হাজার স্বপ্নের সারথি শেখ হাসিনা
jugantor
হাজার স্বপ্নের সারথি শেখ হাসিনা

  আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী  

০২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকার বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিবস উপলক্ষে জানাই আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।

মোহনি চৌধুরীর গানের কলিতে বলতে চাই, ‘যারা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা/ মৌন মলিনমুখে জাগালো ভাষা/আজি রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি/

বিজয়লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরি গলে’

অনন্য মানুষ শেখ হাসিনা, আপনি সেই নেতা, যিনি রক্তাক্ত ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সকল অর্জন যখন লুটেরা লুট করে কফিনবন্দি করে ফেলেছিল- সেই বিবৃত অন্ধকার থেকে আপনি বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের পতাকা, যা আপনার পিতা, আমাদের বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেই পতাকার অপমান করা হয়েছিল।

খুনিদের গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে সরকারিভাবে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সেই লজ্জা থেকে জাতিকে আপনি রক্ষা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে খুনিদের রক্ষা করে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করলে, আপনি (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর, ৭ম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ওই আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের সুযোগ সৃষ্টি করেন।

এভাবেই বঙ্গবন্ধুর আদরের ‘হাসু’কে জনগণ ভালোবাসায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছে দেশরত্ন শেখ হাসিনা রূপে। জিয়াউর রহমান, মোশতাকসহ ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীরা যখন স্বাধীনতার অর্জনকে বিনষ্ট করে ইতিহাস বিকৃত করে, আপনি শেখ হাসিনাই আমাদের ত্যাগ ও শহীদের রক্তে ভেজা সত্য ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানিয়েছেন।

এ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আপনি ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী। দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আপনি চ্যালেঞ্জ করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। চ্যালেঞ্জ হাতে আপনার রূপ যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

‘ঝড়কে আমি করব মিতে/ডরব না আর ভ্রূকুনিতে’

পাপিদের জন্য আপনার এক হাতে উদ্যত খড়গ, আরেক হাতে শঙ্কা হরণের বরাভয়। ধর্মে কথা আছে ‘জল যেমন পদ্ম পাতাকে স্পর্শ করতে পারে না, তেমনি, যে জন সৎকর্ম করে পাপ তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারবে না’।

রাজনীতিতে আপনাকে কলঙ্কিত করার জন্য ১-১১ কুশিলবরা চাঁদাবাজির মামলা করে ‘মাইনাস শেখ হাসিনার’ ষড়যন্ত্র করেছিল, কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে সততার দৃঢ়তায় আপনি তা মোকাবেলা করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনালের’ স্থাপিত আদালতে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক শেখ হাসিনাকে আমরা আইনজীবীরা সে-সময় সেভাবেই প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

ছোটবেলায় ঢাকা ফেরত বাবার মুখে শুনেছিলাম, ১৯৮১ সালে ১৭ মে, ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের ঢল নেমেছিল ঢাকার কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে আসবেন বলে, বাবা বর্ণনা করেছিলেন নেত্রীর আগমন উপলক্ষে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ধ্বনিতে বাংলার আকাশ বাতাস সেদিন আবার নতুন করে মুখরিত হয়েছিল।

মূলত সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল ‘দিন বদলের পালা’। নবনির্বাচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে আপনি বলেছিলেন,

‘আমি নেতা হতে আসিনি,

এসেছি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে পুনরুদ্ধার করতে।

সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে’।

প্রিয় নেত্রী, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দেশবাসীকে দেয়া সে দিনের কথা আপনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ যা আপনার জীবনেরও মনোছবি, আজ আলো ছড়াচ্ছে দিকে দিকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

‘আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি

আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতি’।

আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ রঙিন হয়ে উঠছে উন্নয়নে। আর আপনি এ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আপনাকে অভিনন্দন জানাই, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্প’, ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্প’, ‘ডেলটা প্ল্যান’সহ সব মহৎ উদ্যোগের জন্য। আপনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘কেউ দেশে গরিব, গৃহহীন থাকবে না সরকারের সব কার্যক্রমে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’ আপনি সরকারপ্রধান আছেন বলেই মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানীভাতাসহ উৎসবভাতা পান। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাঙা ঘরে ‘লাল-সবুজ’ রঙে সরকারি অর্থে ভবন নির্মিত হয়। এ সব কিছু সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায়।

বেগম খালেদা জিয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে যেখানে বিতর্ক ছড়ান, শেখ হাসিনা সেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেন। এখানেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিশেষত্ব। শেখ হাসিনার রাজনীতির ফলশ্রুতিতে আজকের আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ। আপনার দীর্ঘ রাজনীতির পথপরিক্রমায় আপনি বারবার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। গৃহবন্দি ও হত্যার পরিকল্পনার শিকার হয়েছেন। তবুও পিতার এ স্বপ্ন পূরণে আপনি পিছপা হননি। আপনার জন্মদিন এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ, আপনিই বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার-বাংলার’ রূপকার। আপনার নেতৃত্বে ‘তলাবিহীন বাংলাদেশ’ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, চিন্তা-দর্শন স্বপ্ন, ও সুখ-দুঃখের অভিব্যক্তি আপনার হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর অনবদ্য রচনা পাঠকের কাছে উঠে এসেছে, সহজ-সাবলিল ভাষায়।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংহতিপূর্ণ এক একটি মহাকাব্য। দূরদর্শী নেতৃত্ব আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িটি, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘরে’ উৎসর্গ করতে।

সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিকে উদ্ধার করে ১৯৮১ সালের ১০ জুন, আপনি এবং আপনার ছোট বোন শেখ রেহেনা ঘোষণা করলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি হবে জনগণের’ যে বাড়ি থেকে বাঙালি জাতি পেয়েছিল মুক্তির দিকনির্দেশনা, সেটি এখন বাঙালির ইতিহাসে ‘মুক্তির ঠিকানায়’ পরিণত হয়েছে।

আর নীরবে, এ প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে- দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের সন্তানদের। এভাবেই আপনি জনকল্যাণে কাজ করে চলেছেন নিরন্তর।

জাতির স্বপ্ন পূরণে আপনি ‘দীপশিখা’। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, তাই আপনার কাছেই আমাদের সব আর্জি-আবেদন। ২০১১ সালে হবিগঞ্জের ৬ বীরাঙ্গনাকে চেতনায়-৭১ হবিগঞ্জ সংগঠনটি থেকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানালে (সে সময়ের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব) মিজানুর রহমানকে আপনি নির্দেশ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বিষয়ে কাজ শুরু করার। আপনার নির্দেশেই সে সময় হবিগঞ্জের ৬ বীরকন্যা মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হন।

এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বিষয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে আওয়ামী লীগ সরকার। আজ তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। জাতিগতভাবে আমরা কিছুটা ঋণমুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি একক কোনো ব্যক্তি নন। জাতির আশা, ভরসার এবং হাজার স্বপ্নের বিশ্বস্ত ঠিকানা এক ‘শেখ হাসিনা’। আপনার মমতার হাত ধরে হবিগঞ্জে আমরা পেয়েছি, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার’।

২০০৯ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর স্বপ্ন পূরণে হবিগঞ্জের স্টাফ কোয়ার্টার রোডে অবস্থিত আমার পৈতৃক সম্পত্তি দান করে অস্থায়ী স্থাপনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু নিরাপত্তাসহ বহুবিদ সমস্যার কারণে, একজন মুক্তিযোদ্ধা পিতার শেষ ইচ্ছাটুকু বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) সাহেবের মাধ্যমে আপনার দৃষ্টিগোচরে বিষয়টি আনলে, ২০১৬ সালের সরকারের অর্থায়নে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগারের জন্য ৫ তলা ভবনটি স্থাপিত হয়। যেখানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের দলিলটিসহ প্রাই দু’শতাধিক মুক্তিযুদ্ধের স্মারক প্রদর্শিত হবে। দেশের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের আলোয়-আলোকিত করতে ভূমিকা রাখবে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ ইচ্ছা (১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী হবিগঞ্জে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কথা বলেছিলেন) পূরণে বঙ্গবন্ধুকন্যা ‘শেখ হাসিনা’ ‘দিকপাল’ হয়ে থাকবেন। ‘হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার’-এর শুভ সূচনা আপনার মমতাভরা হাত দিয়েই শুরু হবে এটাও আমাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।

কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর স্ত্রী বার্ধক্যজনিত কারণে এখন অসুস্থ। বৃদ্ধা এই নারীর আজ একটিই স্বপ্ন, হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর একদিন উদ্বোধন হবে, আর তা হবে বঙ্গবন্ধু কন্যা ‘শেখ হাসিনা’র পবিত্র হাতেই।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, দাতা প্রতিষ্ঠাতা ও সদস্য সচিব হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার।

হাজার স্বপ্নের সারথি শেখ হাসিনা

 আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী 
০২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়নের রূপকার বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিবস উপলক্ষে জানাই আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা।

মোহনি চৌধুরীর গানের কলিতে বলতে চাই, ‘যারা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা/ মৌন মলিনমুখে জাগালো ভাষা/আজি রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি/

বিজয়লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরি গলে’

অনন্য মানুষ শেখ হাসিনা, আপনি সেই নেতা, যিনি রক্তাক্ত ৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর স্বাধীনতা সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত সকল অর্জন যখন লুটেরা লুট করে কফিনবন্দি করে ফেলেছিল- সেই বিবৃত অন্ধকার থেকে আপনি বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে বাংলার সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল লাল-সবুজের পতাকা, যা আপনার পিতা, আমাদের বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সেই পতাকার অপমান করা হয়েছিল।

খুনিদের গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে সরকারিভাবে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সেই লজ্জা থেকে জাতিকে আপনি রক্ষা করেছিলেন। জিয়াউর রহমান ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে খুনিদের রক্ষা করে শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করলে, আপনি (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর, ৭ম জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ওই আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের সুযোগ সৃষ্টি করেন।

এভাবেই বঙ্গবন্ধুর আদরের ‘হাসু’কে জনগণ ভালোবাসায় তিলে তিলে গড়ে তুলেছে দেশরত্ন শেখ হাসিনা রূপে। জিয়াউর রহমান, মোশতাকসহ ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীরা যখন স্বাধীনতার অর্জনকে বিনষ্ট করে ইতিহাস বিকৃত করে, আপনি শেখ হাসিনাই আমাদের ত্যাগ ও শহীদের রক্তে ভেজা সত্য ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানিয়েছেন।

এ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আপনি ছিলেন নির্ভীক ও সাহসী। দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় আপনি চ্যালেঞ্জ করেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। চ্যালেঞ্জ হাতে আপনার রূপ যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

‘ঝড়কে আমি করব মিতে/ডরব না আর ভ্রূকুনিতে’

পাপিদের জন্য আপনার এক হাতে উদ্যত খড়গ, আরেক হাতে শঙ্কা হরণের বরাভয়। ধর্মে কথা আছে ‘জল যেমন পদ্ম পাতাকে স্পর্শ করতে পারে না, তেমনি, যে জন সৎকর্ম করে পাপ তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারবে না’।

রাজনীতিতে আপনাকে কলঙ্কিত করার জন্য ১-১১ কুশিলবরা চাঁদাবাজির মামলা করে ‘মাইনাস শেখ হাসিনার’ ষড়যন্ত্র করেছিল, কিন্তু আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে সততার দৃঢ়তায় আপনি তা মোকাবেলা করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনালের’ স্থাপিত আদালতে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর এক শেখ হাসিনাকে আমরা আইনজীবীরা সে-সময় সেভাবেই প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

ছোটবেলায় ঢাকা ফেরত বাবার মুখে শুনেছিলাম, ১৯৮১ সালে ১৭ মে, ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের ঢল নেমেছিল ঢাকার কুর্মিটোলা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে আসবেন বলে, বাবা বর্ণনা করেছিলেন নেত্রীর আগমন উপলক্ষে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের ধ্বনিতে বাংলার আকাশ বাতাস সেদিন আবার নতুন করে মুখরিত হয়েছিল।

মূলত সেদিন থেকে শুরু হয়েছিল ‘দিন বদলের পালা’। নবনির্বাচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে আপনি বলেছিলেন,

‘আমি নেতা হতে আসিনি,

এসেছি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে পুনরুদ্ধার করতে।

সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়ন করতে’।

প্রিয় নেত্রী, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে দেশবাসীকে দেয়া সে দিনের কথা আপনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ যা আপনার জীবনেরও মনোছবি, আজ আলো ছড়াচ্ছে দিকে দিকে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,

‘আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি

আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতি’।

আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে সবুজ শ্যামল বাংলাদেশ রঙিন হয়ে উঠছে উন্নয়নে। আর আপনি এ উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আপনাকে অভিনন্দন জানাই, ‘পদ্মা সেতু প্রকল্প’, ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ প্রকল্প’, ‘ডেলটা প্ল্যান’সহ সব মহৎ উদ্যোগের জন্য। আপনি ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘কেউ দেশে গরিব, গৃহহীন থাকবে না সরকারের সব কার্যক্রমে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।’ আপনি সরকারপ্রধান আছেন বলেই মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানীভাতাসহ উৎসবভাতা পান। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাঙা ঘরে ‘লাল-সবুজ’ রঙে সরকারি অর্থে ভবন নির্মিত হয়। এ সব কিছু সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকায়।

বেগম খালেদা জিয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়ে যেখানে বিতর্ক ছড়ান, শেখ হাসিনা সেখানে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেন। এখানেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিশেষত্ব। শেখ হাসিনার রাজনীতির ফলশ্রুতিতে আজকের আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ। আপনার দীর্ঘ রাজনীতির পথপরিক্রমায় আপনি বারবার সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। গৃহবন্দি ও হত্যার পরিকল্পনার শিকার হয়েছেন। তবুও পিতার এ স্বপ্ন পূরণে আপনি পিছপা হননি। আপনার জন্মদিন এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ, আপনিই বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার-বাংলার’ রূপকার। আপনার নেতৃত্বে ‘তলাবিহীন বাংলাদেশ’ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, চিন্তা-দর্শন স্বপ্ন, ও সুখ-দুঃখের অভিব্যক্তি আপনার হাত ধরে বঙ্গবন্ধুর অনবদ্য রচনা পাঠকের কাছে উঠে এসেছে, সহজ-সাবলিল ভাষায়।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে সংহতিপূর্ণ এক একটি মহাকাব্য। দূরদর্শী নেতৃত্ব আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছিল ধানমণ্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বরের বাড়িটি, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি জাদুঘরে’ উৎসর্গ করতে।

সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিকে উদ্ধার করে ১৯৮১ সালের ১০ জুন, আপনি এবং আপনার ছোট বোন শেখ রেহেনা ঘোষণা করলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি হবে জনগণের’ যে বাড়ি থেকে বাঙালি জাতি পেয়েছিল মুক্তির দিকনির্দেশনা, সেটি এখন বাঙালির ইতিহাসে ‘মুক্তির ঠিকানায়’ পরিণত হয়েছে।

আর নীরবে, এ প্রতিষ্ঠান থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে- দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের সন্তানদের। এভাবেই আপনি জনকল্যাণে কাজ করে চলেছেন নিরন্তর।

জাতির স্বপ্ন পূরণে আপনি ‘দীপশিখা’। আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা, তাই আপনার কাছেই আমাদের সব আর্জি-আবেদন। ২০১১ সালে হবিগঞ্জের ৬ বীরাঙ্গনাকে চেতনায়-৭১ হবিগঞ্জ সংগঠনটি থেকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানালে (সে সময়ের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব) মিজানুর রহমানকে আপনি নির্দেশ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বিষয়ে কাজ শুরু করার। আপনার নির্দেশেই সে সময় হবিগঞ্জের ৬ বীরকন্যা মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হন।

এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি বিষয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে আওয়ামী লীগ সরকার। আজ তারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত। জাতিগতভাবে আমরা কিছুটা ঋণমুক্ত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি একক কোনো ব্যক্তি নন। জাতির আশা, ভরসার এবং হাজার স্বপ্নের বিশ্বস্ত ঠিকানা এক ‘শেখ হাসিনা’। আপনার মমতার হাত ধরে হবিগঞ্জে আমরা পেয়েছি, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার’।

২০০৯ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর স্বপ্ন পূরণে হবিগঞ্জের স্টাফ কোয়ার্টার রোডে অবস্থিত আমার পৈতৃক সম্পত্তি দান করে অস্থায়ী স্থাপনায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু নিরাপত্তাসহ বহুবিদ সমস্যার কারণে, একজন মুক্তিযোদ্ধা পিতার শেষ ইচ্ছাটুকু বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) সাহেবের মাধ্যমে আপনার দৃষ্টিগোচরে বিষয়টি আনলে, ২০১৬ সালের সরকারের অর্থায়নে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগারের জন্য ৫ তলা ভবনটি স্থাপিত হয়। যেখানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বাধীনতা ঘোষণাপত্রের দলিলটিসহ প্রাই দু’শতাধিক মুক্তিযুদ্ধের স্মারক প্রদর্শিত হবে। দেশের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাসের আলোয়-আলোকিত করতে ভূমিকা রাখবে হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার।

একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনের শেষ ইচ্ছা (১৯৯০ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী হবিগঞ্জে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কথা বলেছিলেন) পূরণে বঙ্গবন্ধুকন্যা ‘শেখ হাসিনা’ ‘দিকপাল’ হয়ে থাকবেন। ‘হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার’-এর শুভ সূচনা আপনার মমতাভরা হাত দিয়েই শুরু হবে এটাও আমাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা।

কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর স্ত্রী বার্ধক্যজনিত কারণে এখন অসুস্থ। বৃদ্ধা এই নারীর আজ একটিই স্বপ্ন, হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর একদিন উদ্বোধন হবে, আর তা হবে বঙ্গবন্ধু কন্যা ‘শেখ হাসিনা’র পবিত্র হাতেই।

লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, দাতা প্রতিষ্ঠাতা ও সদস্য সচিব হবিগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও মানিক চৌধুরী পাঠাগার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন