শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি-চিত্র
jugantor
শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি-চিত্র

  আখতার হোসেন খান  

২৩ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতের লেখা কি হারিয়ে যাবে? বিশ্বজোড়া কিন্ডারগার্টেন-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র শুরু হয়ে গেছে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে লেখালেখি। সাহিত্যিকদের কত ভাগ এখনও হাতে লেখেন? এ হিসাব এখনও এদেশে নির্ধারিত হয়নি সত্য, তবে তরুণ লেখকরাতো বটেই, এমনকী প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন- এমন অনেকের মধ্যেও নতুন অভ্যাসটি চালু হয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি স্বভাবতই আসবে হাতের লেখার কী হবে। যারা বাল্য বয়সে হাতের লেখা সুন্দর করার পরিশ্রমে নামতেন, ভালো হস্তাক্ষরসম্পন্নদের যে একটা বিশেষ অবস্থান ছিল, তার পরিণতি কোথায়? পরীক্ষার খাতা এখনও হস্তাক্ষরেই চলছে: কিন্তু আর কতদিন? সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন সব পরীক্ষার লেখালেখি হয়তো যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাবে। আমরা কি আমাদের কালির অক্ষরে লেখা দুঃখিনী বর্ণমালাকে হারিয়ে ফেলব? তবে একটি প্রশ্ন এখানে উঠবেই: পরীক্ষায় যদি হাতের লেখাকেও একটি বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়, তাহলে হয়তো একটি সার্বিক সূচকের অংশ হিসেবে হস্তাক্ষরে পরীক্ষা পদ্ধতি আরও অনেকদিন, হয়তোবা নিরবধি কাল থেকেই যাবে।

এ কথাগুলো এতটা করে মনে এলো এ বছরের বইমেলায় প্রকাশিত ‘শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি- চিত্র’ বইটি হাতে নিয়ে। অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবাল সম্পাদিত ও কবি তারিক সুজাতের পরিকল্পনায় জার্নিম্যান্স বুক্সের প্রকাশিত এ বইটির চুরাশিটি কবিতা ছাপার অক্ষরে নয়, বের হয়েছে কবি শামসুর রাহমানর নিজের মূলের লেখা চিত্রলিপিতে; এমনকী তিনি যে কালি ব্যবহার করেছিলেন, তা-ও প্রশংসনীয়রূপে অটুট রাখার চেষ্টা করেছেন সম্পাদক ও প্রকাশক। ফলস্বরূপ, ১৯৮২-র ছয়ই আগস্ট থেকে ১৯৮৫-র ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তু ওই একাশিটি কবিতা আমরা পেয়ে যাচ্ছি হুবহু হস্তাক্ষরে। শেষে ‘নিঃসঙ্গতা’ নামের কবিতাটির কোনো তারিখ নেই আর ‘ঘরোয়া’ যদিও লেখা ১৯৮৩-র ২৫ মার্চ; কিন্তু তার অবস্থান একেবারে খাতাটির শেষে। আর শুরুতেই আছে দুই চরণের এপিটাফ, যার তারিখ ১৯৮৫-র ১৫ মার্চ: ‘এখানে শায়িত শামসুর রাহমান,/ছিল সে কলম ধরে যতদিন ধরে ছিল প্রাণ।’ অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবালের কথাতেই শোনা যাক: ‘১৯৮৫-র ১৫ মার্চ পৈতৃক বাসা আশেক লেনে কবি আমাকে এ খাতাটি উপহার দিয়েছিলেন। তবে আমি এর অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়েছিলাম; আমার স্ত্রী টুকু সিন্দুকে সযত্নে রক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি বের করে দেয়।’ অনেকদিন কবিতার খাতাটি আসলেই বিস্মৃতির অতল তলেই হারিয়েছিল, অধ্যাপকের স্ত্রী তা পুনরাবিস্তার না করা পর্যন্ত।

রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে করতে হয়: হাতের লেখায় মূল মানুষটির স্পর্শ মেলার এক অপূর্ব সুযোগ। কাটাছেঁড়া সম্পর্কে নিজ কাব্য ‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি প্রকাশের সময়ে মন্তব্য স্মর্তব্য: ‘এর প্রধান মূল্য হাতের অক্ষরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের।... অন্যমনস্কতায় কাটাকাটি ভুলচুক ঘটেছে। সেসব ত্রুটিতেও ব্যক্তিগত পরিচয়ের আভাস রয়ে গেল।’ আর এ ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিকতার যুগে তাকে আরও বেশি সুস্বাদু মনে হয়; আর কতদিন এ স্বাদ আমরা পাব, এমন একটা ভয় সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নিয়েই পাঠকদের তথা ভক্তদের প্রথম উৎসাহ জাগে গত শতকের দ্বিতীয় দশকে মহাকবির নোবেল পুরস্কার লাভের পর থেকে। যত দিন গেছে, তিনি পাণ্ডুলিপিকে কেটেছিঁড়ে অনেক সময়েই বেশি করে চিত্রের রূপ দিয়েছেন; এবং এ থেকেই হয়তোবা তার উত্তর-পরিণত জীবনে প্রকৃত চিত্রাঙ্কনের পর্বের শুরু। সে যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষর বাংলাভাষীদের মধ্যে অনুকরণের এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের জন্ম দিয়ে যায়; এবং তা এখনও শেষ হয়নি।

মূল লেখার কালির বিভিন্ন রং ঠিক রাখা এ যুগেও দুরূহ, খরচতো বাড়েই। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থনকশাকার তারিক সুজাত, যিনি বাংলাদেশের কবিকুলের উল্লেখ্য একজন, এ পাণ্ডুলিপি চিত্র প্রকাশ সম্ভব করে এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর আগে শামসুর রাহমানের ‘বন্দীশিবির থেকে’ কাব্যের পাণ্ডুলিপি-চিত্র প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তবে এ ‘পাণ্ডুলিপি-চিত্র’ এ জাতীয় অতীত সব প্রয়াসকে ছাড়িয়ে গেছে। সম্পাদকের কথাই শোনা যাক: ‘এই কবিতার খাতায় একটি বিষয় লক্ষ্যযোগ্য: কবি এক রঙের কলমে লেখেননি; কালো, নীল, সবুজ, লাল ও গোলাপি নানা রঙের বলপেনে লিখেছেন। বইটি অবিকল মুদ্রণের সবিশেষ প্রয়াস নেয়া হয়েছে।’ কতটা যে অবিকল তার প্রমাণ দু-এক জায়গায় কবি নিজেই লিখে দিয়েছেন ইংরেজি অক্ষরে ‘স্পেস’ দেয়ার কথা। এ অবিকলতার আরও একটা প্রমাণ কবিতাবহির্ভূত দু-একটি বিষয়ও অবিকল ছাপা হয়েছে পাণ্ডুলিপি চিত্রে: যেমন কবির হাতে লেখা জনৈক খাজা আসলামের টেলিফোন নাম্বারটিও রয়ে গেছে শেষের পৃষ্ঠার কবিতা ‘ঘরোয়া’র চিত্রটির মাথায় (পৃষ্ঠা ১৯৪)।

শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি চিত্রের বইটি হাতে নিলে প্রথমেই যে কথা মনে আসবে, তা হল এটি এক সংরক্ষণযোগ্য শৈল্পিক সৃষ্টি। এগারোটি অপ্রকাশিত কবিতা ও নয়টি প্রকাশিত কাব্যান্তর্ভুক্ত (কবিতার সঙ্গে গেরস্থালী, আমার কোনো তাড়া নেই, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে, অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই, হোমারের স্বপ্নময় হাত, ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই, ধুলায় গড়ায় শিরোস্ত্রাণ, এক ফোঁটা কেমন অনল ও লাল ফুলকির ছড়া) কবিতা এ খাতায়। কবিতাগুলোর এ চিত্ররূপে প্রকাশ এক প্রশংসনীয় শিল্পকর্ম হিসেবেই আগত দিনগুলোতে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত থাকবে। কবির হস্তাক্ষর রাবীন্দ্রিক নয়; এবং তার হস্তাক্ষরের সচেতন অনুকারীর সংখ্যা হয়তো তেমন উল্লেখ্যসংখ্যক হবে না; কিন্তু নগর জীবনের এক অক্লান্ত পর্যবেক্ষক ও ধীমানী এবং জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অঘোষিত পোয়েট-লরেটে হিসেবে তার সাধনার সাক্ষাৎ পরিচয় মিলবে এ বইটিতে। অপ্রকাশিত এগারোটি কবিতার মধ্যে গোটা চারেক সনেট, বাকিগুলো ছোট-বড়র মিশ্রণ। দু-একটিতে জীবনানন্দ দাশ বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দূরবর্তী প্রভাব মিলবে; শেষোক্তজনের মতোই রুল করা খাতায় লিখেছেন তিনি; কিন্তু মূলত নিজের কথা, স্বভাষায়। একাধিক কবিতায় একজন ‘তসলিম রশীদে’র কথা মেলে, যাকে মনে হবে এ যেন শামসুর রাহমানেরই এক প্রতিরূপ। এবং তিনি তার এক বৃহৎ ভক্ত ও শিষ্যগোষ্ঠী তৈরি করে গেছেন, সজ্ঞানে নয়, তার অন্তর্নিহিত উৎকর্ষে।

টলস্টয়ের অগণিত হস্তাক্ষর চিহ্ন রয়ে গেছে রুষিদের সংগ্রহে, টলস্টয় ভবনে: সাত বছর বয়স থেকে ওই মহালেখকের যাত্রা শুরু; জীবনের শেষ রচনা পর্যন্ত। জার্মান গ্যেটে জীবদ্দশাতেই পাণ্ডুলিপি বিক্রি করে দিয়েছেন আর্থিক লাভের জন্য। ব্যবসায়ী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি বদ্ধখামে দরপত্র আহ্বানের এক কৌতুকদ্দীপক পদ্ধতি বের করেছিলেন। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নাট্যকার শেকসপিয়রের তিনটি সই বা ‘টমাস মুর’ নাটকের কয়েকটি পৃষ্ঠা বাদে আর কিছুই মেলেনি বলে ধারণা। ক’দিন আগে চীনের রাষ্ট্রনায়ক প্রয়াত মাও সেতুং, যিনি কবি হিসেবেও পরিচিত, তার কবিতার এক পাণ্ডুলিপি কর্তিত আকারে পাওয়া গেছে হংকংয়ে, যার দাম অনুমিত হচ্ছে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার। এক আরব-কর্তৃক আবিষ্কৃত ডেড্ সী স্কুলের মূল্য হিব্রুরাই জানেন। মহালেখকদের পাণ্ডুলিপির মূল জায়গা জাদুঘরের বিষণ্ন কোঠায়। ‘চর্যাপদ কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’র পাণ্ডুলিপির চিত্ররূপ আমাদের হাতে নেই; সুতরাং তা নিয়ে বক্তব্য কম, বিশেষজ্ঞরা বাদে; কিন্তু জার্নিম্যান বুক্সের শামসুর রাহমান কীার্তি নিঃসন্দেহে কবির ভক্ত ও এ বিষয়ক উৎসাহীদের টানবে, কবির ৯১তম জন্মবার্ষিকীতে তা নির্দ্বিধায় বলা চলে।

শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি-চিত্র

 আখতার হোসেন খান 
২৩ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতের লেখা কি হারিয়ে যাবে? বিশ্বজোড়া কিন্ডারগার্টেন-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র শুরু হয়ে গেছে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে লেখালেখি। সাহিত্যিকদের কত ভাগ এখনও হাতে লেখেন? এ হিসাব এখনও এদেশে নির্ধারিত হয়নি সত্য, তবে তরুণ লেখকরাতো বটেই, এমনকী প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছেন- এমন অনেকের মধ্যেও নতুন অভ্যাসটি চালু হয়েছে। সুতরাং প্রশ্নটি স্বভাবতই আসবে হাতের লেখার কী হবে। যারা বাল্য বয়সে হাতের লেখা সুন্দর করার পরিশ্রমে নামতেন, ভালো হস্তাক্ষরসম্পন্নদের যে একটা বিশেষ অবস্থান ছিল, তার পরিণতি কোথায়? পরীক্ষার খাতা এখনও হস্তাক্ষরেই চলছে: কিন্তু আর কতদিন? সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন সব পরীক্ষার লেখালেখি হয়তো যন্ত্রনির্ভর হয়ে যাবে। আমরা কি আমাদের কালির অক্ষরে লেখা দুঃখিনী বর্ণমালাকে হারিয়ে ফেলব? তবে একটি প্রশ্ন এখানে উঠবেই: পরীক্ষায় যদি হাতের লেখাকেও একটি বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরে নেয়া হয়, তাহলে হয়তো একটি সার্বিক সূচকের অংশ হিসেবে হস্তাক্ষরে পরীক্ষা পদ্ধতি আরও অনেকদিন, হয়তোবা নিরবধি কাল থেকেই যাবে।

এ কথাগুলো এতটা করে মনে এলো এ বছরের বইমেলায় প্রকাশিত ‘শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি- চিত্র’ বইটি হাতে নিয়ে। অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবাল সম্পাদিত ও কবি তারিক সুজাতের পরিকল্পনায় জার্নিম্যান্স বুক্সের প্রকাশিত এ বইটির চুরাশিটি কবিতা ছাপার অক্ষরে নয়, বের হয়েছে কবি শামসুর রাহমানর নিজের মূলের লেখা চিত্রলিপিতে; এমনকী তিনি যে কালি ব্যবহার করেছিলেন, তা-ও প্রশংসনীয়রূপে অটুট রাখার চেষ্টা করেছেন সম্পাদক ও প্রকাশক। ফলস্বরূপ, ১৯৮২-র ছয়ই আগস্ট থেকে ১৯৮৫-র ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্তু ওই একাশিটি কবিতা আমরা পেয়ে যাচ্ছি হুবহু হস্তাক্ষরে। শেষে ‘নিঃসঙ্গতা’ নামের কবিতাটির কোনো তারিখ নেই আর ‘ঘরোয়া’ যদিও লেখা ১৯৮৩-র ২৫ মার্চ; কিন্তু তার অবস্থান একেবারে খাতাটির শেষে। আর শুরুতেই আছে দুই চরণের এপিটাফ, যার তারিখ ১৯৮৫-র ১৫ মার্চ: ‘এখানে শায়িত শামসুর রাহমান,/ছিল সে কলম ধরে যতদিন ধরে ছিল প্রাণ।’ অধ্যাপক ভূঁইয়া ইকবালের কথাতেই শোনা যাক: ‘১৯৮৫-র ১৫ মার্চ পৈতৃক বাসা আশেক লেনে কবি আমাকে এ খাতাটি উপহার দিয়েছিলেন। তবে আমি এর অস্তিত্ব বিস্মৃত হয়েছিলাম; আমার স্ত্রী টুকু সিন্দুকে সযত্নে রক্ষিত পাণ্ডুলিপিটি বের করে দেয়।’ অনেকদিন কবিতার খাতাটি আসলেই বিস্মৃতির অতল তলেই হারিয়েছিল, অধ্যাপকের স্ত্রী তা পুনরাবিস্তার না করা পর্যন্ত।

রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে করতে হয়: হাতের লেখায় মূল মানুষটির স্পর্শ মেলার এক অপূর্ব সুযোগ। কাটাছেঁড়া সম্পর্কে নিজ কাব্য ‘গীতাঞ্জলি’র পাণ্ডুলিপি প্রকাশের সময়ে মন্তব্য স্মর্তব্য: ‘এর প্রধান মূল্য হাতের অক্ষরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের।... অন্যমনস্কতায় কাটাকাটি ভুলচুক ঘটেছে। সেসব ত্রুটিতেও ব্যক্তিগত পরিচয়ের আভাস রয়ে গেল।’ আর এ ক্রমবর্ধমান যান্ত্রিকতার যুগে তাকে আরও বেশি সুস্বাদু মনে হয়; আর কতদিন এ স্বাদ আমরা পাব, এমন একটা ভয় সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নিয়েই পাঠকদের তথা ভক্তদের প্রথম উৎসাহ জাগে গত শতকের দ্বিতীয় দশকে মহাকবির নোবেল পুরস্কার লাভের পর থেকে। যত দিন গেছে, তিনি পাণ্ডুলিপিকে কেটেছিঁড়ে অনেক সময়েই বেশি করে চিত্রের রূপ দিয়েছেন; এবং এ থেকেই হয়তোবা তার উত্তর-পরিণত জীবনে প্রকৃত চিত্রাঙ্কনের পর্বের শুরু। সে যাই হোক, রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষর বাংলাভাষীদের মধ্যে অনুকরণের এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের জন্ম দিয়ে যায়; এবং তা এখনও শেষ হয়নি।

মূল লেখার কালির বিভিন্ন রং ঠিক রাখা এ যুগেও দুরূহ, খরচতো বাড়েই। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থনকশাকার তারিক সুজাত, যিনি বাংলাদেশের কবিকুলের উল্লেখ্য একজন, এ পাণ্ডুলিপি চিত্র প্রকাশ সম্ভব করে এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এর আগে শামসুর রাহমানের ‘বন্দীশিবির থেকে’ কাব্যের পাণ্ডুলিপি-চিত্র প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। তবে এ ‘পাণ্ডুলিপি-চিত্র’ এ জাতীয় অতীত সব প্রয়াসকে ছাড়িয়ে গেছে। সম্পাদকের কথাই শোনা যাক: ‘এই কবিতার খাতায় একটি বিষয় লক্ষ্যযোগ্য: কবি এক রঙের কলমে লেখেননি; কালো, নীল, সবুজ, লাল ও গোলাপি নানা রঙের বলপেনে লিখেছেন। বইটি অবিকল মুদ্রণের সবিশেষ প্রয়াস নেয়া হয়েছে।’ কতটা যে অবিকল তার প্রমাণ দু-এক জায়গায় কবি নিজেই লিখে দিয়েছেন ইংরেজি অক্ষরে ‘স্পেস’ দেয়ার কথা। এ অবিকলতার আরও একটা প্রমাণ কবিতাবহির্ভূত দু-একটি বিষয়ও অবিকল ছাপা হয়েছে পাণ্ডুলিপি চিত্রে: যেমন কবির হাতে লেখা জনৈক খাজা আসলামের টেলিফোন নাম্বারটিও রয়ে গেছে শেষের পৃষ্ঠার কবিতা ‘ঘরোয়া’র চিত্রটির মাথায় (পৃষ্ঠা ১৯৪)।

শামসুর রাহমানের পাণ্ডুলিপি চিত্রের বইটি হাতে নিলে প্রথমেই যে কথা মনে আসবে, তা হল এটি এক সংরক্ষণযোগ্য শৈল্পিক সৃষ্টি। এগারোটি অপ্রকাশিত কবিতা ও নয়টি প্রকাশিত কাব্যান্তর্ভুক্ত (কবিতার সঙ্গে গেরস্থালী, আমার কোনো তাড়া নেই, যে অন্ধ সুন্দরী কাঁদে, অস্ত্রে আমার বিশ্বাস নেই, হোমারের স্বপ্নময় হাত, ইচ্ছে হয় একটু দাঁড়াই, ধুলায় গড়ায় শিরোস্ত্রাণ, এক ফোঁটা কেমন অনল ও লাল ফুলকির ছড়া) কবিতা এ খাতায়। কবিতাগুলোর এ চিত্ররূপে প্রকাশ এক প্রশংসনীয় শিল্পকর্ম হিসেবেই আগত দিনগুলোতে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত থাকবে। কবির হস্তাক্ষর রাবীন্দ্রিক নয়; এবং তার হস্তাক্ষরের সচেতন অনুকারীর সংখ্যা হয়তো তেমন উল্লেখ্যসংখ্যক হবে না; কিন্তু নগর জীবনের এক অক্লান্ত পর্যবেক্ষক ও ধীমানী এবং জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অঘোষিত পোয়েট-লরেটে হিসেবে তার সাধনার সাক্ষাৎ পরিচয় মিলবে এ বইটিতে। অপ্রকাশিত এগারোটি কবিতার মধ্যে গোটা চারেক সনেট, বাকিগুলো ছোট-বড়র মিশ্রণ। দু-একটিতে জীবনানন্দ দাশ বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দূরবর্তী প্রভাব মিলবে; শেষোক্তজনের মতোই রুল করা খাতায় লিখেছেন তিনি; কিন্তু মূলত নিজের কথা, স্বভাষায়। একাধিক কবিতায় একজন ‘তসলিম রশীদে’র কথা মেলে, যাকে মনে হবে এ যেন শামসুর রাহমানেরই এক প্রতিরূপ। এবং তিনি তার এক বৃহৎ ভক্ত ও শিষ্যগোষ্ঠী তৈরি করে গেছেন, সজ্ঞানে নয়, তার অন্তর্নিহিত উৎকর্ষে।

টলস্টয়ের অগণিত হস্তাক্ষর চিহ্ন রয়ে গেছে রুষিদের সংগ্রহে, টলস্টয় ভবনে: সাত বছর বয়স থেকে ওই মহালেখকের যাত্রা শুরু; জীবনের শেষ রচনা পর্যন্ত। জার্মান গ্যেটে জীবদ্দশাতেই পাণ্ডুলিপি বিক্রি করে দিয়েছেন আর্থিক লাভের জন্য। ব্যবসায়ী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি বদ্ধখামে দরপত্র আহ্বানের এক কৌতুকদ্দীপক পদ্ধতি বের করেছিলেন। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ নাট্যকার শেকসপিয়রের তিনটি সই বা ‘টমাস মুর’ নাটকের কয়েকটি পৃষ্ঠা বাদে আর কিছুই মেলেনি বলে ধারণা। ক’দিন আগে চীনের রাষ্ট্রনায়ক প্রয়াত মাও সেতুং, যিনি কবি হিসেবেও পরিচিত, তার কবিতার এক পাণ্ডুলিপি কর্তিত আকারে পাওয়া গেছে হংকংয়ে, যার দাম অনুমিত হচ্ছে মিলিয়ন-মিলিয়ন ডলার। এক আরব-কর্তৃক আবিষ্কৃত ডেড্ সী স্কুলের মূল্য হিব্রুরাই জানেন। মহালেখকদের পাণ্ডুলিপির মূল জায়গা জাদুঘরের বিষণ্ন কোঠায়। ‘চর্যাপদ কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে’র পাণ্ডুলিপির চিত্ররূপ আমাদের হাতে নেই; সুতরাং তা নিয়ে বক্তব্য কম, বিশেষজ্ঞরা বাদে; কিন্তু জার্নিম্যান বুক্সের শামসুর রাহমান কীার্তি নিঃসন্দেহে কবির ভক্ত ও এ বিষয়ক উৎসাহীদের টানবে, কবির ৯১তম জন্মবার্ষিকীতে তা নির্দ্বিধায় বলা চলে।