জামালপুরের সাহিত্য যুগে যুগে
jugantor
জামালপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন
জামালপুরের সাহিত্য যুগে যুগে

  সাযযাদ আনসারী  

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীজুড়েই উপমহাদেশে যেমন দৃষ্টি সাধনার জাগরণ শুরু হয়েছিল সেই উত্তাল হাওয়া জামালপুরেও ছিল বেগবান। এ মাটিতে জন্ম হয়েছে বহু বরেণ্য কবি সাহিত্যিকদের। ইতিহাস বিস্মৃতির কারণে রয়ে গেছে ব্যাপক তথ্য সংকট। এ তথ্য সংকটগ্রস্ততা মেনেই লিখতে হলো। এ সীমাবদ্ধতা শ্রদ্ধেয় পাঠক ক্ষমার চোখে দেখবেন আশা করি। এর মধ্যেও সাহিত্যে প্রজ্ঞার প্রদীপ হিসাবে ভাস্কর যে ক’টি নাম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-দেশবরেণ্য কবি, গবেষক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমান, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচিত্র ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, লেখক সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব প্রমুখ। এ ছাড়া ড. মোহাম্মদ সামাদ, ড. খন্দকার আশরাফ হোসেন, নজরুল ইসলাম বাবু, আতা সরকার, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, কবি ও গবেষক আসাদুল্লাহ, কবি শামীমুল হক শামীম, এরাও জামালপুরের সাহিত্যে কৃতী ব্যক্তিত্ব। জামালপুরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ কিংবা বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলা সাহিত্যের সূচনাকাল হিসাবে ধরলে দেখা যায় সুদূর অতীতকাল থেকেই এখানে সংস্কৃত ভাষাভিত্তিক সাহিত্য এবং মুসলিম জাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি ধারাই বেগবান ছিল। একটি হচ্ছে আরবি, ফার্সি ভাষার সংমিশ্রিত ভাষারূপের সাহিত্য, অন্যটি সংস্কৃত ভাষা।

একদিকে ব্যাপক পুঁথি সাহিত্যের প্রচলন অন্যদিকে সনাতন সংস্কৃত প্রথা সমৃদ্ধ সাহিত্য। যেমন : ‘মুন্সি রমজান আলী’ ‘তাহইয়া তুছাছালাত’, ‘দেওয়ানগঞ্জ থানার মোহাম্মদ তাহের আফতাব এ হেদায়েত’ সৈয়দ আঃ রহমানের উসদায়েতুল মোছায়েল, মাদারগঞ্জের মীর্জা জাফর আলীর ‘বোরহানে হক’ ও কৃষক সহায় ইত্যাদি পুঁথি গ্রন্থ রচনার ব্যাপক প্রসার লক্ষ করা যায়। সংস্কৃত শব্দবহুল সাহিত্য ধারায় যদি লক্ষ করি কিংবা শতাব্দীর শুরুতে বিভিন্ন গোত্রভিত্তিক সাহিত্যের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন : উদ্বাহো চন্দ্রালোক, বুদ্ধি চন্দ্রালোক, জীবনের নশ্বরত্ব, জীবন্ত বংশানুচরিত, শ্রীবৎ সোপাখ্যান, কুসুম কোরক, আতস নারী ইত্যাদি। সে সময় এখানে নিরক্ষর গ্রাম্য গীতি কবিরা রচনা করেন একদলীয় গান।

ঘাটুগান, বাইদাগান, গুনাইবিধিয় গান, কবি গান হলিগান, জারি গান, মার্জিয়া গান ইত্যাদি। এসব ব্যাপকভাবে রচিত ও গীত হতো এবং মানুষের মনও ভরে উঠত উৎসবমুখর হয়ে। ৪৭’র দেশ বিভাগোত্তরকালে ক্রমশ সাহিত্যের সেই সীমাবদ্ধ ঘরানা থেকে উন্মুক্ত চর্চার প্রবাহ ধারণ করে। সে সময়ে সুকৃতিচর্চার রুদ্ধদ্বার ভেঙে কিছু মননশীল সাহিত্যকর্মী এ অঞ্চলে আধুনিক সাহিত্যচর্চায় ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন, এ মহৎ মানুষের মধ্যে যাদের উল্লেখ পাওয়া যায়, তারা হলেন মহিনী মোহন বল, পরেশ বাবু, মাখন পোদ্দার, গিরিন ঘোষ, অতুল নাগ, নীলকান্ত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য এ গুণিজনেরা নাট্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে নাট্যসাহিত্য ও সাহিত্যধারার বিভিন্ন ক্ষেত্রও উর্বর করে তোলেন।

পরবর্তী পর্যায়ে চল্লিশের দশকে কাব্যকলার উল্লেখযোগ্য নাম ফজলুর রহমান আনসারী, ফজলুর রহমান আজনবী, জগবন্ধু গোস্বামী, এদেরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চাশের দশকে উল্লেখযোগ্য নাম নাট্য সাহিত্যে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রনেশ চন্দ্র মজুমদার, আমজাদ হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান, নাট্যকার এম এস হুদা, সৈয়দ ইমামুর রশীদ, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মু আজিজুর রহমান, শেখ আব্দুল জলিল, আব্দুল হামিদ কবিরত্ন, আবু বকর, ফরহাদ মোহাম্মদ আলী, দূর্গাদাস ঘোষ, প্রদীপ কান্তি মজুমদার একই দশকে সৈয়দ আব্দুস সোবাহান, সৈয়দ আব্দুস সাত্তার, অরুন তালুকদার প্রমুখ।

ষাটের দশকে আতা সরকার দেশবরেণ্য গীতিকার ও কবি নজরুল ইসলাম বাবু, হাবিবুর রহমান হবি, মাহবুব বারী, মহিউদ্দিন শ্রীপুরী, হামিদুল ইসলাম প্রমুখের ধারাবাহিকতায় সত্তরের দশকে জামালপুর সাহিত্য সংসদের নামে একটি আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম সংগঠিত হয়েছিল। এ সাহিত্য সংসদের সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা সাহিত্যের বিকাশে অবদান রেখেছে তাদের মধ্যে অন্যতম শাহ্ খায়রুল বাসার, আহমেদ আজীজ, আবু জাইদ লতা, মীর আনিছুল হাসান, রেহানা পারভীন, তমাল সৈয়দ, সামসাদ জাহান, শাহজাহান সাজু, মোস্তাফিজুর রহমান জামাল, আশরাফুল মান্নান, ইসমাইল হোসেন, লাভলু আনসার, সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদার, গুলসান আক্তার, আমজাদ হোসেন বুলবুল, আলাউদ্দিন খান, ইলোরা আজমী, শাহজাদা আঞ্জুমান য়ারা মুক্তি, ফজলুল করিম ভানু, পারভীন করিম, রুমী কবির আসাদুল্লাহ ফারায়জি, সৈয়দ শরিফ প্রমুখ।

এ সময় মীর আনিসুল হাসানের সম্পাদনায় ‘ইমেজ’ নামে একটি ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হয়। যা এ জেলায় বাঙ্গালির ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চার প্রয়াস বলা যায়। একই সময়ে কবি মো. বাকী বিল্লাহ নারায়ণগঞ্জের প্রবাস জীবন শেষ করে জামালপুরে সাহিত্য সাধনায় যুক্ত হন।

সাহিত্য সংসদের পর আশির দশকে কুঁড়ি সাহিত্যগোষ্ঠী একঝাঁক সম্ভাবনাময় তরুণ তরুণীর সমন্বয়ে সাহিত্য আন্দোলনের অভিযাত্রা শুরু করে। এ সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যরা যুক্ত ছিলেন তারা হলো মেহেদী ইকবাল, সায্যাদ্ আনসারী, মনোয়ারা চেতন, হোসনে আরা মমতা, সাহীনা সোবহান মিতু, সৈয়দ নোমান প্রমুখ। একই সময়ে কবি শামীমুল হক শামীমের নেতৃত্বে উত্তরণ সাহিত্য গোষ্ঠীতে জামালপুরে সাহিত্যের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এ ধারাবাহিকতায় নব্বই দশকে সাদী কবির, শিহাব শাহরিয়ার, কবি জাহিদ মামুন, গোলাম হাফিজ বকুল, মোস্তফা বাবুল, জাহাঙ্গীর সেলিম, আলী আক্কাস, কামরুল হাসান সুজন, কাফি পারভেজ, জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল, রকিব লিটন প্রমুখ কবিরা স্বতন্ত্র প্রয়াসে জামালপুরের সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এখনো রেখে চলেছেন। এর পরের পর্যায়ে কবিতীর্থ নামে আরেকটি সাহিত্য সংগঠন গড়ে উঠেছিল। এ সংগঠনে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আনোয়ার হোসেন বাবু, মিনহাজ উদ্দিন শপথ, জিয়া ইব্রাহীম, মারুফ আজাদ বাবু, নাহিদ আনোয়ার, সানজিদা আনোয়ার, মিঠু জাকির, ছানোয়ার হোসেন, কামরুল ইসলাম সুজন, সৈয়দ আলিমুল বাশার প্রমুখ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নিয়মিত আড্ডার মধ্য দিয়ে জামালপুরে সাহিত্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন কবি মোয়াজ্জেম হোসেন আজাদ, শেখ ফজল, মাসুম মোকাররম, নান্নু পারভেজ, শুভ্রত তালুকদার, শ্বেতা শতাব্দী, রাজন্য রুহানী, ফারজানা ইসলাম, তারিকুল ফেরদৌস, জাহাঙ্গীর সেলিম, মাহফিজুল হক প্রমুখ। মেলান্দহে ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ মুকুলের সম্পাদনায় ছন্দে ঝিনাই কবিতাপত্রের মাধ্যমেও একটি সাহিত্য ধারা বেগবান ছিল।

সম্প্রতি জামালপুর কবিতা পরিষদের ব্যানারে বিশিষ্ট কবি ও রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় নবীন-প্রবীণ অনেকেই সাহিত্যে সক্রিয় আছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: অধ্যাপক ড. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী, অ্যাডভোকেট মুহম্মদ হায়দার, ভোলা দেবনাথ, আসকর আলী, আব্দুল হাই আল হাদী, স্বরুপ কাহালী, মিনহাজ উদ্দীন শপথ, ফারজানা ইসলাম, এস এম সাগর প্রমুখ।

এককালে শেরপুর ছিল তদানীন্তন জামালপুর মহকুমার একটি থানা। বৃহত্তর জামালপুর তদানীন্তনকালের সুপণ্ডিত জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী বিদ্যাবিনোদ ছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশে অভিভাবকতুল্য। সংস্কৃত, বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষার সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি ১২৯২ বঙ্গাব্দে (১৮৮৫ সালে) শেরপুর শহরে চারুযন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং সেই ছাপাখানা থেকে সাপ্তাহিক চারুবার্তা নামে একটি সমৃদ্ধ পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই পত্রিকার মাধ্যমেই সূচনা হয়েছিল বৃহত্তর জামালপুরের সাহিত্য বিকাশের প্রভাতকাল। পত্রিকাটিতে নানা বিচিত্র বিষয়ে খবরও থাকত। এরপর ১৯১৬ সালে মহীউদ্দীন সিদ্দিক নামের জনৈক ভদ্রলোক ডায়মন্ড প্রেস স্থাপন করেন। এর কিছুদিন পরে জনৈক সুধেন্দু মোহন ঘোষ (বি এল এল) শান্তি প্রেস নামে আরেকটি প্রেস স্থাপন করেন। এ প্রেস থেকে শান্তিবার্তা নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। যার সহকারী সম্পাদক ছিলেন জনাব গোলাম মোহাম্মদ। এ সময়ে কতিপয় সুধী ব্যবসায়ী মহলের প্রচেষ্টায় বঙ্গলক্ষ্মী প্রেস স্থাপিত হয়। এ প্রেস থেকে তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গুরু সদয়দত্ত আই সি এস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় গোলাম মোহাম্মদের সম্পাদনায় পল্লী মঙ্গল নামক মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এটি ছিল পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা। এ সাহিত্য পত্রিকাটি হয়তো জামালপুরে প্রথম সাহিত্য পত্রিকা। বঙ্গলক্ষ্মী প্রেসটির স্বত্বাধিকারী হন মির্জা আশরাফ উদ্দীন হায়দার। তিনি তৌফিক নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এভাবে সময়ে সময়ে জামালপুরে পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হলেও তার ধারাবাহিকতা সম্পর্ক জানা যায় না। ১৯৫৮ সালে সৈয়দ আব্দুস সোবাহানের সম্পাদনায় ‘ঝান্ডা উচা রাহে হামরা’ নামে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন।

প্রকাশনায় ছিল জামালপুর সংস্কৃতি সংসদ। এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দেশের বরণ্যে সাহিত্য ব্যক্তিত্ব হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ ইমামুর রশীদ। অন্যদের মধ্যে চন্দন বসু, অরুন তালুকদার, মু আজিজুর রহমান, আবু বক্কর উল্লেখযোগ্য। এ সাহিত্য পত্রিকাটি জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনকে শক্ত ভিত্তি দান করেছিল তা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। ১৯৭২ সালে সাঈদুর রহমান হিমু স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন। এতে যারা লিখেছেন- আম্বিয়া বুলবুল, খোদেজা জান্নাত, খালেদুর রহমান খালেদ, নজরুল ইসলাম বাবু প্রমুখ। একই বছর বাবুল হাসান বাবুর সম্পাদনায় আবাহন নামের একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশিত হয়। ওই সময় মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ‘হারুন তোমার রক্ত সড়কে’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদন করেন মাহবুবুল বারী খান (মাহবুব বারী) একই সময়ে হাবিবুর রহমান সম্পাদন করেন ময়ুখ নামে সাহিত্য সংকলন। একই সময়ে ‘নির্যাতিত প্রহরের কবিতা’ সম্পাদনা করেন সাঈদুর রহমান বাবু ও জুন্নু আহমেদ সাদী। সত্তর দশকেই কবি আহমেদ আজিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে শব্দ-নৈঃশব্দ্য নামক সাহিত্য পত্রিকা। এর পর্যায়ক্রমে ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। জামালপুর সাহিত্য সংসদ ও শব্দ নৈঃশব্দ্য পত্রিকাটিকে ঘিরে জামালপুর শহরে একটি উল্লেখযোগ্য আড্ডা জমে ওঠে। এর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের নাম আগে উল্লেখ হয়েছে। এ সত্তর দশকেই প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি নজরুল ইসলাম বাবুর সম্পাদনায় ‘চিঠি’ মাহবুব বারীর সম্পাদনায় ‘পাপড়ী’ প্রকাশিত হয়। আশির দশকে বিবর্তন নামে মেহেদী ইকবালের সম্পাদনায় সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটির মোট প্রকাশিত সংখ্যা হচ্ছে ১৯টি। মেহেদী ইকবাল বিবর্তনের আগেও ‘অনির্বাণ’, ‘দ্বীপ জেলে যাই’, ‘শব্দকানন’ নামে তিনটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। এসব পত্রিকা যারা লিখতেন তাদের নামে আশির দশকের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কবি সায্যাদ্ আনসারী সম্পাদনায় ‘প্রবাহ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। মোস্তফা কামাল মৌসুমের ‘অনিক’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবিম্ব, সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জামাল (১১টি গল্প সংকলন), সৈয়দ শোয়েবের সম্পাদনায় ‘সপ্তর্ষি’ (৭টি প্রবন্ধ সংকলন) সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদারের সম্পাদনায় ছড়া সংকলন ‘ইদানীং’। সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদার ও ড. জাহিদ হাসান রবি’র যৌথ সম্পাদনায় এবং হৃৎপিণ্ডীয় ভালোবাসা প্রকাশিত হয়। (পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু স্মরণে) মাদারগঞ্জ সাহিত্য পরিষদের প্রকাশনায় ‘ভেলা’, কাফি পারভেজের সম্পাদনায় ‘রাঙ্গা পলাশ’ প্রকাশিত হয়।

কবি আহমদ আজীজের সম্পাদনায় নব প্রকাশ নামে একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা ৩টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। শেষের সংখ্যাটি ছিল কবি হাসান হাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ হায়দারের সম্পাদনায় ‘কর্নঝোরা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অতি সম্প্রতি কবি মাহবুব বারীর সম্পাদনায় আর্ট পেপার নামে একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকার মার্চ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া যেহেতু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ছোট কাগজ (লিটল ম্যাগাজিনের) ভূমিকা খুবই প্রেরণা প্রবাহক। সে বিবেচনায় জামালপুরেরও এ লিটল ম্যাগ আন্দোলন চিরকালই শক্তিমান ছিল। উল্লেখিত পত্রপত্রিকার বাইরেও অবিরাম সাহিত্য সাধনা জড়িত তারুণ্য অজস্র সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন যুগে যুগে প্রকাশ করেছে। যার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। তাই অল্প কিছু পত্রপত্রিকা উল্লেখ করেই জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনের আভাস মাত্র প্রদান করা গেল।

সাহিত্য সাধনায় সাহিত্য সংগঠন ও সংঘ বেঁধে চলার অনিবার্যতা পৃথিবীর দেশে দেশে রয়েছে। এ আলোকে জামালপুরের কিছু সংগঠনের নাম উল্লেখ করছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে বললে বলা যেতে পারে করোনেশন রিডিং ক্লাব যা বর্তমানে পাবলিক লাইব্রেরি নামে প্রতিষ্ঠিত আছে। ব্রাহ্ম সমাজ, জাগরনী ক্লাব, কালের পুতুল, সংস্কৃতি সংসদ, শতাব্দীর দূত, মিতালী সংঘ, প্রীতি সংঘ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুরবাণী, স্বরলিপি, সপ্তর্ষি শিল্পী গোষ্ঠী, শিল্পী সমাজ, সাহিত্য সংসদ, কুঁড়ি সাহিত্য গোষ্ঠী, কবিতীর্থ, জামালপুর কবিতা পরিষদ, ষড়ঙ্গ আবৃতি, পীঠ, লোকজ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা, ইত্যাদি সংগঠনগুলো অধিকাংশই সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে সাহিত্য সাধনার পৃষ্ঠপোষকতায় ও চর্চায় সবগুলো সংগঠনই ছিল সাহিত্যচর্চায় সহায়ক শক্তি।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্য আড্ডার ভূমিকা প্রশ্নাতীত। এ ক্ষেত্রে যুগ যুগান্তর ধরে সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য আড্ডার গল্প উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। আড্ডার গল্প বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ নজরুলসহ কল্লল যুগের সাহিত্য আড্ডার গল্প নিয়ে। কালের যাত্রা প্রবাহে জামালপুর সাহিত্যাঙ্গনে আড্ডায় গল্পে যে নামগুলো আসে। ৪৭’র দেশ বিভাগোত্তর কালগুলো যদি ধরা যায় তাহলে দূর্গাবাড়ী নাট মন্দির, গোপালদত্তের মাঠ, দেওয়ানগঞ্জের আলমকেবিন, পাবলিক লাইব্রেরি, দয়াময়ী মন্দির প্রান্তর, বকুলতলায় গোপালের মিষ্টির দোকান, বকুলতলার জল খাবার, দয়াময়ী পাড়ার সালামের হোটেল, দয়াময়ী মনোবসাকের চায়ের দোকান, দেওয়ানপাড়ার কেশবচন্দ্র হোটেল, এমনি আরও অনেক সাহিত্য আড্ডা জানা অজানার মধ্যে রয়ে গেছে। জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনে পাঠাগার একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্রাট ৫ম জর্জের অভিষেকের স্মৃতি রক্ষার জন্য জামালপুরের সুধীজনরা জামালপুর করোনেশন রিডিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। যা পাবলিক লাইব্রেরি নামে আজো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া শাহবাজপুরের দাসবাড়ীতেও একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। সম্প্রতি সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ এবং সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজ, জামালপুর জিলা স্কুল, জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এবং থানায় থানায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত আছে। যা জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনকে সহায়তা করে চলেছে। জামালপুরের প্রকৃতিতে রূপ-রস-সৌন্দর্য-সুরভীর অবিরাম স্রোতে মুগ্ধ এ অঞ্চলের মানুষ আজো সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছে। এ সৃজন ধারার পথে পথে কেউ কেউ পৌঁছে গেছে কাক্সিক্ষত স্বপ্নের বারান্দার কাছাকাছি। কেউ থেমে গিয়েছে মাঝপথে। কেউ কেউ এখনো অবিরাম পথ চলছে স্বপ্ন সাধনা বুকে নিয়ে। সব মিলিয়ে জামালপুর জেলার সাহিত্য বৃত্তান্ত ব্যাপক এবং সমৃদ্ধ সম্ভারে পরিপূর্ণ। যা তথ্য সংকটের কারণে সীমাহীন সীমাবদ্ধতা রয়ে গেল এ লেখায়। ভবিষ্যতের নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভের আশায় রইল।

জামালপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন

জামালপুরের সাহিত্য যুগে যুগে

 সাযযাদ আনসারী 
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীজুড়েই উপমহাদেশে যেমন দৃষ্টি সাধনার জাগরণ শুরু হয়েছিল সেই উত্তাল হাওয়া জামালপুরেও ছিল বেগবান। এ মাটিতে জন্ম হয়েছে বহু বরেণ্য কবি সাহিত্যিকদের। ইতিহাস বিস্মৃতির কারণে রয়ে গেছে ব্যাপক তথ্য সংকট। এ তথ্য সংকটগ্রস্ততা মেনেই লিখতে হলো। এ সীমাবদ্ধতা শ্রদ্ধেয় পাঠক ক্ষমার চোখে দেখবেন আশা করি। এর মধ্যেও সাহিত্যে প্রজ্ঞার প্রদীপ হিসাবে ভাস্কর যে ক’টি নাম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন-দেশবরেণ্য কবি, গবেষক, প্রবন্ধকার, সাংবাদিক, সাহিত্যিক হাসান হাফিজুর রহমান, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচিত্র ব্যক্তিত্ব আমজাদ হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, লেখক সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব প্রমুখ। এ ছাড়া ড. মোহাম্মদ সামাদ, ড. খন্দকার আশরাফ হোসেন, নজরুল ইসলাম বাবু, আতা সরকার, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, কবি ও গবেষক আসাদুল্লাহ, কবি শামীমুল হক শামীম, এরাও জামালপুরের সাহিত্যে কৃতী ব্যক্তিত্ব। জামালপুরে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ কিংবা বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই বাংলা সাহিত্যের সূচনাকাল হিসাবে ধরলে দেখা যায় সুদূর অতীতকাল থেকেই এখানে সংস্কৃত ভাষাভিত্তিক সাহিত্য এবং মুসলিম জাগরণের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি ধারাই বেগবান ছিল। একটি হচ্ছে আরবি, ফার্সি ভাষার সংমিশ্রিত ভাষারূপের সাহিত্য, অন্যটি সংস্কৃত ভাষা।

একদিকে ব্যাপক পুঁথি সাহিত্যের প্রচলন অন্যদিকে সনাতন সংস্কৃত প্রথা সমৃদ্ধ সাহিত্য। যেমন : ‘মুন্সি রমজান আলী’ ‘তাহইয়া তুছাছালাত’, ‘দেওয়ানগঞ্জ থানার মোহাম্মদ তাহের আফতাব এ হেদায়েত’ সৈয়দ আঃ রহমানের উসদায়েতুল মোছায়েল, মাদারগঞ্জের মীর্জা জাফর আলীর ‘বোরহানে হক’ ও কৃষক সহায় ইত্যাদি পুঁথি গ্রন্থ রচনার ব্যাপক প্রসার লক্ষ করা যায়। সংস্কৃত শব্দবহুল সাহিত্য ধারায় যদি লক্ষ করি কিংবা শতাব্দীর শুরুতে বিভিন্ন গোত্রভিত্তিক সাহিত্যের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন : উদ্বাহো চন্দ্রালোক, বুদ্ধি চন্দ্রালোক, জীবনের নশ্বরত্ব, জীবন্ত বংশানুচরিত, শ্রীবৎ সোপাখ্যান, কুসুম কোরক, আতস নারী ইত্যাদি। সে সময় এখানে নিরক্ষর গ্রাম্য গীতি কবিরা রচনা করেন একদলীয় গান।

ঘাটুগান, বাইদাগান, গুনাইবিধিয় গান, কবি গান হলিগান, জারি গান, মার্জিয়া গান ইত্যাদি। এসব ব্যাপকভাবে রচিত ও গীত হতো এবং মানুষের মনও ভরে উঠত উৎসবমুখর হয়ে। ৪৭’র দেশ বিভাগোত্তরকালে ক্রমশ সাহিত্যের সেই সীমাবদ্ধ ঘরানা থেকে উন্মুক্ত চর্চার প্রবাহ ধারণ করে। সে সময়ে সুকৃতিচর্চার রুদ্ধদ্বার ভেঙে কিছু মননশীল সাহিত্যকর্মী এ অঞ্চলে আধুনিক সাহিত্যচর্চায় ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন, এ মহৎ মানুষের মধ্যে যাদের উল্লেখ পাওয়া যায়, তারা হলেন মহিনী মোহন বল, পরেশ বাবু, মাখন পোদ্দার, গিরিন ঘোষ, অতুল নাগ, নীলকান্ত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য এ গুণিজনেরা নাট্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে নাট্যসাহিত্য ও সাহিত্যধারার বিভিন্ন ক্ষেত্রও উর্বর করে তোলেন।

পরবর্তী পর্যায়ে চল্লিশের দশকে কাব্যকলার উল্লেখযোগ্য নাম ফজলুর রহমান আনসারী, ফজলুর রহমান আজনবী, জগবন্ধু গোস্বামী, এদেরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চাশের দশকে উল্লেখযোগ্য নাম নাট্য সাহিত্যে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রনেশ চন্দ্র মজুমদার, আমজাদ হোসেন, হাসান হাফিজুর রহমান, নাট্যকার এম এস হুদা, সৈয়দ ইমামুর রশীদ, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মু আজিজুর রহমান, শেখ আব্দুল জলিল, আব্দুল হামিদ কবিরত্ন, আবু বকর, ফরহাদ মোহাম্মদ আলী, দূর্গাদাস ঘোষ, প্রদীপ কান্তি মজুমদার একই দশকে সৈয়দ আব্দুস সোবাহান, সৈয়দ আব্দুস সাত্তার, অরুন তালুকদার প্রমুখ।

ষাটের দশকে আতা সরকার দেশবরেণ্য গীতিকার ও কবি নজরুল ইসলাম বাবু, হাবিবুর রহমান হবি, মাহবুব বারী, মহিউদ্দিন শ্রীপুরী, হামিদুল ইসলাম প্রমুখের ধারাবাহিকতায় সত্তরের দশকে জামালপুর সাহিত্য সংসদের নামে একটি আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম সংগঠিত হয়েছিল। এ সাহিত্য সংসদের সঙ্গে যুক্ত থেকে যারা সাহিত্যের বিকাশে অবদান রেখেছে তাদের মধ্যে অন্যতম শাহ্ খায়রুল বাসার, আহমেদ আজীজ, আবু জাইদ লতা, মীর আনিছুল হাসান, রেহানা পারভীন, তমাল সৈয়দ, সামসাদ জাহান, শাহজাহান সাজু, মোস্তাফিজুর রহমান জামাল, আশরাফুল মান্নান, ইসমাইল হোসেন, লাভলু আনসার, সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদার, গুলসান আক্তার, আমজাদ হোসেন বুলবুল, আলাউদ্দিন খান, ইলোরা আজমী, শাহজাদা আঞ্জুমান য়ারা মুক্তি, ফজলুল করিম ভানু, পারভীন করিম, রুমী কবির আসাদুল্লাহ ফারায়জি, সৈয়দ শরিফ প্রমুখ।

এ সময় মীর আনিসুল হাসানের সম্পাদনায় ‘ইমেজ’ নামে একটি ইংরেজি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ হয়। যা এ জেলায় বাঙ্গালির ইংরেজিতে সাহিত্য চর্চার প্রয়াস বলা যায়। একই সময়ে কবি মো. বাকী বিল্লাহ নারায়ণগঞ্জের প্রবাস জীবন শেষ করে জামালপুরে সাহিত্য সাধনায় যুক্ত হন।

সাহিত্য সংসদের পর আশির দশকে কুঁড়ি সাহিত্যগোষ্ঠী একঝাঁক সম্ভাবনাময় তরুণ তরুণীর সমন্বয়ে সাহিত্য আন্দোলনের অভিযাত্রা শুরু করে। এ সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যরা যুক্ত ছিলেন তারা হলো মেহেদী ইকবাল, সায্যাদ্ আনসারী, মনোয়ারা চেতন, হোসনে আরা মমতা, সাহীনা সোবহান মিতু, সৈয়দ নোমান প্রমুখ। একই সময়ে কবি শামীমুল হক শামীমের নেতৃত্বে উত্তরণ সাহিত্য গোষ্ঠীতে জামালপুরে সাহিত্যের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এ ধারাবাহিকতায় নব্বই দশকে সাদী কবির, শিহাব শাহরিয়ার, কবি জাহিদ মামুন, গোলাম হাফিজ বকুল, মোস্তফা বাবুল, জাহাঙ্গীর সেলিম, আলী আক্কাস, কামরুল হাসান সুজন, কাফি পারভেজ, জাহিদুর রহমান উজ্জ্বল, রকিব লিটন প্রমুখ কবিরা স্বতন্ত্র প্রয়াসে জামালপুরের সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এখনো রেখে চলেছেন। এর পরের পর্যায়ে কবিতীর্থ নামে আরেকটি সাহিত্য সংগঠন গড়ে উঠেছিল। এ সংগঠনে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আনোয়ার হোসেন বাবু, মিনহাজ উদ্দিন শপথ, জিয়া ইব্রাহীম, মারুফ আজাদ বাবু, নাহিদ আনোয়ার, সানজিদা আনোয়ার, মিঠু জাকির, ছানোয়ার হোসেন, কামরুল ইসলাম সুজন, সৈয়দ আলিমুল বাশার প্রমুখ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নিয়মিত আড্ডার মধ্য দিয়ে জামালপুরে সাহিত্যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন কবি মোয়াজ্জেম হোসেন আজাদ, শেখ ফজল, মাসুম মোকাররম, নান্নু পারভেজ, শুভ্রত তালুকদার, শ্বেতা শতাব্দী, রাজন্য রুহানী, ফারজানা ইসলাম, তারিকুল ফেরদৌস, জাহাঙ্গীর সেলিম, মাহফিজুল হক প্রমুখ। মেলান্দহে ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ মুকুলের সম্পাদনায় ছন্দে ঝিনাই কবিতাপত্রের মাধ্যমেও একটি সাহিত্য ধারা বেগবান ছিল।

সম্প্রতি জামালপুর কবিতা পরিষদের ব্যানারে বিশিষ্ট কবি ও রাজনীতিবিদ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় নবীন-প্রবীণ অনেকেই সাহিত্যে সক্রিয় আছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: অধ্যাপক ড. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী, অ্যাডভোকেট মুহম্মদ হায়দার, ভোলা দেবনাথ, আসকর আলী, আব্দুল হাই আল হাদী, স্বরুপ কাহালী, মিনহাজ উদ্দীন শপথ, ফারজানা ইসলাম, এস এম সাগর প্রমুখ।

এককালে শেরপুর ছিল তদানীন্তন জামালপুর মহকুমার একটি থানা। বৃহত্তর জামালপুর তদানীন্তনকালের সুপণ্ডিত জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী বিদ্যাবিনোদ ছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতি বিকাশে অভিভাবকতুল্য। সংস্কৃত, বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষার সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি ১২৯২ বঙ্গাব্দে (১৮৮৫ সালে) শেরপুর শহরে চারুযন্ত্র নামে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন এবং সেই ছাপাখানা থেকে সাপ্তাহিক চারুবার্তা নামে একটি সমৃদ্ধ পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই পত্রিকার মাধ্যমেই সূচনা হয়েছিল বৃহত্তর জামালপুরের সাহিত্য বিকাশের প্রভাতকাল। পত্রিকাটিতে নানা বিচিত্র বিষয়ে খবরও থাকত। এরপর ১৯১৬ সালে মহীউদ্দীন সিদ্দিক নামের জনৈক ভদ্রলোক ডায়মন্ড প্রেস স্থাপন করেন। এর কিছুদিন পরে জনৈক সুধেন্দু মোহন ঘোষ (বি এল এল) শান্তি প্রেস নামে আরেকটি প্রেস স্থাপন করেন। এ প্রেস থেকে শান্তিবার্তা নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। যার সহকারী সম্পাদক ছিলেন জনাব গোলাম মোহাম্মদ। এ সময়ে কতিপয় সুধী ব্যবসায়ী মহলের প্রচেষ্টায় বঙ্গলক্ষ্মী প্রেস স্থাপিত হয়। এ প্রেস থেকে তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গুরু সদয়দত্ত আই সি এস-এর পৃষ্ঠপোষকতায় গোলাম মোহাম্মদের সম্পাদনায় পল্লী মঙ্গল নামক মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এটি ছিল পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা। এ সাহিত্য পত্রিকাটি হয়তো জামালপুরে প্রথম সাহিত্য পত্রিকা। বঙ্গলক্ষ্মী প্রেসটির স্বত্বাধিকারী হন মির্জা আশরাফ উদ্দীন হায়দার। তিনি তৌফিক নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এভাবে সময়ে সময়ে জামালপুরে পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হলেও তার ধারাবাহিকতা সম্পর্ক জানা যায় না। ১৯৫৮ সালে সৈয়দ আব্দুস সোবাহানের সম্পাদনায় ‘ঝান্ডা উচা রাহে হামরা’ নামে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন।

প্রকাশনায় ছিল জামালপুর সংস্কৃতি সংসদ। এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন দেশের বরণ্যে সাহিত্য ব্যক্তিত্ব হাসান হাফিজুর রহমান, সৈয়দ ইমামুর রশীদ। অন্যদের মধ্যে চন্দন বসু, অরুন তালুকদার, মু আজিজুর রহমান, আবু বক্কর উল্লেখযোগ্য। এ সাহিত্য পত্রিকাটি জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনকে শক্ত ভিত্তি দান করেছিল তা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। ১৯৭২ সালে সাঈদুর রহমান হিমু স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করেন। এতে যারা লিখেছেন- আম্বিয়া বুলবুল, খোদেজা জান্নাত, খালেদুর রহমান খালেদ, নজরুল ইসলাম বাবু প্রমুখ। একই বছর বাবুল হাসান বাবুর সম্পাদনায় আবাহন নামের একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশিত হয়। ওই সময় মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ‘হারুন তোমার রক্ত সড়কে’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদন করেন মাহবুবুল বারী খান (মাহবুব বারী) একই সময়ে হাবিবুর রহমান সম্পাদন করেন ময়ুখ নামে সাহিত্য সংকলন। একই সময়ে ‘নির্যাতিত প্রহরের কবিতা’ সম্পাদনা করেন সাঈদুর রহমান বাবু ও জুন্নু আহমেদ সাদী। সত্তর দশকেই কবি আহমেদ আজিজের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে শব্দ-নৈঃশব্দ্য নামক সাহিত্য পত্রিকা। এর পর্যায়ক্রমে ১৫টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। জামালপুর সাহিত্য সংসদ ও শব্দ নৈঃশব্দ্য পত্রিকাটিকে ঘিরে জামালপুর শহরে একটি উল্লেখযোগ্য আড্ডা জমে ওঠে। এর সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের নাম আগে উল্লেখ হয়েছে। এ সত্তর দশকেই প্রখ্যাত গীতিকার ও কবি নজরুল ইসলাম বাবুর সম্পাদনায় ‘চিঠি’ মাহবুব বারীর সম্পাদনায় ‘পাপড়ী’ প্রকাশিত হয়। আশির দশকে বিবর্তন নামে মেহেদী ইকবালের সম্পাদনায় সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটির মোট প্রকাশিত সংখ্যা হচ্ছে ১৯টি। মেহেদী ইকবাল বিবর্তনের আগেও ‘অনির্বাণ’, ‘দ্বীপ জেলে যাই’, ‘শব্দকানন’ নামে তিনটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেন। এসব পত্রিকা যারা লিখতেন তাদের নামে আশির দশকের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। কবি সায্যাদ্ আনসারী সম্পাদনায় ‘প্রবাহ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা ১৮টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। মোস্তফা কামাল মৌসুমের ‘অনিক’ নামে সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করা হয়। এ ছাড়া প্রতিবিম্ব, সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জামাল (১১টি গল্প সংকলন), সৈয়দ শোয়েবের সম্পাদনায় ‘সপ্তর্ষি’ (৭টি প্রবন্ধ সংকলন) সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদারের সম্পাদনায় ছড়া সংকলন ‘ইদানীং’। সিদ্ধার্থ শংকর তালুকদার ও ড. জাহিদ হাসান রবি’র যৌথ সম্পাদনায় এবং হৃৎপিণ্ডীয় ভালোবাসা প্রকাশিত হয়। (পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু স্মরণে) মাদারগঞ্জ সাহিত্য পরিষদের প্রকাশনায় ‘ভেলা’, কাফি পারভেজের সম্পাদনায় ‘রাঙ্গা পলাশ’ প্রকাশিত হয়।

কবি আহমদ আজীজের সম্পাদনায় নব প্রকাশ নামে একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকা ৩টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। শেষের সংখ্যাটি ছিল কবি হাসান হাফিজুর রহমান, বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যক্তিত্ব ড. মুহাম্মদ হায়দারের সম্পাদনায় ‘কর্নঝোরা’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ২টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অতি সম্প্রতি কবি মাহবুব বারীর সম্পাদনায় আর্ট পেপার নামে একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য পত্রিকার মার্চ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। পরবর্তী সংখ্যা প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া যেহেতু সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ছোট কাগজ (লিটল ম্যাগাজিনের) ভূমিকা খুবই প্রেরণা প্রবাহক। সে বিবেচনায় জামালপুরেরও এ লিটল ম্যাগ আন্দোলন চিরকালই শক্তিমান ছিল। উল্লেখিত পত্রপত্রিকার বাইরেও অবিরাম সাহিত্য সাধনা জড়িত তারুণ্য অজস্র সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন যুগে যুগে প্রকাশ করেছে। যার সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহের কোনো সুযোগ নেই। তাই অল্প কিছু পত্রপত্রিকা উল্লেখ করেই জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনের আভাস মাত্র প্রদান করা গেল।

সাহিত্য সাধনায় সাহিত্য সংগঠন ও সংঘ বেঁধে চলার অনিবার্যতা পৃথিবীর দেশে দেশে রয়েছে। এ আলোকে জামালপুরের কিছু সংগঠনের নাম উল্লেখ করছি। পর্যায়ক্রমিকভাবে বললে বলা যেতে পারে করোনেশন রিডিং ক্লাব যা বর্তমানে পাবলিক লাইব্রেরি নামে প্রতিষ্ঠিত আছে। ব্রাহ্ম সমাজ, জাগরনী ক্লাব, কালের পুতুল, সংস্কৃতি সংসদ, শতাব্দীর দূত, মিতালী সংঘ, প্রীতি সংঘ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, সুরবাণী, স্বরলিপি, সপ্তর্ষি শিল্পী গোষ্ঠী, শিল্পী সমাজ, সাহিত্য সংসদ, কুঁড়ি সাহিত্য গোষ্ঠী, কবিতীর্থ, জামালপুর কবিতা পরিষদ, ষড়ঙ্গ আবৃতি, পীঠ, লোকজ সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা, ইত্যাদি সংগঠনগুলো অধিকাংশই সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে সাহিত্য সাধনার পৃষ্ঠপোষকতায় ও চর্চায় সবগুলো সংগঠনই ছিল সাহিত্যচর্চায় সহায়ক শক্তি।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাহিত্য আড্ডার ভূমিকা প্রশ্নাতীত। এ ক্ষেত্রে যুগ যুগান্তর ধরে সৈয়দ মুজতবা আলীর সাহিত্য আড্ডার গল্প উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। আড্ডার গল্প বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ নজরুলসহ কল্লল যুগের সাহিত্য আড্ডার গল্প নিয়ে। কালের যাত্রা প্রবাহে জামালপুর সাহিত্যাঙ্গনে আড্ডায় গল্পে যে নামগুলো আসে। ৪৭’র দেশ বিভাগোত্তর কালগুলো যদি ধরা যায় তাহলে দূর্গাবাড়ী নাট মন্দির, গোপালদত্তের মাঠ, দেওয়ানগঞ্জের আলমকেবিন, পাবলিক লাইব্রেরি, দয়াময়ী মন্দির প্রান্তর, বকুলতলায় গোপালের মিষ্টির দোকান, বকুলতলার জল খাবার, দয়াময়ী পাড়ার সালামের হোটেল, দয়াময়ী মনোবসাকের চায়ের দোকান, দেওয়ানপাড়ার কেশবচন্দ্র হোটেল, এমনি আরও অনেক সাহিত্য আড্ডা জানা অজানার মধ্যে রয়ে গেছে। জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনে পাঠাগার একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। সম্রাট ৫ম জর্জের অভিষেকের স্মৃতি রক্ষার জন্য জামালপুরের সুধীজনরা জামালপুর করোনেশন রিডিং ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। যা পাবলিক লাইব্রেরি নামে আজো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া শাহবাজপুরের দাসবাড়ীতেও একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার ছিল। সম্প্রতি সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ এবং সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজ, জামালপুর জিলা স্কুল, জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এবং থানায় থানায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত আছে। যা জামালপুরের সাহিত্য আন্দোলনকে সহায়তা করে চলেছে। জামালপুরের প্রকৃতিতে রূপ-রস-সৌন্দর্য-সুরভীর অবিরাম স্রোতে মুগ্ধ এ অঞ্চলের মানুষ আজো সাহিত্য সৃষ্টি করে চলেছে। এ সৃজন ধারার পথে পথে কেউ কেউ পৌঁছে গেছে কাক্সিক্ষত স্বপ্নের বারান্দার কাছাকাছি। কেউ থেমে গিয়েছে মাঝপথে। কেউ কেউ এখনো অবিরাম পথ চলছে স্বপ্ন সাধনা বুকে নিয়ে। সব মিলিয়ে জামালপুর জেলার সাহিত্য বৃত্তান্ত ব্যাপক এবং সমৃদ্ধ সম্ভারে পরিপূর্ণ। যা তথ্য সংকটের কারণে সীমাহীন সীমাবদ্ধতা রয়ে গেল এ লেখায়। ভবিষ্যতের নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভের আশায় রইল।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : প্রান্তছোঁয়া আকাশ

১৫ অক্টোবর, ২০২১
১৫ অক্টোবর, ২০২১
১৫ অক্টোবর, ২০২১
১৫ অক্টোবর, ২০২১
১৫ অক্টোবর, ২০২১
১৫ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১
০৮ অক্টোবর, ২০২১