হুমায়ূন সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ
jugantor
হুমায়ূন সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

  নাসের মাহমুদ  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গৌরবময় অধ্যায়। এ যুদ্ধ শহুরে কি গ্রামে, নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ধনী কি গরিব, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে স্পর্শ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে লেখক হুমায়ূন আহমেদ পিতাকে হারিয়েছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধ তার ব্যক্তিগত স্মৃতিতেও গভীর দাগ কেটেছে। একাত্তরের সময়কে উপন্যাসের পটভূমিকায় প্রক্ষেপণে তার নিজেস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তিবিশ্লেষণ স্বাতন্ত্র্যবোধের পরিচয় দেয়। ইতিহাসের মূলধারাকে অক্ষুণ্ন রেখেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকে গল্পের কাঠামোয় এনেছেন একান্ত নিজস্ব কৌশলে। তিনি একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগে ভরা পারিবারিক কিংবা গ্রাম্য আটপৌরে জীবনে হঠাৎ আসা মৃত্যুভয়, মিলিটারি আতঙ্কের ছবি এঁকেছেন নিজের তুলিতে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্যানভাসে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের। তবে সারসংক্ষেপে তা বায়ান্নর ভাষা অন্দোলন থেকে একাত্তরের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত গণ্য করা যেতে পারে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে মুক্তিযুদ্ধের বীজ অঙ্কুরোদ্গমকাল ভাষা আনন্দোলন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে সরাসরি না এলেও বাংলাভাষার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বিকৃত আচরণের উদাহরণ পাওয়া যায় ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাসটিতে। আবার রেডিও টিভিতে মুসলমানদের লেখা রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য কোনো রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ এ ঘোষণার গল্প শুনিয়ে পূর্ব বাংলার গভর্নর মোনায়েম খানের আহাম্মকিতা ও হিন্দু বিদ্বেষ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আনন্দমোহন কলেজের প্রিন্সিপাল নিয়োগের ঘটনার বর্ণনায় মোনায়েম খানকে বলতে শুনি ডিম হিন্দুয়ানি আর আন্ডা মুসলমানি শব্দ। উপন্যাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ব্যবহার করেছেন কাহিনির বিকাশ অক্ষুণ্ন রেখে। ঐতিহাসিক ঘটনার তারিখের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ফরিদ চরিত্রটির বিয়ে দিলেন ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে। একই তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেলগেটে গ্রেফতার করা হয়। এ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হাবিব উকিল, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের দূর সর্ম্পকের ভাই। হাবিব রাতের শেষ খবরে জানলেন, ‘দু’জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ... দেশ ধ্বংস ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক-শেখ মুজিবুর রহমান’। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক অপরিহার্য উপাদানগুলো পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করলেও তাতে গল্পের মূল স্রোত কখনো বাধাগ্রস্ত হয়নি, আবার ইতিহাসেরও ব্যত্যয় ঘটাননি। এখানেই হুমায়ূন আহমেদের অনন্যতা। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্দকরণসহ গণআন্দোলনে মওলানা ভাসানীর অবদান শামসুর রাহমানের শফেদ পাঞ্জাবী কবিতার সুনিপুণ ব্যবহারে স্পষ্ট করে তুলেছেন হুমায়ূন আহমেদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যেমন ইহুদি হত্যাযজ্ঞে মেতে ছিল পাকিস্তানিরা তেমনই সংখ্যালঘু নির্যাতনে উঠে পড়ে লেগে ছিল। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত নারায়ণ চক্রবর্তীর মেয়ে সীতা অপহরণের খবর এবং লিভ ভ্যাকেন্সিতে লেকচারার পদে থাকা দু’জন মুসলমান ও একজন হিন্দুর মাঝে একাডেমিক কেরিয়ার ভালো থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ কান্তি দে’র চাকরি চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পাকিস্তানি আমলে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। যারা হুমায়ূন আহমেদের লেখায় সমাজের গভীরতর চিত্র খুঁজে পান না তারা ‘মাতাল হাওয়া’ পড়ে দেখতে পারেন। তবে এ কথা ঠিক তার মতো অন্তর্ভেদী লেখকের কাছে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন নিয়ে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে উপন্যাস আশা করা যেত। ইতিহাসের চেয়ে গল্প বলায় বেশি আগ্রহ ও ক্যান্সার তাকে সময় না দেওয়াই বোধ করি এই না পাওয়ার বড় কারণ। তবে ১৯৭১-এর সময়-কাল নিয়ে তাকে বেশ কিছু উপন্যাস, গল্প লিখতে দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে বড় আঙ্গিকে লেখা তার সেরা কাজ বলা হয় ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। সরাসরি রণক্ষেত্রের বর্ণনাধর্মী লেখা তার গল্পে কমই এসেছে। বেশি এসেছে যুদ্ধ চলাকালীন বাঙালির প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধের স্পষ্ট ছবি ধরা দিয়েছে তার ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘আগুনের পরশমনি’তে। সেখানেও সরাসরি যুদ্ধের ক্রীড়াশৈলী অপেক্ষা আক্রমণের প্রস্তুতি, পরবর্তী ফলাফল, স্মৃতিচারণ এবং জনগণের জীবনাচরণে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। রাজাকার এসেছে, গল্পের প্রয়োজনে তাদের নিষ্ঠুরতা, লুটপাট এলেও তাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেয়ে বেশি কুশলী ছিলেন পাকিস্তানি আর্মি অফিসারদের হিংস তার বর্ণনায়। ‘আগুনের পরশমনি’তে নিষ্ঠুরতায় মেজর রাকিবকে যতটা আত্মবিশ্বাসী দেখিয়েছেন, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আশফাকে তার চেয়েও বেশি ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করে এঁকেছেন। কথা আদায়ে পারদর্শী মেজর রাকিব কথার জাদু ও উগ্র অহমিকায় দু’ধাপে আশফাকের চারটি আঙুল ভাঙার পরও একটি কথাও বের করতে না পারার ব্যর্থতায় শেষে গুলি করে গেরিলা আশফাককে হত্যা করে। একাত্তরে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হার না মানা অদম্য মনোবল এত দক্ষতার সঙ্গে, এত সূক্ষ্মতায়, নির্মেদ বর্ণনায় উপস্থাপন করা সত্যি অপূর্ব। আবার ১৯৭১ গল্পের সুদর্শন ও বেপরোয়া মেজর এজাজের সঙ্গে মিলিটারি দলের গাইডের ছদ্দবেশী মুক্তিযোদ্ধা রফিকের বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে রফিকের সাহসিকতা ও বীরত্বের যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। ১৯৭১ উপন্যাসের সূচনা একটি নিস্তরঙ্গ গ্রামে আকস্মিক মিলিটারির আগমনের মধ্য দিয়ে। ছোট গন্ডগ্রামের সাবলীল শাস্তিময় পরিবেশ হঠাৎ অশাস্ত হয়ে ওঠে। গ্রামের পাশের বনে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের সূত্র ধরেই শুরু হয় মিলিটারির অত্যাচার। গ্রামীণ পটভূমিকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় ১৯৭১ এবং শ্যামল ছায়ায়। অন্যদিকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের উৎণ্ঠিত, আতঙ্কিত মানুষের মনস্তাত্তিক প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা হয়েছে সৌরভ, সুর্যের দিন ও আগুনের পরশমনি উপন্যাসে। আবার গ্রাম শহর ছাপিয়ে সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরের একাত্তরের চিত্র ইতিহাসের হাত ধরে তুলে ধরেছেন তার সেরা কাজ ‘জোছনা ও জননীর গল্পে’। একাত্তরের কালক্রমের বিন্যাস পর্যালোচনায় দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্ব স্পষ্টভাবে এসেছে ‘সুর্যের দিন’ উপন্যাসে। উপন্যাসটির গল্পের সময়কাল ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ থেকে একাত্তরের জুন অবধি বিস্তৃত। অষ্টমশ্রেণি পড়ুয়া কিশোর খোকনের জবানীতে লেখা হলেও বড় চাচা, ছোট চাচা, খোকনের বাবা, হেডস্যারসহ পরিণত মানুষের একাত্তরকালীন মিটিং, মিছিল, গুলি, টিয়ারগ্যাস, নিখোঁজ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসের মূল বিষয়। কিশোরের কণ্ঠে গল্প বলালেও এটি কিশোর উপন্যাস না বরং এটি কিশোরের সহজ চোখে বড়দের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। উপন্যাসে কিশোর সাজ্জাদ যেমন মার্চের উত্তাল দিনে মিছিলে, ৭ মার্চের ভাষণের রেসকোর্সের ময়দানে যায়, তেমনি মিছিলে, রেসকোর্সের ময়দানে দেখা মিলে খোকনের গণিত শিক্ষক, হেডস্যার এমনকি দাদুমনির। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের রেসকোর্স ময়দানের যথার্থ বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন ‘... দেখতে দেখতে রেসকোর্সের ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হলো। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী সবাই অপেক্ষা করছে। বাবার কাঁধে চেপে এসেছে শিশুরা। অবাক হয়ে তারা দেখছে এ বিশাল মানুষের সমুদ্রকে’। মার্চের শুরু থেকেই মিছিলে গুলি, কার্ফুয়ের আড়ালে বাঙালি নিধন/নিখোঁজ হওয়া ইত্যাদি পাকিস্তানি মিলিটারির নিত্যনৈমিত্তিক কার‌্যাবলি দিয়ে গল্পের ডালি সুন্দর করে সাজিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বয়স বাড়ে, বাড়ে অভিজ্ঞতা। কিন্তু দুঃসময়ে বয়সের তুলনায় অভিজ্ঞতা বাড়ে অনেক দ্রুত। ফলে দুলাভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিস্থিতির চাপে সাজ্জাদ দ্রুত বেড়ে ওঠে। ঠিক তেমনি মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সঞ্চয় করেছে ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্মমতার এক শতাব্দীর অভিজ্ঞতা। কাহিনির ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ কালরাতের চিত্র এসেছে। হুমায়ূন আহমেদের স্বাতন্ত্র্য চিরায়ত স্বল্প বাক্যে কালরাতের বর্ণনা গভীর, নিখুঁত ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘পঁচিশে মার্চের রাতে হৃদয়হীন একদল পাকিস্তানি মিলিটারি এ শহর দখল করে নিল।...এক রাতে এ শহর মৃতের শহর হয়ে গেল। অসংখ্য বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরে গেল না। অসংখ্য শিশু জানল না বড় হয়ে ওঠা কাকে বলে। অত্যাচারে জর্জরিত মানুষ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাঁচার তাগিদে রুখে দাঁড়ায়, প্রতিরোধ গড়ে সামনে এগিয়ে যায়। উপন্যাসের শেষের দিকে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনি দিয়ে রুখে দাঁড়াল বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক, পুলিশ। এরা মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। কাহিনির সময় পরিক্রমায় জুন মাসে এসে কিশোর খোকন ও সাজ্জাদ একটি সূর্যের দিন আনবে বলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি। স্বর্ণকার যেমন মানুষের নিঃস্ব হওয়ার গল্প জমিয়ে রাখে, হুমায়ূন আহমেদ তেমনি মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বেদনা, দুঃখ-কষ্ট অপমান, বীরত্ব ও মানবিকতার গল্প ছড়িয়ে দিয়েছেন ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসে।

হুমায়ূন সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ

 নাসের মাহমুদ 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গৌরবময় অধ্যায়। এ যুদ্ধ শহুরে কি গ্রামে, নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ধনী কি গরিব, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সবাইকে স্পর্শ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে লেখক হুমায়ূন আহমেদ পিতাকে হারিয়েছেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধ তার ব্যক্তিগত স্মৃতিতেও গভীর দাগ কেটেছে। একাত্তরের সময়কে উপন্যাসের পটভূমিকায় প্রক্ষেপণে তার নিজেস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তিবিশ্লেষণ স্বাতন্ত্র্যবোধের পরিচয় দেয়। ইতিহাসের মূলধারাকে অক্ষুণ্ন রেখেই তিনি মুক্তিযুদ্ধকে গল্পের কাঠামোয় এনেছেন একান্ত নিজস্ব কৌশলে। তিনি একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগে ভরা পারিবারিক কিংবা গ্রাম্য আটপৌরে জীবনে হঠাৎ আসা মৃত্যুভয়, মিলিটারি আতঙ্কের ছবি এঁকেছেন নিজের তুলিতে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ক্যানভাসে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সুদীর্ঘ কালের। তবে সারসংক্ষেপে তা বায়ান্নর ভাষা অন্দোলন থেকে একাত্তরের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত গণ্য করা যেতে পারে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে মুক্তিযুদ্ধের বীজ অঙ্কুরোদ্গমকাল ভাষা আনন্দোলন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে সরাসরি না এলেও বাংলাভাষার প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের বিকৃত আচরণের উদাহরণ পাওয়া যায় ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাসটিতে। আবার রেডিও টিভিতে মুসলমানদের লেখা রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া অন্য কোনো রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ এ ঘোষণার গল্প শুনিয়ে পূর্ব বাংলার গভর্নর মোনায়েম খানের আহাম্মকিতা ও হিন্দু বিদ্বেষ স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। আনন্দমোহন কলেজের প্রিন্সিপাল নিয়োগের ঘটনার বর্ণনায় মোনায়েম খানকে বলতে শুনি ডিম হিন্দুয়ানি আর আন্ডা মুসলমানি শব্দ। উপন্যাসে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে ব্যবহার করেছেন কাহিনির বিকাশ অক্ষুণ্ন রেখে। ঐতিহাসিক ঘটনার তারিখের সঙ্গে সামাঞ্জস্য রেখে ফরিদ চরিত্রটির বিয়ে দিলেন ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৮ সালে। একই তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেলগেটে গ্রেফতার করা হয়। এ উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হাবিব উকিল, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের দূর সর্ম্পকের ভাই। হাবিব রাতের শেষ খবরে জানলেন, ‘দু’জন সিএসপি অফিসারসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ... দেশ ধ্বংস ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক-শেখ মুজিবুর রহমান’। বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ঐতিহাসিক অপরিহার্য উপাদানগুলো পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করলেও তাতে গল্পের মূল স্রোত কখনো বাধাগ্রস্ত হয়নি, আবার ইতিহাসেরও ব্যত্যয় ঘটাননি। এখানেই হুমায়ূন আহমেদের অনন্যতা। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্দকরণসহ গণআন্দোলনে মওলানা ভাসানীর অবদান শামসুর রাহমানের শফেদ পাঞ্জাবী কবিতার সুনিপুণ ব্যবহারে স্পষ্ট করে তুলেছেন হুমায়ূন আহমেদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার যেমন ইহুদি হত্যাযজ্ঞে মেতে ছিল পাকিস্তানিরা তেমনই সংখ্যালঘু নির্যাতনে উঠে পড়ে লেগে ছিল। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত নারায়ণ চক্রবর্তীর মেয়ে সীতা অপহরণের খবর এবং লিভ ভ্যাকেন্সিতে লেকচারার পদে থাকা দু’জন মুসলমান ও একজন হিন্দুর মাঝে একাডেমিক কেরিয়ার ভালো থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ কান্তি দে’র চাকরি চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি পাকিস্তানি আমলে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। যারা হুমায়ূন আহমেদের লেখায় সমাজের গভীরতর চিত্র খুঁজে পান না তারা ‘মাতাল হাওয়া’ পড়ে দেখতে পারেন। তবে এ কথা ঠিক তার মতো অন্তর্ভেদী লেখকের কাছে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা কমিশন আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন নিয়ে আরও বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে উপন্যাস আশা করা যেত। ইতিহাসের চেয়ে গল্প বলায় বেশি আগ্রহ ও ক্যান্সার তাকে সময় না দেওয়াই বোধ করি এই না পাওয়ার বড় কারণ। তবে ১৯৭১-এর সময়-কাল নিয়ে তাকে বেশ কিছু উপন্যাস, গল্প লিখতে দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি নিয়ে বড় আঙ্গিকে লেখা তার সেরা কাজ বলা হয় ‘জোছনা ও জননীর গল্প’। সরাসরি রণক্ষেত্রের বর্ণনাধর্মী লেখা তার গল্পে কমই এসেছে। বেশি এসেছে যুদ্ধ চলাকালীন বাঙালির প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধের স্পষ্ট ছবি ধরা দিয়েছে তার ‘শ্যামল ছায়া’ ও ‘আগুনের পরশমনি’তে। সেখানেও সরাসরি যুদ্ধের ক্রীড়াশৈলী অপেক্ষা আক্রমণের প্রস্তুতি, পরবর্তী ফলাফল, স্মৃতিচারণ এবং জনগণের জীবনাচরণে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। রাজাকার এসেছে, গল্পের প্রয়োজনে তাদের নিষ্ঠুরতা, লুটপাট এলেও তাদের প্রাধান্য দেওয়ার চেয়ে বেশি কুশলী ছিলেন পাকিস্তানি আর্মি অফিসারদের হিংস তার বর্ণনায়। ‘আগুনের পরশমনি’তে নিষ্ঠুরতায় মেজর রাকিবকে যতটা আত্মবিশ্বাসী দেখিয়েছেন, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আশফাকে তার চেয়েও বেশি ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করে এঁকেছেন। কথা আদায়ে পারদর্শী মেজর রাকিব কথার জাদু ও উগ্র অহমিকায় দু’ধাপে আশফাকের চারটি আঙুল ভাঙার পরও একটি কথাও বের করতে না পারার ব্যর্থতায় শেষে গুলি করে গেরিলা আশফাককে হত্যা করে। একাত্তরে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হার না মানা অদম্য মনোবল এত দক্ষতার সঙ্গে, এত সূক্ষ্মতায়, নির্মেদ বর্ণনায় উপস্থাপন করা সত্যি অপূর্ব। আবার ১৯৭১ গল্পের সুদর্শন ও বেপরোয়া মেজর এজাজের সঙ্গে মিলিটারি দলের গাইডের ছদ্দবেশী মুক্তিযোদ্ধা রফিকের বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথনের মধ্য দিয়ে রফিকের সাহসিকতা ও বীরত্বের যে প্রকাশ ঘটিয়েছেন তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। ১৯৭১ উপন্যাসের সূচনা একটি নিস্তরঙ্গ গ্রামে আকস্মিক মিলিটারির আগমনের মধ্য দিয়ে। ছোট গন্ডগ্রামের সাবলীল শাস্তিময় পরিবেশ হঠাৎ অশাস্ত হয়ে ওঠে। গ্রামের পাশের বনে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানের সূত্র ধরেই শুরু হয় মিলিটারির অত্যাচার। গ্রামীণ পটভূমিকায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় ১৯৭১ এবং শ্যামল ছায়ায়। অন্যদিকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ঢাকা শহরের উৎণ্ঠিত, আতঙ্কিত মানুষের মনস্তাত্তিক প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলা হয়েছে সৌরভ, সুর্যের দিন ও আগুনের পরশমনি উপন্যাসে। আবার গ্রাম শহর ছাপিয়ে সীমানা পেরিয়ে শরণার্থী শিবিরের একাত্তরের চিত্র ইতিহাসের হাত ধরে তুলে ধরেছেন তার সেরা কাজ ‘জোছনা ও জননীর গল্পে’। একাত্তরের কালক্রমের বিন্যাস পর্যালোচনায় দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্ব স্পষ্টভাবে এসেছে ‘সুর্যের দিন’ উপন্যাসে। উপন্যাসটির গল্পের সময়কাল ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ থেকে একাত্তরের জুন অবধি বিস্তৃত। অষ্টমশ্রেণি পড়ুয়া কিশোর খোকনের জবানীতে লেখা হলেও বড় চাচা, ছোট চাচা, খোকনের বাবা, হেডস্যারসহ পরিণত মানুষের একাত্তরকালীন মিটিং, মিছিল, গুলি, টিয়ারগ্যাস, নিখোঁজ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসের মূল বিষয়। কিশোরের কণ্ঠে গল্প বলালেও এটি কিশোর উপন্যাস না বরং এটি কিশোরের সহজ চোখে বড়দের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। উপন্যাসে কিশোর সাজ্জাদ যেমন মার্চের উত্তাল দিনে মিছিলে, ৭ মার্চের ভাষণের রেসকোর্সের ময়দানে যায়, তেমনি মিছিলে, রেসকোর্সের ময়দানে দেখা মিলে খোকনের গণিত শিক্ষক, হেডস্যার এমনকি দাদুমনির। বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণের রেসকোর্স ময়দানের যথার্থ বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন ‘... দেখতে দেখতে রেসকোর্সের ময়দান জনসমুদ্রে পরিণত হলো। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী সবাই অপেক্ষা করছে। বাবার কাঁধে চেপে এসেছে শিশুরা। অবাক হয়ে তারা দেখছে এ বিশাল মানুষের সমুদ্রকে’। মার্চের শুরু থেকেই মিছিলে গুলি, কার্ফুয়ের আড়ালে বাঙালি নিধন/নিখোঁজ হওয়া ইত্যাদি পাকিস্তানি মিলিটারির নিত্যনৈমিত্তিক কার‌্যাবলি দিয়ে গল্পের ডালি সুন্দর করে সাজিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে বয়স বাড়ে, বাড়ে অভিজ্ঞতা। কিন্তু দুঃসময়ে বয়সের তুলনায় অভিজ্ঞতা বাড়ে অনেক দ্রুত। ফলে দুলাভাইয়ের নিখোঁজ হওয়ার পর পরিস্থিতির চাপে সাজ্জাদ দ্রুত বেড়ে ওঠে। ঠিক তেমনি মাত্র নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি সঞ্চয় করেছে ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্মমতার এক শতাব্দীর অভিজ্ঞতা। কাহিনির ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ কালরাতের চিত্র এসেছে। হুমায়ূন আহমেদের স্বাতন্ত্র্য চিরায়ত স্বল্প বাক্যে কালরাতের বর্ণনা গভীর, নিখুঁত ও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘পঁচিশে মার্চের রাতে হৃদয়হীন একদল পাকিস্তানি মিলিটারি এ শহর দখল করে নিল।...এক রাতে এ শহর মৃতের শহর হয়ে গেল। অসংখ্য বাবারা তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে ফিরে গেল না। অসংখ্য শিশু জানল না বড় হয়ে ওঠা কাকে বলে। অত্যাচারে জর্জরিত মানুষ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বাঁচার তাগিদে রুখে দাঁড়ায়, প্রতিরোধ গড়ে সামনে এগিয়ে যায়। উপন্যাসের শেষের দিকে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনি দিয়ে রুখে দাঁড়াল বাঙালি কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক, পুলিশ। এরা মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। কাহিনির সময় পরিক্রমায় জুন মাসে এসে কিশোর খোকন ও সাজ্জাদ একটি সূর্যের দিন আনবে বলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের সমাপ্তি। স্বর্ণকার যেমন মানুষের নিঃস্ব হওয়ার গল্প জমিয়ে রাখে, হুমায়ূন আহমেদ তেমনি মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বেদনা, দুঃখ-কষ্ট অপমান, বীরত্ব ও মানবিকতার গল্প ছড়িয়ে দিয়েছেন ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন