অজান্তারা আমার মেয়ে
jugantor
অজান্তারা আমার মেয়ে

  সৈয়দা সালমা খায়ের শিবা  

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তানভীর আর তুলিপের নিজেদের পছন্দের বিয়ে, একই সঙ্গে পড়ত ওরা। দু’পক্ষের কেউই আপত্তি করেনি। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তানভীরের প্রাইভেট ফার্মে চাকরি হয়ে যায়। তুলিপও বেশ কিছুদিন কলেজে পড়িয়েছে কিন্তু অজান্তা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেয়। তারপর আর জয়েন করা হয়নি। তুলিপ শাশুড়িকে দেখেনি। ওদের বিয়ের আগেই মারা গেছেন উনি। তখন তানভীর কলেজে পড়ত।

বেশ ভালোই চলছিল ওদের সংসার। হঠাৎই তানভীর অস্ট্রেলিয়ায় বড় একটা চাকরি পেয়ে যায়। ও অনেক আগে থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ওর বাবা ওকে যেতে না করেননি। শুধু বলেছিলেন নাতনিটাকে যেন অন্তত কিছুটা দিন হলেও এ দেশীয় সংস্কৃতির মাঝে বড় করা হয়। আর বলতেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজী শেখার পত্তন’। কথাটা ওদের খুব ভালো লেগেছিল। ঠিক হলো তানভীর আগে গিয়ে জয়েন করবে তারপর ওদের সবাইকে নিয়ে যাবে। অজান্তাকে ওর দাদাভাই খুব সুন্দর বাংলা শিখিয়ে ফেলেছিলেন এরই মধ্যে। ওর বয়স ছিল তখন মাত্র সাত বছর। দাদাভাইকে নিয়ে সে অস্ট্রিলিয়ায় যাবে, ওখানে বাড়ির সামনে দাদাভাইকে নিয়ে ফুলের বাগান করবে, দাদাভাই ওকে পড়াবে। কত পরিকল্পনা দু’জনার। কিন্তু বলা নাই কওয়া নাই হঠাৎই তিন দিনের জ্বরে মারা গেলেন অজান্তার দাদাভাই। তানভীর দেশে ছিল না। খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল।

অজান্তার বয়স এখন নয় ছুঁই ছুঁই। এ বছর ডিসেম্বরে তানভীর এসে ওদের নিয়ে যাবে। মোটামুটি এমনই কথা হয়েছে। ওরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকে সেখানে নিরাপত্তার কোনো সমস্যা নেই। ওরা আজ অনেকদিন থেকেই এখানে। ওদের মেয়েরও এ বাড়িতেই জন্ম। তানভীরদের নিজেদের বাড়ি মালিবাগে। মা মারা যাওয়ার পর ওরা এখানে এসে পড়েছে। ওর বাবার মন ঠিক ছিল না ওখানে আর। বাড়িজুড়ে কেবল ওর মার স্মৃতি। এ বাড়ির দারোয়ান সেও অনেক পুরনো, বয়ষ্ক ভদ্রলোক। অজান্তাকে খুব ভালোবাসে। দারোয়ানের পরিবার অবশ্য গ্রামে।

ওদের মা আর মেয়ে দু’জনের ছোট্ট সংসার। বাঁধা কাজের লোকের দরকার পড়ে না। তাই ছুটা কাজের লোক দিয়েই ওদের হয়ে যায়। সুফিয়া অনেকদিন থেকেই এখানে কাজ করে। ওর দুই মেয়ে। বড়টা নদী আর ছোটজন নীড়া।

বড় মেয়েটা অজান্তার সমবয়সি প্রায় আর ছোটটা সবে মাত্র বসতে শিখেছে।

-এই সুফিয়া আগামী পরশু আমার মা আর বাবা আসছেন আমেরিকা থেকে। ওরা আমাকে না বলে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি জেনে ফেলেছি। আমার যে ছোট বোনটা ওখানে থাকে ও বলে ফেলল, জানো তো আমার কাল সকাল সকাল একটু বাজার যেতে হবে। তুমি কি পারবে একটু আগে চলে আসতে?

-পারুম না ক্যান? তয় আমার উনি গ্যাছে তার অসুস্থ ভাইয়েরে দ্যাখতে। পাশের বাড়ির যেই খালার ধারে পোলাপাইন রাইখ্যা আহি হেই খালায়ও বাড়িত নাই। আপনি যদি কন মাইয়া দুইডারে কাইলকা লগে কইরা লইয়া আইলে একটু সুবিদা।

-ওকে নিয়ে এসো। আমি কি কখনো না করেছি?

-না, আফা। না তো করেন নাই। এক কাজ করমু আফা আপনে বাজার ভালো করতে পারেন না। হেইডা পারে ভাইজানে। আমি আপনের লগে যামু।

-বাচ্চারা, ওদেরও তাইলে নিয়ে যেতে হবে।

-নাগো আফা পোলাপাইন নেওনের কাম নাই, হুদাই ঝামেলা। আমার নদী অজান্তারে দেইখ্যা রাখব।

-ও কি দেখে রাখবে? ওরা তো একই বয়সি।

-কি যে কন আফা? কই অজান্তা আর কই আমাগো নদী! আমার নদী এ বয়সেই অনেক বুঝদার। নিচের দারোয়ান চাচারে কইয়্যা যামুনে।

-আচ্ছা, তুমি যা ভালো মনে করো।

তুলিপ তানভীরকে ফোন দিয়ে সব সময় অনেক কথা বলে। ঘরে যখন থাকে তখনো এত কথা হয় না। ওর বাবা মা আসবে, ওকে সারপ্রাইজ দেবে কিন্তু ও তো আগেই জেনে ফেলেছে, সবকিছু বলল।

-জানো, বাড়িওয়ালা চাচা একটা নতুন কেয়ারটেকার রেখেছে। আমার না পছন্দ হয়নি ওকে। সারাটাক্ষণ মোবাইল টেপে। ইদানীং দারোয়ান চাচাও সঙ্গে মিলেছে ওর। আমার ইচ্ছা করে বাড়িওয়ালা চাচাকে বলি ওকে যেন বাদ দিয়ে দেয়। আবার কী মনে করে!

-করবেই তো। তোমার কী দরকার? তুমি ভাড়া দাও আর তারপর তোমার মতো করে থাক। ওকে এখন আমার অজান্তা মা মণিকে একটু দাও।

-বাবা তুমি কবে আসবে? আমার জন্য আর কী কী কিনেছ? ডল হাউস কিনেছ?

-তোমার জন্য সব কিনেছি মা, আমার তো এ একটাই মা বলো।

-হ্যাঁ, আমিই তো তোমার মা এখন। বাবা আমি না ব্লেন্ডারে ম্যাংগো জুস বানাতে পারি। এখন শুধু প্র্যাকটিস করছি। তুমি আসলে খেয়ে পাগল হয়ে যাবা। বাবা, তুমি চলে আস নো, তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না। সেদিন স্বপ্ন দেখলাম আমি আর দাদাভাই গাছ বুনছি, আমাদের অস্ট্রেলিয়ার বাড়িতে। সত্যি বাবা।

কথাটা শুনে বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল তানভীরের। পরক্ষণেই ভাবল এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

-বাবা, তুমি চলে এসো। তোমাকে ভালোবাসি বাবা।

-এই তো মা ডিসেম্বরে তোমাদের নিতে আসব। তখন আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব মা। রাখি।

-বাই বাবা।

-বাই মা। উম্মা

ওরা বাজারে যাচ্ছে। শুক্রবার, ছুটির দিন। সবাই বোধহয় ঘুমাচ্ছে। সুফিয়া ওর ছোট মেয়েকে গেস্টরুমের এক কোনায় শুইয়ে দিল।

-নদী অজান্তারে দেইখ্যা রাখিস। কেউ আইলে দরজা খুলিস না।

-অজান্তার কপালে চুমু দিয়ে মা বের হয়ে গেল।

-মা

-আবার মাকে একটা চুমু খেল। ‘মা বেশি দেরি কোরো না।’

-দারোয়ান চাচা একটু খেয়াল রেখ। আমরা একটু বাজারে যাচ্ছি।

-অবশ্যই খেয়াল রাখুম গো মা। হেয় আমার নাতনির লাহান।

অজান্তা আর নদীর আগে থেকেই ভাব ছিল। নদী অনেকবার এসেছে।

-ভাগ্যিস আমার স্কুল বন্ধ। তোমার সঙ্গে দেখা হলো। আসো, ম্যাংগো জুস বানাই। মা খুব খুশি হবে। বাজার করে আনলেই আমরা খেতে দেব। আমরা দরজা খুলেই লুকিয়ে পড়ব। মা খুঁজে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যাবে, তাই না?

-আসো জুস বানাই, তারপর লেগো দিয়ে খেলব, ঠিক আছে।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

-আচ্চা? বলো আচ্ছা।

নদী ফিক করে হেসে ফেলল।

ওদের জুস বানানো হয়ে গেছে। কে যেন কলিংবেল দিয়েছে।

-মনে হয় মা এসেছে। আমরা দরজা খুলে কিন্তু লুকিয়ে পড়ব।

ওরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল, ওদেরকে দরজা খুলতে না করে গেছে।

দারোয়ান আর সেই কেয়ারটেকার এসেছে।

-ম্যাংগো জুস খাবে? আমরা বানিয়েছি।

-অবশ্যই।

সেই ছেলেটা দরজা বন্ধ করে দিল। নদী কিছুটা আঁচ করতে পেরে চিৎকার করে উঠেছিল, সেই সঙ্গে অজান্তাও। তাই ওদের দুজনার মুখ বেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করল এই দুই নরপিশাচ। তারপর দু’জনকে গেস্টরুমে এনে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলল গলায় গামছা পেঁচিয়ে। কাজ শেষে দু’জনই পালাল এ বাড়ি ছেড়ে।

মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে এত কিছু ঘটে গেছে।

দরজা ভেজানো ছিল।

-অজান্তা মা তুমি কোথায়? দেখ তোমার জন্য আমি কত কিছু এনেছি। নদী

-নদী মা ও নদী মা

কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না ওদের। সুফিয়ার ছোট মেয়েটার কান্নার শব্দে ওরা গেস্টরুমে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারাটা রুম। নিথর দুটা দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। পাশে রক্তের মাঝেই বসে কাঁদছে নদীর ছোট বোনটা। সারা শরীরে আঁচড়, কামড়ানোর দাগ, ক্ষতবিক্ষত ছোট্ট যৌনাঙ্গ ওদের।

-মারে...অজান্তারে

-ও আমার নদীরে নদীর বাপেরে আমি কি জবাব দিমুগো আফা।

তুলিপ জ্ঞান হারাল। পুলিশ এসেছে।

খবর পেয়ে তানভীর চলে এসেছে। অজান্তার নানা-নানু এসে পড়েছে। বাড়ির দারোয়ান আর কেয়ারটেকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। দারোয়ানের লাল গামছাটা অজান্তার গলায় পেঁচানো ছিল।

(পাঁচ বছর পর)

টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার হচ্ছে, যাদের বাচ্চাদের ছোট বয়সে যৌন নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছ, সেসব বাবা, মায়েদের। অনেকেই এসেছে। সবাইকে কিছু বলতে বলা হলো। সবাই বলল।

অজান্তার মা সবার শেষে বলেছে।

-অজান্তারা সব আমার মেয়ে। আমিই ওদের মা। আমি বা আমরা আমাদের কচি কচি মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। বেঁচে থাকলে আজ আমার মেয়ের বয়স হতো চৌদ্দ। মানে টিনএজ। প্রতিটা বাচ্চার প্রতিটা বয়সের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য, একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আমি পারিনি আমার মেয়ের সে সৌন্দর্য দেখতে। আমার মেয়ে আজ কিশোরী হতো বেঁচে থাকলে, আমার কাছে, ওর বাবার কাছে ওর কত আবদার থাকত, কত চাওয়া থাকত। আমরা বঞ্চিত হয়েছি। আমরা চাইলেই আর একটা অজান্তাকে পৃথিবীতে আনতে পারতাম। আনিনি। আমার অজান্তার জায়গা তো আমি কাউকে দেব না। তা ছাড়া এ নতুন অজান্তার নিরাপত্তা দেবে কে? প্রতিটাক্ষণ আমাদের বাবা, মার ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, প্রতিটা বাবা-মার। আমাদের দীর্ঘশ্বাস না চাইলেও বের হয়ে আসে।

তবে আমি বা আমরা মা, বাবারা সুইসাইড করিনি। সুইসাইড করা মানেই তো হেরে যাওয়া। আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি, আমাদের দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। আজ প্রতিটা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু। আমি, আমরা সবাই আজ খুশি। আর কোনো অজান্তাকে আমরা এমন নৃশংসভাবে হারাতে চাই না। আজ ধর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে, তারপরও আপনারা সাবধানে থাকবেন। বিশেষ করে অজান্তাদের বাবা, মা। মানে মেয়েদের বাবা, মার কথা বলছি। ওই যে দেখেন আমাদের অজান্তারা সব ফুল হয়ে ফুটে আছে আকাশে আর আমাদের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।

অজান্তারা আমার মেয়ে

 সৈয়দা সালমা খায়ের শিবা 
০৯ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তানভীর আর তুলিপের নিজেদের পছন্দের বিয়ে, একই সঙ্গে পড়ত ওরা। দু’পক্ষের কেউই আপত্তি করেনি। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে তানভীরের প্রাইভেট ফার্মে চাকরি হয়ে যায়। তুলিপও বেশ কিছুদিন কলেজে পড়িয়েছে কিন্তু অজান্তা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেয়। তারপর আর জয়েন করা হয়নি। তুলিপ শাশুড়িকে দেখেনি। ওদের বিয়ের আগেই মারা গেছেন উনি। তখন তানভীর কলেজে পড়ত।

বেশ ভালোই চলছিল ওদের সংসার। হঠাৎই তানভীর অস্ট্রেলিয়ায় বড় একটা চাকরি পেয়ে যায়। ও অনেক আগে থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। ওর বাবা ওকে যেতে না করেননি। শুধু বলেছিলেন নাতনিটাকে যেন অন্তত কিছুটা দিন হলেও এ দেশীয় সংস্কৃতির মাঝে বড় করা হয়। আর বলতেন, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘আগে চাই বাংলা ভাষার গাঁথুনি, তারপর ইংরেজী শেখার পত্তন’। কথাটা ওদের খুব ভালো লেগেছিল। ঠিক হলো তানভীর আগে গিয়ে জয়েন করবে তারপর ওদের সবাইকে নিয়ে যাবে। অজান্তাকে ওর দাদাভাই খুব সুন্দর বাংলা শিখিয়ে ফেলেছিলেন এরই মধ্যে। ওর বয়স ছিল তখন মাত্র সাত বছর। দাদাভাইকে নিয়ে সে অস্ট্রিলিয়ায় যাবে, ওখানে বাড়ির সামনে দাদাভাইকে নিয়ে ফুলের বাগান করবে, দাদাভাই ওকে পড়াবে। কত পরিকল্পনা দু’জনার। কিন্তু বলা নাই কওয়া নাই হঠাৎই তিন দিনের জ্বরে মারা গেলেন অজান্তার দাদাভাই। তানভীর দেশে ছিল না। খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল।

অজান্তার বয়স এখন নয় ছুঁই ছুঁই। এ বছর ডিসেম্বরে তানভীর এসে ওদের নিয়ে যাবে। মোটামুটি এমনই কথা হয়েছে। ওরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকে সেখানে নিরাপত্তার কোনো সমস্যা নেই। ওরা আজ অনেকদিন থেকেই এখানে। ওদের মেয়েরও এ বাড়িতেই জন্ম। তানভীরদের নিজেদের বাড়ি মালিবাগে। মা মারা যাওয়ার পর ওরা এখানে এসে পড়েছে। ওর বাবার মন ঠিক ছিল না ওখানে আর। বাড়িজুড়ে কেবল ওর মার স্মৃতি। এ বাড়ির দারোয়ান সেও অনেক পুরনো, বয়ষ্ক ভদ্রলোক। অজান্তাকে খুব ভালোবাসে। দারোয়ানের পরিবার অবশ্য গ্রামে।

ওদের মা আর মেয়ে দু’জনের ছোট্ট সংসার। বাঁধা কাজের লোকের দরকার পড়ে না। তাই ছুটা কাজের লোক দিয়েই ওদের হয়ে যায়। সুফিয়া অনেকদিন থেকেই এখানে কাজ করে। ওর দুই মেয়ে। বড়টা নদী আর ছোটজন নীড়া।

বড় মেয়েটা অজান্তার সমবয়সি প্রায় আর ছোটটা সবে মাত্র বসতে শিখেছে।

-এই সুফিয়া আগামী পরশু আমার মা আর বাবা আসছেন আমেরিকা থেকে। ওরা আমাকে না বলে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি জেনে ফেলেছি। আমার যে ছোট বোনটা ওখানে থাকে ও বলে ফেলল, জানো তো আমার কাল সকাল সকাল একটু বাজার যেতে হবে। তুমি কি পারবে একটু আগে চলে আসতে?

-পারুম না ক্যান? তয় আমার উনি গ্যাছে তার অসুস্থ ভাইয়েরে দ্যাখতে। পাশের বাড়ির যেই খালার ধারে পোলাপাইন রাইখ্যা আহি হেই খালায়ও বাড়িত নাই। আপনি যদি কন মাইয়া দুইডারে কাইলকা লগে কইরা লইয়া আইলে একটু সুবিদা।

-ওকে নিয়ে এসো। আমি কি কখনো না করেছি?

-না, আফা। না তো করেন নাই। এক কাজ করমু আফা আপনে বাজার ভালো করতে পারেন না। হেইডা পারে ভাইজানে। আমি আপনের লগে যামু।

-বাচ্চারা, ওদেরও তাইলে নিয়ে যেতে হবে।

-নাগো আফা পোলাপাইন নেওনের কাম নাই, হুদাই ঝামেলা। আমার নদী অজান্তারে দেইখ্যা রাখব।

-ও কি দেখে রাখবে? ওরা তো একই বয়সি।

-কি যে কন আফা? কই অজান্তা আর কই আমাগো নদী! আমার নদী এ বয়সেই অনেক বুঝদার। নিচের দারোয়ান চাচারে কইয়্যা যামুনে।

-আচ্ছা, তুমি যা ভালো মনে করো।

তুলিপ তানভীরকে ফোন দিয়ে সব সময় অনেক কথা বলে। ঘরে যখন থাকে তখনো এত কথা হয় না। ওর বাবা মা আসবে, ওকে সারপ্রাইজ দেবে কিন্তু ও তো আগেই জেনে ফেলেছে, সবকিছু বলল।

-জানো, বাড়িওয়ালা চাচা একটা নতুন কেয়ারটেকার রেখেছে। আমার না পছন্দ হয়নি ওকে। সারাটাক্ষণ মোবাইল টেপে। ইদানীং দারোয়ান চাচাও সঙ্গে মিলেছে ওর। আমার ইচ্ছা করে বাড়িওয়ালা চাচাকে বলি ওকে যেন বাদ দিয়ে দেয়। আবার কী মনে করে!

-করবেই তো। তোমার কী দরকার? তুমি ভাড়া দাও আর তারপর তোমার মতো করে থাক। ওকে এখন আমার অজান্তা মা মণিকে একটু দাও।

-বাবা তুমি কবে আসবে? আমার জন্য আর কী কী কিনেছ? ডল হাউস কিনেছ?

-তোমার জন্য সব কিনেছি মা, আমার তো এ একটাই মা বলো।

-হ্যাঁ, আমিই তো তোমার মা এখন। বাবা আমি না ব্লেন্ডারে ম্যাংগো জুস বানাতে পারি। এখন শুধু প্র্যাকটিস করছি। তুমি আসলে খেয়ে পাগল হয়ে যাবা। বাবা, তুমি চলে আস নো, তোমাকে ছাড়া ভালো লাগে না। সেদিন স্বপ্ন দেখলাম আমি আর দাদাভাই গাছ বুনছি, আমাদের অস্ট্রেলিয়ার বাড়িতে। সত্যি বাবা।

কথাটা শুনে বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল তানভীরের। পরক্ষণেই ভাবল এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই।

-বাবা, তুমি চলে এসো। তোমাকে ভালোবাসি বাবা।

-এই তো মা ডিসেম্বরে তোমাদের নিতে আসব। তখন আমরা সবাই একসঙ্গে থাকব মা। রাখি।

-বাই বাবা।

-বাই মা। উম্মা

ওরা বাজারে যাচ্ছে। শুক্রবার, ছুটির দিন। সবাই বোধহয় ঘুমাচ্ছে। সুফিয়া ওর ছোট মেয়েকে গেস্টরুমের এক কোনায় শুইয়ে দিল।

-নদী অজান্তারে দেইখ্যা রাখিস। কেউ আইলে দরজা খুলিস না।

-অজান্তার কপালে চুমু দিয়ে মা বের হয়ে গেল।

-মা

-আবার মাকে একটা চুমু খেল। ‘মা বেশি দেরি কোরো না।’

-দারোয়ান চাচা একটু খেয়াল রেখ। আমরা একটু বাজারে যাচ্ছি।

-অবশ্যই খেয়াল রাখুম গো মা। হেয় আমার নাতনির লাহান।

অজান্তা আর নদীর আগে থেকেই ভাব ছিল। নদী অনেকবার এসেছে।

-ভাগ্যিস আমার স্কুল বন্ধ। তোমার সঙ্গে দেখা হলো। আসো, ম্যাংগো জুস বানাই। মা খুব খুশি হবে। বাজার করে আনলেই আমরা খেতে দেব। আমরা দরজা খুলেই লুকিয়ে পড়ব। মা খুঁজে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যাবে, তাই না?

-আসো জুস বানাই, তারপর লেগো দিয়ে খেলব, ঠিক আছে।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

-আচ্চা? বলো আচ্ছা।

নদী ফিক করে হেসে ফেলল।

ওদের জুস বানানো হয়ে গেছে। কে যেন কলিংবেল দিয়েছে।

-মনে হয় মা এসেছে। আমরা দরজা খুলে কিন্তু লুকিয়ে পড়ব।

ওরা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল, ওদেরকে দরজা খুলতে না করে গেছে।

দারোয়ান আর সেই কেয়ারটেকার এসেছে।

-ম্যাংগো জুস খাবে? আমরা বানিয়েছি।

-অবশ্যই।

সেই ছেলেটা দরজা বন্ধ করে দিল। নদী কিছুটা আঁচ করতে পেরে চিৎকার করে উঠেছিল, সেই সঙ্গে অজান্তাও। তাই ওদের দুজনার মুখ বেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করল এই দুই নরপিশাচ। তারপর দু’জনকে গেস্টরুমে এনে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলল গলায় গামছা পেঁচিয়ে। কাজ শেষে দু’জনই পালাল এ বাড়ি ছেড়ে।

মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে এত কিছু ঘটে গেছে।

দরজা ভেজানো ছিল।

-অজান্তা মা তুমি কোথায়? দেখ তোমার জন্য আমি কত কিছু এনেছি। নদী

-নদী মা ও নদী মা

কোনো সাড়া-শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না ওদের। সুফিয়ার ছোট মেয়েটার কান্নার শব্দে ওরা গেস্টরুমে গেল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারাটা রুম। নিথর দুটা দেহ পড়ে আছে মেঝেতে। পাশে রক্তের মাঝেই বসে কাঁদছে নদীর ছোট বোনটা। সারা শরীরে আঁচড়, কামড়ানোর দাগ, ক্ষতবিক্ষত ছোট্ট যৌনাঙ্গ ওদের।

-মারে...অজান্তারে

-ও আমার নদীরে নদীর বাপেরে আমি কি জবাব দিমুগো আফা।

তুলিপ জ্ঞান হারাল। পুলিশ এসেছে।

খবর পেয়ে তানভীর চলে এসেছে। অজান্তার নানা-নানু এসে পড়েছে। বাড়ির দারোয়ান আর কেয়ারটেকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। দারোয়ানের লাল গামছাটা অজান্তার গলায় পেঁচানো ছিল।

(পাঁচ বছর পর)

টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার হচ্ছে, যাদের বাচ্চাদের ছোট বয়সে যৌন নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছ, সেসব বাবা, মায়েদের। অনেকেই এসেছে। সবাইকে কিছু বলতে বলা হলো। সবাই বলল।

অজান্তার মা সবার শেষে বলেছে।

-অজান্তারা সব আমার মেয়ে। আমিই ওদের মা। আমি বা আমরা আমাদের কচি কচি মেয়েদের নিরাপত্তা দিতে পারিনি। বেঁচে থাকলে আজ আমার মেয়ের বয়স হতো চৌদ্দ। মানে টিনএজ। প্রতিটা বাচ্চার প্রতিটা বয়সের একটা আলাদা বৈশিষ্ট্য, একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। আমি পারিনি আমার মেয়ের সে সৌন্দর্য দেখতে। আমার মেয়ে আজ কিশোরী হতো বেঁচে থাকলে, আমার কাছে, ওর বাবার কাছে ওর কত আবদার থাকত, কত চাওয়া থাকত। আমরা বঞ্চিত হয়েছি। আমরা চাইলেই আর একটা অজান্তাকে পৃথিবীতে আনতে পারতাম। আনিনি। আমার অজান্তার জায়গা তো আমি কাউকে দেব না। তা ছাড়া এ নতুন অজান্তার নিরাপত্তা দেবে কে? প্রতিটাক্ষণ আমাদের বাবা, মার ভেতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, প্রতিটা বাবা-মার। আমাদের দীর্ঘশ্বাস না চাইলেও বের হয়ে আসে।

তবে আমি বা আমরা মা, বাবারা সুইসাইড করিনি। সুইসাইড করা মানেই তো হেরে যাওয়া। আমরা আন্দোলন চালিয়ে গেছি, আমাদের দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। আজ প্রতিটা ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি ‘মৃত্যুদণ্ড। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু। আমি, আমরা সবাই আজ খুশি। আর কোনো অজান্তাকে আমরা এমন নৃশংসভাবে হারাতে চাই না। আজ ধর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে, তারপরও আপনারা সাবধানে থাকবেন। বিশেষ করে অজান্তাদের বাবা, মা। মানে মেয়েদের বাবা, মার কথা বলছি। ওই যে দেখেন আমাদের অজান্তারা সব ফুল হয়ে ফুটে আছে আকাশে আর আমাদের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন