রবীন্দ্র-রচনাবলি
jugantor
রবীন্দ্র-রচনাবলি

  সৈয়দ আকরম হোসেন  

০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং সমাজ ও সংস্কৃতিভাবুক ডক্টর আনিসুজ্জামান, বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলি সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রথমাবধি আমাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। রচনাবিন্যাসের সূত্র নির্ণয় ও পদ্ধতি অনুসরণে তিনি আমাকে পূর্বাপর আস্থা ও সাহস জুগিয়েছেন। তার পরামর্শক্রমেই এযাবৎ প্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথের বাংলা রচনা, বর্তমান ঐতিহ্য রবীন্দ্র-রচনাবলির ত্রিশ খণ্ডে নতুন অবয়বে বিন্যাস করা সম্ভব হলো। তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, বিদ্যার্থীজীবন থেকে তার কাছে আমি নানাভাবে ঋণী ও কৃতজ্ঞ।

বিশ্বভারতী ও তার গ্রন্থন বিভাগ আমাদের সম্পদ ও উত্তরাধিকার। প্রকাশন-বিভাগের অধিকর্তা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যসহ বিশ্বভারতীর গ্রন্থপ্রকাশ-সমিতির অধ্যক্ষবৃন্দ ও রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রণয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সবার কাছে আমাদের ঋণ অপরিসীম। প্রতিটি খণ্ডের পাঠ সংগ্রহ, পাঠ নির্ণয়, তথ্য সংগ্রহ ও সম্পাদনার বিবিধ পর্যায়ে যারা কঠোর শ্রমে সানন্দে ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন সেসব নিষ্ঠাবান গবেষক ও রবীন্দ্র-অনুরাগীর কাছে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ঐতিহ্যের উদ্যোগে ত্রিশ খণ্ড রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশিত হলো। প্রসঙ্গক্রমে বলা বাঞ্ছনীয় যে, বিশ্বভারতী সংস্করণে রচনা বিন্যাসের সময় কৈশোর ও যৌবনের রচনাগুলোর বিপুলাংশ, রবীন্দ্রনাথের ‘বর্জন অভিপ্রায়’ ও ‘বিরাগ’ মান্য করে বিশ্বভারতী গ্রন্থ প্রকাশ-সমিতির অধ্যক্ষেরা ‘অচলিত সংগ্রহ’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড নামে প্রচলন করেন, যা প্রকাশাবধি প্রচলিত আছে। এমনকি বিশ্বভারতীর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় সংকলিত রচনাগুচ্ছকে রবীন্দ্রনাথ অপরিপুষ্ট, অবাঞ্ছিত নির্দেশ করে প্রচলনে দ্বিধা, অনাগ্রহ জানিয়েও পাশাপাশি তিনি লেখেন : ‘আজ যদি আমার সমস্ত রচনার সমগ্র পরিচয় দেবার সময় উপস্থিত হয়ে থাকে তবে তাদের মধ্যে ভালো মন্দ মাঝারি আপন আপন স্থান পাবে এ কথা মানা যেতে পারে। তারা সবাই মিলে সমষ্টির স্বাভাবিকতা রক্ষা করে।... মানুষ সামনের দিকে যেমন অগ্রসরণ করে তেমনি অনুসরণ করে পেছনের, নইলে তার চলাই হয় না। পিছনহারা সাহিত্য বলে যদি কিছু থাকে সে কবন্ধ, সে অস্বাভাবিক।’ এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ তার সৃষ্টির ক্রমবিকাশে কালপরিসর, অবচেতনা, মনঃসমীক্ষণউৎস ও ঐতিহাসিক-তাৎপর্যকে বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন। স্মরণীয়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে ‘স্বদেশ’ নামক একটি কবিতা পাঠানোর সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠিতে জানান : ‘অকিঞ্চিৎকর বলে আমার কোনো বইয়ে স্থান পায়নি। কিন্তু... ঐতিহাসিকের দপ্তরে এর স্থান থাকতে পারে।’- ৩১ আশ্বিন ১৩২৮ [দেশ, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮২]।

বিশ্বভারতী রবীন্দ্র-রচনাবলির ‘নিবেদন’-এ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন : ‘রবীন্দ্রনাথের সমগ্র বাংলা রচনার একটি নতুন সংস্করণ খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের আয়োজন হইল। ... এখানে একটি কথার উল্লেখ প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কবির অনেক রচনা কোনো পুস্তকে সন্নিবিষ্ট হয় নাই। সেই-সকল রচনা সংগৃহীত হইতেছে, সর্বশেষ খণ্ডে সেগুলো সন্নিবিষ্ট হইবে। প্রকাশকাল অনুসারে সেগুলো যথাস্থানে যোজনা করা এখন আর সম্ভব হইল না।’

বিশ্বভারতী সংস্করণ ক্রমশ খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হওয়ায় রবীন্দ্রনাথের রচনাকাল বা প্রকাশকালের পরম্পরা অনিবার্যভাবেই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে রবীন্দ্র প্রতিভার বিষয়বৈভব, রূপবৈচিত্র্য, দর্শন এবং দৃষ্টি-সৃষ্টির ক্রমবিকাশ বা রূপান্তর নির্ণয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়; কখনো কখনো তা আকস্মিক বলেও প্রতীয়মান হয়। এ সত্য বহু বিদিত যে, সমাজ-সভ্যতার আত্মরূপ ও ‘সবদেশী’ রবীন্দ্রনাথের সৃজনশক্তির অবচেতন-স্মৃতিজড়িত ও অন্তর্গূঢ় প্রতিভান-বীজ উৎসারিত হয়েই তার সৃষ্টি শাখাপত্রপুষ্প-সমাচ্ছন্ন হয়ে-ওঠা মহিরুহ।

উল্লিখিত বক্তব্য ও পরিপ্রেক্ষিত স্মরণে রেখেই রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্ত সমগ্র বাংলা রচনা, প্রকাশক্রম-অনুসারে ত্রিশ খণ্ডে নতুনভাবে বিন্যাস করা গেল। বিশ্বভারতী রবীন্দ্র-রচনাবলি অচলিত সংগ্রহ দু-খণ্ডই, প্রকাশকাল অনুসারে, বর্তমান রচনাবলিতে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। ঐতিহ্য-প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলিতে এই প্রথম ‘ছিন্নপত্র’ (শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লিখিত আটটি পত্র), ‘ছিন্নপত্র’সমূহের পূর্ণতর পাঠ ‘ছিন্নপত্রাবলী’ (ইন্দিরা দেবীকে লিখিত পত্রাবলীর পূর্ণতর সংস্করণ), ‘চিঠিপত্র’ (১-১৯ খণ্ড), ‘প্রমথনাথ বিশীকে লিখিত পত্র’, ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ ও ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ অন্তর্ভুক্ত হল। অখণ্ড ‘গীতবিতান’ও ভিন্ন রূপে ও প্রকরণে সন্নিবিষ্ট করা গেল।

‘তত্ত্বের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা ও শিল্পচিন্তা এক খাতেই রয়েছে। রবীন্দ্র-নন্দনতত্ত্বে এদের অবিরোধী সহভাব।’ রবীন্দ্রনাথ জাপানযাত্রী : ১৪ তে লিখেছেন : ‘রূপরাজ্যের কলা ছবি, অরূপরাজ্যের কলা গান। কবিতা উভচর, ছবির মধ্যেও চলে, গানের মধ্যেও ওড়ে।’ সাহিত্য-ছবি-গান ও সুরের মিথস্ক্রিয়ার দিকে লক্ষ রেখেই রবীন্দ্রনাথ-অঙ্কিত ‘রূপ-বিরূপে’র দুই শতাধিকেরও বেশি রঙিন ছবি রচনাবলির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুদ্রিত কোনো ছবিরই শিরোনাম নির্দেশ করা হল না। কেননা : Rabindranath wanted viewers to look at his paintings without any directive intervention from his end. He perceived them as a visual statements that came to him somewhat unbidden and he did not wish to sully or curtail them with titles. [A Guide to the Catalogue, RABINDRACHITRAVALI, Pratikshan, Kolkata 2011, page 6-7]। এতদ্ব্যতীত সংযুক্ত হয়েছে বিশ্বভারতী রচনাবলিবহির্ভূত রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু ফোটোগ্রাফ, দেশি-বিদেশি শিল্পী-অঙ্কিত প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য।

আমার স্নেহভাজন ছাত্র বিশিষ্ট চিত্র-আলোচক অধ্যাপক মইনুদ্দীন খালেদ তার বোধ ও দৃষ্টি দিয়ে রবীন্দ্রচিত্র-নির্বাচন ও সরবরাহে আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য করেছে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের নয়, নিত্যশুভার্থী ও আশীর্বাদকের।

ঐতিহ্য-প্রকাশিত বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলিতে সংকলিত গ্রন্থ ও রচনাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয়-তথ্য মূলত নিুলিখিত উৎস থেকে গৃহীত হয়েছে : (ক) বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলি (অচলিত সংগ্রহ : প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং ১-৩১ খণ্ড); (খ) বর্তমানে প্রচলিত স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলোর বিভিন্ন সংস্করণ; (গ) গল্পগুচ্ছ (অখণ্ড); (ঘ) ছিন্নপত্র; (ঙ) ছিন্নপত্রাবলী; (চ) চিঠিপত্র (১-১৯ খণ্ড); (ছ) ভানুসিংহের পত্রাবলী; (জ) পথে ও পথের প্রান্তে; (ঝ) গীতবিতান; (ঞ) পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রচারিত রবীন্দ্র-রচনাবলি (১-১৫ খণ্ড); (ট) ১২৫তম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলির (১-১৮ খণ্ড) সুলভ সংস্করণসহ অন্যান্য সংস্করণ। এতদ্ব্যতীত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক’ (১-৪ খণ্ড) এবং প্রশান্তকুমার পাল রচিত ‘রবিজীবনী’ (১-৯ খণ্ড) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত উৎস থেকে গৃহীত তথ্যপুঞ্জ বর্তমান রচনাবলির প্রাসঙ্গিক গ্রন্থপরিচয়ে সংযোজনের সময়, উদ্ধৃতিবহির্ভূত অংশে, কিছু শব্দ-বদল এবং সাধু থেকে চলিত রীতিতে পরিবর্তন ও অধুনা বানান রীতিতে রূপান্তর করা হলো।

বিশ্বভারতী প্রবর্তিত রবীন্দ্র-সাহিত্যের মুদ্রণে শব্দ-প্রারম্ভে যেখানে উচ্চারণ ‘এ’ সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে শুরুর এ-কার ()ে; আবার আরম্ভে এ-কারের উচ্চারণ যেখানে ‘অ্যা’ সেখানে প্রযুক্ত হয়েছে মাত্রাযুক্ত এ-কার ()ে। যেমন : ‘যা হোক, যেমন তেল ফুরোয় যেমন দীপ নেবে, তেমনি এক সময়ে রাতও পোহায়। ঘোষাল-পরিবারে সূর্যোদয় দেখা দিল অবিনাশের বাপ মধুসূদনের জোর কপালে। (যোগাযোগ ১)’। বিশ্বভারতী অনুসৃত এ বানানরীতি, ঐতিহ্য প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলির ত্রিশ খণ্ডে অনুসরণ করা হয়েছে।

প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্যের স্বত্বাধিকারী ও পরিচালক জনাব আরিফুর রহমান নাইম অবর্ণনীয় প্রতিকূলতার মাঝে সার্বিক ঝুঁকি নিয়ে বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরেছেন। তার সাহসী রবীন্দ্র-অনুরাগ প্রীতিøিগ্ধচিত্তে স্মরণ করি।

নতুন বিন্যাসে রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশের প্রকল্প-প্রণয়নে ধ্রুবপদের স্বত্বাধিকারী ও গ্রন্থকার শ্রমে অকুণ্ঠ সুহৃদ আবুল বাশার ফিরোজের একাগ্র নিষ্ঠা ও দক্ষতা অতুলনীয়। তার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ছাড়া রচনাবলি প্রকাশ অসম্ভবপ্রায় ছিল। গ্রন্থের মুদ্রণ-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেছেন বাঙলায়নের স্বত্বাধিকারী জনাব অস্ট্রিক আর্যু। মুদ্রণ-প্রমাদ সংশোধনের কঠিন ও জটিল দায়িত্ব পালন করেছেন জনাব সুরুজ্জামান ও জনাব মাহবুবুর রহমান। অক্ষর ও আলোকচিত্র বিন্যাসের দায়িত্বে ছিলেন সদাপ্রসন্ন জনাব জহিরুল ইসলাম। তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

রবীন্দ্র সাহিত্যের কালানুক্রমিক পুনর্বিন্যাসের এ প্রচেষ্টায় ও প্রকাশ-সৌকর্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটতেই পারে, সেজন্য আমরা পাঠকসমাজের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

রবীন্দ্র-রচনাবলি

 সৈয়দ আকরম হোসেন 
০৬ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং সমাজ ও সংস্কৃতিভাবুক ডক্টর আনিসুজ্জামান, বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলি সম্পাদনার ক্ষেত্রে প্রথমাবধি আমাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। রচনাবিন্যাসের সূত্র নির্ণয় ও পদ্ধতি অনুসরণে তিনি আমাকে পূর্বাপর আস্থা ও সাহস জুগিয়েছেন। তার পরামর্শক্রমেই এযাবৎ প্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথের বাংলা রচনা, বর্তমান ঐতিহ্য রবীন্দ্র-রচনাবলির ত্রিশ খণ্ডে নতুন অবয়বে বিন্যাস করা সম্ভব হলো। তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, বিদ্যার্থীজীবন থেকে তার কাছে আমি নানাভাবে ঋণী ও কৃতজ্ঞ।

বিশ্বভারতী ও তার গ্রন্থন বিভাগ আমাদের সম্পদ ও উত্তরাধিকার। প্রকাশন-বিভাগের অধিকর্তা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যসহ বিশ্বভারতীর গ্রন্থপ্রকাশ-সমিতির অধ্যক্ষবৃন্দ ও রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রণয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সবার কাছে আমাদের ঋণ অপরিসীম। প্রতিটি খণ্ডের পাঠ সংগ্রহ, পাঠ নির্ণয়, তথ্য সংগ্রহ ও সম্পাদনার বিবিধ পর্যায়ে যারা কঠোর শ্রমে সানন্দে ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করেছেন সেসব নিষ্ঠাবান গবেষক ও রবীন্দ্র-অনুরাগীর কাছে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।

ঐতিহ্যের উদ্যোগে ত্রিশ খণ্ড রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশিত হলো। প্রসঙ্গক্রমে বলা বাঞ্ছনীয় যে, বিশ্বভারতী সংস্করণে রচনা বিন্যাসের সময় কৈশোর ও যৌবনের রচনাগুলোর বিপুলাংশ, রবীন্দ্রনাথের ‘বর্জন অভিপ্রায়’ ও ‘বিরাগ’ মান্য করে বিশ্বভারতী গ্রন্থ প্রকাশ-সমিতির অধ্যক্ষেরা ‘অচলিত সংগ্রহ’ প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড নামে প্রচলন করেন, যা প্রকাশাবধি প্রচলিত আছে। এমনকি বিশ্বভারতীর প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় সংকলিত রচনাগুচ্ছকে রবীন্দ্রনাথ অপরিপুষ্ট, অবাঞ্ছিত নির্দেশ করে প্রচলনে দ্বিধা, অনাগ্রহ জানিয়েও পাশাপাশি তিনি লেখেন : ‘আজ যদি আমার সমস্ত রচনার সমগ্র পরিচয় দেবার সময় উপস্থিত হয়ে থাকে তবে তাদের মধ্যে ভালো মন্দ মাঝারি আপন আপন স্থান পাবে এ কথা মানা যেতে পারে। তারা সবাই মিলে সমষ্টির স্বাভাবিকতা রক্ষা করে।... মানুষ সামনের দিকে যেমন অগ্রসরণ করে তেমনি অনুসরণ করে পেছনের, নইলে তার চলাই হয় না। পিছনহারা সাহিত্য বলে যদি কিছু থাকে সে কবন্ধ, সে অস্বাভাবিক।’ এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ তার সৃষ্টির ক্রমবিকাশে কালপরিসর, অবচেতনা, মনঃসমীক্ষণউৎস ও ঐতিহাসিক-তাৎপর্যকে বারবার গুরুত্ব দিয়েছেন। স্মরণীয়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে ‘স্বদেশ’ নামক একটি কবিতা পাঠানোর সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠিতে জানান : ‘অকিঞ্চিৎকর বলে আমার কোনো বইয়ে স্থান পায়নি। কিন্তু... ঐতিহাসিকের দপ্তরে এর স্থান থাকতে পারে।’- ৩১ আশ্বিন ১৩২৮ [দেশ, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮২]।

বিশ্বভারতী রবীন্দ্র-রচনাবলির ‘নিবেদন’-এ চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন : ‘রবীন্দ্রনাথের সমগ্র বাংলা রচনার একটি নতুন সংস্করণ খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশের আয়োজন হইল। ... এখানে একটি কথার উল্লেখ প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত কবির অনেক রচনা কোনো পুস্তকে সন্নিবিষ্ট হয় নাই। সেই-সকল রচনা সংগৃহীত হইতেছে, সর্বশেষ খণ্ডে সেগুলো সন্নিবিষ্ট হইবে। প্রকাশকাল অনুসারে সেগুলো যথাস্থানে যোজনা করা এখন আর সম্ভব হইল না।’

বিশ্বভারতী সংস্করণ ক্রমশ খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হওয়ায় রবীন্দ্রনাথের রচনাকাল বা প্রকাশকালের পরম্পরা অনিবার্যভাবেই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে রবীন্দ্র প্রতিভার বিষয়বৈভব, রূপবৈচিত্র্য, দর্শন এবং দৃষ্টি-সৃষ্টির ক্রমবিকাশ বা রূপান্তর নির্ণয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়; কখনো কখনো তা আকস্মিক বলেও প্রতীয়মান হয়। এ সত্য বহু বিদিত যে, সমাজ-সভ্যতার আত্মরূপ ও ‘সবদেশী’ রবীন্দ্রনাথের সৃজনশক্তির অবচেতন-স্মৃতিজড়িত ও অন্তর্গূঢ় প্রতিভান-বীজ উৎসারিত হয়েই তার সৃষ্টি শাখাপত্রপুষ্প-সমাচ্ছন্ন হয়ে-ওঠা মহিরুহ।

উল্লিখিত বক্তব্য ও পরিপ্রেক্ষিত স্মরণে রেখেই রবীন্দ্রনাথের প্রাপ্ত সমগ্র বাংলা রচনা, প্রকাশক্রম-অনুসারে ত্রিশ খণ্ডে নতুনভাবে বিন্যাস করা গেল। বিশ্বভারতী রবীন্দ্র-রচনাবলি অচলিত সংগ্রহ দু-খণ্ডই, প্রকাশকাল অনুসারে, বর্তমান রচনাবলিতে যথাস্থানে সন্নিবিষ্ট হয়েছে। ঐতিহ্য-প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলিতে এই প্রথম ‘ছিন্নপত্র’ (শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে লিখিত আটটি পত্র), ‘ছিন্নপত্র’সমূহের পূর্ণতর পাঠ ‘ছিন্নপত্রাবলী’ (ইন্দিরা দেবীকে লিখিত পত্রাবলীর পূর্ণতর সংস্করণ), ‘চিঠিপত্র’ (১-১৯ খণ্ড), ‘প্রমথনাথ বিশীকে লিখিত পত্র’, ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’ ও ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ অন্তর্ভুক্ত হল। অখণ্ড ‘গীতবিতান’ও ভিন্ন রূপে ও প্রকরণে সন্নিবিষ্ট করা গেল।

‘তত্ত্বের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তা ও শিল্পচিন্তা এক খাতেই রয়েছে। রবীন্দ্র-নন্দনতত্ত্বে এদের অবিরোধী সহভাব।’ রবীন্দ্রনাথ জাপানযাত্রী : ১৪ তে লিখেছেন : ‘রূপরাজ্যের কলা ছবি, অরূপরাজ্যের কলা গান। কবিতা উভচর, ছবির মধ্যেও চলে, গানের মধ্যেও ওড়ে।’ সাহিত্য-ছবি-গান ও সুরের মিথস্ক্রিয়ার দিকে লক্ষ রেখেই রবীন্দ্রনাথ-অঙ্কিত ‘রূপ-বিরূপে’র দুই শতাধিকেরও বেশি রঙিন ছবি রচনাবলির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মুদ্রিত কোনো ছবিরই শিরোনাম নির্দেশ করা হল না। কেননা : Rabindranath wanted viewers to look at his paintings without any directive intervention from his end. He perceived them as a visual statements that came to him somewhat unbidden and he did not wish to sully or curtail them with titles. [A Guide to the Catalogue, RABINDRACHITRAVALI, Pratikshan, Kolkata 2011, page 6-7]। এতদ্ব্যতীত সংযুক্ত হয়েছে বিশ্বভারতী রচনাবলিবহির্ভূত রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু ফোটোগ্রাফ, দেশি-বিদেশি শিল্পী-অঙ্কিত প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য।

আমার স্নেহভাজন ছাত্র বিশিষ্ট চিত্র-আলোচক অধ্যাপক মইনুদ্দীন খালেদ তার বোধ ও দৃষ্টি দিয়ে রবীন্দ্রচিত্র-নির্বাচন ও সরবরাহে আমাকে স্বতঃস্ফূর্ত সাহায্য করেছে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের নয়, নিত্যশুভার্থী ও আশীর্বাদকের।

ঐতিহ্য-প্রকাশিত বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলিতে সংকলিত গ্রন্থ ও রচনাগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয়-তথ্য মূলত নিুলিখিত উৎস থেকে গৃহীত হয়েছে : (ক) বিশ্বভারতী প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলি (অচলিত সংগ্রহ : প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং ১-৩১ খণ্ড); (খ) বর্তমানে প্রচলিত স্বতন্ত্র গ্রন্থগুলোর বিভিন্ন সংস্করণ; (গ) গল্পগুচ্ছ (অখণ্ড); (ঘ) ছিন্নপত্র; (ঙ) ছিন্নপত্রাবলী; (চ) চিঠিপত্র (১-১৯ খণ্ড); (ছ) ভানুসিংহের পত্রাবলী; (জ) পথে ও পথের প্রান্তে; (ঝ) গীতবিতান; (ঞ) পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রচারিত রবীন্দ্র-রচনাবলি (১-১৫ খণ্ড); (ট) ১২৫তম রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলির (১-১৮ খণ্ড) সুলভ সংস্করণসহ অন্যান্য সংস্করণ। এতদ্ব্যতীত প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক’ (১-৪ খণ্ড) এবং প্রশান্তকুমার পাল রচিত ‘রবিজীবনী’ (১-৯ খণ্ড) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লিখিত উৎস থেকে গৃহীত তথ্যপুঞ্জ বর্তমান রচনাবলির প্রাসঙ্গিক গ্রন্থপরিচয়ে সংযোজনের সময়, উদ্ধৃতিবহির্ভূত অংশে, কিছু শব্দ-বদল এবং সাধু থেকে চলিত রীতিতে পরিবর্তন ও অধুনা বানান রীতিতে রূপান্তর করা হলো।

বিশ্বভারতী প্রবর্তিত রবীন্দ্র-সাহিত্যের মুদ্রণে শব্দ-প্রারম্ভে যেখানে উচ্চারণ ‘এ’ সেখানে ব্যবহৃত হয়েছে শুরুর এ-কার ()ে; আবার আরম্ভে এ-কারের উচ্চারণ যেখানে ‘অ্যা’ সেখানে প্রযুক্ত হয়েছে মাত্রাযুক্ত এ-কার ()ে। যেমন : ‘যা হোক, যেমন তেল ফুরোয় যেমন দীপ নেবে, তেমনি এক সময়ে রাতও পোহায়। ঘোষাল-পরিবারে সূর্যোদয় দেখা দিল অবিনাশের বাপ মধুসূদনের জোর কপালে। (যোগাযোগ ১)’। বিশ্বভারতী অনুসৃত এ বানানরীতি, ঐতিহ্য প্রকাশিত রবীন্দ্র-রচনাবলির ত্রিশ খণ্ডে অনুসরণ করা হয়েছে।

প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্যের স্বত্বাধিকারী ও পরিচালক জনাব আরিফুর রহমান নাইম অবর্ণনীয় প্রতিকূলতার মাঝে সার্বিক ঝুঁকি নিয়ে বর্তমান রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পেরেছেন। তার সাহসী রবীন্দ্র-অনুরাগ প্রীতিøিগ্ধচিত্তে স্মরণ করি।

নতুন বিন্যাসে রবীন্দ্র-রচনাবলি প্রকাশের প্রকল্প-প্রণয়নে ধ্রুবপদের স্বত্বাধিকারী ও গ্রন্থকার শ্রমে অকুণ্ঠ সুহৃদ আবুল বাশার ফিরোজের একাগ্র নিষ্ঠা ও দক্ষতা অতুলনীয়। তার সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ছাড়া রচনাবলি প্রকাশ অসম্ভবপ্রায় ছিল। গ্রন্থের মুদ্রণ-তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করেছেন বাঙলায়নের স্বত্বাধিকারী জনাব অস্ট্রিক আর্যু। মুদ্রণ-প্রমাদ সংশোধনের কঠিন ও জটিল দায়িত্ব পালন করেছেন জনাব সুরুজ্জামান ও জনাব মাহবুবুর রহমান। অক্ষর ও আলোকচিত্র বিন্যাসের দায়িত্বে ছিলেন সদাপ্রসন্ন জনাব জহিরুল ইসলাম। তাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ।

রবীন্দ্র সাহিত্যের কালানুক্রমিক পুনর্বিন্যাসের এ প্রচেষ্টায় ও প্রকাশ-সৌকর্যের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটতেই পারে, সেজন্য আমরা পাঠকসমাজের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন