লেখক বঙ্গবন্ধু
jugantor
লেখক বঙ্গবন্ধু

  সরকার আবদুল মান্নান  

১৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১২ সালে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে তার লেখা বই প্রথম প্রকাশিত হয়; শিরোনাম অসমাপ্ত আত্মজীবনী। এই তার লেখকসত্তার প্রথম উন্মোচন। তারপর বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় কারাগারের রোজনামচা এবং ২০২০ সালে আমার দেখা নয়াচীন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করে রসজ্ঞ পাঠক বিস্মিত হয়ে যান। পাঠকরা ভাবতেও পারেননি এমন একটি শক্তিমান লেখার অভিজ্ঞতা তারা লাভ করতে পারবেন। সুতরাং তারা নড়েচড়ে বসেন এবং এ লেখকের যে আরও লেখা থাকা স্বাভাবিক এ ব্যাপারে পাঠকরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যান। কারণ কোনো লেখকই লেখা শুরু করে এতটা শক্তির পরিচয় দিতে পারেন না। এখন শেখ মুজিবুর রহমান শক্তিমান লেখক হিসাবে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত। শুধু সাহিত্য হিসেবে নয়-তার লেখার মধ্যে রাজনীতি, ইতিহাস, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতাবাদ, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদসহ ব্যক্তিত্বের মহিমা এমনভাবে গ্রন্থিত হয়ে আছে যার সঙ্গে প্রথাগত সাহিত্যের কোনো তুলা না চলে না। এবং এ জন্যই ১৮ আগস্ট, ২০১২ তারিখের হিন্দুস্থান টাইম্স-এ সুমিত মিত্র লিখেছেন, "His memoirs are therefore not only of interest to his countrymen but a valuable source of history of post-colonial South Asia." সুতরাং অনিবার্যভাবেই কৌতূহল জাগে, জীবনযাপনের কোনো পটভূমি থেকে তার মধ্যে এই লেখকসত্তার বিকাশ সম্ভব হয়েছে।

বই পড়ার নেশা যাদের মধ্যে তৈরি হয় তাদেরই কেউ কেউ লেখক হন। পঠন-অভ্যাস ছাড়া লেখক হওয়ার ঘটনা বিরল। খুব শৈশব থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে পত্রপত্রিকা ও বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার আব্বা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। ছোটকাল থেকে আমি সকল কগজই পড়তাম।’ [২০১২ : ১০] শেখ মুজিব আমার পিতা শীর্ষক গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার বই পড়ার অভ্যাস সম্পর্কে লিখেছেন : ‘আব্বার কিছু বইপত্র, বহু পুরোনা [পুরোনো] বই ছিল। বিশেষ করে জেলখানায় বই দিলে সেগুলো সেন্সর করে সিল মেরে দিত। ১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন কিন্তু আমার মার অনুরোধে এ বই কয়টা আব্বা কখনো দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলি, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ড শ’র কয়েকটি বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। জেলে কিছু পাঠালে সেন্সর করা হয়, অনুসন্ধান করা হয়, তারপর পাশ হয়ে গেলে সিল মারা হয়। পরপর আব্বা কতবার জেলে গেলেন তার সিল এ বইগুলোতে ছিল। মা এ কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন। আব্বা জেল থেকে ছাড়া পেলেই খোঁজ নিতেন বইগুলো এনেছেন কিনা। যদিও অনেক বই জেলে পাঠানো হতো। মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মার সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বইকেনা [বই কেনা] ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল।’ [২০১৫ : ৭০] ১৯৫০ সালের ২১ ডিসেম্বর ফরিদপুর ডিস্ট্রিক জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চিঠি লিখেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। চিঠিতে লিখেছেন, ‘গত অক্টোবরে কেন্দ্রীয় জেলখানার গেটে যখন আমাদের দেখা হয়েছিল, আপনি কথা দিয়েছিলেন, আমাকে কিছু বই পাঠিয়ে দেবেন। তবে এখনো কোনো বই পাইনি। ভুলে যাবেন না এখানে আমি একা আর বই-ই আমার একমাত্র সঙ্গী।’ ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলখানা থেকে ১৯৫১ সালের ৯ ডিসেম্বর অন্য এক চিঠিতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে তিনি লিখেছেন, ‘নূতন চীনের কিছু বই যদি পাওয়া যায় তবে আমাকে পাঠাবেন।’ এ ছাড়া অসংখ্য চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকের সঙ্গে তার ছিল মধুর সম্পর্ক, যা তাকে জীবন সম্পর্কে উদার-উন্মুক্তভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্বাধীনতা পূর্বকালে জেলের বাইরে থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কখনো লিখতে পেরেছেন তার লেখালেখির মধ্যে এমন কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জানিয়েছেন : দৈনিক আজাদ তখন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল নাজিমউদ্দীন গ্রুপের সমর্থক। আবুল হাশেম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে আজাদ কৌশলে প্রচার চালাত। বঙ্গবন্ধু ছদ্মনামে এ প্রচারণার কোনো কোনোটির জবাব লিখতেন ছোট ছোট প্রবন্ধের মাধ্যমে। তার এ সাংবাদিকতার কথা আমি বহু পরে জানতে পারি কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের মুখে, যখন তিনি ঢাকায় অবজারভার গ্রুপের বাংলা সাপ্তাহিক পল্লীবার্তার সম্পাদক-সময়টা ১৯৬৬ কী ’৬৭ সাল। ইদরিস ভাই শেখ মুজিব কী ছদ্মনামে মিল্লাতে অনিয়মিতভাবে লিখতেন, সেই নামটাও বলেছিলেন। নামটা ছিল মখিক। আমার ইচ্ছা ছিল কথাটার সত্যতা এক সময় বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি মিল্লাতে মাঝে মাঝে লিখতেন সে কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু নিজের ছদ্মনাম কী ছিল স্মরণ করতে পারেননি। [আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ‘সাংবাদিক শেখ মুজিব’, দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মার্চ, ২০২০]

সর্বোতভাবে তিনি মননশীল জীবনযাপন করতেন আর এখন পর্যন্ত সেই জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট ফসল অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন।

এ তিনটি বই তিন রকম। একটি আত্মজীবনী, বলা যায় রাজনৈতিক আত্মজীবনী এবং তার সঙ্গে নানা অনুসঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনের বিপুল মহাকাব্য। কারাগারের রোজনামচা তারিখ দিয়ে দিয়ে বন্দিজীবন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই জীবনের অনেকান্ত কলেবর রচিত হয়েছে। আর আমার দেখা নয়াচীন নিখাঁদ ভ্রমণসাহিত্য। এগুলো নতুন ধারার কোনো সাহিত্য নয়। বহুকাল থেকে সাহিত্যের এ তিনটি ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে। এ তিনটিমাত্র গ্রন্থের মাধ্যমে কোনো শক্তিতে বঙ্গবন্ধু বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন তার ন্যায়সূত্র বোঝা দরকার।

আত্মজীবনী, রোজনামচা এবং ভ্রমণকহিনিতে প্রকটভাবে ‘আমিত্বে’র বিকাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অধিকাংশ লেখক সম্পূর্ণ আলোটুকু নিজের দিকে ফেলতে চেষ্টা করেন এবং নিজের ভালোত্বের বিবরণ দিয়ে খুশি হন আর খুঁটিনাটি বিবরণের ভেতর দিয়ে বারবার নিজের কাছেই ফিরে আসার তাড়া বোধ করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এ তিনটি রচনার মধ্যে কোথাও নিজের ওপর আলো ধরে রাখেননি। অধিকন্তু একটি অসম্ভব সহজাত দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধের পটভূমিতে তিনি তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করছেন জীবনের সর্বাবয়বে। ফলে তিনটি গ্রন্থের মধ্যেই আমরা লক্ষ করব অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর। এবং সেসব মানুষ প্রত্যেকেই আপন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। কিছুকে বা কাউকে ছোট না করে দেখার, গুরুত্বহীন বলে বিবেচনা না করার এবং প্রত্যেক ব্যক্তি ও ঘটনাকে তাদের স্ব স্ব অবস্থানে যথাথ সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করার এই যে মানসিকতা, তাকে অনেক বড় মানের সাহিত্যরুচি বললে অত্যুক্তি হবে না। লেখক শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে অসাধারণ এ সাহিত্যরুচি তৈরি হয়েছিল তার কলকাতার বিপুল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিবেষ্টিত জীবনেই। এ তিনটি গ্রন্থের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো তার রাজনৈতিক জীবনাদর্শনে বিচিত্র ঘটনা, পরিপ্রেক্ষিত ও সঙ্গে-অনুষঙ্গে তুলে ধরা। কিন্তু কিছুতেই তাতে তাত্ত্বিকতার চিহ্নমাত্রও নেই। কখনো নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার ভঙ্গিতে, কখনো ঘটনার বিবরণের মধ্যে এবং কখনো বা বৈঠকি ভঙ্গিতে তিনি তুলে ধরেছেন তার আকাঙ্ক্ষার জগৎকে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনটি গ্রন্থের গড়নগত স্বাতন্ত্র্যে। আত্মজীবনীর ভাষা ও ঘটনার বিস্তার এবং ভাবনার সংগঠন নিশ্চয়ই রোজনামচা ও ভ্রমণকাহিনির মতো নয়। আত্মজীবনীর আখ্যানের মধ্যে এক ধরনের ত্রিকালদর্শী পরিবেশ বিরাজমান থাকে। অতীত ও বর্তমানের পটভূমিতে ভবিষ্যৎও সেখানে নানাভাবে চলে আসে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর মধ্যে আখ্যানের এ সংগঠন স্পষ্টভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু কারাগারের রোচনামচার সংগঠন সম্পূর্ণই আলাদা। প্রতিদিনের ঘটনার বিবরণের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান আটপৌরে যে ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন সে ভাষা কিছুমাত্র আত্মজীবনীতে লক্ষ করা যায় না। এখানে বর্তমানই মুখ্য এবং ভাষার মধ্যেও আছে বই হিসাবে প্রকাশ করা হবে না এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত। কিন্তু দ্বন্দ্ব লাগে যখন গ্রন্থের প্রথমেই জেলখানার বিচিত্র ভাষা, ঘটনা ও রেওয়াজের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করি। তার মানে খুব সচেতনভাবেই তিনি রোজনামচা লিখেছিলেন। কিন্তু তবুও সহজাত সাহিত্য প্রতিভার প্রেরণায়ই আলাদা হয়ে গেছে সবকিছু। ভ্রমণকাহিনির মধ্যে এক ধরনের গতি থাকে। সেই গতি ঘটনার, আখ্যানের ও ভাষার। আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থে ওই গতির স্পর্শ পাওয়া যায় সর্বত্র। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থ তিনটির অভিন্ন একটি মূল সুর আছে, আর তা হলো অন্তরঙ্গতা। কথা বলার ভঙ্গিটাই এমন যে তিনি যেন বৈঠকখানায় বসে সমবেত লোকজনের সামনে কথা বলছেন। সেই শ্রোতা প্রথমত তিনি নিজে। ওইটুকু আস্থা তার নিজের ওপর ছিল। ফলে এমন কোনো ভাষা বা ঘটনার বিবরণ নেই যা পড়ে জেলখানার কর্মকর্তারা লেখাগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। আবার অনেকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে যেমন বঙ্গবন্ধুর মতো লোকের একটি সহজ সচ্ছলতার সৃষ্টি হয় তেমনি ভাষা ও বক্তব্যে সততা, নিষ্ঠা ও পরিশীলনের বিষয় চলে আসে। এ সব বিষয়ই গ্রন্থ তিনটিকে মহিমামণ্ডিত করে তুলেছে। লেখাগুলো উপন্যাস নয়, গল্প নয়, কবিতাও নয়-একান্তই তার ব্যক্তিগত জীবনের আলোকে ইতিহাস, তার সময়ের রাজনীতি, রাজনৈতিক সহকর্মী, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার-পরিজন। এমন লেখায় পদে পদে আততায়ীর মতো ওতপেতে থাকে সততার প্রশ্ন, সঠিকতার প্রশ্ন, ন্যায় ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। গল্প-উপন্যাস-নাটক-কবিতা এ সবের ধার ধারে না। ফলে তিনি একজন সৃষ্টিশীল লেখকের স্বাধীনতা ভোগ করেননি। কিন্তু গ্রন্থ তিনটি পড়লে ওই পরাধীনতার কোনো চিহ্ন আবিষ্কার করা যায় না। মনে হয় তিনি বলতে শুরু করেছেন এবং আর কোথাও না থেমে তিনি গন্তব্যে উপনীত হয়েছেন। লেখার এ সচ্ছলতা গ্রন্থ তিনটিকে বিপুল জনপ্রিয়তা দান করেছে। সৃজনশীল মহৎ গ্রন্থের যা কিছু মাহাত্ম্য তার সকল রূপ-রস-গন্ধ এবং আলো-ছায়ার খেলা খুব ভালোভাবেই গ্রন্থ তিনটিতে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

লেখক বঙ্গবন্ধু

 সরকার আবদুল মান্নান 
১৩ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১২ সালে দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে তার লেখা বই প্রথম প্রকাশিত হয়; শিরোনাম অসমাপ্ত আত্মজীবনী। এই তার লেখকসত্তার প্রথম উন্মোচন। তারপর বাংলা একাডেমি থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় কারাগারের রোজনামচা এবং ২০২০ সালে আমার দেখা নয়াচীন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করে রসজ্ঞ পাঠক বিস্মিত হয়ে যান। পাঠকরা ভাবতেও পারেননি এমন একটি শক্তিমান লেখার অভিজ্ঞতা তারা লাভ করতে পারবেন। সুতরাং তারা নড়েচড়ে বসেন এবং এ লেখকের যে আরও লেখা থাকা স্বাভাবিক এ ব্যাপারে পাঠকরা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যান। কারণ কোনো লেখকই লেখা শুরু করে এতটা শক্তির পরিচয় দিতে পারেন না। এখন শেখ মুজিবুর রহমান শক্তিমান লেখক হিসাবে বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত। শুধু সাহিত্য হিসেবে নয়-তার লেখার মধ্যে রাজনীতি, ইতিহাস, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতাবাদ, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদসহ ব্যক্তিত্বের মহিমা এমনভাবে গ্রন্থিত হয়ে আছে যার সঙ্গে প্রথাগত সাহিত্যের কোনো তুলা না চলে না। এবং এ জন্যই ১৮ আগস্ট, ২০১২ তারিখের হিন্দুস্থান টাইম্স-এ সুমিত মিত্র লিখেছেন, "His memoirs are therefore not only of interest to his countrymen but a valuable source of history of post-colonial South Asia." সুতরাং অনিবার্যভাবেই কৌতূহল জাগে, জীবনযাপনের কোনো পটভূমি থেকে তার মধ্যে এই লেখকসত্তার বিকাশ সম্ভব হয়েছে।

বই পড়ার নেশা যাদের মধ্যে তৈরি হয় তাদেরই কেউ কেউ লেখক হন। পঠন-অভ্যাস ছাড়া লেখক হওয়ার ঘটনা বিরল। খুব শৈশব থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে পত্রপত্রিকা ও বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘আমার আব্বা খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী ও সওগাত। ছোটকাল থেকে আমি সকল কগজই পড়তাম।’ [২০১২ : ১০] শেখ মুজিব আমার পিতা শীর্ষক গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার বই পড়ার অভ্যাস সম্পর্কে লিখেছেন : ‘আব্বার কিছু বইপত্র, বহু পুরোনা [পুরোনো] বই ছিল। বিশেষ করে জেলখানায় বই দিলে সেগুলো সেন্সর করে সিল মেরে দিত। ১৯৪৯ থেকে আব্বা যতবার জেলে গেছেন কয়েকখানা নির্দিষ্ট বই ছিল যা সব সময় আব্বার সঙ্গে থাকত। জেলখানার বই বেশিরভাগই জেল লাইব্রেরিতে দান করে দিতেন কিন্তু আমার মার অনুরোধে এ বই কয়টা আব্বা কখনো দিতেন না, সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তার মধ্যে রবীন্দ্র-রচনাবলি, শরৎচন্দ্র, নজরুলের রচনা, বার্নার্ড শ’র কয়েকটি বইতে সেন্সর করার সিল দেওয়া ছিল। জেলে কিছু পাঠালে সেন্সর করা হয়, অনুসন্ধান করা হয়, তারপর পাশ হয়ে গেলে সিল মারা হয়। পরপর আব্বা কতবার জেলে গেলেন তার সিল এ বইগুলোতে ছিল। মা এ কয়টা বই খুব যত্ন করে রাখতেন। আব্বা জেল থেকে ছাড়া পেলেই খোঁজ নিতেন বইগুলো এনেছেন কিনা। যদিও অনেক বই জেলে পাঠানো হতো। মা প্রচুর বই কিনতেন আর জেলে পাঠাতেন। নিউ মার্কেটে মার সঙ্গে আমরাও যেতাম। বই পছন্দ করতাম, নিজেরাও কিনতাম। সব সময়ই বইকেনা [বই কেনা] ও পড়ার একটা রেওয়াজ আমাদের বাসায় ছিল।’ [২০১৫ : ৭০] ১৯৫০ সালের ২১ ডিসেম্বর ফরিদপুর ডিস্ট্রিক জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চিঠি লিখেছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। চিঠিতে লিখেছেন, ‘গত অক্টোবরে কেন্দ্রীয় জেলখানার গেটে যখন আমাদের দেখা হয়েছিল, আপনি কথা দিয়েছিলেন, আমাকে কিছু বই পাঠিয়ে দেবেন। তবে এখনো কোনো বই পাইনি। ভুলে যাবেন না এখানে আমি একা আর বই-ই আমার একমাত্র সঙ্গী।’ ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলখানা থেকে ১৯৫১ সালের ৯ ডিসেম্বর অন্য এক চিঠিতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে তিনি লিখেছেন, ‘নূতন চীনের কিছু বই যদি পাওয়া যায় তবে আমাকে পাঠাবেন।’ এ ছাড়া অসংখ্য চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকের সঙ্গে তার ছিল মধুর সম্পর্ক, যা তাকে জীবন সম্পর্কে উদার-উন্মুক্তভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে।

স্বাধীনতা পূর্বকালে জেলের বাইরে থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কখনো লিখতে পেরেছেন তার লেখালেখির মধ্যে এমন কোনো নিদর্শন পাওয়া যায় না। তবে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী জানিয়েছেন : দৈনিক আজাদ তখন মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল নাজিমউদ্দীন গ্রুপের সমর্থক। আবুল হাশেম ও শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে আজাদ কৌশলে প্রচার চালাত। বঙ্গবন্ধু ছদ্মনামে এ প্রচারণার কোনো কোনোটির জবাব লিখতেন ছোট ছোট প্রবন্ধের মাধ্যমে। তার এ সাংবাদিকতার কথা আমি বহু পরে জানতে পারি কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের মুখে, যখন তিনি ঢাকায় অবজারভার গ্রুপের বাংলা সাপ্তাহিক পল্লীবার্তার সম্পাদক-সময়টা ১৯৬৬ কী ’৬৭ সাল। ইদরিস ভাই শেখ মুজিব কী ছদ্মনামে মিল্লাতে অনিয়মিতভাবে লিখতেন, সেই নামটাও বলেছিলেন। নামটা ছিল মখিক। আমার ইচ্ছা ছিল কথাটার সত্যতা এক সময় বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করে জেনে নেব। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি মিল্লাতে মাঝে মাঝে লিখতেন সে কথা স্বীকার করেছেন। কিন্তু নিজের ছদ্মনাম কী ছিল স্মরণ করতে পারেননি। [আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ‘সাংবাদিক শেখ মুজিব’, দৈনিক যুগান্তর, ১৬ মার্চ, ২০২০]

সর্বোতভাবে তিনি মননশীল জীবনযাপন করতেন আর এখন পর্যন্ত সেই জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট ফসল অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন।

এ তিনটি বই তিন রকম। একটি আত্মজীবনী, বলা যায় রাজনৈতিক আত্মজীবনী এবং তার সঙ্গে নানা অনুসঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনের বিপুল মহাকাব্য। কারাগারের রোজনামচা তারিখ দিয়ে দিয়ে বন্দিজীবন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সেই জীবনের অনেকান্ত কলেবর রচিত হয়েছে। আর আমার দেখা নয়াচীন নিখাঁদ ভ্রমণসাহিত্য। এগুলো নতুন ধারার কোনো সাহিত্য নয়। বহুকাল থেকে সাহিত্যের এ তিনটি ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে। এ তিনটিমাত্র গ্রন্থের মাধ্যমে কোনো শক্তিতে বঙ্গবন্ধু বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেন তার ন্যায়সূত্র বোঝা দরকার।

আত্মজীবনী, রোজনামচা এবং ভ্রমণকহিনিতে প্রকটভাবে ‘আমিত্বে’র বিকাশ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অধিকাংশ লেখক সম্পূর্ণ আলোটুকু নিজের দিকে ফেলতে চেষ্টা করেন এবং নিজের ভালোত্বের বিবরণ দিয়ে খুশি হন আর খুঁটিনাটি বিবরণের ভেতর দিয়ে বারবার নিজের কাছেই ফিরে আসার তাড়া বোধ করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর এ তিনটি রচনার মধ্যে কোথাও নিজের ওপর আলো ধরে রাখেননি। অধিকন্তু একটি অসম্ভব সহজাত দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধের পটভূমিতে তিনি তার দৃষ্টিকে প্রসারিত করছেন জীবনের সর্বাবয়বে। ফলে তিনটি গ্রন্থের মধ্যেই আমরা লক্ষ করব অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বর। এবং সেসব মানুষ প্রত্যেকেই আপন আপন মহিমায় উজ্জ্বল। কিছুকে বা কাউকে ছোট না করে দেখার, গুরুত্বহীন বলে বিবেচনা না করার এবং প্রত্যেক ব্যক্তি ও ঘটনাকে তাদের স্ব স্ব অবস্থানে যথাথ সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপন করার এই যে মানসিকতা, তাকে অনেক বড় মানের সাহিত্যরুচি বললে অত্যুক্তি হবে না। লেখক শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে অসাধারণ এ সাহিত্যরুচি তৈরি হয়েছিল তার কলকাতার বিপুল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিবেষ্টিত জীবনেই। এ তিনটি গ্রন্থের মধ্যে একটি সাধারণ প্রবণতা হলো তার রাজনৈতিক জীবনাদর্শনে বিচিত্র ঘটনা, পরিপ্রেক্ষিত ও সঙ্গে-অনুষঙ্গে তুলে ধরা। কিন্তু কিছুতেই তাতে তাত্ত্বিকতার চিহ্নমাত্রও নেই। কখনো নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলার ভঙ্গিতে, কখনো ঘটনার বিবরণের মধ্যে এবং কখনো বা বৈঠকি ভঙ্গিতে তিনি তুলে ধরেছেন তার আকাঙ্ক্ষার জগৎকে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনটি গ্রন্থের গড়নগত স্বাতন্ত্র্যে। আত্মজীবনীর ভাষা ও ঘটনার বিস্তার এবং ভাবনার সংগঠন নিশ্চয়ই রোজনামচা ও ভ্রমণকাহিনির মতো নয়। আত্মজীবনীর আখ্যানের মধ্যে এক ধরনের ত্রিকালদর্শী পরিবেশ বিরাজমান থাকে। অতীত ও বর্তমানের পটভূমিতে ভবিষ্যৎও সেখানে নানাভাবে চলে আসে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর মধ্যে আখ্যানের এ সংগঠন স্পষ্টভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু কারাগারের রোচনামচার সংগঠন সম্পূর্ণই আলাদা। প্রতিদিনের ঘটনার বিবরণের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান আটপৌরে যে ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন সে ভাষা কিছুমাত্র আত্মজীবনীতে লক্ষ করা যায় না। এখানে বর্তমানই মুখ্য এবং ভাষার মধ্যেও আছে বই হিসাবে প্রকাশ করা হবে না এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত। কিন্তু দ্বন্দ্ব লাগে যখন গ্রন্থের প্রথমেই জেলখানার বিচিত্র ভাষা, ঘটনা ও রেওয়াজের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা লক্ষ করি। তার মানে খুব সচেতনভাবেই তিনি রোজনামচা লিখেছিলেন। কিন্তু তবুও সহজাত সাহিত্য প্রতিভার প্রেরণায়ই আলাদা হয়ে গেছে সবকিছু। ভ্রমণকাহিনির মধ্যে এক ধরনের গতি থাকে। সেই গতি ঘটনার, আখ্যানের ও ভাষার। আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থে ওই গতির স্পর্শ পাওয়া যায় সর্বত্র। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন গ্রন্থ তিনটির অভিন্ন একটি মূল সুর আছে, আর তা হলো অন্তরঙ্গতা। কথা বলার ভঙ্গিটাই এমন যে তিনি যেন বৈঠকখানায় বসে সমবেত লোকজনের সামনে কথা বলছেন। সেই শ্রোতা প্রথমত তিনি নিজে। ওইটুকু আস্থা তার নিজের ওপর ছিল। ফলে এমন কোনো ভাষা বা ঘটনার বিবরণ নেই যা পড়ে জেলখানার কর্মকর্তারা লেখাগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারেন। আবার অনেকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে যেমন বঙ্গবন্ধুর মতো লোকের একটি সহজ সচ্ছলতার সৃষ্টি হয় তেমনি ভাষা ও বক্তব্যে সততা, নিষ্ঠা ও পরিশীলনের বিষয় চলে আসে। এ সব বিষয়ই গ্রন্থ তিনটিকে মহিমামণ্ডিত করে তুলেছে। লেখাগুলো উপন্যাস নয়, গল্প নয়, কবিতাও নয়-একান্তই তার ব্যক্তিগত জীবনের আলোকে ইতিহাস, তার সময়ের রাজনীতি, রাজনৈতিক সহকর্মী, সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার-পরিজন। এমন লেখায় পদে পদে আততায়ীর মতো ওতপেতে থাকে সততার প্রশ্ন, সঠিকতার প্রশ্ন, ন্যায় ও ন্যায্যতার প্রশ্ন। গল্প-উপন্যাস-নাটক-কবিতা এ সবের ধার ধারে না। ফলে তিনি একজন সৃষ্টিশীল লেখকের স্বাধীনতা ভোগ করেননি। কিন্তু গ্রন্থ তিনটি পড়লে ওই পরাধীনতার কোনো চিহ্ন আবিষ্কার করা যায় না। মনে হয় তিনি বলতে শুরু করেছেন এবং আর কোথাও না থেমে তিনি গন্তব্যে উপনীত হয়েছেন। লেখার এ সচ্ছলতা গ্রন্থ তিনটিকে বিপুল জনপ্রিয়তা দান করেছে। সৃজনশীল মহৎ গ্রন্থের যা কিছু মাহাত্ম্য তার সকল রূপ-রস-গন্ধ এবং আলো-ছায়ার খেলা খুব ভালোভাবেই গ্রন্থ তিনটিতে উপভোগ্য হয়ে ওঠে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন