আরোপণ আর প্রতি আরোপণের বিভোল খেলা
jugantor
সিদ্ধার্থ হকের ‘সাবলেট’
আরোপণ আর প্রতি আরোপণের বিভোল খেলা

  তুষার দাশ  

১১ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিদ্ধার্থ হকের নতুন আর নবম কাব্যগ্রন্থ ‘সাবলেট’। সাবলেট শব্দটার ভেতর দীনতা আছে, রুদ্ধতা আছে, আছে সংকোচন, আছে নিশ্বাস নেওয়ার আছাড়ি-পিছাড়ি যন্ত্রণাময়তা। অবসাদ, ক্লান্তি আর স্বপ্নহীনতার অনপনেয়, অমোচনীয়, ব্যথাতুর এক গল্প আছে। সেই মহাগল্পের অভাবনীয় রূপকল্পকে কবি সিদ্ধার্থ হক তার আপন আলোয়, কল্পনাশক্তির এক সিদ্ধ, অনন্য বয়নকুশলতায় এ ‘সাবলেট’ গ্রন্থের ৩৬টি কবিতায় রক্তাক্ত প্রতিলিপির মতো চিত্রিত করেছেন। সাবলেট বাসিন্দার যাবতীয় স্বপ্নহীনতা, করুণ জীবনের বিশীর্ণ ধারাটির ভেতর কবি কখনো প্রবিষ্ট হয়ে নিজেকে সেই জীবনধারার প্রতিভু ভাবছেন, আবার অ্যদিকে সম্পূর্ণ তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন সাবলেট-থাকা ব্যক্তি-মানুষের মর্মান্তিক বেদনাকে। আবার তাকে পরিশ্রুত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন সম্পূর্ণ একাত্মতার অভিনিবেশসহ। সব মিলিয়ে কবি এখানে তার নিজস্ব একটি জগৎ নির্মাণে সফলকাম, বলা যেতেই পারে। কল্পনা-প্রতিভা ও তার শক্তিমত্ততা একজন কবির সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তিনি যতটা এ অস্ত্র প্রয়োগে সব্যসাচী, ততটাই তার সাফল্যের চূড়ো। চলুন এক ঝলক কবির কিছু পঙ্ক্তি পড়ে নিই। পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতার কিছু স্বাদ নিই-

১. অনেক অসীম পাতা ঘুরে ঘুরে নামছে সেখানে;

কুয়াশায় ভিজে ভিজে তাদের ওজন বেড়ে গেছে;

নামবার পথগুলি কুয়াশায় দীর্ঘ হয়ে গেছে;

কুয়াশায় বাতাসও বহু ঘন; পাতার চলার পথ

নদীর পথের মতো অবিমিশ্র কুশ্মটিকা আজ। (সাবলেট ৩)

২. সারারাত পার করে দেখতে পায় সেও কাটা গাছ,

নিজ হাতে কেটে ফেলা গাছদের সঙ্গে শুয়ে আছে বিছানায়।

(সাবলেট ১০)

৩. গ্রামোফোন রেকর্ডের হারমোনিয়ামের মতন

গাছেরা বাজছে;

গভীর বিষণ্ন এক শীতকাল শীতকালে দেখা

দিয়ে গেছে;

(সাবলেট ১২ক)

এ রকম অজস্র পঙ্ক্তি সাবলেট কাব্যের নানা কবিতায় ছড়ানো রয়েছে।

৩৬টি কবিতার এ বইয়ে প্রথম দুটি কবিতা বাদে সবক’টিরই শিরোনাম সাবলেট দিয়ে। বাংলা কবিতায় সিরিজ কবিতার লেখক খুব বেশি নয় যদিও। একটি বিশেষ থিমকে কেন্দ্র করে এ কবির এটা দ্বিতীয় সিরিজ। এর আগে তার অষ্টম গ্রন্থের স্বীকৃতি পাওয়া লজিং মাস্টার সিরিজটাও তার কবিতার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে বিশেষভাবে সক্ষম হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবি এখানে ৭৭ বার ‘সাবলেট’ শব্দটি ব্যবহার করে সেটিকে পাঠকের মগজের কোষে কোষে চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। সিদ্ধার্থ হকের পর্যবেক্ষণ খুব চমৎকার- সেই পর্যবেক্ষণকে তিনি যখন বস্তুতে আরোপ করেন- তার একটা ডাইমেনশন তৈরি হয়- এতে তৃপ্তি না পেয়ে তিনি তাতে ভিন্ন আরোপণের মাধ্যমে তৈরি করেন নতুনতর ডাইমেশন- এক পর্যায়ে সেসব মিলে এটাকে নিয়ে যায় এবসার্ডিটির দিকে। সেই এবসার্ডিটি সব সময় প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম হয়- এমন বলা চলে না। কখনো কখনো অতিকথনও পেয়ে বসে কবিকে। একটা স্পাইরাল জার্নির ভেতর দিয়ে কবি যেন পৌঁছতে চাইছেন কোথাও- সঙ্গে নিয়ে চলেছেন তার পাঠকদেরও। তার অনেক কবিতার ভেতর এমন সব বিস্ময়কর পঙ্ক্তির মুখোমুখি আমরা হই- কিছুক্ষণ স্তব্ধতার স্পন্দন শুনতে পাই যেন সেসব পঙ্ক্তি পাঠের পর। কখনো ধ্যানমগ্নতার ভেতর, কখনোবা এক অনন্ত ঘোরের ভেতর যেন তিনি শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে চলেন, বহির্জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণতাই উদাসীন হয়ে কিন্তু বস্তুজগতের নানা অসামঞ্জস্য, সামাজিক নানা উত্থান-পতন, সম্পর্কের নিবিড় গহনতা, টানাপোড়েন, দৈনন্দিত অনটন, ভিখিরির চিৎকার, ব্যথিত-বেদনায় অভিব্যক্তি- কোনোটাই তার ইন্দ্রিয়গুলোকে এড়াতে পারে না। তিনি দেখেন, পড়েন, পঠনাভিজ্ঞতাকে আত্মরসে সারিত করে অনুভববেদ্য অনিবার্য শব্দসমষ্টিকে জাগিয়ে নিজের রচনায় নির্মাণ করেন একের পর এক প্রতিমা। চিত্র, চিত্রকল্প, দৃশ্য, দৃশ্যকল্প- জীবনের ভাঙামুখ- সব এক মিছিল যেন, জীবন্ত কোনো কোনো পঙ্ক্তি বা বাক্যও হয়ে ওঠে এপিগ্রাম। যে কবির মনে হয়, ‘শীত এক শরণার্থী; গ্রামের স্মৃতির মতো নিচু কিংবা অনেক ওপর থেকে পৃথিবীকে বিষণ্ন দেখায়। বা চেতনাও গলে যাবে বাতাসে মাটিতে, রৌদ্রে ব্রহ্মাণ্ডের গাঢ় অন্ধকারে’- তিনি কিন্তু পাঠক-প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেন। তার এ যাত্রাপথ দীর্ঘ হোক- পাঠক তার কবিতায় নতুনতর কিছুর সন্ধান পাক সেই প্রত্যাশা আমরা রাখতেই পারি।

এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতার শেষ চারটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে এ আলোচনার সমাপ্তি টানতে চাই-

এ নগরে থাকতে হলে কুয়ার ভিতরে নামতে হয়। অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতে হয় অন্ধকারে;

পথে, পিচে, মিশে যেতে হয়;

বারবার, বারবার, হাসপাতালের মতো মিথ্যা বলতে হয়।

(সাবলেট ৩৩)

এসব নির্মম সত্যোপলব্ধি আর তার বয়ান ছাড়া, সত্যি বলা ছাড়া কবির আর কী কাজ? সত্যের হাত আঁকড়ে থাকা ছাড়া কবির তো আর তেমন কোনো আশ্রয় নেই।

সিদ্ধার্থ হকের ‘সাবলেট’

আরোপণ আর প্রতি আরোপণের বিভোল খেলা

 তুষার দাশ 
১১ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সিদ্ধার্থ হকের নতুন আর নবম কাব্যগ্রন্থ ‘সাবলেট’। সাবলেট শব্দটার ভেতর দীনতা আছে, রুদ্ধতা আছে, আছে সংকোচন, আছে নিশ্বাস নেওয়ার আছাড়ি-পিছাড়ি যন্ত্রণাময়তা। অবসাদ, ক্লান্তি আর স্বপ্নহীনতার অনপনেয়, অমোচনীয়, ব্যথাতুর এক গল্প আছে। সেই মহাগল্পের অভাবনীয় রূপকল্পকে কবি সিদ্ধার্থ হক তার আপন আলোয়, কল্পনাশক্তির এক সিদ্ধ, অনন্য বয়নকুশলতায় এ ‘সাবলেট’ গ্রন্থের ৩৬টি কবিতায় রক্তাক্ত প্রতিলিপির মতো চিত্রিত করেছেন। সাবলেট বাসিন্দার যাবতীয় স্বপ্নহীনতা, করুণ জীবনের বিশীর্ণ ধারাটির ভেতর কবি কখনো প্রবিষ্ট হয়ে নিজেকে সেই জীবনধারার প্রতিভু ভাবছেন, আবার অ্যদিকে সম্পূর্ণ তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে পর্যবেক্ষণ করছেন সাবলেট-থাকা ব্যক্তি-মানুষের মর্মান্তিক বেদনাকে। আবার তাকে পরিশ্রুত করে পাঠকের সামনে তুলে ধরছেন সম্পূর্ণ একাত্মতার অভিনিবেশসহ। সব মিলিয়ে কবি এখানে তার নিজস্ব একটি জগৎ নির্মাণে সফলকাম, বলা যেতেই পারে। কল্পনা-প্রতিভা ও তার শক্তিমত্ততা একজন কবির সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তিনি যতটা এ অস্ত্র প্রয়োগে সব্যসাচী, ততটাই তার সাফল্যের চূড়ো। চলুন এক ঝলক কবির কিছু পঙ্ক্তি পড়ে নিই। পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতার কিছু স্বাদ নিই-

১. অনেক অসীম পাতা ঘুরে ঘুরে নামছে সেখানে;

কুয়াশায় ভিজে ভিজে তাদের ওজন বেড়ে গেছে;

নামবার পথগুলি কুয়াশায় দীর্ঘ হয়ে গেছে;

কুয়াশায় বাতাসও বহু ঘন; পাতার চলার পথ

নদীর পথের মতো অবিমিশ্র কুশ্মটিকা আজ। (সাবলেট ৩)

২. সারারাত পার করে দেখতে পায় সেও কাটা গাছ,

নিজ হাতে কেটে ফেলা গাছদের সঙ্গে শুয়ে আছে বিছানায়।

(সাবলেট ১০)

৩. গ্রামোফোন রেকর্ডের হারমোনিয়ামের মতন

গাছেরা বাজছে;

গভীর বিষণ্ন এক শীতকাল শীতকালে দেখা

দিয়ে গেছে;

(সাবলেট ১২ক)

এ রকম অজস্র পঙ্ক্তি সাবলেট কাব্যের নানা কবিতায় ছড়ানো রয়েছে।

৩৬টি কবিতার এ বইয়ে প্রথম দুটি কবিতা বাদে সবক’টিরই শিরোনাম সাবলেট দিয়ে। বাংলা কবিতায় সিরিজ কবিতার লেখক খুব বেশি নয় যদিও। একটি বিশেষ থিমকে কেন্দ্র করে এ কবির এটা দ্বিতীয় সিরিজ। এর আগে তার অষ্টম গ্রন্থের স্বীকৃতি পাওয়া লজিং মাস্টার সিরিজটাও তার কবিতার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে বিশেষভাবে সক্ষম হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবি এখানে ৭৭ বার ‘সাবলেট’ শব্দটি ব্যবহার করে সেটিকে পাঠকের মগজের কোষে কোষে চারিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। সিদ্ধার্থ হকের পর্যবেক্ষণ খুব চমৎকার- সেই পর্যবেক্ষণকে তিনি যখন বস্তুতে আরোপ করেন- তার একটা ডাইমেনশন তৈরি হয়- এতে তৃপ্তি না পেয়ে তিনি তাতে ভিন্ন আরোপণের মাধ্যমে তৈরি করেন নতুনতর ডাইমেশন- এক পর্যায়ে সেসব মিলে এটাকে নিয়ে যায় এবসার্ডিটির দিকে। সেই এবসার্ডিটি সব সময় প্রশংসা কুড়োতে সক্ষম হয়- এমন বলা চলে না। কখনো কখনো অতিকথনও পেয়ে বসে কবিকে। একটা স্পাইরাল জার্নির ভেতর দিয়ে কবি যেন পৌঁছতে চাইছেন কোথাও- সঙ্গে নিয়ে চলেছেন তার পাঠকদেরও। তার অনেক কবিতার ভেতর এমন সব বিস্ময়কর পঙ্ক্তির মুখোমুখি আমরা হই- কিছুক্ষণ স্তব্ধতার স্পন্দন শুনতে পাই যেন সেসব পঙ্ক্তি পাঠের পর। কখনো ধ্যানমগ্নতার ভেতর, কখনোবা এক অনন্ত ঘোরের ভেতর যেন তিনি শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে চলেন, বহির্জগৎ সম্পর্কে সম্পূর্ণতাই উদাসীন হয়ে কিন্তু বস্তুজগতের নানা অসামঞ্জস্য, সামাজিক নানা উত্থান-পতন, সম্পর্কের নিবিড় গহনতা, টানাপোড়েন, দৈনন্দিত অনটন, ভিখিরির চিৎকার, ব্যথিত-বেদনায় অভিব্যক্তি- কোনোটাই তার ইন্দ্রিয়গুলোকে এড়াতে পারে না। তিনি দেখেন, পড়েন, পঠনাভিজ্ঞতাকে আত্মরসে সারিত করে অনুভববেদ্য অনিবার্য শব্দসমষ্টিকে জাগিয়ে নিজের রচনায় নির্মাণ করেন একের পর এক প্রতিমা। চিত্র, চিত্রকল্প, দৃশ্য, দৃশ্যকল্প- জীবনের ভাঙামুখ- সব এক মিছিল যেন, জীবন্ত কোনো কোনো পঙ্ক্তি বা বাক্যও হয়ে ওঠে এপিগ্রাম। যে কবির মনে হয়, ‘শীত এক শরণার্থী; গ্রামের স্মৃতির মতো নিচু কিংবা অনেক ওপর থেকে পৃথিবীকে বিষণ্ন দেখায়। বা চেতনাও গলে যাবে বাতাসে মাটিতে, রৌদ্রে ব্রহ্মাণ্ডের গাঢ় অন্ধকারে’- তিনি কিন্তু পাঠক-প্রত্যাশা ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেন। তার এ যাত্রাপথ দীর্ঘ হোক- পাঠক তার কবিতায় নতুনতর কিছুর সন্ধান পাক সেই প্রত্যাশা আমরা রাখতেই পারি।

এই কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতার শেষ চারটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে এ আলোচনার সমাপ্তি টানতে চাই-

এ নগরে থাকতে হলে কুয়ার ভিতরে নামতে হয়। অস্তিত্ব বিলিয়ে দিতে হয় অন্ধকারে;

পথে, পিচে, মিশে যেতে হয়;

বারবার, বারবার, হাসপাতালের মতো মিথ্যা বলতে হয়।

(সাবলেট ৩৩)

এসব নির্মম সত্যোপলব্ধি আর তার বয়ান ছাড়া, সত্যি বলা ছাড়া কবির আর কী কাজ? সত্যের হাত আঁকড়ে থাকা ছাড়া কবির তো আর তেমন কোনো আশ্রয় নেই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন