আইনস্টাইনের সাথে আড্ডা
jugantor
সোনার গহনার দোকানে
আইনস্টাইনের সাথে আড্ডা

  খন্দকার রেজাউল করিম  

৩০ জুলাই ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আইনস্টাইন এক অজপাড়াগাঁয়ে আমার অতিথি হয়ে এসেছেন। বেজায় আলসে লোক, রাতে দশ ঘণ্টা ঘুমান। এমন ঘুমকাতুরে লোকের মাথায় কী করে যে এত তত্ত্ব আসে কে জানে?

‘কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে

নিথর দীঘির পাড়ে বসে আছে বক।’

পৌষের সকাল। আইনস্টাইন বেহালায় ‘এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’ গানের সুরটি তোলার চেষ্টা করছেন। আমি এসে সুর-সাধনায় গোল বাধালাম :

‘কাল তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম মাছের বাজারে, আজ নিয়ে যাব সোনার গহনার দোকানে।’ আমি বললাম।

‘আমি এসেছি রূপসী বাংলার রূপ দেখতে। জুয়েলারির দোকানে গিয়ে আমি কী করব?’ আইনস্টাইন প্রশ্ন করলেন।

‘রূপসী বাংলার রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কুৎসিত কংকাল। সেটিও তোমার দেখা উচিত। জুয়েলারির দোকানে সেই কংকাল দেখতে পাবে। এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’ গানের ঘোর এক নিমিষে কেটে যাবে!

‘আমি জুয়েলারির কী-ই বা বুঝি?’

‘যে দু’একটি জিনিসকে আমি ঘৃণা করি, সোনার গহনা তাদের একটি। শুনেছি সোনার চাকচিক্যের পিছনে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের হাত আছে। তুমি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক। কথাটা কতটুকু সত্য?’

‘দেখ বাপু, ঈশ্বর সবকিছু সৃষ্টি করেন, বিজ্ঞানীদের কাজ শুধু সেই সৃষ্টির ব্যাখ্যা দেওয়া। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে সোনার চকচকে রঙের ব্যাখ্যা দিতে পারি, সোনার রং বদলাতে পারি না। সোনা নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ থাকলে ঈশ্বরকে জানাতে পার।’

‘তাকে আর পাচ্ছি কোথায়?’

‘মসজিদ, মন্দির, গির্জায় খুঁজে দেখতে পার; আপন হৃদয়গহন-দ্বারে কান পাততে পার; অথবা সবার পিছে, সবার নিচে যারা পড়ে আছে, তাদের মাঝে সন্ধান করতে পার।’

আমাদের যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য পাশের শহরের সবচেয়ে বড় গহনার দোকান। আবার সেই বাস। তবে আজ হাটের দিন নয়। ভিড় অনেক কম, বাসের ভিতরে ছাগল, মুরগির সংখ্যা নাই বললেই চলে। ‘সেদিনের সেই ভিড় কেন জানি মিস করছি’, আইনস্টাইন বললেন, ‘তবে কন্ডাক্টরের বাস চালানোর সংকেত আমি মনে হয় বুঝে ফেলেছি; বাসের গায়ে এক থাপ্পড় মানে থামতে হবে, দুই থাপ্পড় মানে চলতে হবে।’ আইনস্টাইনের মুখে শিশুর হাসি ফুটে উঠল।

সক্রেটিসের চেলারা একবার তাকে এথেন্সের সবচেয়ে অভিজাত বিপণিতে নিয়ে গিয়েছিল। দোকানের জিনিসপত্রের বাহার দেখে সক্রেটিসের চোখ তো ছানাবড়া; হৃদয়ে বিপন্ন বিস্ময়। একবার এদিক যান, আরেকবার ওদিক। শেষে বললেন, ‘হায়, পৃথিবীতে এত চমৎকার সব জিনিস আছে, অথচ আমার তার একটিরও প্রয়োজন নেই।’ সোনার গহনার দোকানে ঢুকে আইনস্টাইন কী করেন তা দেখার জন্যে আমার ভিতরে একটা কৌতূহল কাজ করছে। দোকানটি শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায়। ঝকমকে নিয়নের আলোয় হীরা আর সোনার গহনাগুলো সোনালি জ্যোতি ছড়াচ্ছে। সুসজ্জিতা মহিলারা ফুটানিকা ডিব্বা ঘাড়ে ঝুলিয়ে নাক উঁচিয়ে গহনা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে তাদের চোখেমুখে সক্রেটিসের মতো কোনো বিস্ময় নেই, যে কোনো ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করা গাঁয়ের খ্যাত লোকের লক্ষণ!

দোকানে কয়েক ধরনের লোকের দেখা মিলল। একদলের কাছে টাকা কোনো ব্যাপার নয়, ওরা স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সারা দোকান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, হাতের সামনে নতুন ঢঙের যে গহনা পাচ্ছে তাই কিনছে। সব কিছুই ওদের চাই। আরেক ধরনের ক্রেতা নিরানন্দ মুখে পছন্দসই গহনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এরা গহনা কিনছেন মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে, বরপক্ষের যৌতুকের দাবি মেটাতে, সমাজে নিজের সন্মান টিকিয়ে রাখার মিথ্যে আয়োজনে। দু’একজন মহিলা এসেছেন গহনা বিক্রি করতে। আঁচলের তলে গয়না লুকানো, মলিন মুখে লজ্জার ছোঁয়া।

‘কারণটা কী?’ আইনস্টাইন জিজ্ঞাসা করলেন।

‘খুব অভাবে না পড়লে কোনো বাঙালি মেয়ে গয়না বিক্রি করে না। এদেশের মেয়েরা দুঃখ এবং অভাবকে ঢেকে রাখতে চায়, প্রতিবাদের ভাষা ওদের জানা নেই।’

‘অঢেল টাকাওয়ালাদের টাকার উৎস কী?’

‘প্রধানত ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, জবরদখল, পুকুরচুরি, ব্যাংক ডাকাতি।’

‘আমার অস্বস্তি লাগছে। তুমি যে কংকাল দেখাতে চেয়েছিলে তাকে আমি দেখেছি। চলো এবার গাঁয়ে ফেরা যাক।’

“তোমাকে একটা কবিতা শোনাই,

‘হারিয়ে কানের সোনা এ-বিপাকে কাঁদো কি কাতরা?

বাইরে দারুণ ঝড়ে নুয়ে পড়ে আনাজের ডাল,

তস্করের হাত থেকে জেয়র কি পাওয়া যায় ত্বরা-

সে কানেট পড়ে আছে হয়তো বা চোরের ছিনাল!’

এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছো চকচকে সোনার গহনা কেন আমার বিবমিষার উদ্রেক করে।”

‘তোমার প্রিয়ার সোনার নোলক এখন এক লুটেরার নারীর নাকে শোভা পাচ্ছে, তাতে সোনার কি দোষ? সোনার দুল চকচক করবে, সে যার কানেই দুলুক। সোনার পরমাণুগুলোর উপরে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ভর করেছে। চকচক না করে ওদের উপায় নাই।’

‘আমি তো সেই কথাই তোমার কাছে জানতে চাই। চকমকির আসল কারণটা কী!’

‘ব্যাপারটা বেশ জটিল। পরমাণু সম্পর্কে জানতে হবে, ওদের গঠন, ইলেক্ট্রনের কোয়ান্টাম ঘর, ইলেক্ট্রনের ভর, গতিবেগ, কক্ষপথ; কক্ষপথে ঘোরার সময় ইত্যাদি। এসবের উপরে নির্ভর করছে পদার্থ কোন রঙের আলো শুষে নিবে, কোন রঙের আলো ছড়াবে এবং তাকে কেমন দেখাবে। কিন্তু তুমি তো জানো, আলোর কাছাকাছি গতিতে চললে সময়, দূরত্ব, এবং ভর ভীষণ ভাবে বদলে যায়।’

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, স্টপ, এক্কেবারে রোক যাও!’ আমি চেঁচিয়ে বললাম।

এমন চেঁচানো আমি বাস কন্ডাক্টরের কাছে শিখেছি। আমাদের আমলে বাসের কন্ডাক্টর এবং ড্রাইভার মহিলা যাত্রীদের যথেষ্ট সন্মান করত। মহিলা যাত্রীর নামার সময় হলে কন্ডাক্টর বাসের গায়ে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় দিয়ে চেঁচিয়ে বলত, ‘ওস্তাদ, লেডিজ! স্টপ, একদম রোককে।’

“গতির সঙ্গে ভরের পরিবর্তন? আপেক্ষিক ভর (relativistic mass) কথাটি সেই তোমার আমল থেকেই চলে আসছে। আমি যতদূর জানি, তুমি কথাটি পছন্দ করোনি, কিন্তু তেমন প্রতিবাদও করোনি! ১৯৪৮ সালে লিঙ্কন বার্নেটকে তুমি এক চিঠিতে লিখেছিলে, ‘It is not good to introduce the concept of relativistic mass of a moving body for which no

clear definition can be given. It is better to introduce no other mass concept than the rest

mass. Instead of introducing relativistic mass, it is better to mention the expression for

the energy and momentum of a body in motion.’ আজকাল অনেক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আপেক্ষিক ভর শব্দটির ওপরে জেহাদ ঘোষণা করেছে। ক্যালটেকের (California Institute of Technology) পদার্থবিদ শন ক্যারোল এ নিয়ে এক ফতোয়া দিয়েছেন, ‘যে পাতায় আপেক্ষিক ভর কথাটি থাকবে তা ছিঁড়ে ফেলতে হবে।’ এই ফতোয়া মানতে যেয়ে ক্যালটেকের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের লেখা আমার প্রিয় ‘The Feynman Lectures on Physics’ বইটির অনেক পাতা ছিঁড়তে হয়েছে। জর্জ গ্যামোর টম্পকিন সিরিজের বইগুলোর একই দশা। এখন ফেরিওয়ালার কাছে বইগুলো সের দরে বিক্রি করতে হবে!”

‘দুঃখ করো না। রসায়নবিদদের কথা একবার ভেবে দেখ। ওদের কোয়ান্টাম রসায়নের প্রায় সব বই তো তাহলে ফেলে দিতে হবে! ওরা যদি আপেক্ষিক ভর দিয়ে সোনার চকচকে রঙের সহজ ব্যাখ্যা দিতে পারে তাহলে আমি কেন নাক গলাতে যাব? আপেক্ষিক ভর একটি দরকারি ধারণা (concept) হিসাবে অনেকেই ব্যবহার করে আসছেন। এই বর্ণনায় গতির সঙ্গে আপেক্ষিক ভর বেড়ে যায়। এত শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে কী লাভ? বিজ্ঞানে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার কারো নেই। আমার E=mc¼2 সমীকরণটাতেও অনেকে খুঁত খুঁজে পেয়েছে।’

‘বল কী? নিন্দুকেরা তোমার সমীকরণেও খুঁত খুঁজে পেল? আপেক্ষিক ভর নিয়ে কেন এত ঝগড়া, সেটা আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও। সেই সঙ্গে সোনার রঙের ব্যাখ্যা।’

সোনার গহনার দোকানে

আইনস্টাইনের সাথে আড্ডা

 খন্দকার রেজাউল করিম 
৩০ জুলাই ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আইনস্টাইন এক অজপাড়াগাঁয়ে আমার অতিথি হয়ে এসেছেন। বেজায় আলসে লোক, রাতে দশ ঘণ্টা ঘুমান। এমন ঘুমকাতুরে লোকের মাথায় কী করে যে এত তত্ত্ব আসে কে জানে?

‘কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে

নিথর দীঘির পাড়ে বসে আছে বক।’

পৌষের সকাল। আইনস্টাইন বেহালায় ‘এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’ গানের সুরটি তোলার চেষ্টা করছেন। আমি এসে সুর-সাধনায় গোল বাধালাম :

‘কাল তোমাকে নিয়ে গিয়েছিলাম মাছের বাজারে, আজ নিয়ে যাব সোনার গহনার দোকানে।’ আমি বললাম।

‘আমি এসেছি রূপসী বাংলার রূপ দেখতে। জুয়েলারির দোকানে গিয়ে আমি কী করব?’ আইনস্টাইন প্রশ্ন করলেন।

‘রূপসী বাংলার রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক কুৎসিত কংকাল। সেটিও তোমার দেখা উচিত। জুয়েলারির দোকানে সেই কংকাল দেখতে পাবে। এ মনিহার আমায় নাহি সাজে’ গানের ঘোর এক নিমিষে কেটে যাবে!

‘আমি জুয়েলারির কী-ই বা বুঝি?’

‘যে দু’একটি জিনিসকে আমি ঘৃণা করি, সোনার গহনা তাদের একটি। শুনেছি সোনার চাকচিক্যের পিছনে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের হাত আছে। তুমি আপেক্ষিকতা তত্ত্বের জনক। কথাটা কতটুকু সত্য?’

‘দেখ বাপু, ঈশ্বর সবকিছু সৃষ্টি করেন, বিজ্ঞানীদের কাজ শুধু সেই সৃষ্টির ব্যাখ্যা দেওয়া। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব দিয়ে সোনার চকচকে রঙের ব্যাখ্যা দিতে পারি, সোনার রং বদলাতে পারি না। সোনা নিয়ে তোমার কোনো অভিযোগ থাকলে ঈশ্বরকে জানাতে পার।’

‘তাকে আর পাচ্ছি কোথায়?’

‘মসজিদ, মন্দির, গির্জায় খুঁজে দেখতে পার; আপন হৃদয়গহন-দ্বারে কান পাততে পার; অথবা সবার পিছে, সবার নিচে যারা পড়ে আছে, তাদের মাঝে সন্ধান করতে পার।’

আমাদের যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্য পাশের শহরের সবচেয়ে বড় গহনার দোকান। আবার সেই বাস। তবে আজ হাটের দিন নয়। ভিড় অনেক কম, বাসের ভিতরে ছাগল, মুরগির সংখ্যা নাই বললেই চলে। ‘সেদিনের সেই ভিড় কেন জানি মিস করছি’, আইনস্টাইন বললেন, ‘তবে কন্ডাক্টরের বাস চালানোর সংকেত আমি মনে হয় বুঝে ফেলেছি; বাসের গায়ে এক থাপ্পড় মানে থামতে হবে, দুই থাপ্পড় মানে চলতে হবে।’ আইনস্টাইনের মুখে শিশুর হাসি ফুটে উঠল।

সক্রেটিসের চেলারা একবার তাকে এথেন্সের সবচেয়ে অভিজাত বিপণিতে নিয়ে গিয়েছিল। দোকানের জিনিসপত্রের বাহার দেখে সক্রেটিসের চোখ তো ছানাবড়া; হৃদয়ে বিপন্ন বিস্ময়। একবার এদিক যান, আরেকবার ওদিক। শেষে বললেন, ‘হায়, পৃথিবীতে এত চমৎকার সব জিনিস আছে, অথচ আমার তার একটিরও প্রয়োজন নেই।’ সোনার গহনার দোকানে ঢুকে আইনস্টাইন কী করেন তা দেখার জন্যে আমার ভিতরে একটা কৌতূহল কাজ করছে। দোকানটি শহরের সবচেয়ে অভিজাত এলাকায়। ঝকমকে নিয়নের আলোয় হীরা আর সোনার গহনাগুলো সোনালি জ্যোতি ছড়াচ্ছে। সুসজ্জিতা মহিলারা ফুটানিকা ডিব্বা ঘাড়ে ঝুলিয়ে নাক উঁচিয়ে গহনা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে তাদের চোখেমুখে সক্রেটিসের মতো কোনো বিস্ময় নেই, যে কোনো ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করা গাঁয়ের খ্যাত লোকের লক্ষণ!

দোকানে কয়েক ধরনের লোকের দেখা মিলল। একদলের কাছে টাকা কোনো ব্যাপার নয়, ওরা স্ত্রী-কন্যা নিয়ে সারা দোকান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, হাতের সামনে নতুন ঢঙের যে গহনা পাচ্ছে তাই কিনছে। সব কিছুই ওদের চাই। আরেক ধরনের ক্রেতা নিরানন্দ মুখে পছন্দসই গহনা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এরা গহনা কিনছেন মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে, বরপক্ষের যৌতুকের দাবি মেটাতে, সমাজে নিজের সন্মান টিকিয়ে রাখার মিথ্যে আয়োজনে। দু’একজন মহিলা এসেছেন গহনা বিক্রি করতে। আঁচলের তলে গয়না লুকানো, মলিন মুখে লজ্জার ছোঁয়া।

‘কারণটা কী?’ আইনস্টাইন জিজ্ঞাসা করলেন।

‘খুব অভাবে না পড়লে কোনো বাঙালি মেয়ে গয়না বিক্রি করে না। এদেশের মেয়েরা দুঃখ এবং অভাবকে ঢেকে রাখতে চায়, প্রতিবাদের ভাষা ওদের জানা নেই।’

‘অঢেল টাকাওয়ালাদের টাকার উৎস কী?’

‘প্রধানত ঘুষ, দুর্নীতি, লুটপাট, জবরদখল, পুকুরচুরি, ব্যাংক ডাকাতি।’

‘আমার অস্বস্তি লাগছে। তুমি যে কংকাল দেখাতে চেয়েছিলে তাকে আমি দেখেছি। চলো এবার গাঁয়ে ফেরা যাক।’

“তোমাকে একটা কবিতা শোনাই,

‘হারিয়ে কানের সোনা এ-বিপাকে কাঁদো কি কাতরা?

বাইরে দারুণ ঝড়ে নুয়ে পড়ে আনাজের ডাল,

তস্করের হাত থেকে জেয়র কি পাওয়া যায় ত্বরা-

সে কানেট পড়ে আছে হয়তো বা চোরের ছিনাল!’

এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছো চকচকে সোনার গহনা কেন আমার বিবমিষার উদ্রেক করে।”

‘তোমার প্রিয়ার সোনার নোলক এখন এক লুটেরার নারীর নাকে শোভা পাচ্ছে, তাতে সোনার কি দোষ? সোনার দুল চকচক করবে, সে যার কানেই দুলুক। সোনার পরমাণুগুলোর উপরে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ভর করেছে। চকচক না করে ওদের উপায় নাই।’

‘আমি তো সেই কথাই তোমার কাছে জানতে চাই। চকমকির আসল কারণটা কী!’

‘ব্যাপারটা বেশ জটিল। পরমাণু সম্পর্কে জানতে হবে, ওদের গঠন, ইলেক্ট্রনের কোয়ান্টাম ঘর, ইলেক্ট্রনের ভর, গতিবেগ, কক্ষপথ; কক্ষপথে ঘোরার সময় ইত্যাদি। এসবের উপরে নির্ভর করছে পদার্থ কোন রঙের আলো শুষে নিবে, কোন রঙের আলো ছড়াবে এবং তাকে কেমন দেখাবে। কিন্তু তুমি তো জানো, আলোর কাছাকাছি গতিতে চললে সময়, দূরত্ব, এবং ভর ভীষণ ভাবে বদলে যায়।’

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, স্টপ, এক্কেবারে রোক যাও!’ আমি চেঁচিয়ে বললাম।

এমন চেঁচানো আমি বাস কন্ডাক্টরের কাছে শিখেছি। আমাদের আমলে বাসের কন্ডাক্টর এবং ড্রাইভার মহিলা যাত্রীদের যথেষ্ট সন্মান করত। মহিলা যাত্রীর নামার সময় হলে কন্ডাক্টর বাসের গায়ে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় দিয়ে চেঁচিয়ে বলত, ‘ওস্তাদ, লেডিজ! স্টপ, একদম রোককে।’

“গতির সঙ্গে ভরের পরিবর্তন? আপেক্ষিক ভর (relativistic mass) কথাটি সেই তোমার আমল থেকেই চলে আসছে। আমি যতদূর জানি, তুমি কথাটি পছন্দ করোনি, কিন্তু তেমন প্রতিবাদও করোনি! ১৯৪৮ সালে লিঙ্কন বার্নেটকে তুমি এক চিঠিতে লিখেছিলে, ‘It is not good to introduce the concept of relativistic mass of a moving body for which no

clear definition can be given. It is better to introduce no other mass concept than the rest

mass. Instead of introducing relativistic mass, it is better to mention the expression for

the energy and momentum of a body in motion.’ আজকাল অনেক তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আপেক্ষিক ভর শব্দটির ওপরে জেহাদ ঘোষণা করেছে। ক্যালটেকের (California Institute of Technology) পদার্থবিদ শন ক্যারোল এ নিয়ে এক ফতোয়া দিয়েছেন, ‘যে পাতায় আপেক্ষিক ভর কথাটি থাকবে তা ছিঁড়ে ফেলতে হবে।’ এই ফতোয়া মানতে যেয়ে ক্যালটেকের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যানের লেখা আমার প্রিয় ‘The Feynman Lectures on Physics’ বইটির অনেক পাতা ছিঁড়তে হয়েছে। জর্জ গ্যামোর টম্পকিন সিরিজের বইগুলোর একই দশা। এখন ফেরিওয়ালার কাছে বইগুলো সের দরে বিক্রি করতে হবে!”

‘দুঃখ করো না। রসায়নবিদদের কথা একবার ভেবে দেখ। ওদের কোয়ান্টাম রসায়নের প্রায় সব বই তো তাহলে ফেলে দিতে হবে! ওরা যদি আপেক্ষিক ভর দিয়ে সোনার চকচকে রঙের সহজ ব্যাখ্যা দিতে পারে তাহলে আমি কেন নাক গলাতে যাব? আপেক্ষিক ভর একটি দরকারি ধারণা (concept) হিসাবে অনেকেই ব্যবহার করে আসছেন। এই বর্ণনায় গতির সঙ্গে আপেক্ষিক ভর বেড়ে যায়। এত শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে কী লাভ? বিজ্ঞানে ফতোয়া দেওয়ার অধিকার কারো নেই। আমার E=mc¼2 সমীকরণটাতেও অনেকে খুঁত খুঁজে পেয়েছে।’

‘বল কী? নিন্দুকেরা তোমার সমীকরণেও খুঁত খুঁজে পেল? আপেক্ষিক ভর নিয়ে কেন এত ঝগড়া, সেটা আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও। সেই সঙ্গে সোনার রঙের ব্যাখ্যা।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন