও নারীশিক্ষার প্রসার, নতুন গদ্যরীতি, সমাজসংস্কার, বিধবাবিবাহ, পাঠ্যসূচি থেকে অলৌকিকতার বিলুপ্তি, জ্যোতিষশ্রাস্ত্রের পরিবর্তে জ্যোতির্বিদ্যার শিক্ষা, চারিত্রিকদৃঢ়তা, মানবমুখিনতার মতো বৈশিষ্ট্য যা ইউরোপীয় নেরেসাঁসকে তুলে ধরেছিল- বিদ্যাসাগর তার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের বিদ্যাসাগর মূল্যায়নে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ এমন একটি বিরল প্রবন্ধ যার প্রতিটি বাক্য পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তিনি শুরুতেই বিদ্যাসাগরের পরিচয় দিয়ে বলেছেন, ‘তিনি যথার্থ মানুষ ছিলেন’। জড়ত্বকে ভেদ করে, দারিদ্র্যকে জয় করে এগিয়ে গেছেন বিদ্যাসাগর। সেই অগ্রযাত্রা ‘হিন্দুত্বের দিকে নহে, সাম্প্রদায়িকতার দিকে নহে।’

রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি বাংলাভাষার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নির্মাণ। তার অসামান্য বিশ্লেষণ-

‘বিদ্যাসাগর বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন। তৎপূর্বে বাংলায় গদ্যসাহিত্যের সূচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথমে বাংলা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন। ...গ্রাম্য পাণ্ডিত্য এবং গ্রাম্য বর্বরতা, উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযোগী আর্যভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন। তৎপূর্বে বাংলা গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষা গঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃষ্টিক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায়।’

অসামান্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু তিনি যে প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন এর মূলে ছিল তার চারিত্রিক শ্রেষ্ঠতা। রবীন্দ্রনাথের মতে প্রতিভা নয়, চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের গুণেই বিদ্যাসাগর বাংলার ইতিহাসে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্বের বিরল পরিচয় দিয়েছেন। তার চারিত্রিক মহত্বের প্রসঙ্গে রামমোহনকেও স্মরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। নবজাগরণের এ দুই মহানায়কের সাদৃশ্য উল্লেখ করে বলেছেন-

‘একদিকে যেমন তাহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপরদিকে ইউরোপীয় প্রকৃতির সহিত তাহাদের চরিত্রের বিস্তর নিকটসাদৃশ্য দেখতে পাই। অথচ তাহা অনুকরণগত সাদৃশ্য নহে। বেশভূষায় আচারে ব্যবহারে তাহারা সম্পূর্ণ বাঙালি ছিলেন; স্বজাতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে তাহাদের সমতুল্য কেহ ছিল না; স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূলপত্তন তাহারাই করিয়া গিয়াছেন; অথচ নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাহারা বিশেষরূপে ইউরোপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন। ইউরোপীয়দের তুচ্ছ বাহ্য অনুকরণের প্রতি তাহারা যে অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়াছেন তাহাতেও তাহাদের ইউরোপীয় সুলভ গভীর আত্মসম্মানবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। ইউরোপীয় কেন, সরল সত্যপ্রিয় সাঁওতালেরাও যে অংশে মনুষ্যত্বে ভূষিত সেই অংশে বিদ্যাসাগর তাহার স্বজাতীয় বাঙালির অপেক্ষা সাঁওতালের সহিত আপনার অন্তরের যথার্থ ঐক্য অনুভব করিতেন।’

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর যথার্থ মনুষ্যত্বের জাজ্বল্যমান প্রতীক। তাদের তুলনায় আমাদের ক্ষুদ্রতাকে লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি-

‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’

বিদ্যাসাগরের মাতা ভগবতী দেবী এক দয়াময়ী নারী ছিলেন। শোকার্ত, রোগার্ত, ক্ষুধার্তকে সেবা করেছেন আজীবন। তাকে বিদ্যাসাগর জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বছরে একদিন পূজা করে ছয় সাতশত টাকা ব্যয় করা ভালো না গ্রামের নিরূপায় অসহায় মানুষকে ওই টাকা থেকে মাসে মাসে সাহায্য করা ভালো। ভগবতী দেবী বলেছিলেন, গ্রামের দরিদ্র নিরূপায় মানুষ প্রতিদিন খেতে পারলে পূজা করার প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথ বিস্মিত হয়ে বলেছেন, ‘মনুষ্যের সেবাই যথার্থ দেবতার পূজা’- এই উপলব্ধি গ্রামের এক সাধারণ নারী কীভাবে করলেন! বিদ্যাসাগর যে সংস্কারমুক্ত মানবিক মূল্যবোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, এর মূলে ছিল তার মায়ের মহৎ আদর্শ।

বিদ্যাসাগরের তেজস্বিতা ও লড়াকু মানসিকতা, প্রতিকূলতাকে জয় করার অদম্য স্পৃহা রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছে। সংগ্রামবিমুখ, অল্পে ভেঙে পড়া বাঙালির বিপরীতে বিদ্যাসাগর চির উন্নত রেখেছেন শির-

“তাহার জীবনে প্রথম হইতে ইহাই দেখা যায় যে, তাহার চরিত্র সমস্ত প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে ক্রমাগতই যুদ্ধ করিয়া জয় লাভ করিয়াছে। তাহার মতো অবস্থাপন্ন ছাত্রের পক্ষে বিদ্যালাভ করা পরম দুঃসাধ্য, কিন্তু এই গ্রাম্য বালক শীর্ণ খর্ব দেহ এবং প্রকাণ্ড মাথা লইয়া আশ্চর্য অল্পকালের মধ্যে বিদ্যাসাগর উপাধিপ্রাপ্ত হইয়াছেন। তাহার মতো দরিদ্রাবস্থার লোকের পক্ষে দান করা, দয়া করা বড় কঠিন; কিন্তু তিনি যখন যে অবস্থাতেই পড়িয়াছেন নিজের কোনো প্রকার অসচ্ছলতায় তাহাকে পরের উপকার হইতে বিরত করিতে পারে নাই, এবং অনেক মহিশ্চার্যশালী রাজা রায় বাহাদুর প্রচুর ক্ষমতা লইয়া যে উপাধি লাভ করিতে পারে নাই এই দরিদ্র পিতার দরিদ্র সন্তান সেই ‘দয়ার সাগর’ নামে বঙ্গদেশে চিরদিনের জন্য বিখ্যাত হইয়া রহিলেন।”

রবীন্দ্রনাথের মতে এই দয়া স্ত্রীলোকের দয়া বা বাঙালিসুলভ দয়া ছিল না। ‘প্রকৃত দয়া যথার্থ পুরুষেরই ধর্ম’। নারী জাতিকে বিদ্যাসগর করুণা করেননি। স্নেহ ও ভক্তি করেছেন। মনুষ্যত্বের দায় থেকেই তিনি বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ বোধের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নারী শিক্ষা সূচনা ও বিস্তারেও তার ভূমিকা পথিকৃতের। সংস্কৃত কলেজে অচলায়তন ভেঙে তিনি অব্রাহ্মণ শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের অন্যতম কীর্তি মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা। দুটি কারণে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত ‘বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ স্থাপন এই প্রথম।’ দ্বিতীয়ত এরই মাধ্যমে ‘আমাদের দেশে ইংরেজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল।’ অসামান্য মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথের-

‘যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃতি বিদ্যায় যাহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না তিনিই ইংরেজি বিদ্যাকে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।’

বিদ্যাসাগর একক ও নিঃসঙ্গ ছিলেন। এ দেশের মাটিতে তার আবির্ভাব অবিশ্বাস্য। বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন-

‘আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না। কাকের বাসায় কোকিলে ডিম পাড়িয়া যায়, মানব ইতিহাসের বিধাতা সেইরূপ গোপনে কৌশলে বঙ্গভূমির প্রতি বিদ্যাসাগরকে মানুষ করিবার ভার দিয়াছিলেন।’

বাঙালি জাতির ক্ষুদ্রতা দুর্বলতা ও হৃদয়হীনতার প্রতি বিদ্যাসাগরের ধিক্কার ছিল। মৃত্যুর পরও বিদ্যাসাগর জ্বলজ্বল করে বেঁচে আছেন, কারণ ‘তাহার মহৎ চরিত্রের যে অক্ষয়বট তিনি বঙ্গভূমিতে রোপণ করিয়া গিয়াছেন তাহার তলদেশ সমস্ত বাঙালি জাতির তীর্থস্থান হইয়াছে।’ এই অপূর্ব প্রবন্ধটির উপসংহারে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তা বিদ্যাসাগর মূল্যায়নে দিকনির্দেশক হয়ে আছে-

‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাহার অজেয় পৌরুষ, তাহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম ও ‘বিদ্যাসাগর চরিত্র।’ শিবনাথ শাস্ত্রীর উক্তিকে স্মরণ করে তিনি বলেছেন, ‘সেই প্রকৃতরূপে জীবিত যে মননের দ্বারা জীবিত থাকে।’ বাল্যবিধবাদের দুঃখ আমাদের মনে ক্ষণিকের প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আমরা গতানুগতিক, তাই তাদের দুঃখ আমাদের জীবনকে স্পর্শ করে না। বিদ্যাসাগর আর যাহাই হউন, গতানুগতিক ছিলেন না। তাই তাদের দুঃখ তার হৃদয়কে স্পর্শ করে। বিদ্যাসাগর ‘আপনার প্রাণের জোরে, কেবল আপনার বেদনার উত্তাপে একাকী আপন কাজ করিয়া গিয়াছেন।’ এই প্রবন্ধে আধুনিক ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ মনীষী স্যামুয়েল জনসনের সঙ্গে বিদ্যাসগরের তুলনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

তৃতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বিদ্যাসাগর’। অনেকেই বিদ্যাসাগরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু তার দয়া দাক্ষিণ্যের কথাই বেশি করে বলেন। তারা বিদ্যাসাগরের প্রকৃত পরিচয় আড়াল করতে চান। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, তিনি দেশাচারের দাস নন। তিনি যে কুসংস্কার ও দেশাচারের দুর্গে আঘাত হেনে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানমনস্কতার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন সেটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বিদ্যাসাগরের বিদ্যাদর্শন সম্পর্কে বলেছেন-

‘তিনি যা কিছু পাশ্চাত্য তাকে অশুচি বলে অপমান করেননি। তিনি জানতেন বিদ্যার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমের দিগবিরোধ নেই।’

বিদ্যাসাগর পাশ্চাত্যের নিত্য নতুন বিদ্যা আয়ত্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে মুক্ত চিন্তা ও ইহজাগতিকতার বিকাশ ঘটানোর জন্য তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সংস্কার করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘তিনিই বর্তমান ইউরোপীয় বিদ্যার অভিমুখে ছাত্রদের অগ্রসর করবার প্রধান উদ্যোগী হয়েছিলেন।’

বাংলার রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগরকে নিয়ে অগণিত লেখক ও গবেষক লিখেছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের অধিকাংশই রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন স্মরণ করেছেন। এটি মোটেও কাকতালীয় নয়। বাংলার রেনেসাঁসের সর্বোত্তম ফসল রবীন্দ্রনাথ। তার পক্ষেই সম্ভব ছিল রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষের চারিত্রিক মাহাত্ম্যকে সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা।