কবি তখন স্বপ্ন দেখান জাতি যখন দুঃস্বপ্নে

আসাদ চৌধুরী

  জাহেদ সরওয়ার ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসাদ চৌধুরী

আসাদ চৌধুরী ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি। তার কবিতার বইয়ের সংখ্যা আঠারো। অনুবাদ, সম্পাদনা ও মৌলিক লেখা মিলিয়ে আরও বিশটির মতো। শিশুসাহিত্য রচনাও করেছেন তিনি। তার কবিতা সহজ, বোধগম্য, প্রাকৃতিক ও সমাজসচেতন। তিনি একজন মিডিয়া ব্যক্তিত্বও। বর্তমান সময়, সমাজ, গ্লোবালাইজেশন, সাহিত্য, রাজনীতি, কবিতা চর্চা, সাহিত্য পুরস্কার, উর্দু সাহিত্য, কবির চাকরি ও সংসার ইত্যাদি বিষয়ে কবি আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে কথা হয় কবি জাহেদ সরওয়ারের। সেই আলোচনা যুগান্তর পাঠকদের জন্য পত্রস্থ হল। বি. স.

জাহেদ সরওয়ার : ফ্রয়েডকে স্মরণ করে বলা যায়। আপনার কবি হওয়ার বীজ শৈশবে রোপিত হয়েছিল কি না?

আসাদ চৌধুরী : আমার শৈশব কেটেছে অনেক জায়গায়। আমার জন্ম বরিশালের উলানিয়ায়। আমাদের পরিবারটাকে বলা হতো বড় হিস্সা। বিরাট জমিদারি। গ্রামে কেটেছে আমার অনেক দিন। একবার খুব পাগলা জ্বর হওয়ার ফলে আমাকে বরিশাল নেয়া হল; সেখান থেকে কলকাতা। এটা ’৪৭ সালের কথা বলছি। কলকাতায় আমি মাস দেড়েকের মতো ছিলাম সে সময়। আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম। ’৪৭-এর দাঙ্গার আবহটা দেখলাম। আব্বা তখন এমএলএ ছিলেন। মো. আরিফ চৌধুরী। যুক্তবঙ্গের শেষ এমএলএদের একজন। পুলিশ পাহারা থাকত। তারা আমাকে ধরে নিয়ে আসে।

ক্লাস টুতে যখন উঠলাম তখন আমাকে ঢাকা আসতে হল। বাবার অ্যাসেমব্লি ছিল। অই একটা বছর আমার পড়াশোনা হয়নি। সেন্ট গ্রেগরিতে বাবা পড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমার ভেতরে ইংরেজ বিদ্বেষের কারণে হয়নি। আব্বাকে বললাম যে, আমি ইংরেজি স্কুলে পড়ব না। আব্বা খুব খুশি হয়ে বললেন যে, পড়তে হবে না তাহলে থাক। তবে এতে বাসায় পড়ার চাপটা বাড়ল। তখন প্রচণ্ড স্বাধীনতা ছিল। আমরা কার সঙ্গে খেলছি কোথায় যাচ্ছি মা-বাবারা এখনকার মতো এত কড়াকড়ি করত না। কয়েক মাস থাকার পরপরই গ্রামে যাওয়ার জন্য আমার মনটা কেমন কেমন করত। গ্রামে কয়েক মাস থাকার পর আবার শহরে আসার জন্য পাগল হয়ে যেতাম।

তখন তো ঢাকা আর আজকের মতো ছিল না। এটা কি এই কারণে যে আপনাদের গ্রাম ঢাকার চেয়ে উন্নত মনে হতো?

আ চৌ : সে কারণে না। গ্রামের একটা আলাদা মজা আছে। গ্রামলগ্ন বন্ধু-বান্ধব। একটু নিরিবিলি সবুজ। এই যে ঈদে লোকে বাড়ি যায় এত কষ্ট করে। শুধু তো মা-বাবাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার জন্য নয়, তাই না? বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খালের পাশে বসা, পরিচিত গাছপালাগুলোর কাছে ফিরে যাওয়া। ওই গ্রামীণ অ্যাসোসিয়েশনটাই আমাকে টানত বেশি। যেটা ঢাকায় পেতাম না। নাইনে আমার পড়াশোনাটা আবারও সমস্যার মুখে পড়ল। আমিই দায়ী- আর কেউ না। কারণ প্রচুর সিনেমা দেখতাম। বইপত্র বিক্রি করে ফেলেও সিনেমা দেখতাম। স্যারের বই পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলাম। মারামারিও করেছি তখন। ধনু বলে এক গুণ্ডা ছিল শাঁখারীপট্টিতে। আমরা রাধিকাগ্রামের বাসায় থাকতাম। এই বাসায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন কয়েক মাস। আব্বা এনে রেখে দিয়েছিলেন। উনি, মোল্লা জালাল পরে মন্ত্রী হন, আব্দুল হামিদ চৌধুরী সিপিবির লিডার ছিলেন, আনোয়ার হোসেন তৎকালীন বিখ্যাত ছাত্রনেতা। এরাও এই বাসায় ছিলেন।

তো যেটা বলছিলাম আমরা বল খেলতাম। শাঁখারীপট্টির লোকেরা চাইত না আমরা ওখানে গিয়ে খেলি। আমরা যারা খেলতে যেতাম তাদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতা থেকে আসা। বিহার থেকে আসা। অবাঙালি মুসলমান। ধনুর সঙ্গে মারামারি হয়ে গেল। সূত্রপাতটা আমিই করেছিলাম। আমরা ক্রিকেট খেলছিলাম। ধনু এসে গালাগালি করল। আমি স্ট্যাম্প একটা নিয়ে তার মুখের একপাশে মারি। ও তখন বিশ্বাসই করতে পারেনি তার গায়ে কেউ হাত তুলতে পারে। ওর এই অবিশ্বাস্যতা বজায় থাকতে থাকতে আমি আবার ওর মুখের অন্যপাশে মারি। ও পালিয়ে যায় ওর বাহিনীসুদ্ধ। ওই মাঠে ও আর কখনও আসেনি। তবে সে সময়ের কথা বলতে গেলে সিনেমা দেখেছি প্রচুর। ওই সময়ের হলের অনেক টিকিট বিক্রেতারাও আমাকে চিনত। তখন মানসীটার নাম নিশাত ছিল। তারপর মায়া সিনেমা হলও চিনতাম। ক্লাস নাইনে তখন। আবার আমি গ্রামে গেলাম। কিছু করি না তখন। তারপর আমি ক্লাস নাইনে পরীক্ষা দিলাম। থার্ড হলাম। ক্লাস টেনে সব পরীক্ষায় ভালো করেছি। টেস্টেও খুবই ভালো হল। এরপর এক স্যারের কাছে পড়তাম। মিন্টু স্যার। উনি বললেন, ‘অংকে ও পঁয়তাল্লিশ পাবে।’ আমি আসলে ওই পঁয়তাল্লিশই পেয়েছিলাম।

পরে আমি ভর্তি হয়েছিলাম বরিশাল বিএম কলেজে। থাকতাম ফুফুর বাসায়। তিন মাইল দূরে হেঁটে যেতে হতো। পাস করার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম বাংলায়। মোহাম্মদীতে প্র“ফ দেখার চাকরি দিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।

ওইটাই আপনার প্রথম চাকরি?

: হ্যাঁ। ওইটাই প্রথম। প্র“ফ দেখার চাকরি। আমি আর কি দেখতাম গাফ্ফার ভাই দেখে দিতেন। আমি বসে চা-ডালপুরি খেতাম। গাফ্ফার ভাই যেদিন চাকরি ছেড়ে দিল সেদিন আমার চাকরিও নট। চলে গেল। পরের দিন গিয়ে দেখি যে আমার চাকরি নেই। ওইখানে মাসতিনেক ছিলাম। ডিপার্টমেন্টে একটা স্কলারশিপ পেতাম পঁয়তিরিশ’ টাকা।

সাহিত্যের ঝোঁকটা কীভাবে এল?

: সাহিত্যের ঝোঁকটা পারিবারিকভাবেই ছিল। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখেছি। উনি ছিলেন আমার নানির আপন ছোট ভাই। শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের জামাতা। সবচেয়ে বড় কথা কি আমাদের বাসায় অনেক পত্রিকা রাখা হতো। প্রবাসী, মোহাম্মদী, ভারতবর্ষ, মাহে নও, সওগাত। আমার এক মামা শিশু সওগাত রাখত। যতটা মনে পড়ে শিশুসাথী বলেও একটা পত্রিকা ছিল। আরও অনেক পত্রিকা থাকত বাসায়। নাম মনে পড়ছে না। আমার খুব প্রিয় ছিল মোহন সিরিজ।

আমাদের পারিবারিক পরিবেশটাও বিশাল; জমিদারি পরিবার। কনজারভেটিভ। কিন্তু খুবই সেকুলার ছিল। ক্লাস ফোরে আমি প্রথম নজরুলের বিষের বাঁশি বইটা পাই। পাগলের মতো পড়েছিলাম। এরপর অগ্নিবীণা পাই। এগুলো কিন্তু ব্রিটিশরা নিষিদ্ধ করেছিল। ’৬৪-এর প্রথম শেরেবাংলা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। আর আমাদের গ্রামে আমার কাজিন আজিম ভাই বিরাট একটা ব্যাটারি চালিত রেডিও এনেছিলেন। অনেক বড় টেলিভিশনের তিনগুণ সাইজ হবে। ব্যাটারিটাও অনেক ওজন ছিল। দু’জনকে বহন করতে হতো। নাটক-আবৃত্তি আমরা তখনই শুনি। ক্লাস ফোরে আমি নজরুলের বইগুলো পড়লাম। এরপর কবিতা পড়লেই ওগুলো আমি পড়ি। কবিতাগুলো জোরে জোরে পড়তাম। ফলে ছন্দটা তখন মনে হয় কানে গেঁথে গিয়েছিল। যখন আবোলতাবোল পেলাম তখন আমি ক্লাস সেভেনে। তখন আমাকে আর পায় কে? সুুকুমার রায় আমার অসম্ভব প্রিয় কবি। রবীন্দ্রনাথ নজরুল এরা না। আর মেট্রিক পরীক্ষা যখন দেই তখনই আমি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা পড়ি। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা পড়লাম। আর সমর সেন আমার ভাইয়ের খুবই ফেভারিট ছিল। তার পরামর্শে আমি সমর সেন পড়ি। কিন্তু তখন অসম্ভব ভালো লেগে যায় জীবনানন্দ দাশ। এই ভালো লাগার আমি ব্যাখ্যা দিতে পারব না। জীবনানন্দ দাশ পড়ার পর আমার মনে হল যে, আমিও তো ইচ্ছে হলে লিখতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি বাংলা বিভাগে তখন আগা সুলতান এমদাদিয়া লাইব্রেরির মালিক ছিলেন বরিশালের। উনি আমাকে বললেন যে, প্যাট্রিক লুলুম্বার উপর একটা কবিতা লিখতে হবে। প্যাট্রিক লুলুম্বার মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। যদিও বিশ্বায়নের চাপের ভেতর ঢুকিনি তখনও আমরা। আমার মনে হয়েছিল আমার কোনো কাজিন মারা গেছে। খুবই অপমানিত বোধ করছিলাম তখন। স্টেডিয়ামে বুকস অ্যান্ড ম্যাগাজিনস বলে একটা দোকান ছিল। ওটা ছিল খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের। ওখানে এক ভদ্রলোক এলেন দেখলেন কোনো মন্তব্য করলেন না, কবিতাটা নিয়ে চলে গেলেন। পরে জানলাম উনি ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। এই কবিতাটা পরে আফ্রিকার হৃদয়ে সূর্যোদয় বলে লুলুম্বাকে নিয়ে একটা সংকলনেও ছাপা হল। পরের দিনই সংবাদে কবিতাটা এডিটোরিয়াল পেজে ছাপা হল। এর আগে আমার কোনো কবিতা সাহিত্যপাতায় ছাপা হয়নি। আমি রাতারাতি কবি খ্যাতি পেয়ে গেলাম। এটা খুব কম লেখকের ভাগ্যে জোটে। তখন থেকেই এটা আমার কবিতার প্রবণতা। সমাজ এবং মানুষ আমার কবিতার বিষয় হয়ে উঠল। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে আমার রুচি একেবারেই এলোমেলো। আমি রাগ পছন্দ করি, লোকসঙ্গীত আমার অসম্ভব প্রিয়। একবার আমরা হাওরে গেলাম। আমরা সেখানে শুনলাম রাধারমণ ও শাহ আব্দুল করিমের গান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা শাহ আব্দুল করিম শুনলাম।

হাওরের সঙ্গে মানে ওইসব আবহে থেকেই তো শাহ আব্দুল করিমের বাউলগিরি। হাওর আর শাহ আব্দুল করিম একসঙ্গে হলে পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। আমি দিরাই নদী পার হয়ে আব্দুল করিমের বাড়িতে গিয়েছিলাম ওনার জীবদ্দশায় একবার।

: হ্যাঁ, তাই। শাকুর মজিদের সঙ্গে গিয়েছিলাম তার বাড়িতে তারই কল্যাণে। একটা পরিপূর্ণ সন্ধ্যা কাটালাম বলতে গেলে শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গে। যা হোক এভাবেই আরকি শুরু হল বলা যায়। ব্রজমোহন কলেজে এক সময় পাগলা ছাত্রলীগ করতাম। বদরুল হক পরে সুপ্রিম কোর্টের জজ হন। ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন কলেজে। আমার দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। এক সময় ছাত্র ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকলাম। এক সময় বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকলাম। তার পরও আসলে রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত হইনি কখনও। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে যখন পড়াই তখন কৃষক-শ্রমিকদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। এর আগে আমি কখনোই ভাবতে পারিনি কৃষকরা সন্ধ্যার সময় খেয়ে ফেলে রাতে তেল বাঁচানোর জন্য। আরেক বাড়িতে গিয়েছিলাম পাশের বাড়ি থেকে গ্লাস এনে তারপর আমাকে পানি দিয়েছিলেন। তাদের বাড়িতে কোনো গ্লাস ছিল না। বিশ্বাস করো এ সব ব্যাপার আমার আগে জানা ছিল না। এটা চৌষট্টি-পঁয়ষট্টির দিকের কথা বলছি। ছয় দফা আসছে তখন। এগারো দফা তো ঊনসত্তরে। তখন আমি ঢাকায় ছিলাম না। তবে এই বাইরে থাকাটা আমার নিজেকে বোঝার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এরকম আরেকটা অভিজ্ঞতা হয়েছে আমাদের কৃষক-শ্রমিকদেরই এক কর্মীর কাছ থেকে। তার বাড়ি ছিল খরোলের দিকে। একটু জঙ্গিমার্কা লোক মানে অতিবিপ্লবী আরকি। সে এসে উদাসীনভাবে কথাবার্তা বলছে। আমি ভাবছি কারণ কী? এই লোক তো এ রকম ছিল না। এ কয়দিনে কি এমন হল উনি আধ্যাত্মিক কথাবার্তা বলছেন কেন প্রতিনিয়ত? তারপরই বুঝলাম কোনো একটা বিয়ে বাড়িতে আবদুল আলীমের গান বেজেছিল। এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়ে এই জাতীয় গান। অনেকগুলো গান শুনেছে তারপর তার ভেতর এটার প্রভাব পড়েছে। তখন আমি আবার নতুন করে সংস্কৃতিকে আবিষ্কার করলাম। সংস্কৃতির শক্তিটাকে। এটা শুধু বিনোদনের ব্যাপার না। সংস্কৃতির যে সোলপাওয়ারটা। এটা শুধু মানুষকে কমিউনিকেট করে না, মানুষকে ভেতর থেকে নাড়িয়েও দিতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থাকতে এই অভিজ্ঞতাটা হয়েছিল। এরপর তো ঢাকায় চলে এলাম। স্বাধীন বাংলা বেতারের সঙ্গে যুক্ত হলাম। জয়বাংলা পত্রিকায় কাজ করলাম। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হলাম। এবার বিয়ে করলাম। আমার স্ত্রী পরিবারের পাল্লায় পড়ে ঢাকায় পার্মানেন্টলি চলে এলাম। আবার সেই গাফ্ফার চৌধুরী। দৈনিক আওয়াজ পত্রিকা বের করলেন। আমাকে নিয়ে এলেন।

যদিও আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না সাংবাদিকতা করার। পরে জার্মানিতে যাওয়ার কথা ছিল বিবিসিতে যোগ দিতে। কিন্তু পরে উনি আবার বললেন যে, খবরদার সাংবাদিকতা করো না। কারণ পত্রিকার মালিকের স্বার্থরক্ষা করতে করতে কলমটাও সেরকম হয়ে যাবে। তোমার কোনো স্বকীয়তা থাকবে না। নিয়ত আপোষ করতে হবে তোমাকে। পারবে না তুমি। আর তোমাকে আমি চিনি যতটা তোমার খুব কষ্টকর হবে ব্যাপারটা। বরং তুমি লেখালেখি করো। তুমি বাংলা একাডেমিতে যোগ দাও। আমি বাংলা একাডেমিতে যোগ দিলাম।

আচ্ছা এখানে একটা ব্যাপারে একটু বলি। আপনি সেই যে লুলুম্বাকে নিয়ে একটা কবিতা লিখলেন। এরপর লেখাটা কন্টিনিউ করেননি। মানে নিয়মিত লিখছিলেন তো?

: না। কন্টিনিউ হচ্ছিল না তবে লেখা থেমে ছিল না। সৃজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। সৃজন একটা সংকলন করবে। ফ্র্যাংকলি বলছি আমার অধিকাংশ লেখাই সম্পাদকদের তাগিদে লেখা। এখানে লিখলাম এজমালি শান্তির স্বপক্ষে নামের একটা কবিতা। এরপর এই কবিতাটা আর কোথাও ছাপা হয়নি। আমার কাছেও সংকলনটা নেই যে অগ্রন্থিত কবিতা বলে এটাকে চালিয়ে দেব। এরপর যখন রফিক আজাদ টাঙ্গাইল থেকে এলেন। প্রশান্ত ঘোষাল ছিলেন মুন্সীগঞ্জের। ইমরুল চৌধুরী মুন্সীগঞ্জের। অর্গানাইজ করলেন। স্বাক্ষর বের হল। স্বাক্ষরে যখন লেখালেখি করি তখনি আমার ভেতরও তাগিদ পেলাম। স্বাক্ষর ৪টি বেরিয়েছে সারা জীবনে। আমি যখন ’৭১-এ কলকাতায় গেলাম এটা আমার কাছে বিস্ময়কর ছিল যে বিষ্ণুদে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাকে চেনেন। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না কি এমন লিখেছি তাই না। কটাই বা লেখা ছাপা হয়েছে।

রাজনীতিতে সম্পৃক্ত না হওয়া কি স্বাভাবিক কবি স্বভাব? অনেক কবিকেই দেখা যায় তারা মতামত দেয় কিন্তু তাদের রাজনৈতিক কোনো প্লাটফর্ম থাকে না। বা শেষ পর্যন্ত সেই প্লাটফর্ম তাদের ধরে রাখতে পারে না। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে দেখা গেছে যে, বিশেষ করে যদি পোলিশ কবিদের কথা বলি চেশোয়াভ মিউশ বা ভিসোয়ার্ভা সিম্বোরোস্কা ওনারা মার্কসিজম কায়েম করার জন্য কমিউনিস্টপার্টির হয়ে লড়াই করলেন। কিন্তু দল যখন ক্ষমতায় এল চেশোয়াভ মিউশ চলে গেলেন আমেরিকায়। তিনি লিখলেন কোনো দেশকে ভালোবেসো না, দেশগুলো খুব দ্রুত মানচিত্র বদলায়। কোনো মানুষকে ভালোবেসো না দ্রুত বদলে যায়। বা সিম্বোরোস্কা লিখলেন, মানুষকে ভালোবেসো না তুমি বরং তাদের পছন্দ করতে পারো। যে কোনো পাওয়ার পছন্দ না করার একটা ব্যাপার মনে হয় কবিদের জন্মগত। প্রকৃত কবিদের কথা বলছি। কবিতা যে আসলে একটা শক্তি। যে শব্দের স্তম্ভের উপর ভর করে দাঁড়ায়। কবিতার শক্তির ব্যাপারটা কখন উপলব্ধি করলেন?

: হ্যাঁ, কবিতার শক্তির ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারলাম প্যাট্রিক লুলুম্বাকে নিয়ে কবিতাটা যখন ছাপা হল। জেলখানা থেকে আমি অভিনন্দন পেয়েছিলাম। সংবাদও তখন বহুল প্রচলিত সংবাদপত্র। আধুনিক ও প্রগতিশীল দুই পক্ষই সংবাদ পড়ে। এবং আমি এটাও বলব ধনী-গরিরের পার্থক্য। গরিব হওয়াটা যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। এটা কোনো উত্তরাধিকার নয়। এটা আমার বুঝতে খুব দেরি হয়নি। এটা আমি সেভেন-এইটেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। যদিও জমিদার বাড়ির ছেলে বলে আমি অনেক বেশি ফেভার পেয়েছি। আব্বা এমএলএ ছিলেন সেই জন্যও আমরা মনোযোগ পেয়েছি। তার পরও বলব সাম্প্রদায়িকতা আমাদের পরিবারে ছিল না।

মানে সচ্ছল সামন্তীয় পরিবার হওয়াতে মাল্টিকালচারের ব্যাপারটা ছিল আরকি। আচ্ছা আপনি তো উর্দু কবিতা বা ফিলিস্তিনি কবিতা অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন। দুইটা বইও আছে। তবে এখানে একটা কথা বলা যায়, সেটা হল ইউরোপের বা আমেরিকার কবি-সাহিত্যিকদের লেখা যে পরিমাণ অনুবাদ হয় বাংলায় সেই তিরিশের দশক থেকে শুরু হয়েছে। যা এখনোব্দি চলছে। কিন্তু আরবি কবিতা, পারশিয়ান কবিতা বা মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই কিন্তু শক্তিমান কবিরা আছে। এটাও কি এক ধরনের পলিটিক্স? মডার্নিজমের পলিটিক্স? আমরা ওমর খৈয়াম অনুবাদ করেছি ফিৎজেরাল্ডের ইংরেজি থেকে। অথচ ফার্সি উর্দু কত কাছেই ছিল আমাদের। কত চর্চাই না হয়েছে উপমহাদেশে।

: ফার্সি তো এক সময় রাষ্ট্রভাষাই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের। রুমি সোসাইটি বলে একটা গ্রুপ এটা নিয়ে কাজ করছে। শুধু রুমির উপরে না মরমি সাহিত্য নিয়েই কাজ করছে। যদিও চট্টগ্রাম বেজড কাজ করছে এরা। তারপরে এখানে ইরানিয়ান অ্যাম্বেসি কাজ করছে বিভিন্ন জায়গায় ফার্সি ভাষার কোর্স চালু করার ব্যাপারে। কিন্তু অর্থনৈতিক অবস্থাটা তো ভালো না। কাজেই যতটা করার কথা ততটা পারে না। ওদের ইচ্ছমতো পারছে না। উর্দুর ব্যাপারে বলতে হয় স্কুল-কলেজগুলোতে তো উর্দু পড়ায় না। মাদ্রাসায় যারা পড়ে তাদের কেউ কেউ পড়াশোনা শেষ করে ইউনিভার্সিটির ভাষা বিভাগে উর্দু পড়তে যায়।

এখানে একটু যোগ করি, যে পরিমাণ ইংরেজি শিখছি আমরা সেই পরিমাণ উপমহাদেশের ভাষাগুলো শিখছি না। এটা এই কারণেও হতে পারে যে, আমরা পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়েছি। পাকিস্তানের ভাষা উর্দু এই জন্য? কিন্তু উর্দুভাষার যে শক্তিশালী লেখাজোকা। উর্দুকেন্দি ক যে সুফি সাহিত্য বা বিভিন্ন লিটারারি ডাইমেনশন। তা থেকে তো আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।

: উর্দু সাহিত্য আমাদের এখানে বিকশিত হয়েছিল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমল থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলা দখল করল এর পরই একটু একটু উর্দু চর্চা কমতে লাগল। জাহাঙ্গীরনগর থেকে কিন্তু অনেক আগেই মুর্শিদাবাদ চলে গিয়েছিল রাজধানী। সেটা মুর্শিদকুলি খানের আমলে। তারপর রাজধানী যখন কলকাতা হল ১৯০৫ পর্যন্ত অলইন্ডিয়া রাজধানী তো কলকাতাই ছিল। এর পরও কিন্তু ঢাকাতে উর্দু সাহিত্যের চর্চা ছিল। পাকিস্তান আমলে তারা বাড়াবাড়ি করায় উর্দুর উপর একটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ তো আরোপিত হলই। আন্দালিব শার্দানির মতো কবি চলে আসছিলেন। রেজা আলি বারসাতের মতো কবি চলে আসছিলেন। নওশাদ নূরির মতো কবি চলে আসছিলেন এই ঢাকাতে। আতাউর রহমান জেমিল চলে এসেছিলেন। কাজেই এখানে উর্দু সাহিত্য চর্চা বিকশিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। আসলাম উদাসের একটা বই ১৯৬৫ সালে বেরোয়। ঢাকা থেকে বেরোয়। নিশ্চয়ই মাগরিবে পাকিস্তান বা মাশরিকে পাকিস্তান লেখার কথা ছিল লিখছে বাংলাদেশকি মশহুর শায়ের। ’৬৫তে বাংলাদেশি মশহুর শায়ের বলাটা উর্দু বইতে এত সহজ ছিল না। এদের মধ্যে সেই চেতনাবোধটা ছিল। কিন্তু যে কথাটা আপনি বললেন, ফয়েজ আহমদ ফয়েজের রুশ অনুবাদক যিনি। তার একটা লেখা কিছুদিন আগে আমার পড়ার সুযোগ হল। সেখানে তিনি বললেন। ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ বলেছিলেন যে, উর্দু মুসলমানের ভাষা না। উর্দু ভারতেরও বড় ভাষা। কিন্তু অনেকেরই ধারণা যে উর্দু মুসলমানদের ভাষা। যেমন একটা বইয়ের কথা বলি যেটার নখ থেকে চুল পর্যন্ত আগাগোড়াই আমার প্রিয়, শঙ্খ ঘোষ ও আলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত সম্পাদিত সপ্তসিন্ধু ও দশদিগন্ত। সেখানে কিন্তু ইরানের বা আরবের কোনো কবিতা নেই।

হ্যাঁ আমি তো সেটাই বলছি যে, এটা মডার্নিজমের রাজনীতি কি না?

: হ্যাঁ, এই কথাটা এতদিন পর আমার কেন মনে পড়ল? যে ইরান নেই কেন, আরব নেই কেন, ভারত নেই কেন? তাহলে মুসলিম দেশ বলেই কি এদের কবিতা খারিজ হয়ে যাবে? এটা আমার মনে হয়েছে যে, একটা কারণ আছে এর। ইরানি আরবি ইত্যাদিকে অনাধুনিক মনে হয়েছে তাদের।

তাহলে এখানে সেই কথাটিই আসবে যে, আধুনিকতাও পলিটিক্যাল টার্ম। যেটা বিশেষ করে লিটারারি মুভমেন্টগুলোর ভেতর দিয়ে রিফর্ম করেছে। আধুনিকতার নির্দিষ্ট প্রডিউসাররা আছেন। যারা আধুনিকতার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন।

: হুম। আমি একটা কথা বলি আমাদের এখানে যখন বলা হয় মধ্যযুগ তখন, কিন্তু ইউরোপীয় মধ্যযুগের কথাই বলা হয়। যখন ডাইনি পোড়ানোর নাম করে নারীদের পোড়ানো হতো। ক্রুশিফাই করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মধ্যযুগ হচ্ছে মোস্ট ব্রিলিয়ান্ট, কালারফুল, এনলাইটমেন্ট। রামায়ণ-মহাভারতের মতো মহাকাব্য রচিত হয়েছে। আজকে পাহাড়পুর বা ময়নামতির খবর আমরা জানি। কিন্তু সারা বাংলায় এ রকম দশ থেকে পনেরোটা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তখন। বলতেই হয় বৌদ্ধদের পরিচালনায়। মুঘল আমলে বাংলাভাষার অগ্রগতিটা কিছুটা রুদ্ধ হল। মুসলমানদের ভেতর আশরাফ-আতরাফ এসে গেল।

না আমার মনে হয় এটা তো শ্রেণীপ্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। সামন্তীয় যুগের পূর্ণ বিকাশ হচ্ছে তখন এখানে। অথচ ইউরোপে তখন বুর্জোয়া যুগের শুরু।

: সৈয়দ, মির, খন্দকার এরা উপরের ক্লাসের যারা কনভার্টেট মুসলিম আহমদ ছফার ভাষায় যারা ‘ডেড়া’। আমরা তো ডেড়া থেকে মুসলমান হওয়া। ডেড়াটা আহমদ ছফার ভাষা মানে চট্টগ্রামের ভাষা। এই পার্থক্য এলো মুঘল আমলে কিন্তু তার আগে সুলতানি আমলে এই পার্থক্য ছিল না। ইংরেজদের আমলে এক ধরনের ক্লাস ডেভেলপ করল। মিডল ক্লাসের প্রসার ঘটল। এই মিডল ক্লাসে মুসলমানদের সংখ্যা খুবই কম ছিল। যদিও সৈয়দ আমির আলির মতো লোক এসে গেছে। কী ব্রিলিয়ান্ট, প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন অনেক বছর। তিনি উর্দুর সপক্ষে ছিলেন। আমাদের জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব তিনি একটা জায়গায় সৈয়দ আহমদকে সম্মান দেখালেন যে, তিনি উর্দু চর্চা করেছিলেন। বাঙালি মুসলমান বাংলাভাষাকে নিয়েছে অনেক পরে। এমনকি বাংলা বর্ণমালাকে পর্যন্ত হিন্দুয়ানি বলা হয়েছে। যে কারণে আলাওলের অধিকাংশ ম্যানস্ক্রিপ্টই আরবি অ্যাকসেন্টে লেখা। সেখান থেকে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আহমদ শরীফ- এরা কিছু কিছু কম্পাইল করেছেন। আমাদের এই যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, বিশেষ করে এখন যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস সেটা সোসিওপলিটিক্যাল রিজনে হচ্ছে বলে আমার মনে হয়। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, আমরা চাই বা না চাই ভারতের যে কোনো তরঙ্গ এসে আঘাত করে আমাদের। আমাদের তরঙ্গ ভারতের মতো একটা বিশাল দেশের কোথাও কোনো আঘাত করার কারণ নেই। কাজেই আমরা খুব সহজেই প্রভাবিত হই। আমাদের এখানে চাই বা না চাই, পাখি জামার জন্য মেয়েরা আত্মহত্যা করে। কিরণমালা জামার জন্য পাগল হয়ে গেছে মানুষ। এই যে ভারতের টেলিভিশনের সিরিয়ালগুলোর জন্য পাগল এখানে মানুষ এবং আরেকটা কথা হচ্ছে, ওখানকার সিরিয়াল বা সিনেমায় কোনো না কোনোভাবে তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ থাকে। কিন্তু তাতে তাদের সেকুলারিজমের কোনো হ্যাম্পার হয় না। কিন্তু আমাদের কোনো একটা নাটকে বা সিনেমায় কেউ টুপি পরে আসছে বা হাতে তজবি নিয়ে আসছে তাকে ভিলেন বানানো হচ্ছে। সে একটা ভিলেন হয়ে যাচ্ছে। এটা কি আইডেন্টিটি ক্রাইসিস? যে কোনো কারণেই হোক না কেন এই বিশ্বায়নের যুগে আমেরিকা বা অন্যরা মিলিয়ে আমাদের ভেতর এই ক্রাইসিস তৈরি করেছে। এবং এটা আমাদের মতো ভুল রাজনীতির দেশে চাউর হয় বেশি। মানতেই হবে। মানুষকে তো সম্মান দিতে জানতে হবে। রাজনীতির প্রথম শর্ত হচ্ছে, মানুষকে কর্মভিত্তিক কর্মসূচি দিতে হবে। রাজনীতি তো জনগণের জন্যই, জনগণকে নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। আমাদের এখানে যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকব এটাই হচ্ছে রাজনীতি। এবং ক্ষমতায় যাবই এটা হচ্ছে রাজনীতি। আর সাম্প্রদায়িকতা বা জাতীয়তাবাদ এগুলো তো রাজনৈতিক হাতিয়ার।

আমি একটু ইন্টারফেয়ার করি আসাদ ভাই। দুনিয়ার প্রায় প্রত্যেক দেশেই এই বিশ্বায়নের মোড়লরা তাদের নাকগলায়। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। যেমন বিশ্বায়নের মোড়লদের যে ডেমোক্রেসির ফর্ম এটা আসলে ফেক মনে হয়। এটার ভেতরে কিছু নেই। ডেমোক্রেসি আসলে একধরনের ফেনোমেনা। রফতানিযোগ্য পণ্য। এটা সারাবিশ্বে সাপ্লাই করছে কর্পোরেটোক্রেসি। এটার নামে অনেক আকাম করা যায়। এটাকে পশ্চিমা মিডিয়া প্রায় ঈশ্বর সমতুল্য করে ছেড়েছে। সারা দুনিয়ায় গরিব দেশগুলো ডেমোক্রেসি ডেমোক্রেসি বলে গলা ফাটাচ্ছে। বস্তুত এটার ছত্রছায়ায় যেভাবে মোড়লরা লাভবান হবে সেই চিন্তাটাই লুকিয়ে থাকে। একদিকে মুনাফা অন্যদিকে তাদের সমর্থন বাড়ানো। তো এই যে কথায় কথায় ভারতকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ। সে গণতন্ত্র কোথায়? বাংলাদেশে আমাদের নাভিশ্বাস উঠছে অথচ ভারতের চেয়ে নাকি বিভিন্ন দিকে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে, তাহলে বোঝেন ভারতীয় জনগণের কী অবস্থা? এগুলো মোড়লদের ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের মনগড়া পরিসংখ্যান। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নাগাল্যান্ডের নাগারা, ঝাড়খণ্ডে মাওবাদিদের যে তৎপরতা সেটা তো ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতার দখলের জন্য নয়, সেটা তাদের জাতীয়তাবাদ রক্ষার জন্য। রাষ্ট্রের হাত-পা থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু সাবকন্টিনেন্টে ভারতের বিশাল পুঁজি তৎপর। আপনি যে কথাটা বললেন যে, মেয়েরা সিরিয়ালের পোশাকের জন্য আত্মহত্যা করছে। আমি আরেকটু যোগ করতে চাই যে, আমাদের এখানে দূরপাল্লার বাসে, বিয়েবাড়ির মেহেদি অনুষ্ঠানে, এমনকি একুশে ফেব্রুয়ারি বা ষোলোই ডিসেম্বরও এখন উদ্যাপন করা হচ্ছে রাস্তার মাঝখানে বিশাল সাউন্ড সিস্টেমে ভারতীয় সিনেমার আইটেম সং শিলা কি জওয়ানি, মুন্নি কি বদনামি ইত্যাদি বাজিয়ে। শুধু কি তাই বাংলাদেশের এমন একটা পণ্যের নাম বলেন যেটার একটা অলটারনেটিভ ভারতীয় পণ্য নেই?

: হ্যাঁ, এটা ডেভেলপমেন্টের নামে করা সড়ক ব্যবস্থার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বিপুল পরিমাণ টাকা রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য ব্রিজ নির্মাণের জন্য ব্যয় হয়েছে। প্রধানত এগুলো করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় এবং বিশ্বব্যাংক চেয়েছে জাপানি গাড়ি হোক ইউরোপের গাড়ি হোক, গাড়ি বিক্রি করতে হবে। পরিষ্কার হিসাব। অথচ এর একশ’ ভাগের এক ভাগ যদি খরচ হতো নদী পরিবহন উন্নয়ন করার জন্য তাহলে যাতায়াতটা øেœা হতো কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু লাভ যেটা হতো সেটা হচ্ছে পরিবহন খরচ কমতো। নদীর নাব্যতা থাকত। পরিবেশের ক্ষতি হতো না তেমন। পেট্রলের গাড়ি বা গ্যাসের গাড়ি বা ট্রেনের বগির যেই পরিবহন কস্ট সেটা যে কোনো ধরনের নৌকায় পরিবহন করলে তার দশ ভাগের এক ভাগ খরচ পড়ত।

এটাই বোধহয় মার্কস কমিউনিস্ট মেনোফেস্টোতে বলেছিলেন বুর্জোয়ারা তাদের পণ্য ও উৎপাদনের কাঁচামালের জন্য সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়। পৃথিবীজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

: বিদ্যুতায়নের ক্ষেত্রেও তাই। এত ইলেকট্রিক্যাল গুডস কোথায় বিক্রি করবে? এত টেলিভিশন সেট উন্নত বিশ্বে কয়টা করে কিনবে? অনেক ধরনের ইলেকট্রিক্যাল পণ্য তারা কোথায় বেচবে। যেহেতু তৃতীয় বিশ্বে এই সুযোগটা আছে। কিছু লোকের হাতে এজেন্সি নেয়ার মতো পয়সা আছে। আমাদের এখানে এলে এটা শুরু হয়েছে আইয়ুব খানের আমলে। কন্ট্রাকটরির নাম করে কিছু লোক ধনী হয়েছে। ওখানে নাজমুল করিমের মতো একজন সমাজবিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন বিশ বছর পর রাজনীতি এদের হাতে থাকবে। আজকে যখন আমরা রাজনীতি দেখি ১৯৭৭-এর অ্যামেন্ডমেন্ট জিয়াউর রহমান করে গেছেন সেটা কী, সমাজতন্ত্র বাদ। তার মানে কী, আমরা মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ঢুকলাম। আর বিএনপি যখন বলে যে, আমরা একাত্তরের চেতনায় উদ্দীপ্ত এটা তো ভুল। এই মুক্তবাজার অর্থনীতি একাত্তরের চেতনার মধ্যে ছিলই না। জিয়াউর রহমান ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করলেন।

একাত্তরের পরে সত্তর-আশির দশকের দিকে আমাদের সাহিত্য যেভাবে এগিয়ে গিয়েছিল যে প্রবল একটা জীবনমুখিনতা ছিল। পেইন্টিংয়ে, কবিতায়, সাহিত্যে সেটা পরে মন্থর হয়ে গেল কেন? পেইন্টিংয়েই সম্ভবত সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে আমাদের সংস্কৃতি, কিন্তু সঙ্গীতে? এখন তো ক্যাওটিক ছাড়া মনে রাখার মতো কোনো কিছু পেয়েছি বলে মনে হয় না। হ

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter