হিরো
jugantor
হিরো

  খন্দকার রেজাউল করিম  

০২ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজকে সেই চিঠিটা আবার এসেছে। মেয়েলি হাতে লেখা। নাম-ঠিকানাবিহীন চিঠি। কিন্তু চিঠিতে নাম ঠিকানা লেখা না থাকলেও লেখিকার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই জাফরের জানা।

মেয়েটির কয়েকটি ফটো জাফরের মুঠোফোনে আপলোড করা আছে। গত ছয় মাস হলো প্রতি সপ্তাহে জাফর এই চিঠি পাচ্ছে। প্রতিটি চিঠির কথা প্রায় এক: ‘আমাকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছেন? আমার যে আর ফেরার পথ নেই! আমার বান্ধবীরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। মুখ দেখাবার উপায় রইল না। আমি এখন কোথায় যাব? আপনার ওষুধ কারখানা থেকে আমার কাছে এক শিশি বিষ পাঠাতে পারেন? আপনি কি পাষাণ? আমার এত বড় সর্বনাশ কেন করলেন?’

সিনেমা-নাটকের ভিলেনরা মেয়েদের যে সর্বনাশ করে কেটে পড়ে, জাফর তেমন কিছুই করেনি। এমনকি মেয়েটির হাতটি পর্যন্ত সে ধরেনি। মেয়েটির সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়েছিল। শুধু কিছু কথা বলেছিল। জাফরের কথায় হয়তো ভালোবাসার রেশ ছিল, চোখের চাহনিতে ছিল অনুরাগের ছোঁয়া। সেটাও ভান নয়, তখন নাসিমাকে তো তার ভালোই লেগেছিল। এখন আর লাগছে না। এখন ভালো লাগছে অন্য একটি মেয়েকে যার ফটো গ্রাম থেকে মা পাঠিয়েছেন।

নাসিমার বাবা ছিল জাফরের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক। জাফরের নিজের বাড়িও একই গ্রামে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে কয়েক দিনের ঘনিষ্ঠতা। গ্রামের মেঠো পথে নাসিমার সঙ্গে কিছু পথচলা, খুনসুটি, হাসি, চোরা চোখে দেখা। এর বেশি কিছু নয়। নিজের পুরোনো স্কুলে জাফর একটু ঘুরতে গিয়েছিল, মেয়েটি সেই স্কুলেই শিক্ষকতা করে।

মেয়েটির এবং কিছু পরিচিত শিক্ষকের সঙ্গে একসঙ্গে বসে আড্ডা মেরেছিল, মুঠোফোনে সেলফি তুলেছিল। সে জন্য এ বয়েসেও মা’র কাছে বকুনি শুনতে হয়েছে। গ্রামের কূটনী মেয়ে-বুড়োরা নাসিমা এবং তাকে নিয়ে কী সব গুজব রটিয়ে বেড়াচ্ছে।

এ ধরনের মেলামেশা গ্রামের লোক ভালো চোখে দেখে না। ঢাকায় ফিরে এসে ছয় মাস ধরে জাফর এ চিঠি পাচ্ছে! জাফর কী মেয়েটির ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের শিকার? মেয়েটির কষ্টের জন্য জাফর কী দায়ী? মা’র পাঠানো এক মিষ্টি মেয়ের ছবি কী এখন নাসিমাকে না ভালো লাগার কারণ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাফর নিজেকে হিরো হিরো ভাবত। তবে সিনেমার সুদর্শন বলবান হিরোরা যেভাবে ভিলেনের হাড়গোড় ভেঙে দিয়ে সুন্দরী নায়িকাদের প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলে, তেমন নয়। জাফরের চেহারা অতি সাধারণ, গায়ের রং ফ্যাকাশে, পাকস্থলী আমাশয় রোগের আস্তানা, দেহের পেশিগুলো সব সময় নিস্তেজ হয়ে থাকে।

এমন দুর্বল শরীর নিয়ে সিনেমার নায়কের হিরোগিরি সম্ভব নয়। জাফর কল্পনায় হতো অন্যরকম হিরো। যে হিরো গুন্ডার কাছ থেকে নয়, বরং সমাজের অবিচারের হাত থেকে মেয়েদের বাঁচাবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারও মেয়ের ভিড়ে এমন মেয়েকে সে চিনবে কী করে?

মফস্বল শহরের এক আধা-শিক্ষিত কিন্তু অবস্থাপন্ন পরিবারে জাফরের জন্ম। তিন বোনের পর এক ভাই, মা তাকে এত যত্নে মানুষ করেছেন যে জীবনে ‘মানুষ’ হওয়ার সুযোগ জাফর পায়নি। টাকার অভাব না থাকলেও পরিবারে রূপের অভাব ছিল।

কিশোর বয়েসে মা-বোনদের সঙ্গে বসে জাফর কলকাতার সিরিয়াল-নাটক দেখত। মেয়েগুলো কত সুন্দরী! শাশুড়ি-ননদ-সমাজের হাতে নিপীড়িত অসহায়া নায়িকা! সবাই ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মেকি-পালক লাগানো চোখের পল্লবে কান্নার আভাস, সিঁথিতে রক্তিম সিঁদুর, ডালিম ফলের মতো প্রসাধনচর্চিত গাল থেকে যেন টস টস করে রং ঝরে পড়ছে। কোনোদিন এমন মেয়ে বউ হয়ে কী এ বাড়িতে আসবে?

গ্রামের স্কুলে জাফর ছিল হাতেগোনা মেধাবী ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড থেকে ‘স্ট্যান্ড’ করা ছাত্রছার্ত্রীর ভিড়ে জাফর হয়ে পড়ল অতি সাধারণ। মায়ের হাতের বানানো চিড়া-দই নাস্তায় অভ্যস্ত জাফর ক্যান্টিনের গোস-পরোটা-হালুয়া-ভাজি খেয়ে বদহজমে ভোগে।

শহীদুল্লাহ হলের খাবারের ঝাঁজ তার দুর্বল পাকস্থলী সহ্য করতে পারে না। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বাথরুম খুঁজে বেড়াতে হয়। সহপাঠীরা হাসাহাসি করে, আড়ালে ওকে ‘চিকনা’ জাফর, ‘ব্যারামি’ জাফর, ‘হাগুড়ে’ জাফর, ইত্যাদি বিশ্রী নামে ডাকে।

কেমিস্ট্রি ল্যাবে সহপাঠীনীদের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জাফর এক্সপেরিমেন্ট করে। এরা কেউ কেউ সুন্দরী, আধুনিকা। উজ্জ্বল মুখ, বব-ছাঁট চুল, ফর্সা হাতে কালো রঙের হাতঘড়ি শোভা পাচ্ছে, বিদেশিনীদের মতো চলন-বলন, গায়ের সুগন্ধি পারফিউম রসায়ন ল্যাবের বিদঘুটে গন্ধ ছাপিয়ে নাকে এসে লাগে। টিভিতে দেখা সিরিয়াল নায়িকাদের চেয়ে এরা কম আকর্ষণীয় নন। এমন একজনকে জাফরের বেশ ভালো লাগে। হয়তো ধনীর কন্যা, প্রতিদিন কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সামনে দামি গাড়ি থেকে নামে। গাড়ির কাচের এপার থেকে গাড়িতে বসা মেয়েদের বেশি সুন্দরী মনে হয়।

কেমিস্ট্রি ল্যাবে মেয়েটি পাশের টেবিলে মনোযোগ দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। ল্যাবে একটি কাজে জাফর দক্ষ। টেস্ট টিউবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার রং দেখে বস্তু শনাক্ত করা। অনেকে তার কাছে টেস্ট টিউব নিয়ে আসে, মেয়েটিও আসে। ‘জাফর ভাই, বলে দিন না আমার টেস্ট টিউবে কি আছে? মনে হচ্ছে কপার সালফেট!’ শিক্ষকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে খুব দ্রুত টেস্ট টিউব দেখাদেখির পর্ব সারতে হয়।

এ সময়টুকু যেন শুধু দু’জনের! সবার অলক্ষ্যে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ানো, হাতে একটু ছোঁয়া, একটু কথা, একটু হাসি। এ নিয়ে জাফর মনেমনে নব ফাল্গুনী রচনা করে! সব স্বপ্নের অবসান হলো যেদিন জাফর আড়াল থেকে শুনল, সুন্দরী মেয়েটি তার বান্ধবীকে বলছে, ‘টেস্ট টিউবটা ব্যারামি ভাইয়ের কাছে নিয়ে যা, উনি ঠিক বলে দেবেন তোর কপালে আজ কি জুটেছে।’ শহুরে রূপসী মেয়েরা এত নিষ্ঠুর হয় কেন?

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার পর জাফর এক ওষুধ কারখানায় ভালো বেতনের চাকরি পেল। সেই সঙ্গে ভাগ্যটা গেল খুলে। প্রণয়প্রার্থী থেকে সরাসরি পাণিপ্রার্থীতে উত্তরণ। শহুরে মেয়েরা পাত্তা না দিলেও নিজের গ্রামে জাফর এখন একজন দুর্লভ বিবাহ-সামগ্রী। তার মতো সুপাত্রের কাছে কন্যার বিয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামের অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারের মা-বাবা হাঁ করে বসে আছে।

কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতাদের আগ্রহ জাফরের ভালোই লাগে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে পথেঘাটে নিজেকে কেউকেটা মনে হয়। সেই সময় প্রাক্তন শিক্ষকের বিবাহযোগ্য কন্যা নাসিমার সঙ্গে পরিচয়। ভালো ছাত্র হিসাবে এককালে জাফর এই শিক্ষকের প্রিয় পাত্র ছিল, তিনি যে তার মেয়েকে জাফরের মতো সুপাত্রের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন তা নিয়ে জাফরের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।

মেয়েটি বিএ পাস করে চার বছর ধরে স্কুলের শিক্ষকতা করছে, জাফরের চেয়ে দুই বছরের ছোট। বয়েসের সঙ্গে বিয়ের হাটে জাফরের দাম তেমন কমেনি, কিন্তু নাসিমা এখন নকল মুদ্রার মতো মূল্যহীন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা নাসিমা অনেকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছে। নিজেকে কখনো সুন্দরী বলে ভ্রম হয়নি। সে সর্বশক্তিমান বিধাতার শক্তির অপচয়। ‘কালো তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’ না, নাসিমার চোখ দুটিও অতি সাধারণ। জাফর জীবনে হিরো হওয়ার স্বপ্ন দেখত। নাসিমা হিরোইন হওয়ার স্বপ্ন কখনো দেখেনি। নাসিমা জীবনে অনেক সিনেমা-নাটক দেখেছে। হিরোইনরা কখনো শহুরে ধনী পিতার আদুরে মেয়ে, কখনো গ্রামের গরিব বাপের বিটি, কখনো শিক্ষিত, কখনো অশিক্ষিত, কখনো শান্ত, কখনো দুষ্টু, কখনো বদরাগী, কখনো প্রিয়ভাষিণী, কখনো উগ্র, কখনো ভদ্র, কখনো পিতৃমাতৃহারা, এমনকি কখনো বা ধর্ষিতা।

কিন্তু হিরোইনদের একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তনীয়, ওরা সবাই রূপসী। রূপ নেই, বাবার টাকা নেই, বয়স সাতাশ পেরিয়ে গেছে, এমন মেয়ে কী নিয়ে স্বপ্ন দেখবে? এ সময় নাসিমার জীবনে জাফরের আবির্ভাব। চেহারা নিয়ে জাফরেরও বড়াই করার মতো কিছু নেই, তবে জাফর পুরুষ মানুষ, ভালো বেতনের চাকরির তকমা ওকে আকাশের চাঁদের মতো দুর্লভ করে তুলেছে। জাফরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার বোকামি নাসিমা করতে চায়নি। কিন্তু জাফর যেন নিজে এসে ধরা দিল।

জাফর কি তার প্রাক্তন শিক্ষকের অরক্ষণীয়া কন্যাকে দয়া করে ভালোবাসতে এসেছে? তাতে নাসিমার আপত্তি নেই। এই নিষ্ঠুর সংসারের দয়াহীন রূপের হাটে কেউ এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। যে ছাড়তে পারে সে তুচ্ছ নয়। নাসিমার চোখে সেই তো হিরো।

জাফরকে নিয়ে জাফরের মা-বাবা ইদানীং ভাবনায় পড়েছেন। বিয়ের হাটে বোকা ছেলেটা কখন যে বিনামূল্যে নিজেকে বিকিয়ে দেয় কে জানে! মায়ের চিঠির সঙ্গে জাফরের কাছে আরও অনেক পাত্রীর ছবি আসে। ওরা সবাই নাসিমার চেয়ে সুন্দরী। অনেক মেয়ের বাবা মেয়ের সঙ্গে টাকা, গাড়ি, হাতি, ঘোড়া, ইত্যাদি দিতে রাজি। ছেলের বিয়েতে যৌতুক চাইবেন এমন ছোটলোক জাফরের বাবা-মা নন। তবে কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় এসব উপঢৌকন দিতে চায় তাকে কি না বলে দেওয়া উচিত?

বিশ্ববিদ্যালয়ে জাফর অনেক যৌতুকবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় দেওয়া যে কোনো যৌতুক সে ঘৃণার চোখে দেখে। তবে সুন্দরী মেয়েদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ সে উপেক্ষা করতে পারে না। নাসিমার ছবি এবং মায়ের পাঠানো অন্য মেয়ের ছবিগুলো পাশাপাশি রেখে সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চোখ যে দিকে ছুটে যেতে চায়, বিবেক টানাটানি করে তার উল্টো দিকে।

ভেবে ভেবে জাফর যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয়। গ্রামের মনুষত্বহীন ইতর শ্রেণির মেয়ে-পুরুষের গঞ্জনা নাসিমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, কোনো গুন্ডার দল নয়। অধমতম কাপুরুষদের হাত থেকে হিরোইনকে বাঁচাতে হিরো কী দৌড়ে হিরোইনের পাশে এসে দাঁড়াবে? রূপসী মেয়েদের টান যতই প্রবল হোক যা কর্তব্য তা তো করতেই হবে। পাগড়ি পরে জাফর নাসিমার কাছেই যাবে।

হিরো

 খন্দকার রেজাউল করিম 
০২ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজকে সেই চিঠিটা আবার এসেছে। মেয়েলি হাতে লেখা। নাম-ঠিকানাবিহীন চিঠি। কিন্তু চিঠিতে নাম ঠিকানা লেখা না থাকলেও লেখিকার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই জাফরের জানা।

মেয়েটির কয়েকটি ফটো জাফরের মুঠোফোনে আপলোড করা আছে। গত ছয় মাস হলো প্রতি সপ্তাহে জাফর এই চিঠি পাচ্ছে। প্রতিটি চিঠির কথা প্রায় এক: ‘আমাকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছেন? আমার যে আর ফেরার পথ নেই! আমার বান্ধবীরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। মুখ দেখাবার উপায় রইল না। আমি এখন কোথায় যাব? আপনার ওষুধ কারখানা থেকে আমার কাছে এক শিশি বিষ পাঠাতে পারেন? আপনি কি পাষাণ? আমার এত বড় সর্বনাশ কেন করলেন?’

সিনেমা-নাটকের ভিলেনরা মেয়েদের যে সর্বনাশ করে কেটে পড়ে, জাফর তেমন কিছুই করেনি। এমনকি মেয়েটির হাতটি পর্যন্ত সে ধরেনি। মেয়েটির সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়েছিল। শুধু কিছু কথা বলেছিল। জাফরের কথায় হয়তো ভালোবাসার রেশ ছিল, চোখের চাহনিতে ছিল অনুরাগের ছোঁয়া। সেটাও ভান নয়, তখন নাসিমাকে তো তার ভালোই লেগেছিল। এখন আর লাগছে না। এখন ভালো লাগছে অন্য একটি মেয়েকে যার ফটো গ্রাম থেকে মা পাঠিয়েছেন।

নাসিমার বাবা ছিল জাফরের প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক। জাফরের নিজের বাড়িও একই গ্রামে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে কয়েক দিনের ঘনিষ্ঠতা। গ্রামের মেঠো পথে নাসিমার সঙ্গে কিছু পথচলা, খুনসুটি, হাসি, চোরা চোখে দেখা। এর বেশি কিছু নয়। নিজের পুরোনো স্কুলে জাফর একটু ঘুরতে গিয়েছিল, মেয়েটি সেই স্কুলেই শিক্ষকতা করে।

মেয়েটির এবং কিছু পরিচিত শিক্ষকের সঙ্গে একসঙ্গে বসে আড্ডা মেরেছিল, মুঠোফোনে সেলফি তুলেছিল। সে জন্য এ বয়েসেও মা’র কাছে বকুনি শুনতে হয়েছে। গ্রামের কূটনী মেয়ে-বুড়োরা নাসিমা এবং তাকে নিয়ে কী সব গুজব রটিয়ে বেড়াচ্ছে।

এ ধরনের মেলামেশা গ্রামের লোক ভালো চোখে দেখে না। ঢাকায় ফিরে এসে ছয় মাস ধরে জাফর এ চিঠি পাচ্ছে! জাফর কী মেয়েটির ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলের শিকার? মেয়েটির কষ্টের জন্য জাফর কী দায়ী? মা’র পাঠানো এক মিষ্টি মেয়ের ছবি কী এখন নাসিমাকে না ভালো লাগার কারণ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় জাফর নিজেকে হিরো হিরো ভাবত। তবে সিনেমার সুদর্শন বলবান হিরোরা যেভাবে ভিলেনের হাড়গোড় ভেঙে দিয়ে সুন্দরী নায়িকাদের প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলে, তেমন নয়। জাফরের চেহারা অতি সাধারণ, গায়ের রং ফ্যাকাশে, পাকস্থলী আমাশয় রোগের আস্তানা, দেহের পেশিগুলো সব সময় নিস্তেজ হয়ে থাকে।

এমন দুর্বল শরীর নিয়ে সিনেমার নায়কের হিরোগিরি সম্ভব নয়। জাফর কল্পনায় হতো অন্যরকম হিরো। যে হিরো গুন্ডার কাছ থেকে নয়, বরং সমাজের অবিচারের হাত থেকে মেয়েদের বাঁচাবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজারও মেয়ের ভিড়ে এমন মেয়েকে সে চিনবে কী করে?

মফস্বল শহরের এক আধা-শিক্ষিত কিন্তু অবস্থাপন্ন পরিবারে জাফরের জন্ম। তিন বোনের পর এক ভাই, মা তাকে এত যত্নে মানুষ করেছেন যে জীবনে ‘মানুষ’ হওয়ার সুযোগ জাফর পায়নি। টাকার অভাব না থাকলেও পরিবারে রূপের অভাব ছিল।

কিশোর বয়েসে মা-বোনদের সঙ্গে বসে জাফর কলকাতার সিরিয়াল-নাটক দেখত। মেয়েগুলো কত সুন্দরী! শাশুড়ি-ননদ-সমাজের হাতে নিপীড়িত অসহায়া নায়িকা! সবাই ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। মেকি-পালক লাগানো চোখের পল্লবে কান্নার আভাস, সিঁথিতে রক্তিম সিঁদুর, ডালিম ফলের মতো প্রসাধনচর্চিত গাল থেকে যেন টস টস করে রং ঝরে পড়ছে। কোনোদিন এমন মেয়ে বউ হয়ে কী এ বাড়িতে আসবে?

গ্রামের স্কুলে জাফর ছিল হাতেগোনা মেধাবী ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড থেকে ‘স্ট্যান্ড’ করা ছাত্রছার্ত্রীর ভিড়ে জাফর হয়ে পড়ল অতি সাধারণ। মায়ের হাতের বানানো চিড়া-দই নাস্তায় অভ্যস্ত জাফর ক্যান্টিনের গোস-পরোটা-হালুয়া-ভাজি খেয়ে বদহজমে ভোগে।

শহীদুল্লাহ হলের খাবারের ঝাঁজ তার দুর্বল পাকস্থলী সহ্য করতে পারে না। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বাথরুম খুঁজে বেড়াতে হয়। সহপাঠীরা হাসাহাসি করে, আড়ালে ওকে ‘চিকনা’ জাফর, ‘ব্যারামি’ জাফর, ‘হাগুড়ে’ জাফর, ইত্যাদি বিশ্রী নামে ডাকে।

কেমিস্ট্রি ল্যাবে সহপাঠীনীদের সঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জাফর এক্সপেরিমেন্ট করে। এরা কেউ কেউ সুন্দরী, আধুনিকা। উজ্জ্বল মুখ, বব-ছাঁট চুল, ফর্সা হাতে কালো রঙের হাতঘড়ি শোভা পাচ্ছে, বিদেশিনীদের মতো চলন-বলন, গায়ের সুগন্ধি পারফিউম রসায়ন ল্যাবের বিদঘুটে গন্ধ ছাপিয়ে নাকে এসে লাগে। টিভিতে দেখা সিরিয়াল নায়িকাদের চেয়ে এরা কম আকর্ষণীয় নন। এমন একজনকে জাফরের বেশ ভালো লাগে। হয়তো ধনীর কন্যা, প্রতিদিন কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সামনে দামি গাড়ি থেকে নামে। গাড়ির কাচের এপার থেকে গাড়িতে বসা মেয়েদের বেশি সুন্দরী মনে হয়।

কেমিস্ট্রি ল্যাবে মেয়েটি পাশের টেবিলে মনোযোগ দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে। ল্যাবে একটি কাজে জাফর দক্ষ। টেস্ট টিউবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার রং দেখে বস্তু শনাক্ত করা। অনেকে তার কাছে টেস্ট টিউব নিয়ে আসে, মেয়েটিও আসে। ‘জাফর ভাই, বলে দিন না আমার টেস্ট টিউবে কি আছে? মনে হচ্ছে কপার সালফেট!’ শিক্ষকের চোখকে ফাঁকি দিয়ে খুব দ্রুত টেস্ট টিউব দেখাদেখির পর্ব সারতে হয়।

এ সময়টুকু যেন শুধু দু’জনের! সবার অলক্ষ্যে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়ানো, হাতে একটু ছোঁয়া, একটু কথা, একটু হাসি। এ নিয়ে জাফর মনেমনে নব ফাল্গুনী রচনা করে! সব স্বপ্নের অবসান হলো যেদিন জাফর আড়াল থেকে শুনল, সুন্দরী মেয়েটি তার বান্ধবীকে বলছে, ‘টেস্ট টিউবটা ব্যারামি ভাইয়ের কাছে নিয়ে যা, উনি ঠিক বলে দেবেন তোর কপালে আজ কি জুটেছে।’ শহুরে রূপসী মেয়েরা এত নিষ্ঠুর হয় কেন?

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স ডিগ্রি নেওয়ার পর জাফর এক ওষুধ কারখানায় ভালো বেতনের চাকরি পেল। সেই সঙ্গে ভাগ্যটা গেল খুলে। প্রণয়প্রার্থী থেকে সরাসরি পাণিপ্রার্থীতে উত্তরণ। শহুরে মেয়েরা পাত্তা না দিলেও নিজের গ্রামে জাফর এখন একজন দুর্লভ বিবাহ-সামগ্রী। তার মতো সুপাত্রের কাছে কন্যার বিয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামের অনেক অবস্থাপন্ন পরিবারের মা-বাবা হাঁ করে বসে আছে।

কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা-মাতাদের আগ্রহ জাফরের ভালোই লাগে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে পথেঘাটে নিজেকে কেউকেটা মনে হয়। সেই সময় প্রাক্তন শিক্ষকের বিবাহযোগ্য কন্যা নাসিমার সঙ্গে পরিচয়। ভালো ছাত্র হিসাবে এককালে জাফর এই শিক্ষকের প্রিয় পাত্র ছিল, তিনি যে তার মেয়েকে জাফরের মতো সুপাত্রের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন তা নিয়ে জাফরের মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।

মেয়েটি বিএ পাস করে চার বছর ধরে স্কুলের শিক্ষকতা করছে, জাফরের চেয়ে দুই বছরের ছোট। বয়েসের সঙ্গে বিয়ের হাটে জাফরের দাম তেমন কমেনি, কিন্তু নাসিমা এখন নকল মুদ্রার মতো মূল্যহীন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেহারাটা নাসিমা অনেকবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছে। নিজেকে কখনো সুন্দরী বলে ভ্রম হয়নি। সে সর্বশক্তিমান বিধাতার শক্তির অপচয়। ‘কালো তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ।’ না, নাসিমার চোখ দুটিও অতি সাধারণ। জাফর জীবনে হিরো হওয়ার স্বপ্ন দেখত। নাসিমা হিরোইন হওয়ার স্বপ্ন কখনো দেখেনি। নাসিমা জীবনে অনেক সিনেমা-নাটক দেখেছে। হিরোইনরা কখনো শহুরে ধনী পিতার আদুরে মেয়ে, কখনো গ্রামের গরিব বাপের বিটি, কখনো শিক্ষিত, কখনো অশিক্ষিত, কখনো শান্ত, কখনো দুষ্টু, কখনো বদরাগী, কখনো প্রিয়ভাষিণী, কখনো উগ্র, কখনো ভদ্র, কখনো পিতৃমাতৃহারা, এমনকি কখনো বা ধর্ষিতা।

কিন্তু হিরোইনদের একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তনীয়, ওরা সবাই রূপসী। রূপ নেই, বাবার টাকা নেই, বয়স সাতাশ পেরিয়ে গেছে, এমন মেয়ে কী নিয়ে স্বপ্ন দেখবে? এ সময় নাসিমার জীবনে জাফরের আবির্ভাব। চেহারা নিয়ে জাফরেরও বড়াই করার মতো কিছু নেই, তবে জাফর পুরুষ মানুষ, ভালো বেতনের চাকরির তকমা ওকে আকাশের চাঁদের মতো দুর্লভ করে তুলেছে। জাফরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার বোকামি নাসিমা করতে চায়নি। কিন্তু জাফর যেন নিজে এসে ধরা দিল।

জাফর কি তার প্রাক্তন শিক্ষকের অরক্ষণীয়া কন্যাকে দয়া করে ভালোবাসতে এসেছে? তাতে নাসিমার আপত্তি নেই। এই নিষ্ঠুর সংসারের দয়াহীন রূপের হাটে কেউ এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। যে ছাড়তে পারে সে তুচ্ছ নয়। নাসিমার চোখে সেই তো হিরো।

জাফরকে নিয়ে জাফরের মা-বাবা ইদানীং ভাবনায় পড়েছেন। বিয়ের হাটে বোকা ছেলেটা কখন যে বিনামূল্যে নিজেকে বিকিয়ে দেয় কে জানে! মায়ের চিঠির সঙ্গে জাফরের কাছে আরও অনেক পাত্রীর ছবি আসে। ওরা সবাই নাসিমার চেয়ে সুন্দরী। অনেক মেয়ের বাবা মেয়ের সঙ্গে টাকা, গাড়ি, হাতি, ঘোড়া, ইত্যাদি দিতে রাজি। ছেলের বিয়েতে যৌতুক চাইবেন এমন ছোটলোক জাফরের বাবা-মা নন। তবে কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় এসব উপঢৌকন দিতে চায় তাকে কি না বলে দেওয়া উচিত?

বিশ্ববিদ্যালয়ে জাফর অনেক যৌতুকবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় দেওয়া যে কোনো যৌতুক সে ঘৃণার চোখে দেখে। তবে সুন্দরী মেয়েদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ সে উপেক্ষা করতে পারে না। নাসিমার ছবি এবং মায়ের পাঠানো অন্য মেয়ের ছবিগুলো পাশাপাশি রেখে সে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। চোখ যে দিকে ছুটে যেতে চায়, বিবেক টানাটানি করে তার উল্টো দিকে।

ভেবে ভেবে জাফর যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয়। গ্রামের মনুষত্বহীন ইতর শ্রেণির মেয়ে-পুরুষের গঞ্জনা নাসিমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে, কোনো গুন্ডার দল নয়। অধমতম কাপুরুষদের হাত থেকে হিরোইনকে বাঁচাতে হিরো কী দৌড়ে হিরোইনের পাশে এসে দাঁড়াবে? রূপসী মেয়েদের টান যতই প্রবল হোক যা কর্তব্য তা তো করতেই হবে। পাগড়ি পরে জাফর নাসিমার কাছেই যাবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন