সাংবাদিকের ভাষা সাহিত্যিকের ভাষা
jugantor
সাংবাদিকের ভাষা সাহিত্যিকের ভাষা

  সরকার মাসুদ  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সংবাদ পাঠকরা সাধারণত ধরেই নেন যে, কাগজে যা বর্ণিত হয়েছে তার পুরোটাই বাস্তব এবং প্রতিবেদনের প্রতিটি অক্ষরই সত্যনিষ্ঠ। ধরা যাক, ব্রিজের রেলিং ভেঙে একটি বাস অনেক নিচে শুকনো খালে পতিত হয়েছে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে অনেক যাত্রী। এখন, ওই দুর্ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা যা দেখেছেন এবং সাংবাদিক যা লিখেছেন- দুটো জিনিস কি একই রকম হবে? আমি বলব, ঠিক একই রকম হবে না। কিছু না কিছু ফাঁক থেকে যাবেই। সে জন্য আমি এমনও দেখেছি একজন ব্যক্তি একাধিক সংবাদপত্র পড়েন। প্রতিবেদকে প্রতিবেদকে ভাষা ও উপস্থাপন রীতির ভিন্নতা আছে। ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকায় পরিবেশিত সংবাদের ভেতর থেকে ওই পাঠক তাই প্রকৃত ঘটনাটির চেহারা বুঝতে চান।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনার পকৃত রূপ ও সাংবাদিকের প্রতিবেদনের ভেতর ফাঁক থেকে যায় কেন? যায় এ জন্যই যে, একালের সাংবাদিকরা হয়ত তথ্যকে যুক্তিভিত্তিক করে তোলার ব্যাপারে খুব বেশি মনোযোগী নন। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই সাহিত্যের রং-রসযুক্ত প্রতিবেদনকে উৎকৃষ্ট সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে মান্য করা হয়।

আজকের যুগে সত্য ও কল্পনার মিশ্রণে তৈরি বিচিত্র সংবাদগুলো হাজির হয় আমাদের সম্মুখে। এরা কেবল হাজিরই হয় না, আমাদের নানাভাবে প্রভাবিতও করে। খবরের হাজার রকম তথ্যের ভেতর দিয়ে আমরা সমাজ-প্রতিবেশ ও নিজেদের চেহারা বারবার দেখি। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনও সরবরাহ করে। বিজ্ঞাপন যেহেতু পণ্যসহ বহু কিছুর তথ্য দেয়, সে জন্য বিজ্ঞাপনও এক ধরনের সংবাদ। একটানা খারাপ সংবাদ যেমন পাঠককে অশনিসংকেত দেয়, তেমনি ইতিবাচক খবরগুলো মানুষকে স্বপ্নও দেখায়। নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ধারাবাহিক খবরগুলো মানুষকে যেভাবে আশান্বিত করে তুলছে তা ইতিবাচক স্বপ্নের মতোই। সংবাদের সঙ্গে স্বপ্নের যোগ অন্যভাবেও আছে। সেটা খবর যিনি পরিবেশন করেন তার দিক থেকে। রিপোর্টার একটি সংবাদ কীভাবে লিখবেন, কোথা থেকে আরম্ভ করবেন, তাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কী কী কৌশল অবলম্বন করবেন- এ পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে একটি স্বপ্নময় তাগিদ থাকে। একে আমরা স্বপ্নকল্পনাও বলতে পারি। কেননা পরিকল্পনামাফিক লিখিত ও পত্রস্থ হওয়ার পর পাঠক সেই সংবাদ কীভাবে নেবে, প্রতিবেদক তা মনের চোখে দেখতে পান। সে জন্য অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার সত্যতার সঙ্গে কিছু পরিমাণ ভাব-কল্পনাও মিশিয়ে দেন আজকের দিনের সংবাদকর্মী।

আমরা জানি, সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য ও সংক্রামী করে তোলার গরজে সাংবাদিকরা প্রচুর ডিটেলের ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময়ই কিছু কলাকৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়। আধুনিক কথাসাহিত্যে ডিটেলের যে ধরনের প্রয়োগ আমরা দেখে থাকি তাতেও কৌশল ও কল্পনা দুটিই উপস্থিত। কাজেই সাহিত্য ও সংবাদের ভেতর যে সরল বিভাজন এতকাল চালু আছে তা আসলে বিষয়টির অতি সরলীকরণ। এ দুটি জিনিস খুবই কাছাকাছি, অন্তত আজকাল সে রকমই মনে হয়। আবার কখনও কখনও এর একটিকে অন্যটি বলে ভ্রম হয়।

সংবাদের ভাষাকে হতে হবে খুব সরাসরি, অতিসংক্ষিপ্ত- এতটা রক্ষণশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে এ যুগের সাংবাদিকতা। অন্যদিকে সৃজনশীল রচনায় লেখক স্বপ্ন-কল্পনার ঘোড়া ছোটানোর অবাধ ও যথেচ্ছ স্বাধীনতা ভোগ করবেন এমনটাও বিশ্বাস করেন না এখনকার সাহিত্যিক। যেহেতু Information ও Fact অনেক কাছাকাছি এবং দুটিারই উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বহুরূপিতা; সে জন্য এরা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যসৃজন উভয় কাজেই তাদের স্ব স্ব শক্তি ও কল্পনা নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন। Death of a President নামে একটি বই পড়েছিলাম। আততায়ীর হাতে নিহত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে নিয়ে বইটি। লেখক উইলিয়াম ম্যানচেস্টার। ওই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা, হত্যাকারী লে হার্ভে অসওয়াল্ড সম্বন্ধে মন্তব্য, আমেরিকার সমাজ ও রাজনীতিতে ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়া- সব কিছু সাংবাদিকের সুদক্ষ কলমে পুনর্নির্মিত হয়ে যে রূপ ধারণ করেছে আর তার পাঠ যে স্বাদ উপহার দিয়েছে তাতে আমার মনে হয়েছিল, এ রচনা সাহিত্য ছাড়া আর কী? দুই বাংলায় খ্যাতিমান অনেক সাহিত্যিকই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। এখনও অনেক লেখক এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। সন্তোষকুমার ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, অরূনাথ সরকার, সন্তোষ গুপ্ত, মহাদেব সাহা প্রমুখ লেখক তাদের রচিত প্রতিবেদনগুলোয় সাহিত্যের স্বাদ ও ভিন্ন মেজাজ এনে সাংবাদিকতার ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, সংগৃহীত প্রমাণাদি, পর্যবেক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া (যার সঙ্গে কিছুটা কল্পনাও মেশানো থাকে) একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রতিবেদনকে কীভাবে বিস্ময়কর সাহিত্যে উত্তীর্ণ করে দিতে পারে তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ হয় In Cold Blood নামের উপন্যাস। এ বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের স্রষ্টার নাম ট্রুম্যান কাপোটি।

উপন্যাসটি রচনার প্রক্রিয়া রীতিমতো চমকপ্রদ। ১৯৫৯ সালের ১৫ নভেম্বর আমেরিকার ক্যানসাস রাজ্যের ছোট্ট শহর হলকুম্বে একই সঙ্গে চার ব্যক্তি খুন হন। মাথার খুব কাছ থেকে বুলেটবিদ্ধ করা হয় তাদের। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও খুনের কারণ এমনকি কোনো সূত্রও খুঁজে পায় না। অবশ্য অল্প সময়ের ভেতর খুনিরা ধরা পড়ে। সাংবাদিক ট্র–ম্যান কাপোটি ওই সময় Newyorker-এর সঙ্গে যুক্ত। ওই পত্রিকার জন্য একটা ফিচার রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশে তিনি হলকুম্ব যান। রিপোর্টটি লিখিত হবে ওই চার খুনের ওপর। তিনি নিহত ব্যক্তিবর্গের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলেন, দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখেন, বারবার সাহায্য নেন পুলিশ ও থানার। তাছাড়া খুনিদের নাম-পরিচয়, তাদের অতীত বর্তমান কর্মকাণ্ড, তাদের বন্ধুবৃত্ত এ সবেরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন তিনি।

ওইসব ঘটনা প্রায় চার বছর ধরে নিপুণ ডিটেল ও চমৎকার লিপিকৌশলে তুলে আনেন ট্রুম্যান কাপোটি। ভাবতে ভাবতে, লিখতে লিখতে এক সময় তিনি আবিষ্কার করলেন ওই খুনের ঘটনা এবং তার সমুদয় প্রতিক্রিয়া পুনর্গঠিত হওয়ার ফলে রীতিমতো উপন্যাসের রূপ ধারণ করেছে। তারপর সেই লেখা যখন বই হয়ে বেরোল, বোদ্ধা পাঠক-সমালোচক মহল বলতে আরম্ভ করল, যে প্রতিবেদন এত নিখুঁত ডিটেল, অসংখ্য তথ্য সর্বোপরি জীবন্ত বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাকে সাহিত্য না বলে উপায় কী? ওই রচনা, অবশেষে, স্বীকৃতি পেল সাহিত্য হিসেবে, আর তার কপালে জুটল non-fietion novel-এর তকমা।

রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন যে, সাহিত্য তাই যা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তথ্য বা সংবাদও তো এখন প্রবলভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনের সঙ্গে। সংবাদও যে লেখার গুণে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে তার মূল সূত্রটি তো ওই ‘জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে’র মধ্যেই। খবরের কাগজ থেকে প্রাপ্ত একটি দুর্ঘটনার সংবাদকে কেন্দ্র করে অনন্য এক স্বাদু গদ্য ‘খারিজ’ নামে যে উপন্যাসটি রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন তার কথা আমরা ভুলে যাইনি। মার্কেজের Story of Kidnapping গ্রন্থে যেভাবে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য পরস্পরপ্রবিষ্ট হয়েছে এক কথায় তা তুলনাহীন। সাহিত্যিকের স্বপ্ন-কল্পনা আর সাংবাদিকের স্বপ্নিল ইচ্ছা এখানে মিলেমিশে একাকার। দেবেশ রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের নাম ‘খরার প্রতিবেদন’। শুধু নামেই নয়, ভেতরের কনটেন্টেও লেখক দক্ষ সাংবাদিকসুলভ ক্যারিশমার উপাদানগুলোকে নিজের মতো করে কাজে লাগিয়েছেন।

In clod Blood পরে একটি ধারার সৃষ্টি করে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর এর নির্মাণরীতির সবচেয়ে বেশি নিন্দা করেছিলেন যিনি সেই নর্মান মেইলার ১৩-১৪ বছর পর The executioners Song নামে এক খুনির জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস লেখেন। অপরাধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার এ গ্রন্থ রচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কাঠামো ও গঠন উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য দিক। উত্তর আধুনিক উপন্যাসের এ যুগে সাংবাদিকতার ধর্ম ও দৃষ্টিকোণকে যখন ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন গঠনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে পুনর্গঠন বা পুনর্নির্মাণ।

সাংবাদিকের ভাষা সাহিত্যিকের ভাষা

 সরকার মাসুদ 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সংবাদ পাঠকরা সাধারণত ধরেই নেন যে, কাগজে যা বর্ণিত হয়েছে তার পুরোটাই বাস্তব এবং প্রতিবেদনের প্রতিটি অক্ষরই সত্যনিষ্ঠ। ধরা যাক, ব্রিজের রেলিং ভেঙে একটি বাস অনেক নিচে শুকনো খালে পতিত হয়েছে। ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে অনেক যাত্রী। এখন, ওই দুর্ঘটনার সময় প্রত্যক্ষদর্শীরা যা দেখেছেন এবং সাংবাদিক যা লিখেছেন- দুটো জিনিস কি একই রকম হবে? আমি বলব, ঠিক একই রকম হবে না। কিছু না কিছু ফাঁক থেকে যাবেই। সে জন্য আমি এমনও দেখেছি একজন ব্যক্তি একাধিক সংবাদপত্র পড়েন। প্রতিবেদকে প্রতিবেদকে ভাষা ও উপস্থাপন রীতির ভিন্নতা আছে। ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকায় পরিবেশিত সংবাদের ভেতর থেকে ওই পাঠক তাই প্রকৃত ঘটনাটির চেহারা বুঝতে চান।

প্রশ্ন হচ্ছে, ঘটনার পকৃত রূপ ও সাংবাদিকের প্রতিবেদনের ভেতর ফাঁক থেকে যায় কেন? যায় এ জন্যই যে, একালের সাংবাদিকরা হয়ত তথ্যকে যুক্তিভিত্তিক করে তোলার ব্যাপারে খুব বেশি মনোযোগী নন। তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রেই সাহিত্যের রং-রসযুক্ত প্রতিবেদনকে উৎকৃষ্ট সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে মান্য করা হয়।

আজকের যুগে সত্য ও কল্পনার মিশ্রণে তৈরি বিচিত্র সংবাদগুলো হাজির হয় আমাদের সম্মুখে। এরা কেবল হাজিরই হয় না, আমাদের নানাভাবে প্রভাবিতও করে। খবরের হাজার রকম তথ্যের ভেতর দিয়ে আমরা সমাজ-প্রতিবেশ ও নিজেদের চেহারা বারবার দেখি। সংবাদপত্র ও টেলিভিশন বিজ্ঞাপনও সরবরাহ করে। বিজ্ঞাপন যেহেতু পণ্যসহ বহু কিছুর তথ্য দেয়, সে জন্য বিজ্ঞাপনও এক ধরনের সংবাদ। একটানা খারাপ সংবাদ যেমন পাঠককে অশনিসংকেত দেয়, তেমনি ইতিবাচক খবরগুলো মানুষকে স্বপ্নও দেখায়। নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ধারাবাহিক খবরগুলো মানুষকে যেভাবে আশান্বিত করে তুলছে তা ইতিবাচক স্বপ্নের মতোই। সংবাদের সঙ্গে স্বপ্নের যোগ অন্যভাবেও আছে। সেটা খবর যিনি পরিবেশন করেন তার দিক থেকে। রিপোর্টার একটি সংবাদ কীভাবে লিখবেন, কোথা থেকে আরম্ভ করবেন, তাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কী কী কৌশল অবলম্বন করবেন- এ পুরো ব্যাপারটার সঙ্গে একটি স্বপ্নময় তাগিদ থাকে। একে আমরা স্বপ্নকল্পনাও বলতে পারি। কেননা পরিকল্পনামাফিক লিখিত ও পত্রস্থ হওয়ার পর পাঠক সেই সংবাদ কীভাবে নেবে, প্রতিবেদক তা মনের চোখে দেখতে পান। সে জন্য অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার সত্যতার সঙ্গে কিছু পরিমাণ ভাব-কল্পনাও মিশিয়ে দেন আজকের দিনের সংবাদকর্মী।

আমরা জানি, সংবাদকে বিশ্বাসযোগ্য ও সংক্রামী করে তোলার গরজে সাংবাদিকরা প্রচুর ডিটেলের ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময়ই কিছু কলাকৌশলের আশ্রয় নেয়া হয়। আধুনিক কথাসাহিত্যে ডিটেলের যে ধরনের প্রয়োগ আমরা দেখে থাকি তাতেও কৌশল ও কল্পনা দুটিই উপস্থিত। কাজেই সাহিত্য ও সংবাদের ভেতর যে সরল বিভাজন এতকাল চালু আছে তা আসলে বিষয়টির অতি সরলীকরণ। এ দুটি জিনিস খুবই কাছাকাছি, অন্তত আজকাল সে রকমই মনে হয়। আবার কখনও কখনও এর একটিকে অন্যটি বলে ভ্রম হয়।

সংবাদের ভাষাকে হতে হবে খুব সরাসরি, অতিসংক্ষিপ্ত- এতটা রক্ষণশীলতার ওপর দাঁড়িয়ে এ যুগের সাংবাদিকতা। অন্যদিকে সৃজনশীল রচনায় লেখক স্বপ্ন-কল্পনার ঘোড়া ছোটানোর অবাধ ও যথেচ্ছ স্বাধীনতা ভোগ করবেন এমনটাও বিশ্বাস করেন না এখনকার সাহিত্যিক। যেহেতু Information ও Fact অনেক কাছাকাছি এবং দুটিারই উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে বহুরূপিতা; সে জন্য এরা সাংবাদিকতা ও সাহিত্যসৃজন উভয় কাজেই তাদের স্ব স্ব শক্তি ও কল্পনা নিয়ে উপস্থিত হতে পারেন। Death of a President নামে একটি বই পড়েছিলাম। আততায়ীর হাতে নিহত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিকে নিয়ে বইটি। লেখক উইলিয়াম ম্যানচেস্টার। ওই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা, হত্যাকারী লে হার্ভে অসওয়াল্ড সম্বন্ধে মন্তব্য, আমেরিকার সমাজ ও রাজনীতিতে ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়া- সব কিছু সাংবাদিকের সুদক্ষ কলমে পুনর্নির্মিত হয়ে যে রূপ ধারণ করেছে আর তার পাঠ যে স্বাদ উপহার দিয়েছে তাতে আমার মনে হয়েছিল, এ রচনা সাহিত্য ছাড়া আর কী? দুই বাংলায় খ্যাতিমান অনেক সাহিত্যিকই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। এখনও অনেক লেখক এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। সন্তোষকুমার ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী, অরূনাথ সরকার, সন্তোষ গুপ্ত, মহাদেব সাহা প্রমুখ লেখক তাদের রচিত প্রতিবেদনগুলোয় সাহিত্যের স্বাদ ও ভিন্ন মেজাজ এনে সাংবাদিকতার ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি, সংগৃহীত প্রমাণাদি, পর্যবেক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া (যার সঙ্গে কিছুটা কল্পনাও মেশানো থাকে) একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রতিবেদনকে কীভাবে বিস্ময়কর সাহিত্যে উত্তীর্ণ করে দিতে পারে তার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ বোধ হয় In Cold Blood নামের উপন্যাস। এ বিখ্যাত সাহিত্যকর্মের স্রষ্টার নাম ট্রুম্যান কাপোটি।

উপন্যাসটি রচনার প্রক্রিয়া রীতিমতো চমকপ্রদ। ১৯৫৯ সালের ১৫ নভেম্বর আমেরিকার ক্যানসাস রাজ্যের ছোট্ট শহর হলকুম্বে একই সঙ্গে চার ব্যক্তি খুন হন। মাথার খুব কাছ থেকে বুলেটবিদ্ধ করা হয় তাদের। পুলিশ অনেক চেষ্টা করেও খুনের কারণ এমনকি কোনো সূত্রও খুঁজে পায় না। অবশ্য অল্প সময়ের ভেতর খুনিরা ধরা পড়ে। সাংবাদিক ট্র–ম্যান কাপোটি ওই সময় Newyorker-এর সঙ্গে যুক্ত। ওই পত্রিকার জন্য একটা ফিচার রিপোর্ট তৈরির উদ্দেশে তিনি হলকুম্ব যান। রিপোর্টটি লিখিত হবে ওই চার খুনের ওপর। তিনি নিহত ব্যক্তিবর্গের আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলেন, দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখেন, বারবার সাহায্য নেন পুলিশ ও থানার। তাছাড়া খুনিদের নাম-পরিচয়, তাদের অতীত বর্তমান কর্মকাণ্ড, তাদের বন্ধুবৃত্ত এ সবেরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন তিনি।

ওইসব ঘটনা প্রায় চার বছর ধরে নিপুণ ডিটেল ও চমৎকার লিপিকৌশলে তুলে আনেন ট্রুম্যান কাপোটি। ভাবতে ভাবতে, লিখতে লিখতে এক সময় তিনি আবিষ্কার করলেন ওই খুনের ঘটনা এবং তার সমুদয় প্রতিক্রিয়া পুনর্গঠিত হওয়ার ফলে রীতিমতো উপন্যাসের রূপ ধারণ করেছে। তারপর সেই লেখা যখন বই হয়ে বেরোল, বোদ্ধা পাঠক-সমালোচক মহল বলতে আরম্ভ করল, যে প্রতিবেদন এত নিখুঁত ডিটেল, অসংখ্য তথ্য সর্বোপরি জীবন্ত বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তাকে সাহিত্য না বলে উপায় কী? ওই রচনা, অবশেষে, স্বীকৃতি পেল সাহিত্য হিসেবে, আর তার কপালে জুটল non-fietion novel-এর তকমা।

রবীন্দ্রনাথ একদা বলেছিলেন যে, সাহিত্য তাই যা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তথ্য বা সংবাদও তো এখন প্রবলভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনের সঙ্গে। সংবাদও যে লেখার গুণে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে তার মূল সূত্রটি তো ওই ‘জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে’র মধ্যেই। খবরের কাগজ থেকে প্রাপ্ত একটি দুর্ঘটনার সংবাদকে কেন্দ্র করে অনন্য এক স্বাদু গদ্য ‘খারিজ’ নামে যে উপন্যাসটি রমাপদ চৌধুরী লিখেছিলেন তার কথা আমরা ভুলে যাইনি। মার্কেজের Story of Kidnapping গ্রন্থে যেভাবে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য পরস্পরপ্রবিষ্ট হয়েছে এক কথায় তা তুলনাহীন। সাহিত্যিকের স্বপ্ন-কল্পনা আর সাংবাদিকের স্বপ্নিল ইচ্ছা এখানে মিলেমিশে একাকার। দেবেশ রায়ের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের নাম ‘খরার প্রতিবেদন’। শুধু নামেই নয়, ভেতরের কনটেন্টেও লেখক দক্ষ সাংবাদিকসুলভ ক্যারিশমার উপাদানগুলোকে নিজের মতো করে কাজে লাগিয়েছেন।

In clod Blood পরে একটি ধারার সৃষ্টি করে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর এর নির্মাণরীতির সবচেয়ে বেশি নিন্দা করেছিলেন যিনি সেই নর্মান মেইলার ১৩-১৪ বছর পর The executioners Song নামে এক খুনির জীবনভিত্তিক একটি উপন্যাস লেখেন। অপরাধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকার এ গ্রন্থ রচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কাঠামো ও গঠন উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য দিক। উত্তর আধুনিক উপন্যাসের এ যুগে সাংবাদিকতার ধর্ম ও দৃষ্টিকোণকে যখন ব্যবহার করা হচ্ছে, তখন গঠনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়েছে পুনর্গঠন বা পুনর্নির্মাণ।