৭ মার্চের ভাষণ : প্রেরণার অনিঃশেষ ফল্গুধারা
jugantor
৭ মার্চের ভাষণ : প্রেরণার অনিঃশেষ ফল্গুধারা

  মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম  

১৩ আগস্ট ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

’৫২-এর ভাষা-আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা-আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬-দফা, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বিজয়ী নেতা হিসাবে ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত মন’ নিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্সের মাঠে ১০ লাখের বেশি জনতার সামনে দাঁড়ালেন বাঙালির সংগ্রামী জীবনের একটা উপসংহার নিয়ে। অনলবর্ষী কিন্তু কাব্যসুষমামণ্ডিত সেই ভাষণে তিনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ অর্জনের মন্ত্রটি বাঙালির অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দিলেন। অন্যদিকে ধর্মকে পুঁজি করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষীগত করে পাকিস্তানের যারা শোষণের স্টিমরোলার চালাচ্ছিল, তাদের কাছে ভাষণটি মনে হলো রণহুঙ্কার। Ralp Waldo Emerson ঠিকই বলেন 'Speech is

power, Speech is to persuade, to convert, to compel.'

বঙ্গবন্ধু যেদিন রেসকোর্সের মাঠে ১০ লাখ ঊর্ধ্ব উন্মুখ জনতার সামনে এসে দাঁড়ালেন সেদিন তার চেনা শক্ররা ক্যান্টনমেন্টে বসে কান খাড়া করে বন্দুকের ট্রিগারে হাত রেখে প্রস্তুত ছিল। ভাষণে একটু এদিক-সেদিক হলে তার নিজের এবং দেশের জনগণের পরিণতি কী হবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু আগেই সম্মকভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই ৭ মার্চের ভাষণে কী বলতে হবে সে কথাগুলো মনে মনে সাজিয়ে ছিলেন যুক্তি আর অভিজ্ঞতার পরিপক্বতায়। বঙ্গবন্ধু জানতেন তার জনগণ কী চায়-সে কারণেই তিনি পরোক্ষভাবে তাদের করণীয়, বর্জনীয় সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন পরিমিত বাগ্মিতায়। চলমান বৈরী আবহের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনের ভাবাবেগ এমনভাবে দুলিয়ে দুলিয়ে এগিয়ে নিলেন যে, তাতে একটা কাব্যিক সৃজনের অতুল্য ভারসাম্য বজায় থাকল। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে যখন ভাষণটি শেষ করলেন তখন বাঙালিরা যে প্রত্যাশা নিয়ে রেসকোর্সের মাঠে হাজির হয়েছিলেন সে প্রত্যাশা পূরণ হলো। সেই অসাধারণ ভাষণটি সুধা সঞ্জীবনী শক্তির মতো তাদের মনে-মননে ব্যাপক আলোড়ন তুলল। ছন্দোবদ্ধ মহাকাব্যিক এ ভাষণের সংযত অথচ উদ্দীপনাময় উচ্চারণ বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল এবং অব্যবহিত পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার Clarion Call হিসাবে গৃহীত হয়েছিল।

২.

‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি’-এ বাক্যটিতে সেদিন বঙ্গবন্ধুর বুকের যে হাহাকার ফুটে উঠেছিল তাতে বিশুদ্ধ মানবতার সর্বকালিক, সর্বদৈশিক ভাবাবেগের অভ্যন্তরীণ শক্তির স্ফূরণ সহজেই উপলব্ধি করা যায়, তাতে সম্মুখগামী একটা অদম্য শক্তি দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে দুর্বার গতিতে অগ্রসরমাণ ছিল। মনে-মননে সদাজাগ্রত ঐকান্তিক ভালোবাসা আর সহানুভূতি থাকলেই এমন প্রকাশ ঘটে। এ একটি ভাষণ সেদিন বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের নিমিত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বাঙালিকে ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ এমন উদ্দীপনাপূর্ণ আটপৌরে বাংলা শব্দের মিশেলে যে বজ্রবাণী উচ্চারিত হয় বাঙালি তা কখনো স্মৃতি ভ্রষ্ট হবে না। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে-এমন হৃদয়সংবেদ্য মঙ্গল শঙ্ক্ষধ্বনি নিয়ে আর কোনো নেতা কোনোদিন বাঙালিকে তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এমনভাবে আহ্বান করেননি। কাজেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে আমাদের পরম গরবের ধন হিসাবে হৃদয়ে সমাসীন এবং তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবেও পরিগণিত।

এবার পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীকার আন্দোলন-অত্যাচার-শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মহান নেতাদের কালজয়ী বক্তৃতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অনির্বচনীয় বক্তৃতার তুলনামূলক বিচার করা যাক, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টি সহজেই প্রনিধানযোগ্য।

১৯১৯ সালে প্রকাশিত Ten Days That Shook the World গ্রন্থে আমেরিকান সাংবাদিক ও বিপ্লবী লেখক John Reed ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের নেতৃত্বে সংগঠিত ‘অক্টোবর বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ১৯১৭ সালের নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ যে কয়টি দিনের উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই ১৮ দিন বাঙালির জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতিপর্ব হিসাবে অক্টোবর বিপ্লবের সমার্থক বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ, ১৮ দিনের এ প্রস্তুতির বীজ উপ্ত হয়েছিল ৭ মার্চের রেসকোর্সের জনসভায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক ভাষণের মধ্য দিয়ে। ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামে যার প্রতিরোধে শুরু হয় দুর্বার মুক্তিযুদ্ধ। গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দেন সেটা ছিল ৭ মার্চের ভাষণেরই পরোক্ষ ঘোষণার পরিপূরক। মূল কথাটি ৭ মার্চেই বঙ্গবন্ধু তার হৃদয়সংবেদ্য মৌলিক আকাঙ্ক্ষার আকারে প্রকাশ করেছিলেন এবং বাঙালিও সেদিন তার আহ্বানের গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং এই ১৮ দিন মহামতি লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের উল্লেখ্য ওই কয়দিনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণের একটি উক্তির জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। তার Gettysburg Adderss (গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেস-এ) ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরে ২৭৫টি শব্দের গাঁথুনিতে পেনসিলভেনিয়ার গ্যাটিসবার্গে মাত্র ৩ মিনিটের এই ভাষণটি শেষ করেছিলেন-''We here highly resolve that these dead shall not have died in vain, that this nation under God shall have a new birth of freedom and that government of

the people, by the people and for the people shall not perish from the Earth.'' (জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার) এ উক্তির মধ্য দিয়ে। তার সামনে উপস্থিত ছিল আনুমানিক ২০ হাজারের মতো মানুষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের তার বক্তৃতা শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উক্তির মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গভীর দেশপ্রেম, জাতির আকাঙ্ক্ষার সম্যক উপলব্ধিজাত প্রগাঢ় অনুভূতি, দেদীপ্যমান সংগ্রামী-চেতনার বিমূর্ত স্ফূরণ মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে যে সংবেদন সৃষ্টি করেছিল, সেটা আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ বক্তৃতা’র চেয়ে অন্যূন নয়।

৩.

ব্রিটেনের পার্লামেন্টের হাউজ অফ কমনস-এ ১৯৪০ সালে ৪ জুন দেওয়া উইস্টন চার্চিলের ''We shall fight on the Beaches'' শিরোনামের ভাষণটিও বিশ্ব ইতিহাসে বিখ্যাত ভাষণ বলে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি স্বগর্ভে এবং বীরোচিত চিত্তে ঘোষণা দেন, ''We shall

fight on the seas and oceans, we shall fight with growing confidence and growing strength in

the air, we shall defend our Island, whatever the cost may be we shall fight on the beaches, we

shall fight in the fields and in the streets, we shall fight in the hills, we shall never

surrender.'' তার এ ভাষণে সেদিন যুদ্ধের ফলাফল সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মুহূর্ত, সেখানে উভয়পক্ষে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী যুদ্ধরত অবস্থায় পরস্পর মুখোমুখি; আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার এ ভাষণে দেশের জনগণকে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ ক্ষমতাসীন সরকারের সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে একমাত্র মনোবলের জোরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চার্চিল ভাষণ দিয়েছিলেন তার মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের মরণপণ লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতে। চার্চিলের সেই ভাষণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি পরিবর্তন করেছিল এবং সেটা ছিল বিশ্বের বহুজাতির একটা সম্মিলিত প্রয়াস। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একাই একটা জাতিকে হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে একটা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী যাদের বলা হতো ''finest fighting machine in Asia'' তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য মানসিকভাবে সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি চার্চিলের হাউস অফ কমনস-এর সামনে দেওয়া ভাষণের তুলনায় কম প্রেরণাদায়ী নয়।

মহাত্মা গান্ধী ৮ আগস্ট ১৯৪২ সালে বোম্বের গোয়ালিয়া ট্যাংক ময়দানে ব্রিটিশদের প্রতি অহিংস ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। গান্ধীর এই 'Do or Die' ‘আগস্ট আন্দোলন’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ (Quit India) বক্তৃতা নামে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। যেখানে গান্ধী বলেন, ''We shall either free India or die in the attempt, We shall not live to see the

perpetuation of our slavery...Let every Indian consider himself to be a freeman''। স্মর্তব্য যে, বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়কর্মী এবং ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর পক্ষে কাজ করেছিলেন। গান্ধী এক দুর্দান্ত প্রতাপশালী বিশ্ব মোড়লের বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ব্রিটিশরা গোটা পৃথিবীতেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। পাকিস্তানও ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ববাংলায় ঔপনিবেশিক কায়দায় শাসন করতে এসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদের মুখে পড়ে। সেই প্রতিবাদের একটা ক্রান্তি মুহূর্ত ছিল ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ তাই গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সমার্থক গুরুত্ব বহন করে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনটি ছিল আরও প্রবল এবং তীব্র যা একটি সফল সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়।

আব্রাহাম লিঙ্কনের গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেসের ১০০ বছর পর ১৯৬৩-এর ২৮ আগস্ট রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এর দেয়া ''I

Have a Dream'' শিরোনামের বক্তৃতাটি স্মরণে আনা যাক। লিংকন মেমোরিয়ালের পাদদেশে দাঁড়িয়ে লুথার কিং সেদিন তার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। দাস প্রথা বিলুপ্তির এক দশক পরও আমেরিকার নাগরিক অধিকার তথা সমান অধিকার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া বক্তৃতায় প্রায় আড়াই লাখ লোকের সমাবেশে তিনি যা বলেছিলেন তার মূল কথা ছিল- 'I say to you today, my friends, so

even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a

dream deeply rooted in the American dream. I have a dream that one day this nation will rise

up and live out the true meaning of its creed... that all man are created equal. I have a dream

that my four children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of

their skin but by the content of their character'. সব নাগরিকের সমঅধিকার আদায়ে আপসহীন এ নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবন চরিত্রেও অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায় বিশেষত এ ভাষণের ৫ বছরের মধ্যে আততায়ীর বুলেটে তার প্রাণ সংহার হয় আর আমাদের জাতির পিতাও তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের অনধিক ৫ বছরের মধ্যে অপরিনামদর্শী, পথভ্রান্ত কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

উপরোক্ত প্রতিটি ভাষণই বিশ্বের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে দৈশিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কারণে। সব ভাষণই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার এক অসাধারণ নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এসব ভাষণের তুলনায় কোনো কোনো বিচারে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। কারণ, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এ ভাষণটি সেদিন বাঙালির জাতীয় জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল সেটা আজ দেশে ও বিদেশে গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ভাষণটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল রচনা করেছিল।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (Documentary heritage) হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অধিকন্তু ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ভাষণটি অনুবাদ করে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতি হিসাবে এ আমাদের এক আত্মমর্যাদার এবং গর্বের বিষয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যুগে যুগে মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে এক নিরন্তর প্রেরণার ফল্পুধারার মতো আবহমানকাল প্রবাহিত হবে যার জন্যই 'Internatioanl Newsweek' ম্যাগাজিন তাদের ৫ এপ্রিল ১৯৭১ ইস্যুর কভারস্টরিতে বঙ্গবন্ধুকে 'Poet of Politics' বা রাজনীতির কবি অভিধায় ভূষিত করে।

লেখক : ব্যাংকার, বঙ্গবন্ধু গবেষক

৭ মার্চের ভাষণ : প্রেরণার অনিঃশেষ ফল্গুধারা

 মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম 
১৩ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

’৫২-এর ভাষা-আন্দোলন, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা-আন্দোলন, ’৬৬-এর ৬-দফা, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বিজয়ী নেতা হিসাবে ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত মন’ নিয়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে রেসকোর্সের মাঠে ১০ লাখের বেশি জনতার সামনে দাঁড়ালেন বাঙালির সংগ্রামী জীবনের একটা উপসংহার নিয়ে। অনলবর্ষী কিন্তু কাব্যসুষমামণ্ডিত সেই ভাষণে তিনি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ অর্জনের মন্ত্রটি বাঙালির অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দিলেন। অন্যদিকে ধর্মকে পুঁজি করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কুক্ষীগত করে পাকিস্তানের যারা শোষণের স্টিমরোলার চালাচ্ছিল, তাদের কাছে ভাষণটি মনে হলো রণহুঙ্কার। Ralp Waldo Emerson ঠিকই বলেন 'Speech is

power, Speech is to persuade, to convert, to compel.'

বঙ্গবন্ধু যেদিন রেসকোর্সের মাঠে ১০ লাখ ঊর্ধ্ব উন্মুখ জনতার সামনে এসে দাঁড়ালেন সেদিন তার চেনা শক্ররা ক্যান্টনমেন্টে বসে কান খাড়া করে বন্দুকের ট্রিগারে হাত রেখে প্রস্তুত ছিল। ভাষণে একটু এদিক-সেদিক হলে তার নিজের এবং দেশের জনগণের পরিণতি কী হবে সে সম্পর্কে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু আগেই সম্মকভাবে আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই ৭ মার্চের ভাষণে কী বলতে হবে সে কথাগুলো মনে মনে সাজিয়ে ছিলেন যুক্তি আর অভিজ্ঞতার পরিপক্বতায়। বঙ্গবন্ধু জানতেন তার জনগণ কী চায়-সে কারণেই তিনি পরোক্ষভাবে তাদের করণীয়, বর্জনীয় সম্পর্কে নির্দেশ দিলেন পরিমিত বাগ্মিতায়। চলমান বৈরী আবহের নাতিদীর্ঘ বর্ণনা দিয়ে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনের ভাবাবেগ এমনভাবে দুলিয়ে দুলিয়ে এগিয়ে নিলেন যে, তাতে একটা কাব্যিক সৃজনের অতুল্য ভারসাম্য বজায় থাকল। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে যখন ভাষণটি শেষ করলেন তখন বাঙালিরা যে প্রত্যাশা নিয়ে রেসকোর্সের মাঠে হাজির হয়েছিলেন সে প্রত্যাশা পূরণ হলো। সেই অসাধারণ ভাষণটি সুধা সঞ্জীবনী শক্তির মতো তাদের মনে-মননে ব্যাপক আলোড়ন তুলল। ছন্দোবদ্ধ মহাকাব্যিক এ ভাষণের সংযত অথচ উদ্দীপনাময় উচ্চারণ বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল এবং অব্যবহিত পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার Clarion Call হিসাবে গৃহীত হয়েছিল।

২.

‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি’-এ বাক্যটিতে সেদিন বঙ্গবন্ধুর বুকের যে হাহাকার ফুটে উঠেছিল তাতে বিশুদ্ধ মানবতার সর্বকালিক, সর্বদৈশিক ভাবাবেগের অভ্যন্তরীণ শক্তির স্ফূরণ সহজেই উপলব্ধি করা যায়, তাতে সম্মুখগামী একটা অদম্য শক্তি দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে দুর্বার গতিতে অগ্রসরমাণ ছিল। মনে-মননে সদাজাগ্রত ঐকান্তিক ভালোবাসা আর সহানুভূতি থাকলেই এমন প্রকাশ ঘটে। এ একটি ভাষণ সেদিন বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের নিমিত্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বাঙালিকে ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ এমন উদ্দীপনাপূর্ণ আটপৌরে বাংলা শব্দের মিশেলে যে বজ্রবাণী উচ্চারিত হয় বাঙালি তা কখনো স্মৃতি ভ্রষ্ট হবে না। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে এ কথা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে-এমন হৃদয়সংবেদ্য মঙ্গল শঙ্ক্ষধ্বনি নিয়ে আর কোনো নেতা কোনোদিন বাঙালিকে তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এমনভাবে আহ্বান করেননি। কাজেই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি রূপে আমাদের পরম গরবের ধন হিসাবে হৃদয়ে সমাসীন এবং তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি আজ পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবেও পরিগণিত।

এবার পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীকার আন্দোলন-অত্যাচার-শোষণ-নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রামের মহান নেতাদের কালজয়ী বক্তৃতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের অনির্বচনীয় বক্তৃতার তুলনামূলক বিচার করা যাক, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠার বিষয়টি সহজেই প্রনিধানযোগ্য।

১৯১৯ সালে প্রকাশিত Ten Days That Shook the World গ্রন্থে আমেরিকান সাংবাদিক ও বিপ্লবী লেখক John Reed ভ্লাদিমির ইলিচ লেলিনের নেতৃত্বে সংগঠিত ‘অক্টোবর বিপ্লবের’ মধ্য দিয়ে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ১৯১৭ সালের নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ যে কয়টি দিনের উল্লেখ করেছেন, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই ১৮ দিন বাঙালির জাতীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতিপর্ব হিসাবে অক্টোবর বিপ্লবের সমার্থক বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ, ১৮ দিনের এ প্রস্তুতির বীজ উপ্ত হয়েছিল ৭ মার্চের রেসকোর্সের জনসভায় দেওয়া বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক ভাষণের মধ্য দিয়ে। ভাষণের ১৮ দিন পর পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালি নিধনে নামে যার প্রতিরোধে শুরু হয় দুর্বার মুক্তিযুদ্ধ। গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দেন সেটা ছিল ৭ মার্চের ভাষণেরই পরোক্ষ ঘোষণার পরিপূরক। মূল কথাটি ৭ মার্চেই বঙ্গবন্ধু তার হৃদয়সংবেদ্য মৌলিক আকাঙ্ক্ষার আকারে প্রকাশ করেছিলেন এবং বাঙালিও সেদিন তার আহ্বানের গুরুত্ব অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল। সুতরাং এই ১৮ দিন মহামতি লেনিনের অক্টোবর বিপ্লবের উল্লেখ্য ওই কয়দিনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন তার সেই ঐতিহাসিক ভাষণের একটি উক্তির জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। তার Gettysburg Adderss (গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেস-এ) ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বরে ২৭৫টি শব্দের গাঁথুনিতে পেনসিলভেনিয়ার গ্যাটিসবার্গে মাত্র ৩ মিনিটের এই ভাষণটি শেষ করেছিলেন-''We here highly resolve that these dead shall not have died in vain, that this nation under God shall have a new birth of freedom and that government of

the people, by the people and for the people shall not perish from the Earth.'' (জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা সরকার এবং জনগণের জন্য সরকার) এ উক্তির মধ্য দিয়ে। তার সামনে উপস্থিত ছিল আনুমানিক ২০ হাজারের মতো মানুষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের তার বক্তৃতা শেষ করেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উক্তির মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের গভীর দেশপ্রেম, জাতির আকাঙ্ক্ষার সম্যক উপলব্ধিজাত প্রগাঢ় অনুভূতি, দেদীপ্যমান সংগ্রামী-চেতনার বিমূর্ত স্ফূরণ মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে যে সংবেদন সৃষ্টি করেছিল, সেটা আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ বক্তৃতা’র চেয়ে অন্যূন নয়।

৩.

ব্রিটেনের পার্লামেন্টের হাউজ অফ কমনস-এ ১৯৪০ সালে ৪ জুন দেওয়া উইস্টন চার্চিলের ''We shall fight on the Beaches'' শিরোনামের ভাষণটিও বিশ্ব ইতিহাসে বিখ্যাত ভাষণ বলে প্রতিভাত হয়েছে। তিনি স্বগর্ভে এবং বীরোচিত চিত্তে ঘোষণা দেন, ''We shall

fight on the seas and oceans, we shall fight with growing confidence and growing strength in

the air, we shall defend our Island, whatever the cost may be we shall fight on the beaches, we

shall fight in the fields and in the streets, we shall fight in the hills, we shall never

surrender.'' তার এ ভাষণে সেদিন যুদ্ধের ফলাফল সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। সেটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মুহূর্ত, সেখানে উভয়পক্ষে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী যুদ্ধরত অবস্থায় পরস্পর মুখোমুখি; আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার এ ভাষণে দেশের জনগণকে ‘যার যা আছে তাই নিয়ে’ ক্ষমতাসীন সরকারের সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে একমাত্র মনোবলের জোরে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। চার্চিল ভাষণ দিয়েছিলেন তার মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের মরণপণ লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাতে। চার্চিলের সেই ভাষণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি পরিবর্তন করেছিল এবং সেটা ছিল বিশ্বের বহুজাতির একটা সম্মিলিত প্রয়াস। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে একাই একটা জাতিকে হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে একটা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী যাদের বলা হতো ''finest fighting machine in Asia'' তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য মানসিকভাবে সাহসী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি চার্চিলের হাউস অফ কমনস-এর সামনে দেওয়া ভাষণের তুলনায় কম প্রেরণাদায়ী নয়।

মহাত্মা গান্ধী ৮ আগস্ট ১৯৪২ সালে বোম্বের গোয়ালিয়া ট্যাংক ময়দানে ব্রিটিশদের প্রতি অহিংস ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সূত্রপাত করেন। গান্ধীর এই 'Do or Die' ‘আগস্ট আন্দোলন’ বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ (Quit India) বক্তৃতা নামে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। যেখানে গান্ধী বলেন, ''We shall either free India or die in the attempt, We shall not live to see the

perpetuation of our slavery...Let every Indian consider himself to be a freeman''। স্মর্তব্য যে, বঙ্গবন্ধু কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়ার পর মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়কর্মী এবং ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর পক্ষে কাজ করেছিলেন। গান্ধী এক দুর্দান্ত প্রতাপশালী বিশ্ব মোড়লের বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। ব্রিটিশরা গোটা পৃথিবীতেই তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। পাকিস্তানও ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ববাংলায় ঔপনিবেশিক কায়দায় শাসন করতে এসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদের মুখে পড়ে। সেই প্রতিবাদের একটা ক্রান্তি মুহূর্ত ছিল ৭ মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ তাই গান্ধীর ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের সমার্থক গুরুত্ব বহন করে। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধুর আন্দোলনটি ছিল আরও প্রবল এবং তীব্র যা একটি সফল সশস্ত্র যুদ্ধে রূপ নেয়।

আব্রাহাম লিঙ্কনের গ্যাটিসবার্গ অ্যাড্রেসের ১০০ বছর পর ১৯৬৩-এর ২৮ আগস্ট রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র এর দেয়া ''I

Have a Dream'' শিরোনামের বক্তৃতাটি স্মরণে আনা যাক। লিংকন মেমোরিয়ালের পাদদেশে দাঁড়িয়ে লুথার কিং সেদিন তার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। দাস প্রথা বিলুপ্তির এক দশক পরও আমেরিকার নাগরিক অধিকার তথা সমান অধিকার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া বক্তৃতায় প্রায় আড়াই লাখ লোকের সমাবেশে তিনি যা বলেছিলেন তার মূল কথা ছিল- 'I say to you today, my friends, so

even though we face the difficulties of today and tomorrow, I still have a dream. It is a

dream deeply rooted in the American dream. I have a dream that one day this nation will rise

up and live out the true meaning of its creed... that all man are created equal. I have a dream

that my four children will one day live in a nation where they will not be judged by the color of

their skin but by the content of their character'. সব নাগরিকের সমঅধিকার আদায়ে আপসহীন এ নেতার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর জীবন চরিত্রেও অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায় বিশেষত এ ভাষণের ৫ বছরের মধ্যে আততায়ীর বুলেটে তার প্রাণ সংহার হয় আর আমাদের জাতির পিতাও তার ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের অনধিক ৫ বছরের মধ্যে অপরিনামদর্শী, পথভ্রান্ত কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতবরণ করেন।

উপরোক্ত প্রতিটি ভাষণই বিশ্বের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে দৈশিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের কারণে। সব ভাষণই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার এক অসাধারণ নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করেছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এসব ভাষণের তুলনায় কোনো কোনো বিচারে অধিক তাৎপর্যপূর্ণ বললেও অতিশয়োক্তি হবে না। কারণ, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এ ভাষণটি সেদিন বাঙালির জাতীয় জীবনে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল সেটা আজ দেশে ও বিদেশে গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ভাষণটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল রচনা করেছিল।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ (Documentary heritage) হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অধিকন্তু ইউনেস্কোর উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ভাষণটি অনুবাদ করে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতি হিসাবে এ আমাদের এক আত্মমর্যাদার এবং গর্বের বিষয়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যুগে যুগে মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে এক নিরন্তর প্রেরণার ফল্পুধারার মতো আবহমানকাল প্রবাহিত হবে যার জন্যই 'Internatioanl Newsweek' ম্যাগাজিন তাদের ৫ এপ্রিল ১৯৭১ ইস্যুর কভারস্টরিতে বঙ্গবন্ধুকে 'Poet of Politics' বা রাজনীতির কবি অভিধায় ভূষিত করে।

লেখক : ব্যাংকার, বঙ্গবন্ধু গবেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন