একটি রবীন্দ্রগ্রন্থের প্রকাশনা
jugantor
একটি রবীন্দ্রগ্রন্থের প্রকাশনা

  ড. মনিরুজ্জামান  

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার ‘সাম্প্রতিক প্রকাশনী’ থেকে সম্প্রতি (আগস্ট ২০২০) আমিনুল ইসলাম বেদুর ‘রবীন্দ্রনাথ : তুমিই আমার আকাশ তুমিই আমার নীড়’ শিরোনামে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও সাহিত্য সাধনার বিষয়ে একখানি চমৎকার ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বই প্রকাশ করেছেন। শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগরের গৈরিক পটভূমিতে কালো ফ্রেমের ভেতর রবীন্দ্রনাথের বাউলের নৃত্য ভঙ্গির একটি প্রতিমানচিত্র দিয়ে আঁকা প্রচ্ছদটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বইটিতে আলোচনা অধ্যায় ১২টি ও পরিশিষ্টে দুই বিদেশি রবীন্দ্রভক্তের কথা আছে। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৭৫+ চিত্র। মূল্য ৬০০ (ছয়শত) টাকা মাত্র। গ্রন্থকার সাম্প্রতিক এবং রবীন্দ্র একাডেমি- এ উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাও। গ্রন্থকারের ইচ্ছা গ্রন্থ প্রকাশের দিনে উল্টোরথ টানা হোক। ৩৭৫ পৃষ্ঠার একটা বইয়ে শুধু চোখ বুলিয়ে ভুলত্রুটি ছেনে আসল রূপ বের করে আনা, মনে হচ্ছে বোতাম টিপে আলো জ্বালার মতো সহজ কাজ। এখানে ব্যবহৃত ভাষা যেমন সহজ, তেমনই নিখাঁজ নিপাট, রবীন্দ্র বিশ্লেষণেরই উপযোগী। তার আলোচনা ভঙ্গিটি তাই নান্দনিক। তথ্য উপস্থাপন রীতি স্বচ্ছ হলেও নীহার রঞ্জন, বুদ্ধদেব, অরবিন্দ পোদ্দার যেমন তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন, যা ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ন, সাহিত্যের আধুনিকতা স্পর্শী প্রতিমূল্যায়ন ও মার্ক্সীয় ধারার বিশ্লেষণ ঘেঁষা, তিনি সেই অভিলাষ পোষণ করেন না।

এ আলোচনার ঘটনাগুলো পরস্পরাগতভাবে সুবিন্যস্ত, বিষয়-সত্যগুলো যথার্থ, তবে আহরিত, অনুসন্ধেয় নয়। কোথাও কোথাও দ্রুত উল্লেখ বা হাস্টি জেনারেলাইজেশনের কারণে তা পুনর্বিচারযোগ্য কিংবা তা বিস্তৃত বিশ্লেষণ দাবি রাখে। স্ফুলিঙ্গ এবং লেখন সম্পর্কিত মন্তব্য (দুটি একই জাতীয়’ পৃ.-৪৭)। কিংবা সঙ্গীতে বাউল সুর সাঙ্গীকৃতকরণ প্রসঙ্গে মন্তব্য (পৃ.-৮৭-৯১) যেখানে একবার বলেছেন, ‘শিলাইদহ-কুষ্টিয়ায় বাউলদের সঙ্গে তার (কবির) যত গভীর সম্পর্কই ঘটুক, ওই সম্প্রদায়ের এসোটারিক তত্ত্বে তার অধিকার

জন্মেছিল বলা যায় না’, আবার বলেছেন, ‘আসলে বাউলদের মিস্টিক তত্ত্ব, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও উপনিষদ তার কবি চেতনায় একটি সহজ সমন্বয় লাভ করেছিল। (পৃ.-৮৮)। তিনি উল্লেখ করেছেন কবি পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গের লোকসঙ্গীতের ধারাগুলোর সঙ্গে অপরিচিত না থাকলেও বাউল ধারা ছাড়া অন্য কোনো ধারার সঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত হননি বা ওই ধারায় গান রচনা করেননি। কিন্তু পরে পশ্চিমবঙ্গের তরজা প্রসঙ্গে ভিন্ন কথাও বলেছেন (পৃ.-৮৮) এবং একাধিক গানের উল্লেখও করেছেন (পৃ.-৮৯)। রবীন্দ্রনাথ কোনো লোকতত্ত্বের গভীরে যাননি (পৃ.-৮৭), কিন্তু সহমর্মিতা অনুভব করেছেন (৮৭) এবং ‘চকিত বাণী’ রচনা করেছেন এবং তার সুরভঙ্গিও গ্রহণ করেছেন (৮৭-৮৮) তার এ আলোচনাগুলো মনে দাগ কাটে বটে, কিন্তু প্রশ্নও সৃষ্টি করে।

এ গ্রন্থের প্রতিটি পর্ব বা অধ্যায়ই সুখপাঠ্য, তবে গানের আলোচনায় তিনি হয়তো জোর দিতে চেয়েছেন। তা চাইলেও আমার বিবেচনায় একাদশতম আলোচনাটি (গৌতম বুদ্ধের প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা) যেখানে বুদ্ধের প্রতি কবির অনুরাগের প্রসঙ্গটি এসেছে, সেটিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পূর্ণাঙ্গ। কবি ব্রাহ্মধর্ম ও রামমোহন রায় এবং খ্রিস্টকে নিয়েও লিখেছেন। কিন্তু বুদ্ধ প্রসঙ্গটি তৌলন বিচারে অধিক গুরুত্ব ও অনুরাগী আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। লেখকও অধিক মনোযোগ এবং শ্রম ব্যয় করেছেন এ অধ্যায়টিতে। আবার অন্যদিক থেকে ধরলে এ গ্রন্থের দীর্ঘতম আলোচনাটি কিন্তু বিজয়াকে নিয়ে লেখা। কিছু দিন আগে ঢাকা থেকে আফিয়া দিলের স্বামী ভাষাবিদ আনোয়ার দিলের একটি বিশাল বই প্রকাশিত হয় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে। দেশ পত্রিকায়ও দিল-এর আর্জেন্টিনার বিজয়া সংক্রান্ত নানা সচিত্র তথ্য প্রকাশিত হয় কাছাকাছি সময়ে। বাংলাদেশের রবীন্দ্রভক্ত হিসেবে আমিনুল ইসলাম বেদুর আলোচনাটির ঐতিহাসিক ও মানগত মূল্যও যথেষ্ট বলেই গণ্য ও গ্রহণীয় হবে সন্দেহ নেই।

কোনো গ্রন্থই কোনো বিষয়ে শেষ গ্রন্থ নয়। কথাগুলো মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলাই গ্রন্থকারের কাজ। বেদু ভাই তথা আমিনুল ইসলাম বেদু রবীন্দ্রপ্রীতিকে আমাদের মধ্যে আবার জাগিয়ে দিলেন। তাকে শ্রদ্ধা জানাই।

একটি রবীন্দ্রগ্রন্থের প্রকাশনা

 ড. মনিরুজ্জামান 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার ‘সাম্প্রতিক প্রকাশনী’ থেকে সম্প্রতি (আগস্ট ২০২০) আমিনুল ইসলাম বেদুর ‘রবীন্দ্রনাথ : তুমিই আমার আকাশ তুমিই আমার নীড়’ শিরোনামে রবীন্দ্রসঙ্গীত ও সাহিত্য সাধনার বিষয়ে একখানি চমৎকার ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বই প্রকাশ করেছেন। শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগরের গৈরিক পটভূমিতে কালো ফ্রেমের ভেতর রবীন্দ্রনাথের বাউলের নৃত্য ভঙ্গির একটি প্রতিমানচিত্র দিয়ে আঁকা প্রচ্ছদটি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বইটিতে আলোচনা অধ্যায় ১২টি ও পরিশিষ্টে দুই বিদেশি রবীন্দ্রভক্তের কথা আছে। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৭৫+ চিত্র। মূল্য ৬০০ (ছয়শত) টাকা মাত্র। গ্রন্থকার সাম্প্রতিক এবং রবীন্দ্র একাডেমি- এ উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতাও। গ্রন্থকারের ইচ্ছা গ্রন্থ প্রকাশের দিনে উল্টোরথ টানা হোক। ৩৭৫ পৃষ্ঠার একটা বইয়ে শুধু চোখ বুলিয়ে ভুলত্রুটি ছেনে আসল রূপ বের করে আনা, মনে হচ্ছে বোতাম টিপে আলো জ্বালার মতো সহজ কাজ। এখানে ব্যবহৃত ভাষা যেমন সহজ, তেমনই নিখাঁজ নিপাট, রবীন্দ্র বিশ্লেষণেরই উপযোগী। তার আলোচনা ভঙ্গিটি তাই নান্দনিক। তথ্য উপস্থাপন রীতি স্বচ্ছ হলেও নীহার রঞ্জন, বুদ্ধদেব, অরবিন্দ পোদ্দার যেমন তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন, যা ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ন, সাহিত্যের আধুনিকতা স্পর্শী প্রতিমূল্যায়ন ও মার্ক্সীয় ধারার বিশ্লেষণ ঘেঁষা, তিনি সেই অভিলাষ পোষণ করেন না।

এ আলোচনার ঘটনাগুলো পরস্পরাগতভাবে সুবিন্যস্ত, বিষয়-সত্যগুলো যথার্থ, তবে আহরিত, অনুসন্ধেয় নয়। কোথাও কোথাও দ্রুত উল্লেখ বা হাস্টি জেনারেলাইজেশনের কারণে তা পুনর্বিচারযোগ্য কিংবা তা বিস্তৃত বিশ্লেষণ দাবি রাখে। স্ফুলিঙ্গ এবং লেখন সম্পর্কিত মন্তব্য (দুটি একই জাতীয়’ পৃ.-৪৭)। কিংবা সঙ্গীতে বাউল সুর সাঙ্গীকৃতকরণ প্রসঙ্গে মন্তব্য (পৃ.-৮৭-৯১) যেখানে একবার বলেছেন, ‘শিলাইদহ-কুষ্টিয়ায় বাউলদের সঙ্গে তার (কবির) যত গভীর সম্পর্কই ঘটুক, ওই সম্প্রদায়ের এসোটারিক তত্ত্বে তার অধিকার

জন্মেছিল বলা যায় না’, আবার বলেছেন, ‘আসলে বাউলদের মিস্টিক তত্ত্ব, বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব ও উপনিষদ তার কবি চেতনায় একটি সহজ সমন্বয় লাভ করেছিল। (পৃ.-৮৮)। তিনি উল্লেখ করেছেন কবি পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ বা পশ্চিমবঙ্গের লোকসঙ্গীতের ধারাগুলোর সঙ্গে অপরিচিত না থাকলেও বাউল ধারা ছাড়া অন্য কোনো ধারার সঙ্গীত দ্বারা প্রভাবিত হননি বা ওই ধারায় গান রচনা করেননি। কিন্তু পরে পশ্চিমবঙ্গের তরজা প্রসঙ্গে ভিন্ন কথাও বলেছেন (পৃ.-৮৮) এবং একাধিক গানের উল্লেখও করেছেন (পৃ.-৮৯)। রবীন্দ্রনাথ কোনো লোকতত্ত্বের গভীরে যাননি (পৃ.-৮৭), কিন্তু সহমর্মিতা অনুভব করেছেন (৮৭) এবং ‘চকিত বাণী’ রচনা করেছেন এবং তার সুরভঙ্গিও গ্রহণ করেছেন (৮৭-৮৮) তার এ আলোচনাগুলো মনে দাগ কাটে বটে, কিন্তু প্রশ্নও সৃষ্টি করে।

এ গ্রন্থের প্রতিটি পর্ব বা অধ্যায়ই সুখপাঠ্য, তবে গানের আলোচনায় তিনি হয়তো জোর দিতে চেয়েছেন। তা চাইলেও আমার বিবেচনায় একাদশতম আলোচনাটি (গৌতম বুদ্ধের প্রতি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শ্রদ্ধা) যেখানে বুদ্ধের প্রতি কবির অনুরাগের প্রসঙ্গটি এসেছে, সেটিই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং পূর্ণাঙ্গ। কবি ব্রাহ্মধর্ম ও রামমোহন রায় এবং খ্রিস্টকে নিয়েও লিখেছেন। কিন্তু বুদ্ধ প্রসঙ্গটি তৌলন বিচারে অধিক গুরুত্ব ও অনুরাগী আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে। লেখকও অধিক মনোযোগ এবং শ্রম ব্যয় করেছেন এ অধ্যায়টিতে। আবার অন্যদিক থেকে ধরলে এ গ্রন্থের দীর্ঘতম আলোচনাটি কিন্তু বিজয়াকে নিয়ে লেখা। কিছু দিন আগে ঢাকা থেকে আফিয়া দিলের স্বামী ভাষাবিদ আনোয়ার দিলের একটি বিশাল বই প্রকাশিত হয় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে। দেশ পত্রিকায়ও দিল-এর আর্জেন্টিনার বিজয়া সংক্রান্ত নানা সচিত্র তথ্য প্রকাশিত হয় কাছাকাছি সময়ে। বাংলাদেশের রবীন্দ্রভক্ত হিসেবে আমিনুল ইসলাম বেদুর আলোচনাটির ঐতিহাসিক ও মানগত মূল্যও যথেষ্ট বলেই গণ্য ও গ্রহণীয় হবে সন্দেহ নেই।

কোনো গ্রন্থই কোনো বিষয়ে শেষ গ্রন্থ নয়। কথাগুলো মনের মধ্যে জাগিয়ে তোলাই গ্রন্থকারের কাজ। বেদু ভাই তথা আমিনুল ইসলাম বেদু রবীন্দ্রপ্রীতিকে আমাদের মধ্যে আবার জাগিয়ে দিলেন। তাকে শ্রদ্ধা জানাই।