সাহিত্যের উর্বর ভূমি ময়মনসিংহ
jugantor
সাহিত্যের উর্বর ভূমি ময়মনসিংহ

  আসাদ উল্লাহ  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু বাংলাদেশ নয়। অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রাচীনতম জেলাগুলোর একটি ময়মনসিংহ। ১৭৮৭ সালের ১ মে স্থাপিত হয় ময়মনসিংহ জেলা। রাজনীতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ এ জেলার রয়েছে নানা অনুষঙ্গের গৌরব। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তো বলাই যায় ময়মনসিংহ উবর্র ভূমি। রবিঠাকুর থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের বরণীয় বহু লেখকের চরণ ছোঁয়ায় অভিষিক্ত এ জেলা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের তারুণ্যের দিনগুলোর অংশত কেটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। তার লেখা ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের পটভূমিও ত্রিশাল। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ তো বিশ্বসাহিত্যেরই উজ্জ্বল নাম। এ অঞ্চলের লোকায়ত কাহিনি নিয়েই ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি দেশের লোকসাহিত্যের ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা নিঃসন্দেহে উচ্চ মর্যাদার দাবি রাখে। কারণ, বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ছাড়া অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে অনেকাংশেই দুর্বোধ্য। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা এতটা দুর্বোধ্য নয়। সহজেই দেশের যে কোনো অঞ্চলের মানুষের মন-মননকে স্পর্শ করতে পারে এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা। নাটক, সিনেমায় হালে দেখা যায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক ব্যবহার। বিশেষ করে বিভিন্ন ইল্যাকট্রনিক মিডিয়ায় (টিভি চ্যানেল) প্রচারিত নাটকগুলোর মধ্যে যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার হয় তার অধিকাংশগুলোতেই ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যারা এ ভাষাটি ব্যবহার করছে তাদের মূলত এ অঞ্চলের ভাষা সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি শূন্যের কোঠায়। ফলে যথাযথ উচ্চারণের ঘাটতিতে পরে নষ্ট বা বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা।

আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে রচিত ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের রয়েছে নানা শাখা। যেমন-জারি সারি, বাউলগান, কবিগান, ঘাটুগান, পুঁথি, মেয়েলি গীত, পালাগান, কিচ্ছা, প্রবাদ ইত্যাদি।

আঠারো শতকের পর আধুনিক সাহিত্যের প্রভাবজাত ঢেউ আছড়ে পড়ে ময়মনসিংহেও। সাহিত্যে শুরু হয় বাঁক বদল। এ বাঁক বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকসাহিত্যের ধারাটিও ঔজ্জ্বল্য বজায় রেখে ময়মনসিংহের গ্রামজনপদকে স্পন্দিত রাখে। এ স্পন্দন অব্যাহত থাকে স্বাধীনতা পরবর্তী আশির দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত। ক্রমে ক্রমে নগর সভ্যতা আর নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির হাওয়ায় উদ্ভাসিত হয় গ্রাম, আর হারিয়ে যেতে থাকে লোকসংস্কৃতির নির্মল আনন্দ। এক পর্যায়ে ম্রিয়মাণ হয়ে যায় এ লোকসংস্কৃতি-কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা লোকসাহিত্যের গৌরবময় পদযাত্রা। মৈমনসিংহ গীতিকার সাহিত্যই প্রমাণ দেয় এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ ছিল। এর ভাষা আটপৌরে হলেও নিঃসন্দেহে সর্বজনবিদিত।

একটি উদাহরণে এর সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে-

‘লজ্জা নাই নির্লজ্জ ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর।

গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর॥’

‘কোথায় পাব কলসী কন্যা কোথায় পাব দড়ি

তুমি হও গহীন গাং আমি ডুব্যা মরি॥’ (মহুয়া)

আধুনিক সাহিত্যের প্রভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চল বিশেষ প্রভাবিত হয়। এ অঞ্চলে অর্থাৎ মফস্বলে বসবাস করে সাহিত্যচর্চা করলেও অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে হয়েছেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। যেমন-আমরা মুশাররাফ করিমের কথা বলতে পারি। ১৯৪৬ সালের ৯ জানুয়ারি তার জন্ম। ঢাকাতে কিছু কাল জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অবস্থান করলেও পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ শহরেরই ছিল তার বসবাস। এ কবি কাব্য পথে ছিলেন শতভাগ নিবেদিত। লিখেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মুশাররাফ করিম। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশটির মতো রয়েছে কাব্যগ্রন্থ। তার আগে এ জেলার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন-আবুল মনসুর আহমেদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীনসহ অনেকেই। আবুল মনসুর স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য ফুড কনফারেন্স, আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর, শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু, বেশি দামে কেনা কমদামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা, আয়না ইত্যাদি অন্যতম। আবুল কালাম শামসুদ্দীনও বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে-পলাশী থেকে পাকিস্তান, অতীত দিনের স্মৃতি ইত্যাদি অন্যতম। আলোচিত সমালোচিত লেখক তসলিমা নাসরীনের বাড়িও এ ময়মনসিংহ জেলায়। দেশের বরেণ্য অনেক লেখক ঢাকায় বসবাস করছেন। তবে তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। যেমন-কথাসাহিত্যিত ও নাট্যকার শহীদ আখন্দ, ঔপন্যাসিক মোজাম্মেল হক নিয়োগী, ইউসুফ শরীফ, ফাইজুস সালেহীন, নাসরীন জাহান, কবি মনিরুস সালেহীন, ছড়াকার ও গল্পকার পারভীন সুলতানা, বিজ্ঞান লেখক সরকার হুমায়ুন, সৌরভ জাহাঙ্গীর, পারভেজ আহসান, মামুন মোয়াজ্জেম, নাসের মাহমুদ, রেজাউল করিম রনি, রুহুল মাহফুজ জয়, সারাজাত সৌম, বিজয় আহমেদ, গৌতম কৈরী, সাদাফ আমিন প্রমুখ। ইউসুফ শরীফের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম গল্পগ্রন্থ-চেনাঅচেনার মাঝখানের মানুষ, নির্বাচিত গল্প ও উপন্যাস ধ্বনির বিস্ফোরণ। ফাইজুস সালেহীনের গল্পগ্রন্থ-সাঁতার, সাঁকোর পরে সবুজ গ্রাম অন্যতম। নাসরীন জাহানের অন্যতম গ্রন্থ-øায়ু দিয়ে চেনা, উড়ুক্কু, কবচকুন্ডল, কাঠপেঁচা, যখন চারপাশের বাতিগুলো নিভে আসছে। মনিরুস সালেহীনের-খেলে যায় রৌদ্রছাড়া, যেতে পথে অন্যতম।

ময়মনসিংহের সংগঠন ও লিখিয়ে

ময়মনসিংহ জেলায় রয়েছে বেশ কিছু সক্রিয় সাহিত্য সংগঠন ও নবীন প্রবীণ লিখিয়ে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাহিত্য পরিষদ, ছড়া সংসদ, মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদ, অনুশীলন সাহিত্য সংসদ, তারাকান্দা, ত্রিশাল সাহিত্য সংসদ অন্যতম। রয়েছে সাহিত্যের আড্ডাস্থল ও পাঠচক্র। নবীন প্রবীণ লিখিয়েদের মধ্যে অনেকেই বেশ সক্রিয়। তারা সার্বক্ষণিক লেখার নেশায় মেতে থাকেন। এসব লিখিয়েদের মধ্যে ফরিদ আহমদ দুলাল, ছালিম হাসান, নজরুল হায়াত, আওলাদ হোসেন, শহীদ আল মামুন, সালাউদ্দিন পাঠান, মোহাম্মদ আজাদ, স্বপন ধর, আবু সাইদ কামাল, তাছাদ্দুক হোসেন, মুহম্মদ ফারুক, ডা. তারা গোলন্দাজ, মোঃ রফিকুল ইসলাম, এস. কে. অপু, মঈন হুদা, আলম মাহবুব, আব্দুর রশীদ আকন্দ, সাব্বির রেজা, নাজমা মমতাজ, যুগল দাশ, আনোয়ারা সুলতানা, আমজাদ দোলন, মর্জিয়া বেগম, রাজিয়া সুলতানা, শেখ সুজন আলী, সরকার আজিজ, ইয়াজদানী কোরাইশী কাজল, এফ আর কামাল, আশরাফ রোকন, আলী ইউসুফ, ডা. সাইমন চৌধুরী, সোহেল মজহার, এহসান হাবীব, অরূপ কিষাণ, শরৎ সেলিম, আল মাকসুদ, স্বাধীন চৌধুরী, মোস্তাফিজুর বাসার ভাষাণী, শেখ বুলবুল আহমেদ, ওয়ালিউল্লাহ আকন্দ, আইয়ুব আলী (গীতিকার), মোহাম্মদ আনোয়ার, মরিয়ম বেগম, জেবুন নেছা রীনা, চান মিয়া ফকির, মাহমুদ বাবু, আশিক আকবর, শহিদ আমিনী রুমী, শাহিদা হোসেন রিনা, মুশতাক বিবাগী, মিজানুর রহমান টিটু, তপন বর্মণ, কামাল মাহমুদ, কাঙাল শাহীন, রিয়েল আবদুল্লাহ, কাব্য সুমী সরকার, মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম, সারোয়ার জাহান, জসীম উদ্দীন মুহাম্মদ, জহির খান, কাজী নাসির মামুন, সেলিনা রশিদ, আব্দুর রশিদ, বিল্লাহ মাহমুদ মানিক, আমজাদ শ্রাবণ, শরীফা সুলতানা, কবি আলম মাহবুব, রাহমান হাবিব, জান্নাতুন নাহার নূপুর, জামাল জাফরি, শফিউল্লাহ আনসারী, সোহেল রানা, সনৎ ঘোষ, অনন্য কামরুল, অরন্য ই চিরান, কামরান পারভেজ, চয়ন বিকাশ ভদ্র, তাহমিনা রহমান, নাজমুল আলম চৌধুরী, পান্না আকন্দ, সরকার হুমায়ুন, হাসান জামিল, ফজলুল হক পরাগ, খুরশিদ মল্লিক, মাসুমা টকি, আলমাস হোসাইন সাজা, রাশিদ আহমেদ নিসর্গ, জাহান য়ারা রানী, মোঃ লোকমান হোসেন, আবুল বাশার শেখ, অনন্য রাজ্জাক, শামীমা আক্তার, সুমী, আনোয়ার সুফিয়ান, ফাহিম ফারুক, মোঃ শরিফুল ইসলাম তালুকদার, মোঃ মোফাজ্জল হোসেন অনু, ত্বকী আফসারী, আফসানা আক্তার, জুলহাস উদ্দিন আকন্দ, আরাফাত রিলকে, ফাতেমা হক শিখা, সৌরভ দত্ত দিপু, শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ, আফজাল হোসেন, জালাল উদ্দিন আহম্মেদ, রুকুনুজ্জামান, শিরিনা আক্তার, হানিফ রুবেল, অনন ফয়সাল, আবদুস সাত্তার, নিতাই চন্দ্র রায়, জুয়েল মুর্শেদ, মাহফুজা গোলন্দাজ, সালমা ইসলাম, মোঃ ইয়াসিন আলী, সেকান্দর আলী ওসমানী, এস এম মাসুদ রানা, মোঃ আরিফ হাসান, রওশন আরা খান, সপ্তবর্না পাল সোমা, এমএসবি নাজনীন লাকী, পারভেজ শিহাব, সাদিয়া ফয়জুন, মোমেন এইচ, এরশাদ আলী আসাদ, শরীফুল ইসলাম সরকার, মুরাদ দস্তগীর, ওয়ালিউল ইসলাম, অনন্য সাঈদ, হাবিবুর রহমান হাবিব, রায়হান শহিদ, সজীব আহমেদ, আক্তারুজ্জামান শাহ, ফ্লোরেন্স মালা ডায়াস, খাইরুল ইসলাম হিরক, সরকার হুমায়ুন, অনন্য কামরুল, তাহমিনা রহমান, মোবারক মুর্শেদ মিল্কী, বারী সুমন, জান্নাতুন নাহার নুপুর, শামসুল হক, আহম্মদ সাহাবউদ্দিন, শামীম আশরাফ, ফয়সাল আহমেদ, সিরাজ উদ্দিন, জহিরুল ইসলাম, কাজী রাসেল, নম্ফোন্দ্র দিলাওয়ার উল্লেখযোগ্য।

ময়মনসিংহের প্রবাদ প্রবচন

১. পরের ঘরের পিডা দাতে লাগে মিডা

২. হাওর জঙ্গল মইষের শিং, এই তিনে মৈমনসিং

৩. এক পয়সার ঋণের লাইগ্যা চান্দেরে খাইল

৪. এমন জায়গায় বওন নাই কেউ কয় উঠ

এমন কথা কওন নাই কেউ কয় ঝুট

৫. নাইড়্যা মাথায় টিনটিন, এক পয়সার তেলের টিন

৬. বল বল আপনার বল

ছায়া ছাতির তল।

৭. হাড্ডি পুড়ি পাতা খাই

চামড়া বেইচ্যা পয়সা পাই।

৮. মুরগা নাচে মুরগি নাচে চালত ঠ্যাং থুইয়া

হউরি বউয়ে কাইজ্যা করে মাইট্টা উক্কা লইয়া।

৯. আক্কলের খাইয়া মাডি

বাপে পুতে কামলা খাডি

১০. ধুলা-মাডি-ছাই

তিন গরিবের ভাই

সাহিত্যের উর্বর ভূমি ময়মনসিংহ

 আসাদ উল্লাহ 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু বাংলাদেশ নয়। অবিভক্ত ভারতবর্ষের প্রাচীনতম জেলাগুলোর একটি ময়মনসিংহ। ১৭৮৭ সালের ১ মে স্থাপিত হয় ময়মনসিংহ জেলা। রাজনীতি-ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ এ জেলার রয়েছে নানা অনুষঙ্গের গৌরব। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তো বলাই যায় ময়মনসিংহ উবর্র ভূমি। রবিঠাকুর থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের বরণীয় বহু লেখকের চরণ ছোঁয়ায় অভিষিক্ত এ জেলা। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের তারুণ্যের দিনগুলোর অংশত কেটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে। তার লেখা ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের পটভূমিও ত্রিশাল। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ তো বিশ্বসাহিত্যেরই উজ্জ্বল নাম। এ অঞ্চলের লোকায়ত কাহিনি নিয়েই ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’। ময়মনসিংহের লোকসংস্কৃতি দেশের লোকসাহিত্যের ইতিহাসে গৌরবময় অধ্যায়। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা নিঃসন্দেহে উচ্চ মর্যাদার দাবি রাখে। কারণ, বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ছাড়া অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে অনেকাংশেই দুর্বোধ্য। ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা এতটা দুর্বোধ্য নয়। সহজেই দেশের যে কোনো অঞ্চলের মানুষের মন-মননকে স্পর্শ করতে পারে এ অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা। নাটক, সিনেমায় হালে দেখা যায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষার ব্যাপক ব্যবহার। বিশেষ করে বিভিন্ন ইল্যাকট্রনিক মিডিয়ায় (টিভি চ্যানেল) প্রচারিত নাটকগুলোর মধ্যে যে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার হয় তার অধিকাংশগুলোতেই ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যারা এ ভাষাটি ব্যবহার করছে তাদের মূলত এ অঞ্চলের ভাষা সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি শূন্যের কোঠায়। ফলে যথাযথ উচ্চারণের ঘাটতিতে পরে নষ্ট বা বিকৃত হয়ে উপস্থাপিত হচ্ছে ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষা।

আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করে রচিত ময়মনসিংহের লোকসাহিত্যের রয়েছে নানা শাখা। যেমন-জারি সারি, বাউলগান, কবিগান, ঘাটুগান, পুঁথি, মেয়েলি গীত, পালাগান, কিচ্ছা, প্রবাদ ইত্যাদি।

আঠারো শতকের পর আধুনিক সাহিত্যের প্রভাবজাত ঢেউ আছড়ে পড়ে ময়মনসিংহেও। সাহিত্যে শুরু হয় বাঁক বদল। এ বাঁক বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকসাহিত্যের ধারাটিও ঔজ্জ্বল্য বজায় রেখে ময়মনসিংহের গ্রামজনপদকে স্পন্দিত রাখে। এ স্পন্দন অব্যাহত থাকে স্বাধীনতা পরবর্তী আশির দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত। ক্রমে ক্রমে নগর সভ্যতা আর নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির হাওয়ায় উদ্ভাসিত হয় গ্রাম, আর হারিয়ে যেতে থাকে লোকসংস্কৃতির নির্মল আনন্দ। এক পর্যায়ে ম্রিয়মাণ হয়ে যায় এ লোকসংস্কৃতি-কেন্দ্রিক গড়ে ওঠা লোকসাহিত্যের গৌরবময় পদযাত্রা। মৈমনসিংহ গীতিকার সাহিত্যই প্রমাণ দেয় এ অঞ্চলের লোকসাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ ছিল। এর ভাষা আটপৌরে হলেও নিঃসন্দেহে সর্বজনবিদিত।

একটি উদাহরণে এর সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে-

‘লজ্জা নাই নির্লজ্জ ঠাকুর লজ্জা নাইরে তর।

গলায় কলসী বাইন্দা জলে ডুব্যা মর॥’

‘কোথায় পাব কলসী কন্যা কোথায় পাব দড়ি

তুমি হও গহীন গাং আমি ডুব্যা মরি॥’ (মহুয়া)

আধুনিক সাহিত্যের প্রভাবে ময়মনসিংহ অঞ্চল বিশেষ প্রভাবিত হয়। এ অঞ্চলে অর্থাৎ মফস্বলে বসবাস করে সাহিত্যচর্চা করলেও অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে হয়েছেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। যেমন-আমরা মুশাররাফ করিমের কথা বলতে পারি। ১৯৪৬ সালের ৯ জানুয়ারি তার জন্ম। ঢাকাতে কিছু কাল জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে অবস্থান করলেও পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ শহরেরই ছিল তার বসবাস। এ কবি কাব্য পথে ছিলেন শতভাগ নিবেদিত। লিখেছেন বেশ কিছু গ্রন্থ। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন মুশাররাফ করিম। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিশটির মতো রয়েছে কাব্যগ্রন্থ। তার আগে এ জেলার সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন-আবুল মনসুর আহমেদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীনসহ অনেকেই। আবুল মনসুর স্বাধীনতা পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য ফুড কনফারেন্স, আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর, শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু, বেশি দামে কেনা কমদামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা, আয়না ইত্যাদি অন্যতম। আবুল কালাম শামসুদ্দীনও বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে-পলাশী থেকে পাকিস্তান, অতীত দিনের স্মৃতি ইত্যাদি অন্যতম। আলোচিত সমালোচিত লেখক তসলিমা নাসরীনের বাড়িও এ ময়মনসিংহ জেলায়। দেশের বরেণ্য অনেক লেখক ঢাকায় বসবাস করছেন। তবে তাদের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। যেমন-কথাসাহিত্যিত ও নাট্যকার শহীদ আখন্দ, ঔপন্যাসিক মোজাম্মেল হক নিয়োগী, ইউসুফ শরীফ, ফাইজুস সালেহীন, নাসরীন জাহান, কবি মনিরুস সালেহীন, ছড়াকার ও গল্পকার পারভীন সুলতানা, বিজ্ঞান লেখক সরকার হুমায়ুন, সৌরভ জাহাঙ্গীর, পারভেজ আহসান, মামুন মোয়াজ্জেম, নাসের মাহমুদ, রেজাউল করিম রনি, রুহুল মাহফুজ জয়, সারাজাত সৌম, বিজয় আহমেদ, গৌতম কৈরী, সাদাফ আমিন প্রমুখ। ইউসুফ শরীফের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম গল্পগ্রন্থ-চেনাঅচেনার মাঝখানের মানুষ, নির্বাচিত গল্প ও উপন্যাস ধ্বনির বিস্ফোরণ। ফাইজুস সালেহীনের গল্পগ্রন্থ-সাঁতার, সাঁকোর পরে সবুজ গ্রাম অন্যতম। নাসরীন জাহানের অন্যতম গ্রন্থ-øায়ু দিয়ে চেনা, উড়ুক্কু, কবচকুন্ডল, কাঠপেঁচা, যখন চারপাশের বাতিগুলো নিভে আসছে। মনিরুস সালেহীনের-খেলে যায় রৌদ্রছাড়া, যেতে পথে অন্যতম।

ময়মনসিংহের সংগঠন ও লিখিয়ে

ময়মনসিংহ জেলায় রয়েছে বেশ কিছু সক্রিয় সাহিত্য সংগঠন ও নবীন প্রবীণ লিখিয়ে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ, ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাহিত্য পরিষদ, ছড়া সংসদ, মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদ, অনুশীলন সাহিত্য সংসদ, তারাকান্দা, ত্রিশাল সাহিত্য সংসদ অন্যতম। রয়েছে সাহিত্যের আড্ডাস্থল ও পাঠচক্র। নবীন প্রবীণ লিখিয়েদের মধ্যে অনেকেই বেশ সক্রিয়। তারা সার্বক্ষণিক লেখার নেশায় মেতে থাকেন। এসব লিখিয়েদের মধ্যে ফরিদ আহমদ দুলাল, ছালিম হাসান, নজরুল হায়াত, আওলাদ হোসেন, শহীদ আল মামুন, সালাউদ্দিন পাঠান, মোহাম্মদ আজাদ, স্বপন ধর, আবু সাইদ কামাল, তাছাদ্দুক হোসেন, মুহম্মদ ফারুক, ডা. তারা গোলন্দাজ, মোঃ রফিকুল ইসলাম, এস. কে. অপু, মঈন হুদা, আলম মাহবুব, আব্দুর রশীদ আকন্দ, সাব্বির রেজা, নাজমা মমতাজ, যুগল দাশ, আনোয়ারা সুলতানা, আমজাদ দোলন, মর্জিয়া বেগম, রাজিয়া সুলতানা, শেখ সুজন আলী, সরকার আজিজ, ইয়াজদানী কোরাইশী কাজল, এফ আর কামাল, আশরাফ রোকন, আলী ইউসুফ, ডা. সাইমন চৌধুরী, সোহেল মজহার, এহসান হাবীব, অরূপ কিষাণ, শরৎ সেলিম, আল মাকসুদ, স্বাধীন চৌধুরী, মোস্তাফিজুর বাসার ভাষাণী, শেখ বুলবুল আহমেদ, ওয়ালিউল্লাহ আকন্দ, আইয়ুব আলী (গীতিকার), মোহাম্মদ আনোয়ার, মরিয়ম বেগম, জেবুন নেছা রীনা, চান মিয়া ফকির, মাহমুদ বাবু, আশিক আকবর, শহিদ আমিনী রুমী, শাহিদা হোসেন রিনা, মুশতাক বিবাগী, মিজানুর রহমান টিটু, তপন বর্মণ, কামাল মাহমুদ, কাঙাল শাহীন, রিয়েল আবদুল্লাহ, কাব্য সুমী সরকার, মুজাহীদুল ইসলাম নাজিম, সারোয়ার জাহান, জসীম উদ্দীন মুহাম্মদ, জহির খান, কাজী নাসির মামুন, সেলিনা রশিদ, আব্দুর রশিদ, বিল্লাহ মাহমুদ মানিক, আমজাদ শ্রাবণ, শরীফা সুলতানা, কবি আলম মাহবুব, রাহমান হাবিব, জান্নাতুন নাহার নূপুর, জামাল জাফরি, শফিউল্লাহ আনসারী, সোহেল রানা, সনৎ ঘোষ, অনন্য কামরুল, অরন্য ই চিরান, কামরান পারভেজ, চয়ন বিকাশ ভদ্র, তাহমিনা রহমান, নাজমুল আলম চৌধুরী, পান্না আকন্দ, সরকার হুমায়ুন, হাসান জামিল, ফজলুল হক পরাগ, খুরশিদ মল্লিক, মাসুমা টকি, আলমাস হোসাইন সাজা, রাশিদ আহমেদ নিসর্গ, জাহান য়ারা রানী, মোঃ লোকমান হোসেন, আবুল বাশার শেখ, অনন্য রাজ্জাক, শামীমা আক্তার, সুমী, আনোয়ার সুফিয়ান, ফাহিম ফারুক, মোঃ শরিফুল ইসলাম তালুকদার, মোঃ মোফাজ্জল হোসেন অনু, ত্বকী আফসারী, আফসানা আক্তার, জুলহাস উদ্দিন আকন্দ, আরাফাত রিলকে, ফাতেমা হক শিখা, সৌরভ দত্ত দিপু, শাহাব উদ্দিন আহম্মেদ, আফজাল হোসেন, জালাল উদ্দিন আহম্মেদ, রুকুনুজ্জামান, শিরিনা আক্তার, হানিফ রুবেল, অনন ফয়সাল, আবদুস সাত্তার, নিতাই চন্দ্র রায়, জুয়েল মুর্শেদ, মাহফুজা গোলন্দাজ, সালমা ইসলাম, মোঃ ইয়াসিন আলী, সেকান্দর আলী ওসমানী, এস এম মাসুদ রানা, মোঃ আরিফ হাসান, রওশন আরা খান, সপ্তবর্না পাল সোমা, এমএসবি নাজনীন লাকী, পারভেজ শিহাব, সাদিয়া ফয়জুন, মোমেন এইচ, এরশাদ আলী আসাদ, শরীফুল ইসলাম সরকার, মুরাদ দস্তগীর, ওয়ালিউল ইসলাম, অনন্য সাঈদ, হাবিবুর রহমান হাবিব, রায়হান শহিদ, সজীব আহমেদ, আক্তারুজ্জামান শাহ, ফ্লোরেন্স মালা ডায়াস, খাইরুল ইসলাম হিরক, সরকার হুমায়ুন, অনন্য কামরুল, তাহমিনা রহমান, মোবারক মুর্শেদ মিল্কী, বারী সুমন, জান্নাতুন নাহার নুপুর, শামসুল হক, আহম্মদ সাহাবউদ্দিন, শামীম আশরাফ, ফয়সাল আহমেদ, সিরাজ উদ্দিন, জহিরুল ইসলাম, কাজী রাসেল, নম্ফোন্দ্র দিলাওয়ার উল্লেখযোগ্য।

ময়মনসিংহের প্রবাদ প্রবচন

১. পরের ঘরের পিডা দাতে লাগে মিডা

২. হাওর জঙ্গল মইষের শিং, এই তিনে মৈমনসিং

৩. এক পয়সার ঋণের লাইগ্যা চান্দেরে খাইল

৪. এমন জায়গায় বওন নাই কেউ কয় উঠ

এমন কথা কওন নাই কেউ কয় ঝুট

৫. নাইড়্যা মাথায় টিনটিন, এক পয়সার তেলের টিন

৬. বল বল আপনার বল

ছায়া ছাতির তল।

৭. হাড্ডি পুড়ি পাতা খাই

চামড়া বেইচ্যা পয়সা পাই।

৮. মুরগা নাচে মুরগি নাচে চালত ঠ্যাং থুইয়া

হউরি বউয়ে কাইজ্যা করে মাইট্টা উক্কা লইয়া।

৯. আক্কলের খাইয়া মাডি

বাপে পুতে কামলা খাডি

১০. ধুলা-মাডি-ছাই

তিন গরিবের ভাই

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : প্রান্তছোঁয়া আকাশ

০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১