শিল্পকলা ও জীবনদর্শন
jugantor
শিল্পকলা ও জীবনদর্শন

  সরকার মাসুদ  

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানত চিন্তা করার ক্ষমতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। শিল্পীর কাজের পেছনেও সক্রিয় এই চিন্তাশীলতা। এর সঙ্গে আছে সৌন্দর্যপ্রেম, সত্যপ্রতীতি, সমাজবীক্ষা, বিস্ময়বোধ, ভালোবাসা, সঙ্গ-নিঃসঙ্গ মুহূর্তের বিচিত্র অনুভব প্রভৃতি। এ যুগে শিল্পীদের সৃষ্ট বস্তুকে- যে ‘কাজ’ বলা হয়ে থাকে তার পেছনেও কি এ ধারণা নেই যে, মানুষ কর্মশীল প্রাণী? চিন্তাশীলতার পাশাপাশি এ কর্মশীলতাও মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীবনের মর্যাদা দিয়েছে। মানুষকে জীবিকার জন্য কাজ করতে হয় যা একটা পাখিকে বা শেয়ালকে করতে হয় না। একটা বাঘ বা সাপ মানুষের মতো করে ভাবাতুর হয় না।

কবিতার মতো দেখতে কিছু একটা লিখলেই তা যেমন কবিতা হয় না, তেমনি যা খুশি আঁকলেই তা ছবি হয়ে ওঠে না। মনের ভাব যদি রং-তুলিতে বিশিষ্ট আকার না পায়, যদি না তাতে থাকে গভীর ভাবনার প্রকাশ যা শুধু ফিগারের মধ্য দিয়ে নয় রঙের ব্যবহারের ভেতর দিয়েও দৃশমান হয়, সেই নিরুদ্দেশ আঁকাআঁকিকে আমি ‘পেইন্টিং’ বলব না। কবিতা বা গল্পের মতো সচেতনভাবে আঁকার ব্যাপারটাও এসেছে বহু পরে। অগ্রসর ভাবুকের শিক্ষা-দীক্ষা প্রসূত ওই সচেতনতা শিল্পকলাকে উচ্চ জায়গায় নিয়ে গেছে বিশেষভাবে যখন তা কাজ করেছে প্রতিভাবানদের মাথায়। সৌন্দর্য বোধের কথা আলাদাভাবে না বললেও চলে। সভ্যতার উন্মেষ যুগের আগেও আদিম মানুষের মধ্যেও তা ছিল, অর্থাৎ এ চেতনাটিও আদিম। তা না হলে গুহার দেওয়ালে শিকারের ছবি, ছুটন্ত বাইসন এসব আবিষ্কৃত হলো কেন? প্রাগৈতিহাসিক মানুষ প্রধানত দুটি কাজ করত। এক. জীবিকার জন্য পশু শিকার, দুই. যৌন সঙ্গম। শিকার নিয়ে ছবি আঁকলেও যৌনতা বিষয়টি তাদের কাছে উপেক্ষিত থেকে গেছে। হতে পারে, এটাকে তরা চিত্রের বিষয় হিসাবে উপযুক্ত মনে করেনি। তো মানুষ যেসব কাজকর্ম করে বা যে ধরনের পরিবেশে থাকে তার প্রতিফলন দেখা যায় তার চিন্তায় ও শিল্পকর্মে। আদিম মানুষের গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের চিত্রশিল্প- সবখানেই এটা লক্ষণীয়। এখানে আমি দু’জন শিল্পীর কথা আলাদাভাবে বলব। একজন, জয়নুল আবেদীন। অন্যজন, এসএম সুলতান। সুলতানের ছবিতে দেখবেন, কর্মমুখরতা খুব গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত। ওই যে বলদ লাঙল টানছে, স্বাস্থ্যবতী নারীরা বাসন মাজছে, পানিতে দাঁড়িয়ে পাট ধুচ্ছে কৃষক- এ সবই তো কর্মচাঞ্চল্যের প্রমাণ। আবার জয়নুলের ছবিতে দেখতে পাবেন জীবনের জঙ্গমতার অন্যরকম প্রতিভাস। ভিন্ন আঙ্গিকে-অভিব্যক্তিতে তিনি মানুষের কর্মব্যস্ততাকে ধরেছেন। আত্মরক্ষা ও তার জন্য নিয়োজিত শক্তিকে ‘গুণ টানা’, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে দড়ি ছিঁড়ে গৃহমুখী হতে চাওয়া গরু প্রভৃতি ‘কাজ’-এ যেভাবে তুলে এনেছেন তা কেবল বিশিষ্ট এক শিল্পীর অঙ্কন দক্ষতাই প্রমাণ করে না, শিল্পী মানুষটির মনোভাব- মাটিসংলগ্ন জীবনদর্শনও তুলে ধরে।

জয়নুল, সুলতান, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পীর চিত্রকর্ম বহুযুগ ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে তো এ জন্যই যে, ওই শিল্পীরা গোড়া থেকে স্বভূমির কাছাকাছি থেকেছেন। স্বদেশের প্রকৃতি, জল-হাওয়া, শ্রমজীবী মানুষজন বারবার উপজীব্য হয়েছে তাদের ছবির। দেশপ্রেম ও কর্মযোগী মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাদের সৌন্দর্য চেতনায় যোগ করেছে অভিনব মাত্রা। জীবন দেখার ধরন, রং-রেখা ব্যবহারে নিজত্ব, আলোছায়ার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পশ্চিমের দিকপাল শিল্পীদের কাছ থেকে তারা অনেক কিছুই শিখেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তু বেছে নিয়েছেন স্বদেশের সমাজ-সংস্কৃতি ও নিসর্গ থেকে। এদের সবারই ভাবুকতার কেন্দ্রে আছে গ্রাম-বাংলাদেশ। এ একটি থিমকে তার প্রগাঢ় শিল্পভাবনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন এসএম সুলতান। পরিণত বয়সে প্রাজ্ঞ মস্তিষ্কে তিনি ভূমিকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা- তার সারল্য ও গভীরতার ব্যাপারটা ঘুরেফিরে চিত্রিত করেছেন। এ পুনরাবৃত্তিও সেখান থেকে সৃষ্ট প্রাচুর্য; শিল্পবিভা ও বৈভবকে আমাদের বুঝতে হবে দার্শনিক প্রত্যয়ের জায়গা থেকে। কেন হার্ট ক্রেন বা ফিলিপ লারকিনের মতো কবিরা কিংবা আমাদের শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা আবুল হাসান সাধারণ কবি নন? তার একটা কড় কারণ, এ কবিদের কল্পনা-চিন্তার কেন্দ্রে বেদনাবোধ বা বাউলপনার মতো গভীর ভাব ধর্ম বিশ্বাসের মতোই সুদৃঢ়। কবিসুলভ দার্শনিকতা আমাদের মাথা ভারী করে দেয় না যেহেতু তা স্বতঃস্ফূর্ত। চিত্রীসুলভ দার্শনিকতা সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। বড় মাপের চিত্রশিল্পীদের সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা তাই শুধু বিস্মিত হই না, ভাববিহ্বলও হই। ইয়েটস, ফ্রস্ট বা জীবনানন্দের কবিতার মতো ভ্যানগঘ কিংবা সুলতানের ছবিও ভাবনাগভীর প্রশান্তি আনে আমাদের মনে।

এ উপমহাদেশের প্রধান এমনকি গৌণ চিত্রীদের সৃজনী কর্মেও পশ্চিমের শিল্প আন্দোলনগুলোর পরোক্ষ প্রভাব বিরাজমান। সন্দেহ নেই মিকেলেঞ্জোলো থেকে মাতিস; পিকাস্যে থেকে পল ক্লি প্রমুখ বিরাট চিত্রীদের অঙ্কনের কায়দা-কৌশল, চিত্রিত পাত্রপাত্রীদের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, বস্তু ও সংশ্লিষ্ট আলো-আঁধারের খেলা, নিটোল, অনতিনিটোল বা ভাঙাচোরা ফিগারের প্রকাশপ্রধান উপস্থিতি এবং এ সবকিছু থেকে আহরিত ধ্যান-জ্ঞান, শিল্পবুদ্ধি আমাদের প্রথম সারির চিত্রীদের কাজগুলোকে আধুনিক করে তুলতে কতই না সাহায্য করেছে। কিন্তু কোনো কায়দা-কৌশলই শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয় না যদি তাতে প্রতিভার আলোর অভাব ঘটে। জয়নুল, কামরুল, সুলতান, মুর্তুজা বশির, শফিউদ্দীন, মোহাম্মদ কিবরিয়া কিংবা হালের মনিরুল ইসলাম যার কথাই বলি না কেন, এরা বড় হতে পেরেছে এ জন্যই যে, শিল্প বিষয়টিকে এরা হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে ধারণ করতে পেরেছিলেন। আর কেবল ধারণই করেননি, স্ব-স্ব প্রতিভার উপযোগী বিষয়-আশয় বেছে নিয়ে কাজ করে গেছেন অনলসভাবে।

কবিতার মতো চিত্রশিল্পেরও নানা ধরন ও চেহারা আছে। জসীমউদ্দীনের কবিতার সঙ্গে জয়নুলের পেইন্টিংয়ে ধৃত জীবনের মিল আছে। শহীদ কাদরীর অনেক কবিতায় পলায়নপর অনুভূতিগুলোকে ধরার যে প্রয়াস আছে তার সঙ্গে সাজুয্য খুঁজে পাই আমিনুল ইসলাম বা কিবরিয়ার ছবির বিমূর্ত জগতের। কবি বিনয় মজুমদারের দার্শনিক অবস্থানের সঙ্গে চিত্রী সুলতানের প্রগাঢ় দার্শনিক মাত্রার সাজুয্য অন্বেষণ কি অন্যায় হবে? দু’জনের কাজের ক্ষেত্র ও থিমগুলো খুবই আলাদা। কিন্তু যদি দার্শনিক প্রত্যয়ের কথা বলি, পর্যবেক্ষণও তা থেকে জাত উপলব্ধির কথা বলি, তা হলে তো খুব ভেতরে দারুণ একটা মিল দেখতে পাই উভয়ের মধ্যে।

পশ্চিমে নতুন কিছু করার বিদ্রোহী মনোভাব থেকে উৎসারিত হয়ে ছিল নানা শিল্পমতবাদ। ওইসব ইজম, তাদের বিচিত্র প্রকাশ আমাদের চিন্তাকে অস্থির করে তোলে। অনেক শিল্পীকেও কি তা করে না? বড় মাপের ভাবুকরা কিন্তু স্থিরতা চান। আর সে কারণেই জয়নুল, সুলতানরা মহান। প্রতিভার সঙ্গে নিষ্ঠার যোগ, সর্বোপরি কী আঁকছি এবং কেন আঁকছি সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা ছিল বলেই শুধু জয়নুল, সুলতান বা কামরুলের শিল্পকর্মে নয়, দেবদাস চক্রবর্তী, মুর্তুজা বশির, আব্দুল বাতেন প্রমুখের ‘কাজ’-এও নিজত্ব চিহ্নিত সৃজনশীলতার নানা ধরন টের পাওয়া যায়। অমামুলি প্রতিভার ধর্মই হচ্ছে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া। সৃষ্টিশীল কাজে বিরতি আসতেই পারে কিন্তু সে এগোবেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে আবার সুলতানকেই আনছি। ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার আদি শিল্পীদের থেকে সুলতানের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু ইমপ্রেশনিস্ট (অভিব্যক্তিবাদী) চিত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া রঙের সুষমার ধারণাকে সুলতান সার্থকভাবে কাজে লাগালেন তার গ্রামজীবনভিত্তিক ছবিগুলোতে। এসব ছবিতে ধৃত শুধু প্রাণীগুলোই কি মনোযোগযোগ্য? মেটে, হলদু, কালচে হলুদ রংগুলোর প্রাচুর্যও কি চোখে পড়ার মতো নয়? সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে উঁচুতে আছে তার জীবনবীক্ষা- তার ওই অন্তর্নিহিত তেজ সমবায়ী জীবনের অনিঃশেষ কর্মস্পৃহার আইডিয়া যেটি ছাড়া তার কৃষি পরিবারগুলোর গল্প খুব সাদামাটা থেকে যেত। কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো সেখানে।

শিল্পকলা ও জীবনদর্শন

 সরকার মাসুদ 
০৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধানত চিন্তা করার ক্ষমতাই মানুষকে অন্যসব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। শিল্পীর কাজের পেছনেও সক্রিয় এই চিন্তাশীলতা। এর সঙ্গে আছে সৌন্দর্যপ্রেম, সত্যপ্রতীতি, সমাজবীক্ষা, বিস্ময়বোধ, ভালোবাসা, সঙ্গ-নিঃসঙ্গ মুহূর্তের বিচিত্র অনুভব প্রভৃতি। এ যুগে শিল্পীদের সৃষ্ট বস্তুকে- যে ‘কাজ’ বলা হয়ে থাকে তার পেছনেও কি এ ধারণা নেই যে, মানুষ কর্মশীল প্রাণী? চিন্তাশীলতার পাশাপাশি এ কর্মশীলতাও মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীবনের মর্যাদা দিয়েছে। মানুষকে জীবিকার জন্য কাজ করতে হয় যা একটা পাখিকে বা শেয়ালকে করতে হয় না। একটা বাঘ বা সাপ মানুষের মতো করে ভাবাতুর হয় না।

কবিতার মতো দেখতে কিছু একটা লিখলেই তা যেমন কবিতা হয় না, তেমনি যা খুশি আঁকলেই তা ছবি হয়ে ওঠে না। মনের ভাব যদি রং-তুলিতে বিশিষ্ট আকার না পায়, যদি না তাতে থাকে গভীর ভাবনার প্রকাশ যা শুধু ফিগারের মধ্য দিয়ে নয় রঙের ব্যবহারের ভেতর দিয়েও দৃশমান হয়, সেই নিরুদ্দেশ আঁকাআঁকিকে আমি ‘পেইন্টিং’ বলব না। কবিতা বা গল্পের মতো সচেতনভাবে আঁকার ব্যাপারটাও এসেছে বহু পরে। অগ্রসর ভাবুকের শিক্ষা-দীক্ষা প্রসূত ওই সচেতনতা শিল্পকলাকে উচ্চ জায়গায় নিয়ে গেছে বিশেষভাবে যখন তা কাজ করেছে প্রতিভাবানদের মাথায়। সৌন্দর্য বোধের কথা আলাদাভাবে না বললেও চলে। সভ্যতার উন্মেষ যুগের আগেও আদিম মানুষের মধ্যেও তা ছিল, অর্থাৎ এ চেতনাটিও আদিম। তা না হলে গুহার দেওয়ালে শিকারের ছবি, ছুটন্ত বাইসন এসব আবিষ্কৃত হলো কেন? প্রাগৈতিহাসিক মানুষ প্রধানত দুটি কাজ করত। এক. জীবিকার জন্য পশু শিকার, দুই. যৌন সঙ্গম। শিকার নিয়ে ছবি আঁকলেও যৌনতা বিষয়টি তাদের কাছে উপেক্ষিত থেকে গেছে। হতে পারে, এটাকে তরা চিত্রের বিষয় হিসাবে উপযুক্ত মনে করেনি। তো মানুষ যেসব কাজকর্ম করে বা যে ধরনের পরিবেশে থাকে তার প্রতিফলন দেখা যায় তার চিন্তায় ও শিল্পকর্মে। আদিম মানুষের গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের চিত্রশিল্প- সবখানেই এটা লক্ষণীয়। এখানে আমি দু’জন শিল্পীর কথা আলাদাভাবে বলব। একজন, জয়নুল আবেদীন। অন্যজন, এসএম সুলতান। সুলতানের ছবিতে দেখবেন, কর্মমুখরতা খুব গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত। ওই যে বলদ লাঙল টানছে, স্বাস্থ্যবতী নারীরা বাসন মাজছে, পানিতে দাঁড়িয়ে পাট ধুচ্ছে কৃষক- এ সবই তো কর্মচাঞ্চল্যের প্রমাণ। আবার জয়নুলের ছবিতে দেখতে পাবেন জীবনের জঙ্গমতার অন্যরকম প্রতিভাস। ভিন্ন আঙ্গিকে-অভিব্যক্তিতে তিনি মানুষের কর্মব্যস্ততাকে ধরেছেন। আত্মরক্ষা ও তার জন্য নিয়োজিত শক্তিকে ‘গুণ টানা’, প্রবল বৃষ্টির মধ্যে দড়ি ছিঁড়ে গৃহমুখী হতে চাওয়া গরু প্রভৃতি ‘কাজ’-এ যেভাবে তুলে এনেছেন তা কেবল বিশিষ্ট এক শিল্পীর অঙ্কন দক্ষতাই প্রমাণ করে না, শিল্পী মানুষটির মনোভাব- মাটিসংলগ্ন জীবনদর্শনও তুলে ধরে।

জয়নুল, সুলতান, কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ শিল্পীর চিত্রকর্ম বহুযুগ ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে তো এ জন্যই যে, ওই শিল্পীরা গোড়া থেকে স্বভূমির কাছাকাছি থেকেছেন। স্বদেশের প্রকৃতি, জল-হাওয়া, শ্রমজীবী মানুষজন বারবার উপজীব্য হয়েছে তাদের ছবির। দেশপ্রেম ও কর্মযোগী মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাদের সৌন্দর্য চেতনায় যোগ করেছে অভিনব মাত্রা। জীবন দেখার ধরন, রং-রেখা ব্যবহারে নিজত্ব, আলোছায়ার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে পশ্চিমের দিকপাল শিল্পীদের কাছ থেকে তারা অনেক কিছুই শিখেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিষয়বস্তু বেছে নিয়েছেন স্বদেশের সমাজ-সংস্কৃতি ও নিসর্গ থেকে। এদের সবারই ভাবুকতার কেন্দ্রে আছে গ্রাম-বাংলাদেশ। এ একটি থিমকে তার প্রগাঢ় শিল্পভাবনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন এসএম সুলতান। পরিণত বয়সে প্রাজ্ঞ মস্তিষ্কে তিনি ভূমিকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রা- তার সারল্য ও গভীরতার ব্যাপারটা ঘুরেফিরে চিত্রিত করেছেন। এ পুনরাবৃত্তিও সেখান থেকে সৃষ্ট প্রাচুর্য; শিল্পবিভা ও বৈভবকে আমাদের বুঝতে হবে দার্শনিক প্রত্যয়ের জায়গা থেকে। কেন হার্ট ক্রেন বা ফিলিপ লারকিনের মতো কবিরা কিংবা আমাদের শক্তি চট্টোপাধ্যায় বা আবুল হাসান সাধারণ কবি নন? তার একটা কড় কারণ, এ কবিদের কল্পনা-চিন্তার কেন্দ্রে বেদনাবোধ বা বাউলপনার মতো গভীর ভাব ধর্ম বিশ্বাসের মতোই সুদৃঢ়। কবিসুলভ দার্শনিকতা আমাদের মাথা ভারী করে দেয় না যেহেতু তা স্বতঃস্ফূর্ত। চিত্রীসুলভ দার্শনিকতা সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। বড় মাপের চিত্রশিল্পীদের সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা তাই শুধু বিস্মিত হই না, ভাববিহ্বলও হই। ইয়েটস, ফ্রস্ট বা জীবনানন্দের কবিতার মতো ভ্যানগঘ কিংবা সুলতানের ছবিও ভাবনাগভীর প্রশান্তি আনে আমাদের মনে।

এ উপমহাদেশের প্রধান এমনকি গৌণ চিত্রীদের সৃজনী কর্মেও পশ্চিমের শিল্প আন্দোলনগুলোর পরোক্ষ প্রভাব বিরাজমান। সন্দেহ নেই মিকেলেঞ্জোলো থেকে মাতিস; পিকাস্যে থেকে পল ক্লি প্রমুখ বিরাট চিত্রীদের অঙ্কনের কায়দা-কৌশল, চিত্রিত পাত্রপাত্রীদের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, বস্তু ও সংশ্লিষ্ট আলো-আঁধারের খেলা, নিটোল, অনতিনিটোল বা ভাঙাচোরা ফিগারের প্রকাশপ্রধান উপস্থিতি এবং এ সবকিছু থেকে আহরিত ধ্যান-জ্ঞান, শিল্পবুদ্ধি আমাদের প্রথম সারির চিত্রীদের কাজগুলোকে আধুনিক করে তুলতে কতই না সাহায্য করেছে। কিন্তু কোনো কায়দা-কৌশলই শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয় না যদি তাতে প্রতিভার আলোর অভাব ঘটে। জয়নুল, কামরুল, সুলতান, মুর্তুজা বশির, শফিউদ্দীন, মোহাম্মদ কিবরিয়া কিংবা হালের মনিরুল ইসলাম যার কথাই বলি না কেন, এরা বড় হতে পেরেছে এ জন্যই যে, শিল্প বিষয়টিকে এরা হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে ধারণ করতে পেরেছিলেন। আর কেবল ধারণই করেননি, স্ব-স্ব প্রতিভার উপযোগী বিষয়-আশয় বেছে নিয়ে কাজ করে গেছেন অনলসভাবে।

কবিতার মতো চিত্রশিল্পেরও নানা ধরন ও চেহারা আছে। জসীমউদ্দীনের কবিতার সঙ্গে জয়নুলের পেইন্টিংয়ে ধৃত জীবনের মিল আছে। শহীদ কাদরীর অনেক কবিতায় পলায়নপর অনুভূতিগুলোকে ধরার যে প্রয়াস আছে তার সঙ্গে সাজুয্য খুঁজে পাই আমিনুল ইসলাম বা কিবরিয়ার ছবির বিমূর্ত জগতের। কবি বিনয় মজুমদারের দার্শনিক অবস্থানের সঙ্গে চিত্রী সুলতানের প্রগাঢ় দার্শনিক মাত্রার সাজুয্য অন্বেষণ কি অন্যায় হবে? দু’জনের কাজের ক্ষেত্র ও থিমগুলো খুবই আলাদা। কিন্তু যদি দার্শনিক প্রত্যয়ের কথা বলি, পর্যবেক্ষণও তা থেকে জাত উপলব্ধির কথা বলি, তা হলে তো খুব ভেতরে দারুণ একটা মিল দেখতে পাই উভয়ের মধ্যে।

পশ্চিমে নতুন কিছু করার বিদ্রোহী মনোভাব থেকে উৎসারিত হয়ে ছিল নানা শিল্পমতবাদ। ওইসব ইজম, তাদের বিচিত্র প্রকাশ আমাদের চিন্তাকে অস্থির করে তোলে। অনেক শিল্পীকেও কি তা করে না? বড় মাপের ভাবুকরা কিন্তু স্থিরতা চান। আর সে কারণেই জয়নুল, সুলতানরা মহান। প্রতিভার সঙ্গে নিষ্ঠার যোগ, সর্বোপরি কী আঁকছি এবং কেন আঁকছি সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা ছিল বলেই শুধু জয়নুল, সুলতান বা কামরুলের শিল্পকর্মে নয়, দেবদাস চক্রবর্তী, মুর্তুজা বশির, আব্দুল বাতেন প্রমুখের ‘কাজ’-এও নিজত্ব চিহ্নিত সৃজনশীলতার নানা ধরন টের পাওয়া যায়। অমামুলি প্রতিভার ধর্মই হচ্ছে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া। সৃষ্টিশীল কাজে বিরতি আসতেই পারে কিন্তু সে এগোবেই। দৃষ্টান্ত হিসেবে আবার সুলতানকেই আনছি। ইমপ্রেশনিস্ট ঘরানার আদি শিল্পীদের থেকে সুলতানের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু ইমপ্রেশনিস্ট (অভিব্যক্তিবাদী) চিত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া রঙের সুষমার ধারণাকে সুলতান সার্থকভাবে কাজে লাগালেন তার গ্রামজীবনভিত্তিক ছবিগুলোতে। এসব ছবিতে ধৃত শুধু প্রাণীগুলোই কি মনোযোগযোগ্য? মেটে, হলদু, কালচে হলুদ রংগুলোর প্রাচুর্যও কি চোখে পড়ার মতো নয়? সবকিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে উঁচুতে আছে তার জীবনবীক্ষা- তার ওই অন্তর্নিহিত তেজ সমবায়ী জীবনের অনিঃশেষ কর্মস্পৃহার আইডিয়া যেটি ছাড়া তার কৃষি পরিবারগুলোর গল্প খুব সাদামাটা থেকে যেত। কোনো তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো সেখানে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন