বাংলা সাহিত্যে রংপুরের অবদান
jugantor
রংপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন
বাংলা সাহিত্যে রংপুরের অবদান

  আনওয়ারুল ইসলাম রাজু  

০৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের ভাষার সঙ্গে রংপুরের ভাষার অনেক সাদৃশ্য বিবেচনায় গবেষকরা ‘রঙ্গপুর চর্যাপদ রচয়িতাদের চর্চাক্ষেত্র ছিল’ বলে মনে করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন ‘নাথগীতিকা’ রংপুর অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও পুঁথি সাহিত্য ইত্যাদি ধারার সাহিত্য রংপুর অঞ্চলেও চর্চিত হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলার কাহিনির আদলে ‘জাগের গান’ নামে এক ধরনের গান শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের সমকাল থেকে রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত আছে। মধ্যযুগের অন্যতম দিকপাল সাধককবি হেয়াত মামুদ। তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বিশলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জঙ্গনামা, সর্বভেদবাণী, হিতজ্ঞানবাণী ও আম্বিয়াবাণী নামে তার রচিত ৪টি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। মধ্যযুগের আরও অনেক কবির রচিত কাব্যের পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দ্বিজ কমললোচন, রাধাকৃষ্ণ দাস বৈরাগী, শ্রী জীবনকৃষ্ণ দাস, কৃষ্ণ হরিদাস, কবি মুহম্মদ কালা, শেখ শরফুদ্দীন, গোলাম রসুল, সৈয়দ মীর হেলু, খোদা বকস, শরীয়তুল্লাহ, রফিক মোহাম্মদ, শেখ আসমত উল্লাহ প্রমুখ উল্লেযোগ্য।

আধুনিক যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে রংপুরের উল্লেখযোগ্য কবি-সাহিত্যিকরা হলেন আমির উদ্দিন বসুনিয়া, হায়দার উল্লাহ, মুন্সী হাফিজুল্লাহ, তেলেঙ্গা সাহা ফকির, মৌলভী সৈয়দ আমানত আলী, কবি পঞ্চানন প্রমুখ। রাজা রামমোহন রায় রংপুর জেলা কালেক্টরেটে চাকরির সুবাদে এখানে অনেকদিন অবস্থান করেন। তার সান্নিধ্যে রংপুরে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়ও কর্মসূত্রে রংপুরে অবস্থানকালে সাহিত্য রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক সামাজিক নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ রচনার গৌরবের দাবিদার রংপুর। রংপুরের কুণ্ডি পরগণার জমিদার শ্রীযুক্ত কালী চন্দ্র রায় চৌধুরীর আহ্বানে তৎকালীন বহুবিবাহ ও কৌলীণ্য প্রথার কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্ন এ ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটক রচনা করে ৫০ টাকা পুরস্কার লাভ করেন।

রংপুরের গর্ব নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণের পথিকৃৎ মহীয়সী বেগম রোকেয়া সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। রংপুরের আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক সাহিত্যচর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেন। এদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন-খান বাহাদুর তসলিম উদ্দিন, রতিরাম দাস, পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন, জামাল উদ্দিন, হরগোপাল দাস, মুহাম্মদ ইব্রাহিম, শাহ করিম উদ্দিন আহমদ, শাহ আব্দুর রউফ, মোহাম্মদ হোসেন, মুন্সী ইসাহাক উদ্দিন, সমীর উদ্দিন আহমদ, এনাতুল্লাহ সরকার, সাদেক আলী, মো. খেরাজ আলী, রবীন্দ্রনাথ মৈত্র, তুলসী লাহিড়ী, কাজী মোহাম্মদ ইলিয়াস, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, মহমুদ হোসেন, মোহাম্মদ সুলতান, প্রকাশচন্দ্র চৌধুরী, প্রদীপ বিকাশ চৌধুরী, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, কবি নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, দোস্ত মোহাম্মদ, কাজী মোহাম্মদ এহিয়া, ডা. আশুতোষ দত্ত, আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, কবি কায়সুল হক, শেখ আমানত আলী, খন্দকার আব্দুল গণি, হায়দার আলী চৌদুরী, রোমেনা চৌধুরী, হাসান আলী চৌধুরী, আখতার উল আলম, তাহমিদুল ইসলাম, মোনাজাত উদ্দিন, হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সৈকত আসগর, শাহ আব্দুল মজিদ বুলু, কামরান শাহ আব্দুল আউয়াল, মুহম্মদ আলীম উদ্দীন, হামিদা সরকার, রোমেনা চৌধুরী, মুকুল মোস্তাফিজ, এ কে এম শহীদুর রহমান, এম এ বাশার, রকিবুল হাসান বুলবুল, খন্দকার সাইদুর রহমান, গোলাম মোস্তফা কাজল, সৈয়দ আবুল হাসনাত লাবলু, আবু ইউনুস বাদশাহ, খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, কাজী জাকির হাসান চন্দন, মো. আব্দুল বাকের রাজা প্রমুখ।

বর্তমানে রংপুরের যেসব কবি-সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন-মোতাহার হোসেন সুফী, মতিয়ার রহমান বস্নীয়া, সামসুন্নাহার জামান, মহফিল হক, মনোয়ারা বেগম, দিলরুবা শাহাদাৎ, নুর হাসনা লতিফ, মঞ্জু সরকার, মাহবুব আলম, রফিকুল হক দাদুভাই, মতলুব আলী, ছড়াকার আনিসুল হক, সাংবাদিক-সাহিত্যিক আনিসুল হক, আকবর হোসেন, মোস্তফা তোফয়েল হোসেন, মাহবুবুল ইসলাম, দিল আরা বানু খানম, মফিজুল ইসলাম মান্টু, আনওয়ারুল ইসলাম রাজু, মোহাম্মদ শাহ আলম, সোহরাব দুলাল, ওয়াদুদ মোস্তফা, অমোক ভদ্র, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, কালীরঞ্জন বর্মণ, আতাহার আলী খান, আফতাব হোসেন, সুনীল সরকার, স্বাত্তিক শাহ আল মারুফ, নাসিমা আকতার, এ এস এম হাবিবুর রহমান, মমতাজুর রহমান বাবু, বিলকিস সুলতানা শিরি, মারুফ হোসেন মাহবুব, হেলেন আরা সিডনি, জাকিয়া সুলতানা চৈতি, দিলীপ কুমার রায়, কাজল রায়, অধরা জ্যোতি, মাহবুব রহমান, জয়নাল আবেদীন, শাশ্বত ভট্টাচার্য, রেজাউল করিম মুকুল, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, রিয়াদ আনোয়ার শুভ, আবিদ করিম মুন্না, এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, সাকিল মাসুদ, মাহমুদ ইলাহী মণ্ডল, বাশার ইবনে জহুর, আবুল কাসেম, এমদাদুল হক ফারুক, রওশন আরা চামেলী, হোসনে আরা লিলি, বাদল রহমান, রানা মাসুদ, আশাফা সেলিম, এস এম খলিল বাবু, তৈয়বুর রহমান বাবু, খন্দকার নুরুল আজম, আহমেদ মওদুদ, নুরুন্নবী শান্ত, সাহিদা মিলকি, শাহীন মোমতাজ, কামরুন নাহার রেনু, সাঈদ সাহেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন, মজনুর রহমান, মনজিল মুরাদ লাভলু, ব্রজগোপাল রায়, শামসুজ্জামান সোহাগ, এস এম সাথী বেগম, শ্রাবণ বাঙালি, সেলিনা সাত্তার শেলী, জাহিদ হোসেন, নজরুল মৃধা, মুস্তাফিজ রহমান, রেজাউল করিম জীবন, মিনার বসুনিয়া, ফারুক প্রধান, তপন মাসরুর, রশিদুল হাসান, তাসমিন আফরোজ, সফুরা বেগম, হাই হাফিজ, আদিল ফকির, শিস খন্দকার, নূর মোহাম্মদ, শওকত আলী, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, আশরাফুজ্জামান বাবু, মতিয়ার রহমান, এটিএম মোরশেদ, আবিদ করিম মুন্না, মোকাদ্দেস আলী রাব্বী, আসহাদুজ্জামান মিলন, মোশাররফ হোসেন রাজু, এম এ শোয়েব দুলাল, সোমের কৌমুদী, শেখ ফাতিমা, নূর উন নবী, মৌসুমী সংকর রীতা, এস এম শহীদুল আলম, সুলতান আহমেদ সোনা, লুৎফর রহমান সাজু, সুমন সোবহান, শৈলেন্দ্রনাথ বর্মা, বিমলেন্দদু রায়, মনিরা পারভিন পপি, নাহিদা ইয়াসমিন শান্তা, নূর ই হাসিন দিশা, ফেরদৌস হোসেন পলাশ, হাই হাফিজ, দেলোয়ার হোসেন রংপুরী, সাব্বির হোসেন, মোরশেদ সরওয়ার জুয়েল, নাসরীন নাজ, অঙ্কনা জাহান প্রমুখ। অপেক্ষাকৃত নবীনদের মধ্যে যারা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন-শ্যামলি বিনতে আমজাদ, মাহাবুবা লাভীন, মোহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ, মুবাশ্বের দুহা, নাদিয়া জান্নাত, হোসেন রওশন, শুভ সরকার, ওয়াসিফা জাফর অদ্রি, এস এম মুরসালিন আয়াস, সঞ্জয় পুণীক, মিকদাদ মুগ্ধ, ফজলে রাব্বি, রোমানুর রহমান হাবিব, অনিরুদ্ধ সরকার, খাদিমুল মুরসালিন, রেজওয়ানা রিশতা, মুরাদ নীল, রিফাত আজহার, ফাহিম মুনতাসির, নাফিস সাদিক অর্ক, এলাহি মিনহা, সামীউল হক প্রমুখ।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ছিল আধুনিক সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্র। আর জেলাগুলোর মধ্যে রংপুর হয়ে উঠেছিল শিল্প-সাহিত্যচর্চার অন্যতম পীঠস্থান। এ কারণে স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার মতো এখানে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। রংপুর অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে এ লাইব্রেরিটির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে ‘রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি’র পশ্চিম প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর ড্রামেটিক অ্যাসোসিয়েশনের স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ। পরে এটির নামকরণ হয় ‘রংপুর টাউন হল’। এই হলটি এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে আজও স্বগৌরবে বিদ্যমান।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রস্তাবে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর প্রথম শাখা হিসাবে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’। ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’ বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চার প্রথম বাতিঘর। এ পরিষৎ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল-উত্তরবঙ্গ এবং আসামে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, প্রাচীন পুস্তক ও পুঁথি প্রকাশ পুনঃপ্রকাশ, প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে বাংলাভাষার চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করা। ১৩১৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস থেকে ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’ নামে একটি গবেষণাধর্মী ত্রৈমাসিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। এতে খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের লেখা ছাপা হয়। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ এবং আসামের খ্যাতিমান লেখক, গবেষকদের সমন্বয়ে প্রতিবছর সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’ গোটা উপমহাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি বৃহৎ ও প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সমসাময়িক সময়ে রংপুরে ‘স্বারস্বত সমাজ’ নামে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এটিও সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজনসহ সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। রংপুরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীর প্রকাশনা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুণ্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর থেকে ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ নামে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকা ছাপার জন্য বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্রও স্থাপিত হয় রংপুরের মাটিতে। এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার পথ প্রসারিত করার ক্ষেত্রে ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ পত্রিকার অবদান ইতিহাস স্বীকৃত। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর থেকে দ্বিতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার কার্যালয় থেকে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘রচনাবলি’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যেটি স্বল্প সময়ের মধ্যে সাহিত্যানুরাগীদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত বাসনা, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত আল হক, ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রংপুর ক্ষত্রিয় সমিতির পত্রিকা ‘ক্ষত্রিয়’, ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘ত্রৈমাসিক অরুণ’ পত্রিকা, পরে নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ সম্পাদিত ‘নজরুলিকা’, কবি কায়সুল হকের সম্পাদনায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘অধুনা’ ও ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘কালান্তর’ ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর জেলা কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা ‘উন্নয়ন’, সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ‘রবিবাসরীয় সাহিত্য আসর’ সাহিত্য বৈঠক অনুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি ‘শব্দ’ নামে একটি উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রংপুর কবিসভা’। সাহিত্য সভা-সম্মেলনের আয়োজনসহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রন্থ প্রকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কায়সুল হক ও মহফিল হকে সম্পাদনায় ‘বর্ষার পদাবলী’ নামে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ‘অভিযাত্রিক নতুন লিখিয়েদের আলোকিত আশ্রয়’-এ স্লোগান নিয়ে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত অভিযাত্রিক সাহিত্য সংসদ, রংপুর। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্য বৈঠকের পাশাপাশি ‘অভিযাত্রিক’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশসহ নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। ‘সাহিত্যে শুদ্ধতায় আলোকিত জীবন’-এ প্রতিপাদ্য নিয়ে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ’। এ সংগঠনটিও নিয়মিত সাহিত্য বৈঠক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ‘রংপুর সাহিত্যপত্র’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা এবং গবেষণামূলক ও সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা, দেশ-বিদেশের গুণী কবি-সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে সাহিত্য সমেম্মলন অনুষ্ঠান, গুণী সাহিত্যিকদের পদক ও সম্মাননা প্রদানসহ নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। লেখক সংসদ, রংপুর সাপ্তাহিক সাহিত্য বৈঠকের পাশাপাশি ‘ঐতিহ্য’ নামে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘বিভাগীয় লেখক পরিষদ’ রংপুর বিভাগের ৮ জেলার কবি-সাহিত্যিকদের এক ছাতার নিচে সংগঠিত করে সাহিত্যচর্চায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর বিভাগীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ৮ জেলার গুণী সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান করে আসছে। ছান্দসিক, ‘ছড়া সংসদ, রংপুর’, লেখক সংসদ, রংপুর, ফিরেদেখা সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন, সাফল্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিবার, জাতীয় কবিতা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এ ছাড়া ‘সম্মিলিত লেখক সমাজ, রংপুর’ স্থানীয় সব লেখককে সংগঠিত করে প্রতিবছর ‘রংপুর বইমেলা’র আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

রংপুর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল মাগাজিনের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে কবি মহফিল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘নতুন সাহিত্য’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে এ সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশনার পাশাপাশি ‘নতুন সাহিত্য আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব’ পালিত হয়ে আসছে। রংপুরের আর একটি উল্লেখযোগ্য ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র ‘অঞ্জলিকা’। কবি দিলরুবা শাহাদাৎ সম্পাদিত এ সাহিত্যপত্রে উদ্যোগে বিভিন্ন ঋতু ও দিবসভিত্তিক সাহিত্য আসর অনষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রংপুর থেকে আরও অনেক স্বল্পায়ু লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভার ঘটে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-বিপ্লবী কণ্ঠ, জনতার কণ্ঠ, অবর্গ, মৃৎ, ছাপাখানা, ক্যাথার্সিস, সৃষ্টি ছান্দসিক, ফাল্গুনি, উল্কা, উজ্জীবন, উত্তরণ, জিগীষা, বিপ্রতীপ, ডাহুক, সূচনা, চেতনা, প্রত্যাশা, দুর্বার, অন্বেষা, সজীব, জননী, মহীয়সী, করুল, সৃষ্টি, মঞ্জুরি, সোনার তরী, বাঁক, প্রত্যয়, অনুকাব্য, গুঞ্জন, মহাকাল, গুনগুন, প্রতিবিম্ব, প্রতিরোধ, শাব্দিক, সংশপ্ত, উচ্চারণ, শোণিতে সূর্যোদয়, জরতরঙ্গ, কালি ও কলম, থৈ-থৈ, উত্তর মেঘ, চর্চাপদ, চক্রবাক, কলমকারি।

বর্তমানে র্ছরা, রংধনু, মৌচাক, ফিরে দেখা, সূত্রপাত, দুয়ার, পেনসিল, উত্তরযুগ প্রভৃতি সাহিত্যের ছোট কাগজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রংপুর থেকে বর্তমানে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী এবং একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রতি বছর প্রকাশিত সংকলন-স্মরণিকাগুলো নতুন লেখক সৃষ্টিতে অবদান রেখে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেশ কিছু ‘ই-ম্যাগাজিন’ বা ‘ওয়েবজিন’ প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ‘পাতাপ্রকাশ ডট কম’, ‘মুগ্ধতা ডট কম’ এবং ‘তারুণ্যের পদাবলী’ উল্লেখযোগ্য। ই-ম্যাগাজিনের পাশাপাশি ‘ই-বুক’ও প্রকাশিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরের কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় লেখকদের বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। এর মধ্যে আইডিয়া প্রকাশন ও পাতা প্রকাশ উল্লেখযোগ্য। এ দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অমর একুশে বইমেলাতেও স্টল দিয়ে রংপুরের লেখকদের জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করা ও বই বিপণনের মাধ্যমে লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করে চলেছে।

রংপুর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন

বাংলা সাহিত্যে রংপুরের অবদান

 আনওয়ারুল ইসলাম রাজু 
০৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদের ভাষার সঙ্গে রংপুরের ভাষার অনেক সাদৃশ্য বিবেচনায় গবেষকরা ‘রঙ্গপুর চর্যাপদ রচয়িতাদের চর্চাক্ষেত্র ছিল’ বলে মনে করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন ‘নাথগীতিকা’ রংপুর অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও পুঁথি সাহিত্য ইত্যাদি ধারার সাহিত্য রংপুর অঞ্চলেও চর্চিত হয়েছে। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়লীলার কাহিনির আদলে ‘জাগের গান’ নামে এক ধরনের গান শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের সমকাল থেকে রংপুর অঞ্চলে প্রচলিত আছে। মধ্যযুগের অন্যতম দিকপাল সাধককবি হেয়াত মামুদ। তিনি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়বিশলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জঙ্গনামা, সর্বভেদবাণী, হিতজ্ঞানবাণী ও আম্বিয়াবাণী নামে তার রচিত ৪টি কাব্যগ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। মধ্যযুগের আরও অনেক কবির রচিত কাব্যের পুঁথির সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে দ্বিজ কমললোচন, রাধাকৃষ্ণ দাস বৈরাগী, শ্রী জীবনকৃষ্ণ দাস, কৃষ্ণ হরিদাস, কবি মুহম্মদ কালা, শেখ শরফুদ্দীন, গোলাম রসুল, সৈয়দ মীর হেলু, খোদা বকস, শরীয়তুল্লাহ, রফিক মোহাম্মদ, শেখ আসমত উল্লাহ প্রমুখ উল্লেযোগ্য।

আধুনিক যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে রংপুরের উল্লেখযোগ্য কবি-সাহিত্যিকরা হলেন আমির উদ্দিন বসুনিয়া, হায়দার উল্লাহ, মুন্সী হাফিজুল্লাহ, তেলেঙ্গা সাহা ফকির, মৌলভী সৈয়দ আমানত আলী, কবি পঞ্চানন প্রমুখ। রাজা রামমোহন রায় রংপুর জেলা কালেক্টরেটে চাকরির সুবাদে এখানে অনেকদিন অবস্থান করেন। তার সান্নিধ্যে রংপুরে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা সমৃদ্ধ হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়ও কর্মসূত্রে রংপুরে অবস্থানকালে সাহিত্য রচনা করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মৌলিক সামাজিক নাটক ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ রচনার গৌরবের দাবিদার রংপুর। রংপুরের কুণ্ডি পরগণার জমিদার শ্রীযুক্ত কালী চন্দ্র রায় চৌধুরীর আহ্বানে তৎকালীন বহুবিবাহ ও কৌলীণ্য প্রথার কুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নাট্যকার রামনারায়ণ তর্করত্ন এ ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটক রচনা করে ৫০ টাকা পুরস্কার লাভ করেন।

রংপুরের গর্ব নারীশিক্ষা ও নারী জাগরণের পথিকৃৎ মহীয়সী বেগম রোকেয়া সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। রংপুরের আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক সাহিত্যচর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেন। এদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন-খান বাহাদুর তসলিম উদ্দিন, রতিরাম দাস, পণ্ডিত যাদবেশ্বর তর্করত্ন, জামাল উদ্দিন, হরগোপাল দাস, মুহাম্মদ ইব্রাহিম, শাহ করিম উদ্দিন আহমদ, শাহ আব্দুর রউফ, মোহাম্মদ হোসেন, মুন্সী ইসাহাক উদ্দিন, সমীর উদ্দিন আহমদ, এনাতুল্লাহ সরকার, সাদেক আলী, মো. খেরাজ আলী, রবীন্দ্রনাথ মৈত্র, তুলসী লাহিড়ী, কাজী মোহাম্মদ ইলিয়াস, কাজী মোহাম্মদ ইদ্রিস, মহমুদ হোসেন, মোহাম্মদ সুলতান, প্রকাশচন্দ্র চৌধুরী, প্রদীপ বিকাশ চৌধুরী, একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, কবি নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, দোস্ত মোহাম্মদ, কাজী মোহাম্মদ এহিয়া, ডা. আশুতোষ দত্ত, আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, কবি কায়সুল হক, শেখ আমানত আলী, খন্দকার আব্দুল গণি, হায়দার আলী চৌদুরী, রোমেনা চৌধুরী, হাসান আলী চৌধুরী, আখতার উল আলম, তাহমিদুল ইসলাম, মোনাজাত উদ্দিন, হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, আবু মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, সৈকত আসগর, শাহ আব্দুল মজিদ বুলু, কামরান শাহ আব্দুল আউয়াল, মুহম্মদ আলীম উদ্দীন, হামিদা সরকার, রোমেনা চৌধুরী, মুকুল মোস্তাফিজ, এ কে এম শহীদুর রহমান, এম এ বাশার, রকিবুল হাসান বুলবুল, খন্দকার সাইদুর রহমান, গোলাম মোস্তফা কাজল, সৈয়দ আবুল হাসনাত লাবলু, আবু ইউনুস বাদশাহ, খাদেমুল ইসলাম বসুনিয়া, কাজী জাকির হাসান চন্দন, মো. আব্দুল বাকের রাজা প্রমুখ।

বর্তমানে রংপুরের যেসব কবি-সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন-মোতাহার হোসেন সুফী, মতিয়ার রহমান বস্নীয়া, সামসুন্নাহার জামান, মহফিল হক, মনোয়ারা বেগম, দিলরুবা শাহাদাৎ, নুর হাসনা লতিফ, মঞ্জু সরকার, মাহবুব আলম, রফিকুল হক দাদুভাই, মতলুব আলী, ছড়াকার আনিসুল হক, সাংবাদিক-সাহিত্যিক আনিসুল হক, আকবর হোসেন, মোস্তফা তোফয়েল হোসেন, মাহবুবুল ইসলাম, দিল আরা বানু খানম, মফিজুল ইসলাম মান্টু, আনওয়ারুল ইসলাম রাজু, মোহাম্মদ শাহ আলম, সোহরাব দুলাল, ওয়াদুদ মোস্তফা, অমোক ভদ্র, হোসনে আরা লুৎফা ডালিয়া, কালীরঞ্জন বর্মণ, আতাহার আলী খান, আফতাব হোসেন, সুনীল সরকার, স্বাত্তিক শাহ আল মারুফ, নাসিমা আকতার, এ এস এম হাবিবুর রহমান, মমতাজুর রহমান বাবু, বিলকিস সুলতানা শিরি, মারুফ হোসেন মাহবুব, হেলেন আরা সিডনি, জাকিয়া সুলতানা চৈতি, দিলীপ কুমার রায়, কাজল রায়, অধরা জ্যোতি, মাহবুব রহমান, জয়নাল আবেদীন, শাশ্বত ভট্টাচার্য, রেজাউল করিম মুকুল, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, রিয়াদ আনোয়ার শুভ, আবিদ করিম মুন্না, এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, সাকিল মাসুদ, মাহমুদ ইলাহী মণ্ডল, বাশার ইবনে জহুর, আবুল কাসেম, এমদাদুল হক ফারুক, রওশন আরা চামেলী, হোসনে আরা লিলি, বাদল রহমান, রানা মাসুদ, আশাফা সেলিম, এস এম খলিল বাবু, তৈয়বুর রহমান বাবু, খন্দকার নুরুল আজম, আহমেদ মওদুদ, নুরুন্নবী শান্ত, সাহিদা মিলকি, শাহীন মোমতাজ, কামরুন নাহার রেনু, সাঈদ সাহেদুল ইসলাম, জাকির হোসেন, মজনুর রহমান, মনজিল মুরাদ লাভলু, ব্রজগোপাল রায়, শামসুজ্জামান সোহাগ, এস এম সাথী বেগম, শ্রাবণ বাঙালি, সেলিনা সাত্তার শেলী, জাহিদ হোসেন, নজরুল মৃধা, মুস্তাফিজ রহমান, রেজাউল করিম জীবন, মিনার বসুনিয়া, ফারুক প্রধান, তপন মাসরুর, রশিদুল হাসান, তাসমিন আফরোজ, সফুরা বেগম, হাই হাফিজ, আদিল ফকির, শিস খন্দকার, নূর মোহাম্মদ, শওকত আলী, রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, আশরাফুজ্জামান বাবু, মতিয়ার রহমান, এটিএম মোরশেদ, আবিদ করিম মুন্না, মোকাদ্দেস আলী রাব্বী, আসহাদুজ্জামান মিলন, মোশাররফ হোসেন রাজু, এম এ শোয়েব দুলাল, সোমের কৌমুদী, শেখ ফাতিমা, নূর উন নবী, মৌসুমী সংকর রীতা, এস এম শহীদুল আলম, সুলতান আহমেদ সোনা, লুৎফর রহমান সাজু, সুমন সোবহান, শৈলেন্দ্রনাথ বর্মা, বিমলেন্দদু রায়, মনিরা পারভিন পপি, নাহিদা ইয়াসমিন শান্তা, নূর ই হাসিন দিশা, ফেরদৌস হোসেন পলাশ, হাই হাফিজ, দেলোয়ার হোসেন রংপুরী, সাব্বির হোসেন, মোরশেদ সরওয়ার জুয়েল, নাসরীন নাজ, অঙ্কনা জাহান প্রমুখ। অপেক্ষাকৃত নবীনদের মধ্যে যারা প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন-শ্যামলি বিনতে আমজাদ, মাহাবুবা লাভীন, মোহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ, মুবাশ্বের দুহা, নাদিয়া জান্নাত, হোসেন রওশন, শুভ সরকার, ওয়াসিফা জাফর অদ্রি, এস এম মুরসালিন আয়াস, সঞ্জয় পুণীক, মিকদাদ মুগ্ধ, ফজলে রাব্বি, রোমানুর রহমান হাবিব, অনিরুদ্ধ সরকার, খাদিমুল মুরসালিন, রেজওয়ানা রিশতা, মুরাদ নীল, রিফাত আজহার, ফাহিম মুনতাসির, নাফিস সাদিক অর্ক, এলাহি মিনহা, সামীউল হক প্রমুখ।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ছিল আধুনিক সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্র। আর জেলাগুলোর মধ্যে রংপুর হয়ে উঠেছিল শিল্প-সাহিত্যচর্চার অন্যতম পীঠস্থান। এ কারণে স্থানীয় জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার মতো এখানে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রঙ্গপুর পাবলিক লাইব্রেরি’। রংপুর অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার ক্ষেত্রে এ লাইব্রেরিটির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দে ‘রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি’র পশ্চিম প্রতিষ্ঠিত হয় রংপুর ড্রামেটিক অ্যাসোসিয়েশনের স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ। পরে এটির নামকরণ হয় ‘রংপুর টাউন হল’। এই হলটি এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে আজও স্বগৌরবে বিদ্যমান।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রস্তাবে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর প্রথম শাখা হিসাবে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’। ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’ বাংলাদেশে সাহিত্য চর্চার প্রথম বাতিঘর। এ পরিষৎ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল-উত্তরবঙ্গ এবং আসামে বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, প্রাচীন পুস্তক ও পুঁথি প্রকাশ পুনঃপ্রকাশ, প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে বাংলাভাষার চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করা। ১৩১৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস থেকে ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’ নামে একটি গবেষণাধর্মী ত্রৈমাসিক পত্রিকার প্রকাশনা শুরু হয়। এতে খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের লেখা ছাপা হয়। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ এবং আসামের খ্যাতিমান লেখক, গবেষকদের সমন্বয়ে প্রতিবছর সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ‘রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষৎ’ গোটা উপমহাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির একটি বৃহৎ ও প্রাণবন্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সমসাময়িক সময়ে রংপুরে ‘স্বারস্বত সমাজ’ নামে একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এটিও সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজনসহ সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। রংপুরের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও সাহিত্য সাময়িকীর প্রকাশনা সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুণ্ডি পরগণার জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর থেকে ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ নামে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকা ছাপার জন্য বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণযন্ত্রও স্থাপিত হয় রংপুরের মাটিতে। এ অঞ্চলের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার পথ প্রসারিত করার ক্ষেত্রে ‘রঙ্গপুর বার্তাবহ’ পত্রিকার অবদান ইতিহাস স্বীকৃত। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর থেকে দ্বিতীয় সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকার কার্যালয় থেকে ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে ‘রচনাবলি’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হয়, যেটি স্বল্প সময়ের মধ্যে সাহিত্যানুরাগীদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত বাসনা, ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত আল হক, ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রংপুর ক্ষত্রিয় সমিতির পত্রিকা ‘ক্ষত্রিয়’, ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘ত্রৈমাসিক অরুণ’ পত্রিকা, পরে নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ সম্পাদিত ‘নজরুলিকা’, কবি কায়সুল হকের সম্পাদনায় ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘অধুনা’ ও ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘কালান্তর’ ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর জেলা কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক পত্রিকা ‘উন্নয়ন’, সাহিত্যচর্চায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ‘রবিবাসরীয় সাহিত্য আসর’ সাহিত্য বৈঠক অনুষ্ঠানের আয়োজনের পাশাপাশি ‘শব্দ’ নামে একটি উন্নতমানের সাহিত্য পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রংপুর কবিসভা’। সাহিত্য সভা-সম্মেলনের আয়োজনসহ কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ প্রন্থ প্রকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। কায়সুল হক ও মহফিল হকে সম্পাদনায় ‘বর্ষার পদাবলী’ নামে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ‘অভিযাত্রিক নতুন লিখিয়েদের আলোকিত আশ্রয়’-এ স্লোগান নিয়ে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত অভিযাত্রিক সাহিত্য সংসদ, রংপুর। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নিয়মিত সাপ্তাহিক সাহিত্য বৈঠকের পাশাপাশি ‘অভিযাত্রিক’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশসহ নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। ‘সাহিত্যে শুদ্ধতায় আলোকিত জীবন’-এ প্রতিপাদ্য নিয়ে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রংপুর সাহিত্য-সংস্কৃতি পরিষদ’। এ সংগঠনটিও নিয়মিত সাহিত্য বৈঠক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ‘রংপুর সাহিত্যপত্র’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা এবং গবেষণামূলক ও সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা, দেশ-বিদেশের গুণী কবি-সাহিত্যিকদের সমন্বয়ে সাহিত্য সমেম্মলন অনুষ্ঠান, গুণী সাহিত্যিকদের পদক ও সম্মাননা প্রদানসহ নানা কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। লেখক সংসদ, রংপুর সাপ্তাহিক সাহিত্য বৈঠকের পাশাপাশি ‘ঐতিহ্য’ নামে সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে।

২০১১ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘বিভাগীয় লেখক পরিষদ’ রংপুর বিভাগের ৮ জেলার কবি-সাহিত্যিকদের এক ছাতার নিচে সংগঠিত করে সাহিত্যচর্চায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছর বিভাগীয় সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি ৮ জেলার গুণী সাহিত্যিকদের সম্মাননা প্রদান করে আসছে। ছান্দসিক, ‘ছড়া সংসদ, রংপুর’, লেখক সংসদ, রংপুর, ফিরেদেখা সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন, সাফল্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিবার, জাতীয় কবিতা পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। এ ছাড়া ‘সম্মিলিত লেখক সমাজ, রংপুর’ স্থানীয় সব লেখককে সংগঠিত করে প্রতিবছর ‘রংপুর বইমেলা’র আয়োজনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।

রংপুর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল মাগাজিনের অবদানও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ প্রসঙ্গে কবি মহফিল হক সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘নতুন সাহিত্য’-এর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দুই বাংলার কবি-সাহিত্যিকদের লেখা নিয়ে এ সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশনার পাশাপাশি ‘নতুন সাহিত্য আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব’ পালিত হয়ে আসছে। রংপুরের আর একটি উল্লেখযোগ্য ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র ‘অঞ্জলিকা’। কবি দিলরুবা শাহাদাৎ সম্পাদিত এ সাহিত্যপত্রে উদ্যোগে বিভিন্ন ঋতু ও দিবসভিত্তিক সাহিত্য আসর অনষ্ঠিত হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে রংপুর থেকে আরও অনেক স্বল্পায়ু লিটল ম্যাগাজিনের আবির্ভার ঘটে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য-বিপ্লবী কণ্ঠ, জনতার কণ্ঠ, অবর্গ, মৃৎ, ছাপাখানা, ক্যাথার্সিস, সৃষ্টি ছান্দসিক, ফাল্গুনি, উল্কা, উজ্জীবন, উত্তরণ, জিগীষা, বিপ্রতীপ, ডাহুক, সূচনা, চেতনা, প্রত্যাশা, দুর্বার, অন্বেষা, সজীব, জননী, মহীয়সী, করুল, সৃষ্টি, মঞ্জুরি, সোনার তরী, বাঁক, প্রত্যয়, অনুকাব্য, গুঞ্জন, মহাকাল, গুনগুন, প্রতিবিম্ব, প্রতিরোধ, শাব্দিক, সংশপ্ত, উচ্চারণ, শোণিতে সূর্যোদয়, জরতরঙ্গ, কালি ও কলম, থৈ-থৈ, উত্তর মেঘ, চর্চাপদ, চক্রবাক, কলমকারি।

বর্তমানে র্ছরা, রংধনু, মৌচাক, ফিরে দেখা, সূত্রপাত, দুয়ার, পেনসিল, উত্তরযুগ প্রভৃতি সাহিত্যের ছোট কাগজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। রংপুর থেকে বর্তমানে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী এবং একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, বাংলা নববর্ষসহ বিভিন্ন উপলক্ষে প্রতি বছর প্রকাশিত সংকলন-স্মরণিকাগুলো নতুন লেখক সৃষ্টিতে অবদান রেখে চলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেশ কিছু ‘ই-ম্যাগাজিন’ বা ‘ওয়েবজিন’ প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ‘পাতাপ্রকাশ ডট কম’, ‘মুগ্ধতা ডট কম’ এবং ‘তারুণ্যের পদাবলী’ উল্লেখযোগ্য। ই-ম্যাগাজিনের পাশাপাশি ‘ই-বুক’ও প্রকাশিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রংপুরের কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্থানীয় লেখকদের বিভিন্ন ধরনের বই প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে। এর মধ্যে আইডিয়া প্রকাশন ও পাতা প্রকাশ উল্লেখযোগ্য। এ দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অমর একুশে বইমেলাতেও স্টল দিয়ে রংপুরের লেখকদের জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করা ও বই বিপণনের মাধ্যমে লেখকদের সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করে চলেছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : প্রান্তছোঁয়া আকাশ

০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১