রবীন্দ্রনাথ ও রেনেসাঁস
jugantor
রবীন্দ্রনাথ ও রেনেসাঁস

  রাজীব সরকার  

০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইতালিতে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীজুড়ে রেনেসাঁসের ঢেউ আছড়ে পড়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। রেনেসাঁসের বহুমাত্রিক ইতিবাচকতা থাকলেও যেটি মূল বৈশিষ্ট্য হিসাবে রেনেসাঁসকে চিহ্নিত করে সেটি হলো মানবমুখিনতা বা মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর আগে ধর্মীয় সংস্কার, দৈব বা অলৌকিকের ওপর ভিত্তি করে মানুষের চিন্তা জগৎ আবর্তিত হতো। রেনেসাঁসের আলো সেই বদ্ধ দুয়ারে সজোরে ধাক্কা দেয়। শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান তথা সৃজনশীল ও মননশীলতার জগতে যুগান্তর এনে দেয় রেনেসাঁস।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অসাধারণ বাঁক বদলকারী রেনেসাঁস সংঘটনের পেছনে কয়েকজন অনন্য সাধারণ মনীষীর অবদান ক্রিয়াশীল ছিল। মানবমুখিনতা ও শিল্পচেতনা এ দুই দিক থেকে তারা মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কীর্তিমান দু’জন হলেন ফ্রানসেসকো পেত্রার্কা (১৩০৪-১৩৭৪) ও লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯)। রেনেসাঁসের প্রভাবে সেক্যুলার বা ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত ঘটে। কুসংস্কারের বদলে যুক্তিবাদ, অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্কতা মানুষের চিত্তলোকের মুক্তি ঘটায়। উনিশ শতকে তৎকালীন ভারতবর্ষের রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিম, বিবেকানন্দের মতো মনীষীর আবির্ভাবে বাংলার চিন্তা ও কর্মজগতে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা এ আলোড়নকে অভিহিত করেছেন ‘বাংলার রেনেসাঁস’ হিসাবে। যদিও এটি রেনেসাঁস কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো ইতিহাসবিদ। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে, সে সময় সমগ্র ভারতবর্ষে শতাব্দীব্যাপী বাঙালি মনীষার দ্যুতিময় উপস্থিতি দেশবাসীকে অন্ধকার থেকে আলোক রেখায় উত্তরণের পথ নির্দেশ করেছিল।

বুর্খহার্ট তার রেনেসাঁস সংক্রান্ত বিখ্যাত বইয়ে রেনেসাঁসকে ব্যক্তি প্রতিভার বিস্ফোরণের যুগ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। উনিশ শতকের ভারতীয় রেনেসাঁসেও ব্যক্তিপ্রতিভার বিস্ফোরণের দেখা মেলে। রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসে বাংলায় যে উজ্জ্বল প্রতিভার মিছিল দৃশ্যমান এর তুলনা সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর নেই। ধর্ম ও সমাজসংস্কারে, শিক্ষাদীক্ষায়, নারী উন্নয়নে, মানবসেবায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষে, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে, আধুনিক ধ্যান-ধারণায়, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন বহুমুখী জাগরণ আর কখনো দেখা যায়নি ভারতবর্ষে।

ইতালির চেয়েও স্বল্প সময়ব্যাপী বিস্তৃত বাংলার রেনেসাঁস সৃজনশীল ও মননশীল প্রতিভার বিচ্ছুরণে শিক্ষিত ভারতবাসী আলোকিত হয়েছিল। রামমোহন রায়কে দিয়ে যে রেনেসাঁসের সূচনা, রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত উৎকর্ষ ঘটে। রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে এ রেনেসাঁসের অন্যতম স্রষ্টা ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ইতালির রেনেসাঁসের ইতিহাসে পেত্রার্কা ও ভিঞ্চি যে ভূমিকা পালন করেছেন, বাংলার রেনেসাঁসেও রবীন্দ্রনাথও সেই ভূমিকা পালন করেছেন।

ইতালির রেনেসাঁসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের দৃষ্টিকে অপার্থিব বা অলৌকিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে জাগতিক ও মানবিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। মধ্যযুগে মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরলোক, ধর্মসাধনা ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতি; জাগতিক ও মানবিক চিন্তাধারা তখন উপেক্ষিত হয়েছে, প্রাধান্য পেয়েছে বিষয় বৈরাগ্য ও সন্ন্যাস। রেনেসাঁস এ দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দেয়। জাগতিক ও মানবমুখিনতার প্রতি নবজাগ্রত এ আগ্রহ ইতিহাসে Humanism নামে অভিহিত হয়েছে। ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রবর্তক পেত্রার্কাকে বলা হয়েছে First of the humanists. Humanism বা মানবমুখিনতার প্রতি প্রবল আগ্রহ রবীন্দ্রনাথ বরাবরই পোষণ করে এসেছেন। ‘কড়ি ও কোমলে’র যুগে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন-‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।’ জীবন ও জগতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই অনুরাগ পরবর্তীকালে গভীরতর হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’-এর কবি, তিনি ‘বসুন্ধরা’র কবি। ‘মায়াবাদ’ ও ‘বৈরাগ্যসাধন’ কখনো তার চিন্তালোকে ঠাঁই পায়নি-‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়/ অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়/ লভিব মুক্তির স্বাদ।’

রেনেসাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ অবলোকন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল ইতালীয় রেনেসাঁসে। তখন ইতালি প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন সংস্কৃতির নিবিড় চর্চায় নিয়োজিত ছিল। রামমোহন বেদান্ত ও উপনিষদ অনুবাদের মধ্য দিয়ে যার সূচনা করেছিলেন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল ও বঙ্কিম তাদের অনুবাদমূলক ও সৃজনশীল গদ্য-পদ্য চর্চার মধ্য দিয়ে যে বিস্মৃত প্রায় প্রাচীন মনন ও সৌন্দয চর্চাকে পুনর্জীবিত করতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ একে পরিপূর্ণতা দান করেছেন তার জীবনব্যাপী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাধনার মাধ্যমে।

ভারতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কারণে রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধার সঙ্গে অবলোকন করেছেন গৌতম বুদ্ধের অবদানকে। কালিদাস ও অশোকের মহিমা কীর্তন করেছেন। বেদ, উপনিষদ তার অন্তর্জগতকে সমৃদ্ধ করেছে, মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত তার সৃজনশীলতার গুণে নবরূপ লাভ করেছে। অর্থাৎ রেনেসাঁসের অন্যতম যে শর্ত ঐতিহ্যের নবায়ন তা সার্থকভাবে ঘটেছে তার সাহিত্যে। বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিমের কীর্তি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তাদের সার্থক উত্তরসূরী হিসাবে রেনেসাঁসের সর্বোচ্চ পরিণতিতে উপনীত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

‘চারিত্রপূজা’ গ্রন্থে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের ভূমিকার মূল্যায়ন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই মূল্যায়ন এত প্রাসঙ্গিক যে পরবর্তীকালের লেখক গবেষকরা বারবার রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেছেন। রামমোহন সম্পর্কে তার মূল্যায়ন,‘রামমোহন রায় যখন ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেন তখন এখানে চতুর্দিকে কালরাত্রির অন্ধকার বিরাজ করিতেছিল। আকাশে মৃত্যু বিচরণ করিতেছিল। মিথ্যা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে তাহাকে সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল।...কী সংকটের সময়েই তিনি জন্মিয়াছিলেন। তাহার একদিকে হিন্দু সমাজের তটভূমি জীর্ণ হইয়া পড়িতেছিল, আর একদিকে বিদেশীয় সভ্যতা সাগরের প্রচণ্ড বন্যা বিদ্যুৎবেগে অগ্রসর হইতেছিল, রামমোহন তাহার অটল মহত্ত্বে মাঝখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন।’

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যাসাগর এ অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফূট করিয়া যে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা বাংলার ইতিহাসে অতি বিরল। এত বিরল যে, এক শতাব্দী কাল মধ্যে কেবল আর দুই-একজনের নাম মনে পড়ে।...যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়া ছিলেন, তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না, তিনিই ইংরেজি বিদ্যাকে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।’

রামমোহন ও বিদ্যাসাগরকে একই বন্ধনীতে রেখে বলেছেন-‘একদিকে যেমন তাহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপরদিকে ইউরোপীয় প্রকৃতির সহিত তাহাদের চরিত্রের বিস্তর নিকট সাদৃশ্য দেখিতে পাই। বেশভূষায়, আচারে ব্যবহারে তাহারা সম্পূর্ণ বাঙালি ছিলেন। স্বজাতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে তাহাদের সমতুল্য কেহ ছিল না। স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূল পত্তন তাহারাই করিয়া গিয়াছেন-নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাহারা বিশেষরূপে ইউরোপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন।’

বাংলার রেনেসাঁসে বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক চেতনার আলোকে জীবনকে পরিশ্রুত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ। এর পাশাপাশি সেক্যুলার মানবতাবাদের পতাকা বহন করেছিলেন ডিরোজিও, ইয়ং বেঙ্গল, অক্ষয়কুমার দত্ত, বিদ্যাসাগর প্রমুখ। এ দুই ধারার দূরত্ব মোচন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার আবির্ভাব ঘটেছিল বিশ্বাসনিষ্ঠ আধ্যাত্মিকতার পথ ধরে। কিন্তু সেক্যুলার মানবতাবাদের অনুসারীদের তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ করেছিলেন। ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’র কবি ‘ধর্মমোহ’নামক অবিস্মরণীয় কবিতায় লিখেছেন, ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সেজন শুধু মারে আর মরে।/ নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,/ ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর/শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো/ শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।’

বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দের মতো রেনেসাঁসপুরুষদের রচনার কোনো কোনো অংশে স্বদেশ ও স্বধর্ম একাকার হয়ে গিয়েছিল। শশধর তর্কচূড়ামণির ভূমিকায় এরই পথ ধরে হিন্দু রিভাইভ্যালিজমের উত্থান ঘটে উনিশ শতকের শেষ ভাগে। হিন্দুত্বের অভিমানযুক্ত স্বাদেশিকতার আবেগ রবীন্দ্রনাথকে গ্রাস করতে না পারলেও ক্ষণিকের জন্য স্পর্শ করেছিল। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ বলেই সেই বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি ‘কালান্তর’ এ বলেন, ‘ধর্মের মিলেই যে দেশে মানুষকে মিলায়, সে দেশ হতভাগ্য।’ ‘গোরা’ উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের সেই মোহমুক্তির ফসল। হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বকে সমার্থক করে রিভাইভ্যালিজমের কল্যাণে যে জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটেছিল, ‘গোরা’ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি সেই মোহ থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করলেন। উপন্যাসের উপসংহারের গোরা বলছে, ‘আপনি আমাকে সেই দেবতার মন্ত্র দিন যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিষ্টান ব্রাহ্ম সকলেরই-যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না। যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’

উনিশ শতকের শেষভাগে হিন্দু রিভ্যাইভ্যালিজমের পাশাপাশি মুসলিম রিভ্যাইভ্যালিজমও দানা বাঁধতে শুরু করে। হিন্দু রিভ্যাইভ্যালিস্ট ও মুসলিম রিভ্যাইভ্যালিস্টরা যখন স্বজাতিকে পরস্পর-নিরপেক্ষ স্বাতন্ত্র্যের দিকে টান দিচ্ছেন তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, ভারতীয় সংস্কৃতি হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি। বাংলার রেনেসাঁসের ইতিহাস হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের রিভ্যাইভ্যালিস্টদের দ্বারা কণ্টকিত হয়েছিল। সেই কাঁটা অপসারণ করে রেনেসাঁসকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেন রবীন্দ্রনাথ। এভাবেই বাংলার রেনেসাঁসের ফলবতী ধারাকে দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা করেন তিনি।

রেনেসাঁসের প্রকৃতিগত কারণেই নগর ও গ্রামের মধ্যে বিভেদের বীজ রোপিত হয়। এটি যেমন ইতালীয় রেনেসাঁসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য বাংলার রেনেসাঁসের ক্ষেত্রেও। ইতালীয় রেনেসাঁসের অবিসংবাদিত পুরুষ পেত্রার্কা, ভিঞ্চি বা অন্য কোনো শিল্পী বঞ্চিত, নিপীড়িতদের সমর্থনে বিবেকবোধ জাগ্রত রেখেছিলেন কিনা তা আমরা জানি না। বাংলার রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠ শিল্পী রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে/ দিতে হবে ভাষা; এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে/ ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা’।

ছোটগল্পে, নাটকে, প্রবন্ধেও শোষিত এবং অবহেলিত প্রান্তজনের অধিকারের বলিষ্ঠ প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথ। ‘কালের যাত্রা’, ‘রথের রশি’, ‘মুক্তধারা’, ‘রক্তকরবী’ নাটকে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীকে আঘাত করে নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়েছেন। ‘রথযাত্রা’ নাটকে শুদ্র তথা কৃষক শ্রমিকদের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর অবিস্মরণীয় ‘আমরাই তো জোগায়েছি অন্ন, তাই খেয়ে তোমরা বেঁচে আছ। আমরা বুনছি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জারক্ষা।’ শুধু লেখনীতে নয়, কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়েও দরিদ্র কৃষকদের দুঃখ মোচনের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহ, পতিসরসহ নানা স্থানে তার প্রজাহিতৈষী কর্মযজ্ঞে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হয়েছে।

বাংলার রেনেসাঁসের সবচেয়ে সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ। রেনেসাঁসের দুই চেতনা অর্থাৎ মানবমুখিনতা ও শিল্পচেতনা উভয়কেই তিনি উচ্চ সাফল্যের সঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তার মধ্যে একই সঙ্গে পেত্রার্কা ও ভিঞ্চির প্রতিভার সমন্বয় ঘটেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের কীর্তিকে অনুধাবন করলেই বাংলা তথা ভারতীয় রেনেসাঁসের ভূমিকা বোঝা সহজ হবে।

রবীন্দ্রনাথ ও রেনেসাঁস

 রাজীব সরকার 
০৬ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইতালিতে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সূত্রপাত ঘটে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীজুড়ে রেনেসাঁসের ঢেউ আছড়ে পড়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। রেনেসাঁসের বহুমাত্রিক ইতিবাচকতা থাকলেও যেটি মূল বৈশিষ্ট্য হিসাবে রেনেসাঁসকে চিহ্নিত করে সেটি হলো মানবমুখিনতা বা মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এর আগে ধর্মীয় সংস্কার, দৈব বা অলৌকিকের ওপর ভিত্তি করে মানুষের চিন্তা জগৎ আবর্তিত হতো। রেনেসাঁসের আলো সেই বদ্ধ দুয়ারে সজোরে ধাক্কা দেয়। শিল্প, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান তথা সৃজনশীল ও মননশীলতার জগতে যুগান্তর এনে দেয় রেনেসাঁস।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অসাধারণ বাঁক বদলকারী রেনেসাঁস সংঘটনের পেছনে কয়েকজন অনন্য সাধারণ মনীষীর অবদান ক্রিয়াশীল ছিল। মানবমুখিনতা ও শিল্পচেতনা এ দুই দিক থেকে তারা মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে কীর্তিমান দু’জন হলেন ফ্রানসেসকো পেত্রার্কা (১৩০৪-১৩৭৪) ও লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯)। রেনেসাঁসের প্রভাবে সেক্যুলার বা ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত ঘটে। কুসংস্কারের বদলে যুক্তিবাদ, অন্ধবিশ্বাসের পরিবর্তে বিজ্ঞানমনস্কতা মানুষের চিত্তলোকের মুক্তি ঘটায়। উনিশ শতকে তৎকালীন ভারতবর্ষের রামমোহন, ডিরোজিও, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিম, বিবেকানন্দের মতো মনীষীর আবির্ভাবে বাংলার চিন্তা ও কর্মজগতে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা এ আলোড়নকে অভিহিত করেছেন ‘বাংলার রেনেসাঁস’ হিসাবে। যদিও এটি রেনেসাঁস কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো ইতিহাসবিদ। তবু এ কথা অনস্বীকার্য যে, সে সময় সমগ্র ভারতবর্ষে শতাব্দীব্যাপী বাঙালি মনীষার দ্যুতিময় উপস্থিতি দেশবাসীকে অন্ধকার থেকে আলোক রেখায় উত্তরণের পথ নির্দেশ করেছিল।

বুর্খহার্ট তার রেনেসাঁস সংক্রান্ত বিখ্যাত বইয়ে রেনেসাঁসকে ব্যক্তি প্রতিভার বিস্ফোরণের যুগ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। উনিশ শতকের ভারতীয় রেনেসাঁসেও ব্যক্তিপ্রতিভার বিস্ফোরণের দেখা মেলে। রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শতাব্দীব্যাপী ইতিহাসে বাংলায় যে উজ্জ্বল প্রতিভার মিছিল দৃশ্যমান এর তুলনা সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসে আর নেই। ধর্ম ও সমাজসংস্কারে, শিক্ষাদীক্ষায়, নারী উন্নয়নে, মানবসেবায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষে, শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে, আধুনিক ধ্যান-ধারণায়, সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে এমন বহুমুখী জাগরণ আর কখনো দেখা যায়নি ভারতবর্ষে।

ইতালির চেয়েও স্বল্প সময়ব্যাপী বিস্তৃত বাংলার রেনেসাঁস সৃজনশীল ও মননশীল প্রতিভার বিচ্ছুরণে শিক্ষিত ভারতবাসী আলোকিত হয়েছিল। রামমোহন রায়কে দিয়ে যে রেনেসাঁসের সূচনা, রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত উৎকর্ষ ঘটে। রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে এ রেনেসাঁসের অন্যতম স্রষ্টা ও শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ইতালির রেনেসাঁসের ইতিহাসে পেত্রার্কা ও ভিঞ্চি যে ভূমিকা পালন করেছেন, বাংলার রেনেসাঁসেও রবীন্দ্রনাথও সেই ভূমিকা পালন করেছেন।

ইতালির রেনেসাঁসের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের দৃষ্টিকে অপার্থিব বা অলৌকিক প্রভাব থেকে মুক্ত করে জাগতিক ও মানবিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করা। মধ্যযুগে মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল পরলোক, ধর্মসাধনা ও অন্ধবিশ্বাসের প্রতি; জাগতিক ও মানবিক চিন্তাধারা তখন উপেক্ষিত হয়েছে, প্রাধান্য পেয়েছে বিষয় বৈরাগ্য ও সন্ন্যাস। রেনেসাঁস এ দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দেয়। জাগতিক ও মানবমুখিনতার প্রতি নবজাগ্রত এ আগ্রহ ইতিহাসে Humanism নামে অভিহিত হয়েছে। ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রবর্তক পেত্রার্কাকে বলা হয়েছে First of the humanists. Humanism বা মানবমুখিনতার প্রতি প্রবল আগ্রহ রবীন্দ্রনাথ বরাবরই পোষণ করে এসেছেন। ‘কড়ি ও কোমলে’র যুগে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন-‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।’ জীবন ও জগতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই অনুরাগ পরবর্তীকালে গভীরতর হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’-এর কবি, তিনি ‘বসুন্ধরা’র কবি। ‘মায়াবাদ’ ও ‘বৈরাগ্যসাধন’ কখনো তার চিন্তালোকে ঠাঁই পায়নি-‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়/ অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়/ লভিব মুক্তির স্বাদ।’

রেনেসাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ অবলোকন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল ইতালীয় রেনেসাঁসে। তখন ইতালি প্রাচীন গ্রিক ও ল্যাটিন সংস্কৃতির নিবিড় চর্চায় নিয়োজিত ছিল। রামমোহন বেদান্ত ও উপনিষদ অনুবাদের মধ্য দিয়ে যার সূচনা করেছিলেন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল ও বঙ্কিম তাদের অনুবাদমূলক ও সৃজনশীল গদ্য-পদ্য চর্চার মধ্য দিয়ে যে বিস্মৃত প্রায় প্রাচীন মনন ও সৌন্দয চর্চাকে পুনর্জীবিত করতে চেয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ একে পরিপূর্ণতা দান করেছেন তার জীবনব্যাপী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাধনার মাধ্যমে।

ভারতবর্ষের গৌরবোজ্জ্বল অতীতের কারণে রবীন্দ্রনাথ শ্রদ্ধার সঙ্গে অবলোকন করেছেন গৌতম বুদ্ধের অবদানকে। কালিদাস ও অশোকের মহিমা কীর্তন করেছেন। বেদ, উপনিষদ তার অন্তর্জগতকে সমৃদ্ধ করেছে, মহাকাব্য রামায়ণ ও মহাভারত তার সৃজনশীলতার গুণে নবরূপ লাভ করেছে। অর্থাৎ রেনেসাঁসের অন্যতম যে শর্ত ঐতিহ্যের নবায়ন তা সার্থকভাবে ঘটেছে তার সাহিত্যে। বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিমের কীর্তি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তাদের সার্থক উত্তরসূরী হিসাবে রেনেসাঁসের সর্বোচ্চ পরিণতিতে উপনীত হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

‘চারিত্রপূজা’ গ্রন্থে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের ভূমিকার মূল্যায়ন করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেই মূল্যায়ন এত প্রাসঙ্গিক যে পরবর্তীকালের লেখক গবেষকরা বারবার রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করেছেন। রামমোহন সম্পর্কে তার মূল্যায়ন,‘রামমোহন রায় যখন ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেন তখন এখানে চতুর্দিকে কালরাত্রির অন্ধকার বিরাজ করিতেছিল। আকাশে মৃত্যু বিচরণ করিতেছিল। মিথ্যা ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে তাহাকে সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল।...কী সংকটের সময়েই তিনি জন্মিয়াছিলেন। তাহার একদিকে হিন্দু সমাজের তটভূমি জীর্ণ হইয়া পড়িতেছিল, আর একদিকে বিদেশীয় সভ্যতা সাগরের প্রচণ্ড বন্যা বিদ্যুৎবেগে অগ্রসর হইতেছিল, রামমোহন তাহার অটল মহত্ত্বে মাঝখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন।’

বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘বিদ্যাসাগর এ অকৃতকীর্তি অকিঞ্চিৎকর বঙ্গসমাজের মধ্যে নিজের চরিত্রকে মনুষ্যত্বের আদর্শরূপে প্রস্ফূট করিয়া যে এক অসামান্য অনন্যতন্ত্রত্ব প্রকাশ করিয়াছেন, তাহা বাংলার ইতিহাসে অতি বিরল। এত বিরল যে, এক শতাব্দী কাল মধ্যে কেবল আর দুই-একজনের নাম মনে পড়ে।...যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়া ছিলেন, তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না, তিনিই ইংরেজি বিদ্যাকে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।’

রামমোহন ও বিদ্যাসাগরকে একই বন্ধনীতে রেখে বলেছেন-‘একদিকে যেমন তাহারা ভারতবর্ষীয়, তেমনি অপরদিকে ইউরোপীয় প্রকৃতির সহিত তাহাদের চরিত্রের বিস্তর নিকট সাদৃশ্য দেখিতে পাই। বেশভূষায়, আচারে ব্যবহারে তাহারা সম্পূর্ণ বাঙালি ছিলেন। স্বজাতীয় শাস্ত্রজ্ঞানে তাহাদের সমতুল্য কেহ ছিল না। স্বজাতিকে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের মূল পত্তন তাহারাই করিয়া গিয়াছেন-নির্ভীক বলিষ্ঠতা, সত্যচারিতা, লোকহিতৈষা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞা এবং আত্মনির্ভরতায় তাহারা বিশেষরূপে ইউরোপীয় মহাজনদের সহিত তুলনীয় ছিলেন।’

বাংলার রেনেসাঁসে বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক চেতনার আলোকে জীবনকে পরিশ্রুত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ। এর পাশাপাশি সেক্যুলার মানবতাবাদের পতাকা বহন করেছিলেন ডিরোজিও, ইয়ং বেঙ্গল, অক্ষয়কুমার দত্ত, বিদ্যাসাগর প্রমুখ। এ দুই ধারার দূরত্ব মোচন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তার আবির্ভাব ঘটেছিল বিশ্বাসনিষ্ঠ আধ্যাত্মিকতার পথ ধরে। কিন্তু সেক্যুলার মানবতাবাদের অনুসারীদের তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে বরণ করেছিলেন। ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’র কবি ‘ধর্মমোহ’নামক অবিস্মরণীয় কবিতায় লিখেছেন, ‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সেজন শুধু মারে আর মরে।/ নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,/ ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর/শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো/ শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।’

বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দের মতো রেনেসাঁসপুরুষদের রচনার কোনো কোনো অংশে স্বদেশ ও স্বধর্ম একাকার হয়ে গিয়েছিল। শশধর তর্কচূড়ামণির ভূমিকায় এরই পথ ধরে হিন্দু রিভাইভ্যালিজমের উত্থান ঘটে উনিশ শতকের শেষ ভাগে। হিন্দুত্বের অভিমানযুক্ত স্বাদেশিকতার আবেগ রবীন্দ্রনাথকে গ্রাস করতে না পারলেও ক্ষণিকের জন্য স্পর্শ করেছিল। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ বলেই সেই বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি ‘কালান্তর’ এ বলেন, ‘ধর্মের মিলেই যে দেশে মানুষকে মিলায়, সে দেশ হতভাগ্য।’ ‘গোরা’ উপন্যাস রবীন্দ্রনাথের সেই মোহমুক্তির ফসল। হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বকে সমার্থক করে রিভাইভ্যালিজমের কল্যাণে যে জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটেছিল, ‘গোরা’ রচনার মধ্য দিয়ে তিনি সেই মোহ থেকে মুক্তির পথ নির্দেশ করলেন। উপন্যাসের উপসংহারের গোরা বলছে, ‘আপনি আমাকে সেই দেবতার মন্ত্র দিন যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিষ্টান ব্রাহ্ম সকলেরই-যার মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না। যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’

উনিশ শতকের শেষভাগে হিন্দু রিভ্যাইভ্যালিজমের পাশাপাশি মুসলিম রিভ্যাইভ্যালিজমও দানা বাঁধতে শুরু করে। হিন্দু রিভ্যাইভ্যালিস্ট ও মুসলিম রিভ্যাইভ্যালিস্টরা যখন স্বজাতিকে পরস্পর-নিরপেক্ষ স্বাতন্ত্র্যের দিকে টান দিচ্ছেন তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, ভারতীয় সংস্কৃতি হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত সংস্কৃতি। বাংলার রেনেসাঁসের ইতিহাস হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের রিভ্যাইভ্যালিস্টদের দ্বারা কণ্টকিত হয়েছিল। সেই কাঁটা অপসারণ করে রেনেসাঁসকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দেন রবীন্দ্রনাথ। এভাবেই বাংলার রেনেসাঁসের ফলবতী ধারাকে দুর্ঘটনার কবল থেকে রক্ষা করেন তিনি।

রেনেসাঁসের প্রকৃতিগত কারণেই নগর ও গ্রামের মধ্যে বিভেদের বীজ রোপিত হয়। এটি যেমন ইতালীয় রেনেসাঁসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য বাংলার রেনেসাঁসের ক্ষেত্রেও। ইতালীয় রেনেসাঁসের অবিসংবাদিত পুরুষ পেত্রার্কা, ভিঞ্চি বা অন্য কোনো শিল্পী বঞ্চিত, নিপীড়িতদের সমর্থনে বিবেকবোধ জাগ্রত রেখেছিলেন কিনা তা আমরা জানি না। বাংলার রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠ শিল্পী রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে/ দিতে হবে ভাষা; এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে/ ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা’।

ছোটগল্পে, নাটকে, প্রবন্ধেও শোষিত এবং অবহেলিত প্রান্তজনের অধিকারের বলিষ্ঠ প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথ। ‘কালের যাত্রা’, ‘রথের রশি’, ‘মুক্তধারা’, ‘রক্তকরবী’ নাটকে সাম্রাজ্যবাদী শাসকগোষ্ঠীকে আঘাত করে নিপীড়িত মানুষের পক্ষ নিয়েছেন। ‘রথযাত্রা’ নাটকে শুদ্র তথা কৃষক শ্রমিকদের দৃপ্ত কণ্ঠস্বর অবিস্মরণীয় ‘আমরাই তো জোগায়েছি অন্ন, তাই খেয়ে তোমরা বেঁচে আছ। আমরা বুনছি বস্ত্র, তাতেই তোমাদের লজ্জারক্ষা।’ শুধু লেখনীতে নয়, কর্মোদ্যোগের মধ্য দিয়েও দরিদ্র কৃষকদের দুঃখ মোচনের ব্রত গ্রহণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহ, পতিসরসহ নানা স্থানে তার প্রজাহিতৈষী কর্মযজ্ঞে দরিদ্র মানুষ উপকৃত হয়েছে।

বাংলার রেনেসাঁসের সবচেয়ে সার্থক রূপকার রবীন্দ্রনাথ। রেনেসাঁসের দুই চেতনা অর্থাৎ মানবমুখিনতা ও শিল্পচেতনা উভয়কেই তিনি উচ্চ সাফল্যের সঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তার মধ্যে একই সঙ্গে পেত্রার্কা ও ভিঞ্চির প্রতিভার সমন্বয় ঘটেছে। তাই রবীন্দ্রনাথের কীর্তিকে অনুধাবন করলেই বাংলা তথা ভারতীয় রেনেসাঁসের ভূমিকা বোঝা সহজ হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন