কবিতা
jugantor
কবিতা

   

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বলছি

আতাহার খান

আমি আবার পাল্টে নিচ্ছি নিজেকে আজ

সম্পূর্ণটাই-স্বভাব থেকে ঝেড়ে-মুছে

বিদায় করি সব জড়তা, ভাঙা-গড়ার গভীরে যাই,

তার পরে ঠিক বুক ফুলিয়ে জেগে উঠি,

সারা দেহে খেলছে এখন আবেগঘন জলতরঙ্গ।

সুতীক্ষ্ন এক পেশির কাঁপন

ঢেউ তুলেছে মাটির ওপর, চোখের তারায়

খানিকটা রাগ জড়িয়ে নিই,

হেমবজ পাত হয়ে এখন জ্বলছি দেখ অবিরত,

বয়ঃসন্ধির দাহ মেলে ছড়িয়ে দিই সকাল দুপুর

গ্রহণযোগ্য আলো জ্বলছে চতুর্দিকে- দেখতে পাচ্ছি?

দুঃসময়ে হাল ছাড়িনি,

পাল্টে যাওয়া মানুষটাকে চেনা যায় না? অচেনা কী?

সেজন্য চাই প্রখর অনুসন্ধানী মন-

তাহলে ঠিক চোখে পড়ত

এইখানে আজ সোনালি রোদ গায়ে মেখে পরিপূর্ণ বিষ্টি ঝরছে!

শিমুলফুলের দিব্যি

আহমেদ তানভীর

লালের আগুনে চোখ পুড়িয়ে দিয়ে শিমুলেরা চলে যায়,

ডাংগুলি-মাঠ, কানামাছি-রোদ, শাপলা-বিলের জল- চলে যায়!

চলে যায় ইশকুলবেলা, সালাম স্যারের কানমলা-ক্ষণ,

যারে ফেলে যায় একা- সে ক্রন্দসী শিমুলফুলের সহোদর এক।

তারও আগে মা-খালাদের নায়র-দিনের সঙ্গী সে বালক;

ভাঁটফুলঝাড়ে জোনাকিসন্ধ্যায় ভাষাহীন ভাসা এক অবুঝ নৌকা,

জুম্মাঘরের জিলাপি-কাতারে দাঁড়ানো শর্মিন্দা ‘মফিজের পুত’

এক জীবনে সব চলে যাওয়াদের শিমুলফুল মনে হয় তার,

নিজেরে মনে হয় শিমুলফুলের বেদনার্ত সহোদর কোনো।

তোমার প্রিয় নদী একটি, দুটি, তিনটি...

তাসনুভা রাইসা

কোনোটা সাঁতরে পাড়ি দিয়েছো, কোনোটার তীরে দাঁড়িয়েই মুগ্ধ হয়েছ...

কোনোটা পাশ দিয়েই বয়ে চলে, প্রিয় অভ্যাসের মতো তাকে দেখো...

কোনোটা পাড়ি দিতে দিতে তুমি বিহবল সাগর মোহনায়,

কোনোটার ভাসমান বাগানের বেগুণী ফুলটাই কেবল ভালোবাসো...

তাদের প্রিয় কোন নামে ডাকে যায় না, তাদের নাম একটাই- নদী...

তোমার প্রিয় নদী একটি, দুটি, তিনটি....

স্রোত গোনার অধিকার

মনিরুস সালেহীন

আগে নদীতে স্রোত ছিল, মানুষের হাতে ছিল অফুরন্ত সময় কিন্তু কাজ ছিল কম, সে স্রোত গুনতো! নদীগুলো ক্রমশ স্রোতহীন হলো, পুষ্টিহীন শিশুর মতো শুকিয়ে গেল, ধারা হারাল মরুপথে। স্রোত গোনার কাজটিও হয়ে গেল প্রাগৈতিহাসিক। ভরা নদীতে পাল তোলা নৌকার রমণীয় গমনাগমন দেখা আর স্রোত গোনা মানুষ এলো শহরে। এখনো তার হাতে অফুরন্ত সময়। কিন্তু তাকে সময় দেওয়ার কেউ নেই। শহরে এসে এখন সে কাক গোনে। আর দেখে গর্ত খোঁড়া। সে জেনেছে এ গর্ত গ্রামে দেখা শেষ ঠিকানার গর্ত নয়, এ গর্তেই নাকি প্রতিদিন পোতা হয় সভ্যতার নতুন নতুন বীজ। কাক আর গর্ত দুটোই তাকে ক্লান্ত করে। ক্লান্ত প্রাণ পাখির নীড় খোঁজে। কাক কি কোনো পাখি, ডাস্টবিন কি কোনো নীড়? একদিন চেঁচিয়ে উঠে মানুষটা, বলে, ফিরিয়ে দাও আমার নদী, ফিরিয়ে দাও আমার স্রোত গোনার অধিকার।

উত্তম

আজাদুর রহমান

তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম,

যারা জানে

পৃথিবীটা আসলে ঘোরাঘুরির জায়গা!

এখানে পরিচয় দেয়া মানে

নিজেকে ফাঁদে ফেলা।

এখানে পরিচিত হওয়া মানে

দোটানায় ঝুলে যাওয়া!

মনের টান

মোবাশ্বির হাসান শিপন

নিঃসঙ্গতার সীমানার কী একাকিত্ব আছে!

তোমার বারবার জিতে যাওয়ার সাধ

আমাকে ডুবিয়ে দেয় সমুদ্রের শেষ পাটাতনে;

আমি অবজ্ঞার ফেনায় বুদ্বুদ হয়ে ভেসে রই।

তাচ্ছিল্যের পিরানে যখন দাগ জেগে রয়

গুটিয়ে নেই পিষে ফেলা ভালোবাসার জাল;

আমাদের মাঝে এখন জ্যামিতিক দূরত্ব নয়

বরং মনের টান ক্লান্ত হয়ে খুঁজে নিয়েছে নিজ কক্ষপথ।

তারুণ্য

তপংকর চক্রবর্তী

সভ্যতার যাবতীয় অসভ্য ভ্রুকুটি

উপেক্ষার সুকঠিন বর্ণে

প্রতিহত করতে করতে

চলে আসছে যে প্রবহমানতা

এরই নাম তারুণ্য

যে তারুণ্য সভ্যতার সমান বয়সী

যত দিন যায় ততই লাবণ্য বাড়ে

উজ্জ্বলতা বেড়ে ওঠে মানুষের গূঢ় চেতনায়।

জš§ : ৯ জুলাই (২৪ আষাঢ়) ১৯৫৫। পিতা : ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, মাতা : ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী কুন্তীরানী চক্রবর্তী, সাবেক অধ্যক্ষ, অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয়, বরিশাল। প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ ১৯ এবং সম্পাদিত গ্রন্থ ৩০টি। ধারাপাত, কবি ও কবিতা, আলোকপত্র, নান্দনিক ও স্বকাল কবিতাপত্রের সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত।

জলধি ও আরাকান

পথিক মোস্তফা

প্রতিদিন মরণ এবং আগুনবসতি

কালসাপের দংশনলীলা, কামুকঘ্রাণ।

তবু বেঁচে থাকে ব-দ্বীপ

বুভুক্ষু জলধি ও আরাকান।

আমি আর কালনাগিনীর সতীন-সংসার।

জন্ম : ১৯৭৮ সালের ১ মার্চ বরিশাল জেলা, আগৈলঝাড়া উপজেলায়।

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-আলোর দরপত্র, সবকিছু রোদে দেব, স্বর্গ ও শূন্যতার উপাখ্যান তার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা-প্রভা, শেকড় ও যোগফল।

ভিক্ষুক

আসমা চৌধুরী

আমার বাবা অন্ধ হলে

আমি তার হাত ধরে ভিক্ষা করি পথ

অন্ধকারে নড়ে ওঠে গ্রামের নদী

সেও ভিক্ষা করে চাঁদ

পর পর ঘটনাগুলো সাজালে

আমরা একটা ভিক্ষুকের মিছিল হয়ে যাই-

শীতের ঝরাপাতা আমাদের পায়ের পাশে থাকে

সেও ভিক্ষা করে শিশির

সব ভিক্ষুকেরই নিজস্ব একটা গান তৈরি হয়ে যায়

বাবা গলা ছেড়ে গান ধরেন-

না চিনলাম তারে-

জন্ম : ৩০ নভেম্বর ১৯৬৫ মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল, পেশা: অধ্যাপনা। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ সাহিত্যে বিচরণ। বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার। প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি।

অন্তহীন এক নির্মম অতীত

টুনু কর্মকার

অনন্তকাল বয়ে চলা তীব্র দহনে অন্তর উদ্বেলিত;

বিধ্বস্ত যখন গোটা মানব জীবন,

তখন আবার নতুন আহ্বানে দোলা দিল

ঢেউয়ের মতো নতুনের ছন্দে!

দুলিয়া যাওয়ার স্পন্দে...।

চিত্ত হলো মুগ্ধ, ঝরে পড়া আনন্দগুলো

আবার ভরে উঠল আলোর ঝলকানিতে।

হাজারো স্মৃতির মাঝে মন ভেসে গেল;

অন্তহীন চলার গহিন পথে, যেখানে জমা আছে...

অনন্তকাল বয়ে চলা এক নির্মম অতীত।

জন্ম : ১৫ জুন ১৯৬২। পেশা: অধ্যাপনা। প্রকাশিত গ্রন্থ : ভাবনাগুচ্ছ (কবিতা)। চিন্তন ও চেতনা (প্রবন্ধ)

উপহার

নয়ন আহমেদ

হাঁড়িভাঙা আমের মতোন তোমাকে পাঠাই মিষ্টি উপহার।

শিল্পাচার্য জয়নুলের ভোর;

হাশেম খানের হাতপাখার মরমি বিজ্ঞান

কিংবা পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রেমপত্রে মৃদু ইকোলজি।

এ উপহারে দোলে বিশকোটি পাতার বাহার;

বিশকোটি সূর্যের মুখ নেচে ওঠে

শুদ্ধ উচ্চারণে, ভাষাতত্ত্বের কোমল

বিদুষী কন্যাগণ ব্রতগানে উৎসব ছড়ায়।

কিছু শ্র“তিপাঠ তার লেগে আছে ভোরের ডগায়।

রোদে রোদে প্রেমের সঘন শাস্ত্র আবৃত্তি হয়।

শুভেচ্ছা নিও। ভোরের হৃৎপিণ্ডে লেখা ভালোবাসা।

পেয়েছ কি? পত্রপাঠ উত্তর জানিও।

জন্ম : ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর। বরিশাল শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। পেশা: শিক্ষকতা। বরিশাল শেকড় সাহিত্য সংসদের সভাপতি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অসম্ভব অহংকার (১৯৯৬), বাসা বদলের গল্প (২০০৪), আমার বিবাহিত শব্দরা (২০১০), খনিঘুম (২০১৫), এককাপ গণযোগাযোগ (২০১৮) এবং নাতিদীর্ঘ দুপুরের ধ্বনি (২০১৯)।

শত্রুর ছায়া

শামীমা সুলতানা

বিষধর তুমি জেনেও দিয়েছি রোজ দুগ্ধ কলা

উদর পুর্তি হলেই করেছো শরীর পাকিয়ে দলা,

বিন্দু স্বার্থে আঘাত লাগলেই মুখে তুলেছো ফনা

বিষিয়ে তুলেছো আমার মস্তিষ্ক সমস্ত রক্তকণা।

ভয় করিনি কখনোই আমি করেছি ভীষণ দয়া

শত্র“র তরে দয়া মায়া দূরছাই মাড়াতে হয় না ছায়া।

তাইতো এবার বিষদাঁত ভেঙে গর্তে ছুড়েছি কায়া

জীবদ্দশায় দেখতে না হয় জাত শত্র“র ছায়া।

সর্প কখনো পোষ মানে না ছোবোলেই তার নেশা

চাটুকার শোনেনা ধর্ম বাণী প্রবঞ্চনাই পেশা।

জন্ম : ১৯৮৪ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি । বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার নিয়মিত লেখালেখি করেন। পুষ্পকলির কথা ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি।

উদ্যানের দিকে

সৈয়দ মেহেদী হাসান

সব প্রহসন অন্তত একবার মিলে যায় বাস্তবে

তারপরও কিছু অভিনয় বাকি থাকে!

বিদূষি বর্ণমালা ঘুরে বেড়ায় মঞ্চে-ময়দানে

কতবার দেখি পরিচিত কোতয়াল পঞ্চায়েতের ছবক

মানবীর আঁচলে লুকিয়ে রাখা শীতল অভীপ্সা

উদ্যানের দিকে ছুটে যাওয়া মার্বেলের দান

ঢুকে পড়ে কারও বাড়ি কারও আয়নায়

আমাদের অপরাধ কী? হাত খুলে জোনাক ধরা!

অনির্ণিত অজুহাতের কঙ্কাল দেখিয়ে খুলে নিচ্ছ কণ্ঠস্বর

মানুষগুলো কথা বলতে পারছে না নিজেদের সাথেও

শুধু শুনে কি বেঁচে থাকতে পারে কেউ পেছনের কাতারে?

জন্ম : ১৯৯০ সালের ১০ ডিসেম্বর। তার প্রথম কবিতার বই ‘জলপরীর ডানায় ঝাপটা লাগা বাতাস’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। পেশা: সাংবাদিকতা। তার সম্পাদিত ছোট কাগজ অগ্নিযুগ।

আয়না

কাশেম নবী

কার লাবণ্য ছুঁয়ে তোমার সমস্ত ধান চিটা হয়ে যায়;

বিউগল সঞ্চয়ে এসে লাম্পট্যে গিলে ফেল

ধীবরের সাথে রাতের গল্প, মাছের বিষাদ!

আমিও কিছুকাল জিভের ডেরায় ব্যয় করে এসেছি

বিনাশের স্বাদ, গ্রেগর সামসার জাহাজভরা ঘুম;

জেনেছি-স্বপ্ন এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর ঘুম চেয়ে

ব্যয়িত ডানার অনুমানে জেগে থাকা-

প্লেগোপদ্রুত শহরে চৈতন্যের তলদেশে পড়ে আছে

ইঁদুরের সন্ন্যাস, বিড়ালের শবদেহ;

উদ্যানে, রাস্তায়, নদী-খালে পড়ে আছে আমার অযুত লাশ;

আমি নিজের লাশ নিয়ে বসে থাকি পোকাদের অপেক্ষায়।

জন্ম : ০১ জুলাই ১৯৭৪। পেশা : অধ্যাপনা। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সবকিছু রোদে দিবো, উদ্বাস্তু আমিও, তোমাদের শহরে ঘুরছে দণ্ডিত এক পুরুষ, আমি আর শয়তান গলা ধরে কাঁদি।

জোনাকিরা জ্বলে ধিকিধিকি

শাহরিয়ার মাসুম

এক রাতে চোখ মেলে জানালাতে দেখি

উঠোনেতে তারাদের খুব হাঁটাহাঁটি

ঝলমলে জামা গায়ে জোনাকিরা সেকি!

অস্থির বিচরণ তবে পরিপাটি।

আলো ঝিলিমিলি পেটে জানালাতে উঁকি

আধো ঘুমে মনে হলো জোনাকিটা সুখি

তারাদের আলোমাখা রাত গাঢ়ো হলো

জোনাকিটা ফিসফিস-‘আঁখি পুরো খোলো’।

চেয়ে দেখি সুখি কই জ্বলে ধিকিধিকি

রাত্রির গায়ে ফোটে হাসি ঝিকিমিকি

আলো যদি নিভে যায় জোনাকিটা কাঁদে

আঁধারের বুক চিরে জ্বলে প্রতিবাদে।

জন্ম : বরিশাল জেলা সদর। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাগত জীবনের শুরু। আর এখন পুরোদস্তুর ব্যাংকার ও বরিশালের স্থায়ী বাসিন্দা। বর্তমানে বরিশাল থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুক্তবুলি’র উপ-সম্পাদক হিসাবে কাজ করছেন।

কবিতা

  
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বলছি

আতাহার খান

আমি আবার পাল্টে নিচ্ছি নিজেকে আজ

সম্পূর্ণটাই-স্বভাব থেকে ঝেড়ে-মুছে

বিদায় করি সব জড়তা, ভাঙা-গড়ার গভীরে যাই,

তার পরে ঠিক বুক ফুলিয়ে জেগে উঠি,

সারা দেহে খেলছে এখন আবেগঘন জলতরঙ্গ।

সুতীক্ষ্ন এক পেশির কাঁপন

ঢেউ তুলেছে মাটির ওপর, চোখের তারায়

খানিকটা রাগ জড়িয়ে নিই,

হেমবজ পাত হয়ে এখন জ্বলছি দেখ অবিরত,

বয়ঃসন্ধির দাহ মেলে ছড়িয়ে দিই সকাল দুপুর

গ্রহণযোগ্য আলো জ্বলছে চতুর্দিকে- দেখতে পাচ্ছি?

দুঃসময়ে হাল ছাড়িনি,

পাল্টে যাওয়া মানুষটাকে চেনা যায় না? অচেনা কী?

সেজন্য চাই প্রখর অনুসন্ধানী মন-

তাহলে ঠিক চোখে পড়ত

এইখানে আজ সোনালি রোদ গায়ে মেখে পরিপূর্ণ বিষ্টি ঝরছে!

শিমুলফুলের দিব্যি

আহমেদ তানভীর

লালের আগুনে চোখ পুড়িয়ে দিয়ে শিমুলেরা চলে যায়,

ডাংগুলি-মাঠ, কানামাছি-রোদ, শাপলা-বিলের জল- চলে যায়!

চলে যায় ইশকুলবেলা, সালাম স্যারের কানমলা-ক্ষণ,

যারে ফেলে যায় একা- সে ক্রন্দসী শিমুলফুলের সহোদর এক।

তারও আগে মা-খালাদের নায়র-দিনের সঙ্গী সে বালক;

ভাঁটফুলঝাড়ে জোনাকিসন্ধ্যায় ভাষাহীন ভাসা এক অবুঝ নৌকা,

জুম্মাঘরের জিলাপি-কাতারে দাঁড়ানো শর্মিন্দা ‘মফিজের পুত’

এক জীবনে সব চলে যাওয়াদের শিমুলফুল মনে হয় তার,

নিজেরে মনে হয় শিমুলফুলের বেদনার্ত সহোদর কোনো।

তোমার প্রিয় নদী একটি, দুটি, তিনটি...

তাসনুভা রাইসা

কোনোটা সাঁতরে পাড়ি দিয়েছো, কোনোটার তীরে দাঁড়িয়েই মুগ্ধ হয়েছ...

কোনোটা পাশ দিয়েই বয়ে চলে, প্রিয় অভ্যাসের মতো তাকে দেখো...

কোনোটা পাড়ি দিতে দিতে তুমি বিহবল সাগর মোহনায়,

কোনোটার ভাসমান বাগানের বেগুণী ফুলটাই কেবল ভালোবাসো...

তাদের প্রিয় কোন নামে ডাকে যায় না, তাদের নাম একটাই- নদী...

তোমার প্রিয় নদী একটি, দুটি, তিনটি....

স্রোত গোনার অধিকার

মনিরুস সালেহীন

আগে নদীতে স্রোত ছিল, মানুষের হাতে ছিল অফুরন্ত সময় কিন্তু কাজ ছিল কম, সে স্রোত গুনতো! নদীগুলো ক্রমশ স্রোতহীন হলো, পুষ্টিহীন শিশুর মতো শুকিয়ে গেল, ধারা হারাল মরুপথে। স্রোত গোনার কাজটিও হয়ে গেল প্রাগৈতিহাসিক। ভরা নদীতে পাল তোলা নৌকার রমণীয় গমনাগমন দেখা আর স্রোত গোনা মানুষ এলো শহরে। এখনো তার হাতে অফুরন্ত সময়। কিন্তু তাকে সময় দেওয়ার কেউ নেই। শহরে এসে এখন সে কাক গোনে। আর দেখে গর্ত খোঁড়া। সে জেনেছে এ গর্ত গ্রামে দেখা শেষ ঠিকানার গর্ত নয়, এ গর্তেই নাকি প্রতিদিন পোতা হয় সভ্যতার নতুন নতুন বীজ। কাক আর গর্ত দুটোই তাকে ক্লান্ত করে। ক্লান্ত প্রাণ পাখির নীড় খোঁজে। কাক কি কোনো পাখি, ডাস্টবিন কি কোনো নীড়? একদিন চেঁচিয়ে উঠে মানুষটা, বলে, ফিরিয়ে দাও আমার নদী, ফিরিয়ে দাও আমার স্রোত গোনার অধিকার।

উত্তম

আজাদুর রহমান

তোমাদের মধ্যে তারাই উত্তম,

যারা জানে

পৃথিবীটা আসলে ঘোরাঘুরির জায়গা!

এখানে পরিচয় দেয়া মানে

নিজেকে ফাঁদে ফেলা।

এখানে পরিচিত হওয়া মানে

দোটানায় ঝুলে যাওয়া!

মনের টান

মোবাশ্বির হাসান শিপন

নিঃসঙ্গতার সীমানার কী একাকিত্ব আছে!

তোমার বারবার জিতে যাওয়ার সাধ

আমাকে ডুবিয়ে দেয় সমুদ্রের শেষ পাটাতনে;

আমি অবজ্ঞার ফেনায় বুদ্বুদ হয়ে ভেসে রই।

তাচ্ছিল্যের পিরানে যখন দাগ জেগে রয়

গুটিয়ে নেই পিষে ফেলা ভালোবাসার জাল;

আমাদের মাঝে এখন জ্যামিতিক দূরত্ব নয়

বরং মনের টান ক্লান্ত হয়ে খুঁজে নিয়েছে নিজ কক্ষপথ।

তারুণ্য

তপংকর চক্রবর্তী

সভ্যতার যাবতীয় অসভ্য ভ্রুকুটি

উপেক্ষার সুকঠিন বর্ণে

প্রতিহত করতে করতে

চলে আসছে যে প্রবহমানতা

এরই নাম তারুণ্য

যে তারুণ্য সভ্যতার সমান বয়সী

যত দিন যায় ততই লাবণ্য বাড়ে

উজ্জ্বলতা বেড়ে ওঠে মানুষের গূঢ় চেতনায়।

জš§ : ৯ জুলাই (২৪ আষাঢ়) ১৯৫৫। পিতা : ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও শিক্ষাবিদ শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, মাতা : ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী কুন্তীরানী চক্রবর্তী, সাবেক অধ্যক্ষ, অমৃতলাল দে মহাবিদ্যালয়, বরিশাল। প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ ১৯ এবং সম্পাদিত গ্রন্থ ৩০টি। ধারাপাত, কবি ও কবিতা, আলোকপত্র, নান্দনিক ও স্বকাল কবিতাপত্রের সম্পাদক। দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গেও জড়িত।

জলধি ও আরাকান

পথিক মোস্তফা

প্রতিদিন মরণ এবং আগুনবসতি

কালসাপের দংশনলীলা, কামুকঘ্রাণ।

তবু বেঁচে থাকে ব-দ্বীপ

বুভুক্ষু জলধি ও আরাকান।

আমি আর কালনাগিনীর সতীন-সংসার।

জন্ম : ১৯৭৮ সালের ১ মার্চ বরিশাল জেলা, আগৈলঝাড়া উপজেলায়।

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ-আলোর দরপত্র, সবকিছু রোদে দেব, স্বর্গ ও শূন্যতার উপাখ্যান তার সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা-প্রভা, শেকড় ও যোগফল।

ভিক্ষুক

আসমা চৌধুরী

আমার বাবা অন্ধ হলে

আমি তার হাত ধরে ভিক্ষা করি পথ

অন্ধকারে নড়ে ওঠে গ্রামের নদী

সেও ভিক্ষা করে চাঁদ

পর পর ঘটনাগুলো সাজালে

আমরা একটা ভিক্ষুকের মিছিল হয়ে যাই-

শীতের ঝরাপাতা আমাদের পায়ের পাশে থাকে

সেও ভিক্ষা করে শিশির

সব ভিক্ষুকেরই নিজস্ব একটা গান তৈরি হয়ে যায়

বাবা গলা ছেড়ে গান ধরেন-

না চিনলাম তারে-

জন্ম : ৩০ নভেম্বর ১৯৬৫ মেহেন্দিগঞ্জ, বরিশাল, পেশা: অধ্যাপনা। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও শিশুতোষ সাহিত্যে বিচরণ। বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার। প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি।

অন্তহীন এক নির্মম অতীত

টুনু কর্মকার

অনন্তকাল বয়ে চলা তীব্র দহনে অন্তর উদ্বেলিত;

বিধ্বস্ত যখন গোটা মানব জীবন,

তখন আবার নতুন আহ্বানে দোলা দিল

ঢেউয়ের মতো নতুনের ছন্দে!

দুলিয়া যাওয়ার স্পন্দে...।

চিত্ত হলো মুগ্ধ, ঝরে পড়া আনন্দগুলো

আবার ভরে উঠল আলোর ঝলকানিতে।

হাজারো স্মৃতির মাঝে মন ভেসে গেল;

অন্তহীন চলার গহিন পথে, যেখানে জমা আছে...

অনন্তকাল বয়ে চলা এক নির্মম অতীত।

জন্ম : ১৫ জুন ১৯৬২। পেশা: অধ্যাপনা। প্রকাশিত গ্রন্থ : ভাবনাগুচ্ছ (কবিতা)। চিন্তন ও চেতনা (প্রবন্ধ)

উপহার

নয়ন আহমেদ

হাঁড়িভাঙা আমের মতোন তোমাকে পাঠাই মিষ্টি উপহার।

শিল্পাচার্য জয়নুলের ভোর;

হাশেম খানের হাতপাখার মরমি বিজ্ঞান

কিংবা পদ্মা, মেঘনা, যমুনার প্রেমপত্রে মৃদু ইকোলজি।

এ উপহারে দোলে বিশকোটি পাতার বাহার;

বিশকোটি সূর্যের মুখ নেচে ওঠে

শুদ্ধ উচ্চারণে, ভাষাতত্ত্বের কোমল

বিদুষী কন্যাগণ ব্রতগানে উৎসব ছড়ায়।

কিছু শ্র“তিপাঠ তার লেগে আছে ভোরের ডগায়।

রোদে রোদে প্রেমের সঘন শাস্ত্র আবৃত্তি হয়।

শুভেচ্ছা নিও। ভোরের হৃৎপিণ্ডে লেখা ভালোবাসা।

পেয়েছ কি? পত্রপাঠ উত্তর জানিও।

জন্ম : ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর। বরিশাল শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। পেশা: শিক্ষকতা। বরিশাল শেকড় সাহিত্য সংসদের সভাপতি। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : অসম্ভব অহংকার (১৯৯৬), বাসা বদলের গল্প (২০০৪), আমার বিবাহিত শব্দরা (২০১০), খনিঘুম (২০১৫), এককাপ গণযোগাযোগ (২০১৮) এবং নাতিদীর্ঘ দুপুরের ধ্বনি (২০১৯)।

শত্রুর ছায়া

শামীমা সুলতানা

বিষধর তুমি জেনেও দিয়েছি রোজ দুগ্ধ কলা

উদর পুর্তি হলেই করেছো শরীর পাকিয়ে দলা,

বিন্দু স্বার্থে আঘাত লাগলেই মুখে তুলেছো ফনা

বিষিয়ে তুলেছো আমার মস্তিষ্ক সমস্ত রক্তকণা।

ভয় করিনি কখনোই আমি করেছি ভীষণ দয়া

শত্র“র তরে দয়া মায়া দূরছাই মাড়াতে হয় না ছায়া।

তাইতো এবার বিষদাঁত ভেঙে গর্তে ছুড়েছি কায়া

জীবদ্দশায় দেখতে না হয় জাত শত্র“র ছায়া।

সর্প কখনো পোষ মানে না ছোবোলেই তার নেশা

চাটুকার শোনেনা ধর্ম বাণী প্রবঞ্চনাই পেশা।

জন্ম : ১৯৮৪ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি । বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার নিয়মিত লেখালেখি করেন। পুষ্পকলির কথা ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক তিনি।

উদ্যানের দিকে

সৈয়দ মেহেদী হাসান

সব প্রহসন অন্তত একবার মিলে যায় বাস্তবে

তারপরও কিছু অভিনয় বাকি থাকে!

বিদূষি বর্ণমালা ঘুরে বেড়ায় মঞ্চে-ময়দানে

কতবার দেখি পরিচিত কোতয়াল পঞ্চায়েতের ছবক

মানবীর আঁচলে লুকিয়ে রাখা শীতল অভীপ্সা

উদ্যানের দিকে ছুটে যাওয়া মার্বেলের দান

ঢুকে পড়ে কারও বাড়ি কারও আয়নায়

আমাদের অপরাধ কী? হাত খুলে জোনাক ধরা!

অনির্ণিত অজুহাতের কঙ্কাল দেখিয়ে খুলে নিচ্ছ কণ্ঠস্বর

মানুষগুলো কথা বলতে পারছে না নিজেদের সাথেও

শুধু শুনে কি বেঁচে থাকতে পারে কেউ পেছনের কাতারে?

জন্ম : ১৯৯০ সালের ১০ ডিসেম্বর। তার প্রথম কবিতার বই ‘জলপরীর ডানায় ঝাপটা লাগা বাতাস’ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। পেশা: সাংবাদিকতা। তার সম্পাদিত ছোট কাগজ অগ্নিযুগ।

আয়না

কাশেম নবী

কার লাবণ্য ছুঁয়ে তোমার সমস্ত ধান চিটা হয়ে যায়;

বিউগল সঞ্চয়ে এসে লাম্পট্যে গিলে ফেল

ধীবরের সাথে রাতের গল্প, মাছের বিষাদ!

আমিও কিছুকাল জিভের ডেরায় ব্যয় করে এসেছি

বিনাশের স্বাদ, গ্রেগর সামসার জাহাজভরা ঘুম;

জেনেছি-স্বপ্ন এক দুগ্ধপোষ্য শিশুর ঘুম চেয়ে

ব্যয়িত ডানার অনুমানে জেগে থাকা-

প্লেগোপদ্রুত শহরে চৈতন্যের তলদেশে পড়ে আছে

ইঁদুরের সন্ন্যাস, বিড়ালের শবদেহ;

উদ্যানে, রাস্তায়, নদী-খালে পড়ে আছে আমার অযুত লাশ;

আমি নিজের লাশ নিয়ে বসে থাকি পোকাদের অপেক্ষায়।

জন্ম : ০১ জুলাই ১৯৭৪। পেশা : অধ্যাপনা। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : সবকিছু রোদে দিবো, উদ্বাস্তু আমিও, তোমাদের শহরে ঘুরছে দণ্ডিত এক পুরুষ, আমি আর শয়তান গলা ধরে কাঁদি।

জোনাকিরা জ্বলে ধিকিধিকি

শাহরিয়ার মাসুম

এক রাতে চোখ মেলে জানালাতে দেখি

উঠোনেতে তারাদের খুব হাঁটাহাঁটি

ঝলমলে জামা গায়ে জোনাকিরা সেকি!

অস্থির বিচরণ তবে পরিপাটি।

আলো ঝিলিমিলি পেটে জানালাতে উঁকি

আধো ঘুমে মনে হলো জোনাকিটা সুখি

তারাদের আলোমাখা রাত গাঢ়ো হলো

জোনাকিটা ফিসফিস-‘আঁখি পুরো খোলো’।

চেয়ে দেখি সুখি কই জ্বলে ধিকিধিকি

রাত্রির গায়ে ফোটে হাসি ঝিকিমিকি

আলো যদি নিভে যায় জোনাকিটা কাঁদে

আঁধারের বুক চিরে জ্বলে প্রতিবাদে।

জন্ম : বরিশাল জেলা সদর। সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাগত জীবনের শুরু। আর এখন পুরোদস্তুর ব্যাংকার ও বরিশালের স্থায়ী বাসিন্দা। বর্তমানে বরিশাল থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা মুক্তবুলি’র উপ-সম্পাদক হিসাবে কাজ করছেন।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন