সমস্যা একটাই আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয় না
jugantor
সাক্ষাৎকারে সেলিনা হোসেন
সমস্যা একটাই আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয় না

  সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইজাজ আহ্মেদ মিলন  

১১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা কথাসাহিত্যে পাঠকপ্রিয় লেখিকা সেলিনা হোসেন। তার লেখা ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসসহ বেশ কয়েকটি বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ সালে সাহিত্যকাশে এ নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম উপন্যাস ‘জলোচ্ছ্বাস’ প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালে। তারপর থেকে লিখে চলছেন নিরন্তর।

স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারই জমা হয়েছে তার ঝুড়িতে। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারও। সবচেয়ে বড় পুরস্কার অগণিত পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া। সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকট সামগ্রিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। ১৪ জুন সেলিনা হোসেনের ৭৫তম জন্মদিন। জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে সেলিনা হোসেনের মুখোমুখি হয়েছিলেন- কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহ্মেদ মিলন। সেই আলোচনার অংশবিশেষ পত্রস্থ হলো।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : জীবন আপনাকে কী শেখাল? যাপিতজীবনের এ প্রান্তে এসে কী মনে হয়? কেউ কেউ বলে থাকেন-জীবন মানে একটি ভুল সমগ্র।

সেলিনা হোসেন : সাহিত্যের মাঝে জীবনচর্চায় সাহিত্যের বড় অনুভব আমাকে দীর্ঘমাত্রা দিয়েছে। জীবন মানে ভুল সমগ্র এটি আমার কাছে কোনো ব্যাখ্যাই নয়।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে আপনার চরিত্রগুলো একটি মাতৃভূমির সন্ধ্যান করে। আপনার কাল্পনিক মাতৃভূমি কেমন?

সেলিনা হোসেন : এটাই আমার কল্পনার মাঝ দিয়ে বাস্তবতার স্বরূপ। আমি মনে করি, মাতৃভূমিকে মর্যাদার আসনে রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কেউ যেন মাতৃভূমির অবমাননা না ঘটায়।

ইজাজ আহমেদ মিলন : আপনি তো আপাদমস্তক একজন লেখকের জীবনই যাপন করলেন। আপনার কোনো অতৃপ্তিও নেই। কখনো কি মনে হয়-এই পথে না ওই পথে হাঁটলে আরও ভালো করতেন?

সেলিনা হোসেন : আমি বহুকাল ধরেই লেখালেখি করছি। শৈশবে-কৈশোরে আমার অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল। নদ-নদী, খাল-বিল, গাছপালা অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে আমার নিবিড়ভাবে মিশেছিলাম। খুব কাছ থেকে প্রকৃতি দেখার সুযোগ হয়েছিল। পাশাপাশি মানুষের আচার-আচরণ তাদের বসবাস, মানুষের দরিদ্রতা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দেখা-এগুলো আমার কৈশোরে দেখার একটা বড় জায়গা ছিল। তারপর আমি লিখতে আসি। কিন্তু পাশাপাশি আমি অনেক কিছু করেছি। ছাত্রজীবনে আমি ডিবেটিং-এর একজন বড় ভক্ত ছিলাম। ডিবেট করতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারবার আমি ডিবেটিং-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। তাছাড়া আবৃত্তি, নাচ-গানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। গিটার বাজাতেও শিখেছিলাম। কিন্তু মাস্টার্স করার পর ১৯৭০ সালে যখন আমি বাংলা একাডেমিতে যোগদান করলাম, তখন আমার মনে হলো, একজন মানুষের এত কিছু করা উচিত নয়। সব ধরে রাখলে আমি কোথাও সার্থক হবো না। আমি অভিনয় করব? আমি গিটার বাজাব? আমি আবৃত্তি করব? আমি লিখব? আমি সব কিছু করব-এত বাহাদুরি করার জায়গা বোধহয় নয়। একনিষ্ঠভাবে যে সে জায়গাটাতে ধরবে শিল্পের সাধনাকে বড় করে তোলার জায়গায় পরিণত হবে। সুতরাং আমি যখন বাংলা একাডেমিতে ঢুকলাম এবং আমার একটি বই তখন বেরিয়েছে। বইয়ের গল্পগুলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লেখা ছিল। তখন আমার মনে হলো, আমার বোধহয় লেখালেখিতেই থাকা উচিত। অবশ্য সূচনালগ্নে এত বিশাল কোনো প্রত্যাশা ছিল না কিংবা আমি পারবই এমনটিও মনে করিনি। মনের মধ্যে তেমন জোরও ছিল না। এভাবেই আমি লেখালেখিতে আসি। আর বাংলা একাডেমিতে চাকরি করার সুযোগে আমার লেখালেখির জায়গাটা আরও প্রসারিত হয়। সেখানে বড় একটি লাইব্রেরি ছিল, অনবরত বই পেতাম হাতের কাছে। পড়তাম। গবেষণার জায়গা ছিল। ইতিহাসচর্চার একটা সুযোগ ছিল। সেখান থেকে আমার মনে হলো, লেখালেখিতে আমার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে হবে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : আপনার এ দীর্ঘ সাহিত্য ভ্রমণে কখনো কি মনে হয়েছে ল্যাটিন সাহিত্য বা পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষ করে কথাসাহিত্যে আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষ কোনো সাদৃশ্য আছে?

সেলিনা হোসেন : ’৪৭-পরবর্তী সময় থেকে রচিত আমাদের সাহিত্য পাশ্চাত্যের সব দেশের সাহিত্যের সমতুল্য। আমরা যেসব বই পড়ি তার মাত্রা আমাদের সাহিত্যকে ছাড়িয়ে যায় না। আমাদের সমস্যা একটাই যে, আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয় না।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : বাংলাসাহিত্য বিশ্ব বিবেচনায় একটা পর্যায়ে এসেছে। সেটা কথাসাহিত্য, কাব্য, প্রবন্ধ, নাটক সব ক্ষেত্রেই বলা চলে। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের লেখকরা আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে ততটা সমাদৃত নন কেন?

সেলিনা হোসেন : বাংলাদেশ একমাত্র রাষ্ট্র যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বাংলা ভাষার কবি হিসাবে। আমাদের সাহিত্য বিদেশি পাঠকের কাছে যায় না, এজন্য বিশ্ব তার কোনো ভূমিকা পায়নি। আমাদের অনুবাদের জায়গা উন্নত করা এখন সরকারি পর্যায়ের দায়িত্ব।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : আপনার লেখা বেশ কিছু বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে?

সেলিনা হোসেন : বিষয়টি ভাবতে অবশ্যই ভালোলাগে। ফ্রান্সের এক অধ্যাপক পাসকাল জিঙ্ক প্যারিসে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি South Asian Literature পড়ান। আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাস ১৯৮৭ সালে অনুবাদ করেছিল আবেদীন কাদের। পাসকাল জিঙ্ক এ বইটি নেট থেকে গ্রহণ করেন। তিনি পড়ে খুশি হয়ে আমাকে ই-মেইল পাঠান। লিখেন, ফরেন রিডার হিসাবে আমি এ উপন্যাসের আরও কিছু বিবরণ চাই। আপনি কী লিখবেন? আমি লিখলাম, কোথায় চান, তা আমাকে জানান। আমি লিখব। বইয়ের ইংরেজি একটু সংশোধন করতে চাই। আমাকে পারমিশন দিন। আমি লিখলাম এবং আগের ইংরেজি ব্রাশআপ করার পারমিশন দিলাম। তিনি খুব খুশি হয়ে কাজটি শুরু করলেন। শেষ হলে দিল্লি রূপা পাবলিকেশনে যোগাযোগ করলেন। বাইয়ের নাম রাখলেন জরাবৎ ড়ভ গু ইষড়ড়ফ. বইটি দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। সুতরাং এভাবে সুযোগ পেলে লেখালেখির জগৎ আলোড়িত হয়। ভাবতে দারুণ লাগে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে আপনার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে গেল। তিনি আপনাকে ছায়া দিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। আজকের সেলিনা হোসেন হয়ে উঠার পেছনে একজন আনোয়ার হোসেন খানের ভূমিকাকে কীভাবে ব্যখ্যা করবেন?

সেলিনা হোসেন : বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খান তার মানসিক দীপ্তিতে যত আলোকিত সেভাবে আলোকিত করে রেখেছে। সবসময় আমাকে বলে, লেখার টেবিলেই থাক। রান্নাঘরে ঢুকতে হবে না। কাজের বুয়া যা রান্না করে তা নিয়ে আমি হ্যাপি। তোমার সাহিত্যের পৃথিবী তুমি বড় করতে থাক। এ ভালোবাসা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : তরুণদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে? কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়াই কেউ কেউ লিখতে আসছেন। লেখালেখি শুরু পর থেকেই বিখ্যাত হয়ে উঠা কিংবা সেলিব্রেটি বনে যাওয়ার নেশায় তারা বিভোর থাকেন। এ নেশা কি লেখকের জন্য ক্ষতিকারক নয়?

সেলিনা হোসেন : তরুণরা যে যেভাবে ভাবছে তারা সেভাবে ভাবুক। কেউ শক্ত ইংরেজি পারলে সেভাবে লিখুক। আমাদের জনজীবন ইংরেজি ভাষায় উঠে আসুক। বিখ্যাত হয়ে ওঠার চিন্তা সাধনার ব্যাপার।

সাক্ষাৎকারে সেলিনা হোসেন

সমস্যা একটাই আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয় না

 সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ইজাজ আহ্মেদ মিলন 
১১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা কথাসাহিত্যে পাঠকপ্রিয় লেখিকা সেলিনা হোসেন। তার লেখা ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসসহ বেশ কয়েকটি বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়েছে। ‘উৎস থেকে নিরন্তর’ গল্পগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে ১৯৬৯ সালে সাহিত্যকাশে এ নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে। প্রথম উপন্যাস ‘জলোচ্ছ্বাস’ প্রকাশ হয় ১৯৭২ সালে। তারপর থেকে লিখে চলছেন নিরন্তর।

স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারই জমা হয়েছে তার ঝুড়িতে। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারও। সবচেয়ে বড় পুরস্কার অগণিত পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া। সেলিনা হোসেনের উপন্যাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংকট সামগ্রিকতা প্রতিফলিত হয়েছে। ১৪ জুন সেলিনা হোসেনের ৭৫তম জন্মদিন। জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে সেলিনা হোসেনের মুখোমুখি হয়েছিলেন- কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক ইজাজ আহ্মেদ মিলন। সেই আলোচনার অংশবিশেষ পত্রস্থ হলো।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : জীবন আপনাকে কী শেখাল? যাপিতজীবনের এ প্রান্তে এসে কী মনে হয়? কেউ কেউ বলে থাকেন-জীবন মানে একটি ভুল সমগ্র।

সেলিনা হোসেন : সাহিত্যের মাঝে জীবনচর্চায় সাহিত্যের বড় অনুভব আমাকে দীর্ঘমাত্রা দিয়েছে। জীবন মানে ভুল সমগ্র এটি আমার কাছে কোনো ব্যাখ্যাই নয়।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : চিত্রকল্পের মধ্য দিয়ে আপনার চরিত্রগুলো একটি মাতৃভূমির সন্ধ্যান করে। আপনার কাল্পনিক মাতৃভূমি কেমন?

সেলিনা হোসেন : এটাই আমার কল্পনার মাঝ দিয়ে বাস্তবতার স্বরূপ। আমি মনে করি, মাতৃভূমিকে মর্যাদার আসনে রাখা প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। কেউ যেন মাতৃভূমির অবমাননা না ঘটায়।

ইজাজ আহমেদ মিলন : আপনি তো আপাদমস্তক একজন লেখকের জীবনই যাপন করলেন। আপনার কোনো অতৃপ্তিও নেই। কখনো কি মনে হয়-এই পথে না ওই পথে হাঁটলে আরও ভালো করতেন?

সেলিনা হোসেন : আমি বহুকাল ধরেই লেখালেখি করছি। শৈশবে-কৈশোরে আমার অসাধারণ একটা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল। নদ-নদী, খাল-বিল, গাছপালা অর্থাৎ প্রকৃতির সঙ্গে আমার নিবিড়ভাবে মিশেছিলাম। খুব কাছ থেকে প্রকৃতি দেখার সুযোগ হয়েছিল। পাশাপাশি মানুষের আচার-আচরণ তাদের বসবাস, মানুষের দরিদ্রতা, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দেখা-এগুলো আমার কৈশোরে দেখার একটা বড় জায়গা ছিল। তারপর আমি লিখতে আসি। কিন্তু পাশাপাশি আমি অনেক কিছু করেছি। ছাত্রজীবনে আমি ডিবেটিং-এর একজন বড় ভক্ত ছিলাম। ডিবেট করতাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারবার আমি ডিবেটিং-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। তাছাড়া আবৃত্তি, নাচ-গানের সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। গিটার বাজাতেও শিখেছিলাম। কিন্তু মাস্টার্স করার পর ১৯৭০ সালে যখন আমি বাংলা একাডেমিতে যোগদান করলাম, তখন আমার মনে হলো, একজন মানুষের এত কিছু করা উচিত নয়। সব ধরে রাখলে আমি কোথাও সার্থক হবো না। আমি অভিনয় করব? আমি গিটার বাজাব? আমি আবৃত্তি করব? আমি লিখব? আমি সব কিছু করব-এত বাহাদুরি করার জায়গা বোধহয় নয়। একনিষ্ঠভাবে যে সে জায়গাটাতে ধরবে শিল্পের সাধনাকে বড় করে তোলার জায়গায় পরিণত হবে। সুতরাং আমি যখন বাংলা একাডেমিতে ঢুকলাম এবং আমার একটি বই তখন বেরিয়েছে। বইয়ের গল্পগুলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লেখা ছিল। তখন আমার মনে হলো, আমার বোধহয় লেখালেখিতেই থাকা উচিত। অবশ্য সূচনালগ্নে এত বিশাল কোনো প্রত্যাশা ছিল না কিংবা আমি পারবই এমনটিও মনে করিনি। মনের মধ্যে তেমন জোরও ছিল না। এভাবেই আমি লেখালেখিতে আসি। আর বাংলা একাডেমিতে চাকরি করার সুযোগে আমার লেখালেখির জায়গাটা আরও প্রসারিত হয়। সেখানে বড় একটি লাইব্রেরি ছিল, অনবরত বই পেতাম হাতের কাছে। পড়তাম। গবেষণার জায়গা ছিল। ইতিহাসচর্চার একটা সুযোগ ছিল। সেখান থেকে আমার মনে হলো, লেখালেখিতে আমার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে হবে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : আপনার এ দীর্ঘ সাহিত্য ভ্রমণে কখনো কি মনে হয়েছে ল্যাটিন সাহিত্য বা পাশ্চাত্য সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষ করে কথাসাহিত্যে আমাদের সাহিত্যের সঙ্গে বিশেষ কোনো সাদৃশ্য আছে?

সেলিনা হোসেন : ’৪৭-পরবর্তী সময় থেকে রচিত আমাদের সাহিত্য পাশ্চাত্যের সব দেশের সাহিত্যের সমতুল্য। আমরা যেসব বই পড়ি তার মাত্রা আমাদের সাহিত্যকে ছাড়িয়ে যায় না। আমাদের সমস্যা একটাই যে, আমাদের সাহিত্য অনুবাদ হয় না।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : বাংলাসাহিত্য বিশ্ব বিবেচনায় একটা পর্যায়ে এসেছে। সেটা কথাসাহিত্য, কাব্য, প্রবন্ধ, নাটক সব ক্ষেত্রেই বলা চলে। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের লেখকরা আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে ততটা সমাদৃত নন কেন?

সেলিনা হোসেন : বাংলাদেশ একমাত্র রাষ্ট্র যার রাষ্ট্রভাষা বাংলা। আমাদের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বাংলা ভাষার কবি হিসাবে। আমাদের সাহিত্য বিদেশি পাঠকের কাছে যায় না, এজন্য বিশ্ব তার কোনো ভূমিকা পায়নি। আমাদের অনুবাদের জায়গা উন্নত করা এখন সরকারি পর্যায়ের দায়িত্ব।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : আপনার লেখা বেশ কিছু বই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বিষয়টি ভাবতে কেমন লাগে?

সেলিনা হোসেন : বিষয়টি ভাবতে অবশ্যই ভালোলাগে। ফ্রান্সের এক অধ্যাপক পাসকাল জিঙ্ক প্যারিসে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। তিনি South Asian Literature পড়ান। আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাস ১৯৮৭ সালে অনুবাদ করেছিল আবেদীন কাদের। পাসকাল জিঙ্ক এ বইটি নেট থেকে গ্রহণ করেন। তিনি পড়ে খুশি হয়ে আমাকে ই-মেইল পাঠান। লিখেন, ফরেন রিডার হিসাবে আমি এ উপন্যাসের আরও কিছু বিবরণ চাই। আপনি কী লিখবেন? আমি লিখলাম, কোথায় চান, তা আমাকে জানান। আমি লিখব। বইয়ের ইংরেজি একটু সংশোধন করতে চাই। আমাকে পারমিশন দিন। আমি লিখলাম এবং আগের ইংরেজি ব্রাশআপ করার পারমিশন দিলাম। তিনি খুব খুশি হয়ে কাজটি শুরু করলেন। শেষ হলে দিল্লি রূপা পাবলিকেশনে যোগাযোগ করলেন। বাইয়ের নাম রাখলেন জরাবৎ ড়ভ গু ইষড়ড়ফ. বইটি দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। সুতরাং এভাবে সুযোগ পেলে লেখালেখির জগৎ আলোড়িত হয়। ভাবতে দারুণ লাগে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে আপনার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে গেল। তিনি আপনাকে ছায়া দিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন। আজকের সেলিনা হোসেন হয়ে উঠার পেছনে একজন আনোয়ার হোসেন খানের ভূমিকাকে কীভাবে ব্যখ্যা করবেন?

সেলিনা হোসেন : বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন খান তার মানসিক দীপ্তিতে যত আলোকিত সেভাবে আলোকিত করে রেখেছে। সবসময় আমাকে বলে, লেখার টেবিলেই থাক। রান্নাঘরে ঢুকতে হবে না। কাজের বুয়া যা রান্না করে তা নিয়ে আমি হ্যাপি। তোমার সাহিত্যের পৃথিবী তুমি বড় করতে থাক। এ ভালোবাসা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

ইজাজ আহ্মেদ মিলন : তরুণদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে? কোনো রকম পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়াই কেউ কেউ লিখতে আসছেন। লেখালেখি শুরু পর থেকেই বিখ্যাত হয়ে উঠা কিংবা সেলিব্রেটি বনে যাওয়ার নেশায় তারা বিভোর থাকেন। এ নেশা কি লেখকের জন্য ক্ষতিকারক নয়?

সেলিনা হোসেন : তরুণরা যে যেভাবে ভাবছে তারা সেভাবে ভাবুক। কেউ শক্ত ইংরেজি পারলে সেভাবে লিখুক। আমাদের জনজীবন ইংরেজি ভাষায় উঠে আসুক। বিখ্যাত হয়ে ওঠার চিন্তা সাধনার ব্যাপার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন