উগ্রবাদের যুগে ‘গোরা’র প্রাসঙ্গিকতা

  রাজীব সরকার ০৪ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিখ্যাত ‘ধর্মমোহ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ

বিখ্যাত ‘ধর্মমোহ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।’ কবিতার শেষ দুই পঙ্ক্তি- ‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো/এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’

এই অসামান্য কবিতাটি যখন রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন তখন ভারতীয় সমাজমানস যেসব দুষ্টক্ষতে জর্জরিত ছিল তার অন্যতম ছিল ধর্মাশ্রিত সাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মীয় উগ্রবাদ। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ একজন সমাজবিজ্ঞানীর মতো ভেবেছেন। গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, প্রবন্ধে, নাটকে, অভিভাষণে অসংখ্যবার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। সমাধানের উপায়ও নির্দেশ করেছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বলিষ্ঠ সৃষ্টি ‘গোরা’ উপন্যাস।

১৯১০ সালে রচিত এ উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের বৃহত্তম উপন্যাস। কলকাতার বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকার বিচারে এটি রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস। এ উপন্যাসের উপজীব্য ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে সংঘটিত ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন, সামাজিক অধিকার, দেশপ্রেম ও নারীমুক্তি।

‘গোরা’ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র গোরার সঙ্গে অন্য চরিত্রগুলোর প্রাণবন্ত বিতর্কে সত্যের বিভিন্ন রূপ প্রকাশিত হয়েছে। কখনও এ বিতর্ক বিনয়ের সঙ্গে, কখনও পরেশবাবু, হারানবাবুর সঙ্গে কখনোবা প্রিয়তমা সুচরিতার সঙ্গে। এমনকি অসহায় মুসলমান ফেরিওয়ালার সঙ্গে গোরার কথোপকথনও শিক্ষণীয়।

সেই বৃদ্ধ মুসলমান মাথায় এক-ঝাঁকা ফল সবজি রুটি মাখন প্রভৃতি খাবার নিয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক ধনাঢ্য ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে তার সামনে এসে পড়ে। বৃদ্ধ প্রাণে বেঁচে যায় কিন্তু তার বহন করা আহার্য সামগ্রী রাস্তায় পড়ে নষ্ট হয়। শুধু তাই নয়, সেই ধনাঢ্য ব্যক্তি তাকে গালিগালাজ করতে করতে চাবুক মেরে তাকে রক্তাক্ত করে। গোরা সেই অসহায় বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে কেন সে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেনি। বৃদ্ধ বলে যে, দোষীকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন। গোরা জবাবে বলে, ‘যে অন্যায় সহ্য করে সেও দোষী। কেননা, সে জগতে অন্যায়ের সৃষ্টি করে। আমার কথা বুঝবে না, তবু মনে রেখো ভালোমানুষি ধর্ম নয়, তাতে দুষ্ট মানুষকে বাড়িয়ে তোলে, তোমাদের মহম্মদ সে কথা বুঝতেন তাই তিনি ভালোমানুষ সেজে ধর্মপ্রচার করেননি।’

পুরো উপন্যাসে গোরার শারীরিক ও মানসিক জোরের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এ জোর সবসময় যুক্তির নয়, কখনও কখনও জোরের যুক্তিও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু যে কারণে গোরার অসাধারণত্ব কারও দৃষ্টি এড়ায় না তা হচ্ছে তার নিখাদ দেশপ্রেম। এই গুণ থেকেই সে শোষিত, নিপীড়িতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কারাবরণ করে। ভারতবর্ষ আর হিন্দুত্ববাদ সমার্থক- এমন যুক্তিবর্জিত দার্শনিকতা নিয়ে জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় করে গোরা। কিন্তু তৃণমূলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মেলামেশার অভিজ্ঞতা তাকে নতুন সত্যের মুখোমুখি করে। অত্যাচারী হিন্দু নয়, অত্যচারিত মুসলমানকে সে আত্মীয় মনে করে- ‘পবিত্রতাকে বাহিরের জিনিস করিয়া তুলিয়া ভারতবর্ষে আমরা এ কী ভয়ংকর অধর্ম করিতেছি। উৎপাত ডাকিয়া আনিয়া মুসলমানকে যে লোক পীড়ন করিতেছে তাহারই ঘরে আমার জাত থাকিবে যে, আর উৎপাত স্বীকার করিয়া মুসলমানের ছেলেকে যে রক্ষা করিতেছে এবং সমাজের নিন্দাও বহন করিতে প্রস্তুত হইয়াছে তাহারই ঘরে আমার জাত নষ্ট হইবে।’

পবিত্রতাকে বাইরের জিনিসে রূপান্তরিত করার এই ব্যাধি থেকে এখনও আমরা মুক্ত হতে পারিনি। উপমহাদেশের বর্তমান চিত্রই এর প্রমাণ। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে ভারতে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের একাধিক শীর্ষনেতা ‘হিন্দু’ ও ‘ভারতীয়’ কে সমার্থক মনে করেন। ভারত যে বহুজাতি, বহুধর্ম, বহুভাষার দেশ- এই সর্বভারতীয় ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে দেশটি। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার যে কত আত্মঘাতী হতে পারে এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পাকিস্তান। বর্বর প্রথা, জঙ্গিবাদের ছোবলে পাকিস্থানের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। ধর্মান্ধ, মৌলবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভিত্তি করে একটি উদার, ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রা করেছিল। কিন্তু সাড়ে তিন বছরের মাথায় পাকিস্তানের ভূত চেপে বসে বাংলাদেশের ঘাড়ে। ধর্মাশ্রিত রাজনীতি এদেশেও শেকড় গেঁড়ে বসে। বলতে দ্বিধা নেই, এ বিপজ্জনক রাজনীতির ফাঁদে এদেশের অনেক সাধারণ মানুষ পা দিয়েছে। তাই যখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করা হয় একজন যুদ্ধাপরাধীকে চাঁদে দেখা গেছে তখন হাজার হাজার উন্মত্ত মানুষ তা বিশ্বাস করে। এমনকি নিরীহ পাঠ্যপুস্তক থেকে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম অপসারণের দাবি করে কোনো কোনো গোষ্ঠী এই অজুহাতে যে এই সাহিত্যকর্মের রচয়িতাগণ অমুসলিম। এমন অযৌক্তিক ও মূঢ় আবদারের পশ্চাতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে। এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন প্রগতিশীল লেখক- বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই। সমাধানের উপায়ও নির্দেশ করেছেন তারা। কিন্তু ‘গোরা’ উপন্যাসের উপসংহারে রবীন্দ্রনাথ যে সমাধান দিয়েছেন এর চেয়ে উৎকৃষ্ট ঔষধ আর নেই। যে হিন্দুত্বের অহংকারে গোরা গরিয়ান ছিল, একদিন জানতে পারল সে হিন্দুই নয়, সে এক আইরিশ দম্পতির সন্তান। নিজের ভুল বুঝতে পেরে পরেশবাবুকে গোরা বলেছিল-

‘আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই, যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন- যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’

উগ্রবাদের উন্মাদনা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য গোরার উপরোক্ত উপলব্ধির কোনো বিকল্প আছে কি?

‘গোরা’ উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় আরও বিস্ময় অপেক্ষা করে পাঠকের জন্য। জাতিভেদকে সøেহে মনের মধ্যে এতকাল লালন করে এসেছে গোরা। মা আনন্দময়ীর ঘরে সে খেতে চায়নি খ্রিস্টান দাসী লছমিয়া সেখানে থাকে বলে। আনন্দময়ীর ঔদার্যকে কখনও মেনে নিতে পারেনি সে। কিন্তু গোরার জন্ম রহস্য উন্মোচন তার অন্তর্দৃষ্টিকে প্রসারিত করে। আনন্দময়ীকে সে বলে-

‘মা, তুমিই আমার মা! যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসেছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই- শুধুু তুমি কল্যাণের প্রতিমা! তুমিই আমার ভারতবর্ষ!.....’

এটুকু বলেই গোরা ক্ষান্ত হয়নি। সেই দাসী লছমিয়ার হাতে জল খেতে চেয়েছে। এভাবে শুধু সাম্প্রদায়িকতা নয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও স্বাজাত্যবোধের মূলেও আঘাত হেনেছে গোরা। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’- এই অনন্য উপলব্ধিতে চিরভাস্বর উপন্যাস ‘গোরা।’ হ

আরও পড়ুন
pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.