পাঠক নিজের জীবনকেই প্রত্যক্ষ করেন সাহিত্যে: মোহাম্মদ শাহ আলম
jugantor
পাঠক নিজের জীবনকেই প্রত্যক্ষ করেন সাহিত্যে: মোহাম্মদ শাহ আলম

  জুননু রাইন  

০৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জন্ম ৬ জুলাই, ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ। জন্ম রংপুরের পীরগাছা থানার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামে। লেখালেখি সূচনা : স্কুল জীবনে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, নিবন্ধ, গল্প, ফিচার প্রকাশ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রপত্রিকায়। বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা, উপদেশক। প্রকাশনা : ভাওয়াইয়া (যৌথ গবেষণা); ধবল আলোর মায়াবী ডাক (কাব্যগ্রন্থ); সাহসী নিসর্গ (যৌথ কাব্য); বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা (গল্পগ্রন্থ); ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন (যৌথ ছড়াগ্রন্থ), গবেষণা গ্রন্থ-ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা। সম্পাদনা : রংপুর সাহিত্য পত্র, অভিযাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা, মুহম্মদ আলীম উদ্দীনের ৭৫ বছর পূর্তি স্মারক-প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ; নায়েম-এর প্রশিক্ষণ পত্রিকা, বিভিন্ন দেয়াল পত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিন। প্রফেসর শাহ আলম দক্ষ সংগঠক, গীতিকার, নাট্যকার ও আবৃত্তিকার। আবৃত্তি ও বিতর্ক ক্ষেত্রে রেখে চলেছেন অনবদ্য অবদান। তিনি করামাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক, কারমাইকেল নাট্য সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা শিক্ষক। অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছে শিখেছেন আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক, সুন্দর বাচনভঙ্গি, এখনো শিখছেন অনেকেই। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জুননু রাইন

লেখক হওয়ার জন্য শহরে আসার প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন?

: অপরিহার্য মনে করি না। তবে গ্রামীণ আবহে প্রকাশনার সুযোগ সুবিধা কম, অন্য শহরের সঙ্গে যোগসূত্র রাখা দোষের কিছু নয়। জীবিকার ক্ষেত্রেও শহরের সুযোগ সুবিধা বেশি। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরকেন্দ্রিক, তাই শহরে যাওয়ার প্রবণতা সঙ্গত। যারা ভালো লেখেন তারাও শহরভিত্তিক চর্চাতেই নিবেদিত, সে কারণেও শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে মেনে নিতেই হয়। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে গ্রামীণ জীবনে যদি সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রসার ঘটানোর সুযোগ প্রসারিত হয় তবে শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে।

পুরস্কার বা সংগঠন সাহিত্যের জন্য কী করতে পারে?

: প্রেরণার বিষয় ভাবলে পুরস্কার মন্দ নয়। কারণ সাধনার ফল হিসাবে পুরস্কার নতুন সৃজনের বোধ সৃষ্টি করে। দায়বদ্ধতা থেকে ভালো লেখার প্রত্যয় জাগে। সৃজনজগৎ সমৃদ্ধ হয়। তবে পুরস্কার অর্জন মানেই শ্রেষ্ঠত্ব এমনটা সব সময় ভাবার অবকাশ নেই। কারণ আজকাল লেখকের গুণগত মান যাচাই কতটা হয় তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। যদি উপযুক্ত লেখককে নির্বাচন করে পুরস্কার প্রদান করা হয় তবে তা নিশ্চয়ই উপকারী।

সংগঠনগুলোতে যথাযথ পরিবেশ, সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক সুযোগ পেয়ে সাহিত্যকর্মে নিবেদিত হতে দেখা যায় অনেককেই। প্রতিযোগিতার মনোভাব জন্মে, তরুণরা জ্যেষ্ঠ লেখকদের উপদেশ পান, তাদের লেখা শোনার সুযোগ থাকে সংগঠনে। আবার নিজের লেখা পাঠ ও নির্দেশনামূলক আলোচনা শোনার সুযোগ মেলে সংগঠনে।

মনে করা হয়ে থাকে সাহিত্যের পাঠক কমে গেছে। এটা কী লেখকের দুর্বলতা না জ্ঞানার্জন ইচ্ছুক মানুষ তৈরিতে আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে?

: পাঠক সংখ্যা সত্যি কী কমেছে? এমন প্রশ্ন আমারও। এক সময় শিল্পের জন্য শিল্প ছিল সৃজনের বৈশিষ্ট্য কিন্তু সময়ের চাহিদায় এখন তো-‘মানুষের জন্য শিল্প।’ সাহিত্যে জীবনের নানা দিকের উপস্থাপন থাকে অন্য পাঠকরা নিজেদের জীবনকেই প্রত্যক্ষ করেন সাহিত্যে। তারপরও পাঠক সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত। আধুনিক কবিতার পাঠক সংখ্যা কম, এমন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ হয়েছে। আধুনিক কবিতা কঠিন, অনেকটা অবোধ্য, সে কারণে পাঠকরা আধুনিক কবিতা পাঠে উৎসাহ হারিয়েছেন। আবার উল্টো যুক্তিতে বলা হয়েছে- পাঠকদেরও বিস্তৃত করতে হবে জানার ও বোধের পরিধি।

প্রমথ চৌধুরী মানসম্মত লেখার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে লিখেছেন-‘আমরা যদি পাঠকদের মানসম্মসত লেখা উপহার দিতে না পারি তবে ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্য কোন পথে যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যাবে।’

মনোযোগী হতে হবে অনুবাদ বিষয়েও। জীবনবান্ধব, বৈচিত্র্যময় ও সুখপাঠ্য হলেই সাহিত্য পাঠককে অধিক আকর্ষণ করবে বলে মনে হয়।

রংপুরের সাহিত্যচর্চা অতীতের তুলনায় বেশি না কম সক্রিয়? এ সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তার কারণ?

: রংপুরে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, লেখকের সংখ্যা, বৃদ্ধি পেয়েছে প্রকাশনার সুযোগ। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও বেগবান। তবে রংপুরের অতীত চর্চাও প্রশংসার দাবি রাখে। রংপুরের প্রচলিত কথা রং রসে ভরপুর-গরিয়সী রংপুর। রংপুরের লোকসাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ।

আগে প্রায় প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুল ম্যাগাজিন বেরোত। এখন অনেক কমে গেছে, হয় না বললেই চলে। এ অবস্থা আমাদের শিল্প সাহিত্যে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে? এ থেকে উত্তরণের উপায়?

: সে প্রয়াস কমে গেছে অনেকটা। যা শিল্প-সাহিত্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। করাণ স্কুল ম্যাগাজি প্রকাশিত হলে শিক্ষার্থীরা কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নাটিকাসহ বিভিন্ন লেখায় আগ্রহী ও ব্রতী হতো। এতে বেশি বেশি জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হতো তারা। দেশ, জাতি, ভাষা, স্বাধীনতা, জীবন, প্রকৃতি, অতীত, বর্তমান, ভবিষৎ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, ইতিহাস-ঐতিহ্য নানা বিষয়ে চর্চার সুযোগ পেত। ছোট থেকেই সাহিত্য সৃজনে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগ পেলে তারাই খ্যাতিমান সাহিত্যিক বা লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে পেত।

উত্তরণের জন্য দরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার আন্তরিক উদ্যোগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ফরম পূরণে ম্যাগাজিনের জন্য অর্থ আদায় করা হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তা অন্য খাতে ব্যয়ের কথা শোনা যায়। তা যেন ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজেই ব্যয় হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে তাগিদ দেওয়া, ম্যাগাজিন প্রকাশে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ প্রদান, প্রকাশ না করলে সে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা হলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগের মতো স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে।

বর্তমান সাহিত্যে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। কোন বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত?

: বর্তমান সময়ে জীবনের নানা বিষয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে। জীবন, জীবিকা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, জীবনের চলমান জটিলতা, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, করোনায় মানবিক বিপর্যয় সবই সাহিত্যে দৃশ্যমান। জীবন জিজ্ঞাসা, সমাজে আস্থার যে সংকট, সংশয় তা নিয়েও লিখছেন অনেকে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আশা ভঙ্গের বেদনা প্রসঙ্গও বাদ যায়নি।

আমার মনে হয় যে বিষয়ে মানুষের মঙ্গল সাধিত হয়, সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, ভবিষ্যৎ স্বস্তিময় হয় এমন বিষয় প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

আমাদের বর্তমান সাহিত্যে প্রকৃতি মানুষ জীবনের কতটা নিজস্ব সৌন্দর্যে বহমান, কতটা বিকৃতির শিকার? কী করণে হচ্ছে?

: বর্তমান সাহিত্যে প্রকৃতির শোভা, সৌন্দর্য যথাযথ তুলে ধরছেন লেখকরা। যাতে বাংলাদেশের যে রূপলাবণ্য তা প্রস্ফুট হচ্ছে। তবে দুর্যোগের ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত প্রকৃতিও তুলে ধরেন সাহিত্যিকরা। এটাই বাস্তবতা। তবে কল্পনানির্ভরতায় ‘সিমেন্টের রাস্তায় গরু ঘাস খায়’-এমন চিত্র কতটা বাস্তব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে, বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে প্রকৃতি ও জীবনকে বিকৃত করার বিষয়টিও ভিন্ন ভাবনার জন্ম দেয়। এ জন্য দরকার প্রকৃতির প্রকৃত রূপেরই চিত্রায়ণ।

প্রযুক্তির ব্যবহার সাহিত্যের জন্য কতটা ভালো, কতটা মন্দ?

: প্রযুক্তির আশ্রয় মন্দ কিছু নয়। ই-বুক, ই-পেপারসহ সৃজনশীল বহুকিছুই প্রযুক্তির অবদান। তাই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েই অব্যাহত রাখতে হবে সৃজনশীলতা। শুধু লক্ষ রাখতে হবে, সচেতন থাকতে হবে যেন প্রযুক্তির অপব্যবহার না হয় বর্তমান রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কেমন? কেমন হওয়া উচিত?

: শাসক আর শাসিত-অতীতের মতো এমন ধারণা এখন নেই। দলগত আদর্শের বিভাজনে অনেক বিষয়ে সংশয় থাকলেও বাস্তবতা হলো বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক নিকটবর্র্তী। রাষ্ট্র যারা চালান তারা জনগণের দ্বারা ক্ষমতায়িত তাই তাদের জনগণের কল্যাণে কাজ করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, সংস্কৃতি, বিচারসহ সব বিষয়ে সমান অধিকার পায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এমন জনবান্ধব, অসাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রই প্রত্যাশা।

পাঠক নিজের জীবনকেই প্রত্যক্ষ করেন সাহিত্যে: মোহাম্মদ শাহ আলম

 জুননু রাইন 
০৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জন্ম ৬ জুলাই, ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ। জন্ম রংপুরের পীরগাছা থানার অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামে। লেখালেখি সূচনা : স্কুল জীবনে। কবিতা, প্রবন্ধ, ছড়া, নিবন্ধ, গল্প, ফিচার প্রকাশ স্থানীয় ও জাতীয় পত্রপত্রিকায়। বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা, উপদেশক। প্রকাশনা : ভাওয়াইয়া (যৌথ গবেষণা); ধবল আলোর মায়াবী ডাক (কাব্যগ্রন্থ); সাহসী নিসর্গ (যৌথ কাব্য); বৈরী বাতাসে স্বপ্নেরা (গল্পগ্রন্থ); ছড়ায় স্বদেশ ছড়ায় জীবন (যৌথ ছড়াগ্রন্থ), গবেষণা গ্রন্থ-ভাওয়াইয়ায় প্রেম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, স্বাধীনতা পরবর্তী রংপুরের নাট্যচর্চা। সম্পাদনা : রংপুর সাহিত্য পত্র, অভিযাত্রিক সাহিত্য পত্রিকা, মুহম্মদ আলীম উদ্দীনের ৭৫ বছর পূর্তি স্মারক-প্রজ্ঞার পাললিক ঘ্রাণ; নায়েম-এর প্রশিক্ষণ পত্রিকা, বিভিন্ন দেয়াল পত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিন। প্রফেসর শাহ আলম দক্ষ সংগঠক, গীতিকার, নাট্যকার ও আবৃত্তিকার। আবৃত্তি ও বিতর্ক ক্ষেত্রে রেখে চলেছেন অনবদ্য অবদান। তিনি করামাইকেল কলেজ বিতর্ক পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক, কারমাইকেল নাট্য সাহিত্য সংসদের প্রতিষ্ঠাতা উপদেষ্টা শিক্ষক। অসংখ্য শিক্ষার্থী তার কাছে শিখেছেন আবৃত্তি, উপস্থাপন, বিতর্ক, সুন্দর বাচনভঙ্গি, এখনো শিখছেন অনেকেই। সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জুননু রাইন

লেখক হওয়ার জন্য শহরে আসার প্রবণতাকে কীভাবে দেখেন?

: অপরিহার্য মনে করি না। তবে গ্রামীণ আবহে প্রকাশনার সুযোগ সুবিধা কম, অন্য শহরের সঙ্গে যোগসূত্র রাখা দোষের কিছু নয়। জীবিকার ক্ষেত্রেও শহরের সুযোগ সুবিধা বেশি। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরকেন্দ্রিক, তাই শহরে যাওয়ার প্রবণতা সঙ্গত। যারা ভালো লেখেন তারাও শহরভিত্তিক চর্চাতেই নিবেদিত, সে কারণেও শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে মেনে নিতেই হয়। ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে গ্রামীণ জীবনে যদি সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার প্রসার ঘটানোর সুযোগ প্রসারিত হয় তবে শহরে চলে যাওয়ার প্রবণতা কমে যাবে।

পুরস্কার বা সংগঠন সাহিত্যের জন্য কী করতে পারে?

: প্রেরণার বিষয় ভাবলে পুরস্কার মন্দ নয়। কারণ সাধনার ফল হিসাবে পুরস্কার নতুন সৃজনের বোধ সৃষ্টি করে। দায়বদ্ধতা থেকে ভালো লেখার প্রত্যয় জাগে। সৃজনজগৎ সমৃদ্ধ হয়। তবে পুরস্কার অর্জন মানেই শ্রেষ্ঠত্ব এমনটা সব সময় ভাবার অবকাশ নেই। কারণ আজকাল লেখকের গুণগত মান যাচাই কতটা হয় তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে। যদি উপযুক্ত লেখককে নির্বাচন করে পুরস্কার প্রদান করা হয় তবে তা নিশ্চয়ই উপকারী।

সংগঠনগুলোতে যথাযথ পরিবেশ, সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক সুযোগ পেয়ে সাহিত্যকর্মে নিবেদিত হতে দেখা যায় অনেককেই। প্রতিযোগিতার মনোভাব জন্মে, তরুণরা জ্যেষ্ঠ লেখকদের উপদেশ পান, তাদের লেখা শোনার সুযোগ থাকে সংগঠনে। আবার নিজের লেখা পাঠ ও নির্দেশনামূলক আলোচনা শোনার সুযোগ মেলে সংগঠনে।

মনে করা হয়ে থাকে সাহিত্যের পাঠক কমে গেছে। এটা কী লেখকের দুর্বলতা না জ্ঞানার্জন ইচ্ছুক মানুষ তৈরিতে আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে?

: পাঠক সংখ্যা সত্যি কী কমেছে? এমন প্রশ্ন আমারও। এক সময় শিল্পের জন্য শিল্প ছিল সৃজনের বৈশিষ্ট্য কিন্তু সময়ের চাহিদায় এখন তো-‘মানুষের জন্য শিল্প।’ সাহিত্যে জীবনের নানা দিকের উপস্থাপন থাকে অন্য পাঠকরা নিজেদের জীবনকেই প্রত্যক্ষ করেন সাহিত্যে। তারপরও পাঠক সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত। আধুনিক কবিতার পাঠক সংখ্যা কম, এমন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা হয়েছে অনেক। পাল্টাপাল্টি দোষারোপ হয়েছে। আধুনিক কবিতা কঠিন, অনেকটা অবোধ্য, সে কারণে পাঠকরা আধুনিক কবিতা পাঠে উৎসাহ হারিয়েছেন। আবার উল্টো যুক্তিতে বলা হয়েছে- পাঠকদেরও বিস্তৃত করতে হবে জানার ও বোধের পরিধি।

প্রমথ চৌধুরী মানসম্মত লেখার ওপর গুরুত্ব প্রদান করে লিখেছেন-‘আমরা যদি পাঠকদের মানসম্মসত লেখা উপহার দিতে না পারি তবে ভবিষ্যতে আমাদের সাহিত্য কোন পথে যাবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই যাবে।’

মনোযোগী হতে হবে অনুবাদ বিষয়েও। জীবনবান্ধব, বৈচিত্র্যময় ও সুখপাঠ্য হলেই সাহিত্য পাঠককে অধিক আকর্ষণ করবে বলে মনে হয়।

রংপুরের সাহিত্যচর্চা অতীতের তুলনায় বেশি না কম সক্রিয়? এ সক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয়তার কারণ?

: রংপুরে অতীতের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়। বেড়েছে মানুষের সংখ্যা, লেখকের সংখ্যা, বৃদ্ধি পেয়েছে প্রকাশনার সুযোগ। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও বেগবান। তবে রংপুরের অতীত চর্চাও প্রশংসার দাবি রাখে। রংপুরের প্রচলিত কথা রং রসে ভরপুর-গরিয়সী রংপুর। রংপুরের লোকসাহিত্য বেশ সমৃদ্ধ।

আগে প্রায় প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্কুল ম্যাগাজিন বেরোত। এখন অনেক কমে গেছে, হয় না বললেই চলে। এ অবস্থা আমাদের শিল্প সাহিত্যে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে? এ থেকে উত্তরণের উপায়?

: সে প্রয়াস কমে গেছে অনেকটা। যা শিল্প-সাহিত্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। করাণ স্কুল ম্যাগাজি প্রকাশিত হলে শিক্ষার্থীরা কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ, নাটিকাসহ বিভিন্ন লেখায় আগ্রহী ও ব্রতী হতো। এতে বেশি বেশি জ্ঞানার্জনে মনোযোগী হতো তারা। দেশ, জাতি, ভাষা, স্বাধীনতা, জীবন, প্রকৃতি, অতীত, বর্তমান, ভবিষৎ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, দর্শন, বিজ্ঞান, ধর্ম, ইতিহাস-ঐতিহ্য নানা বিষয়ে চর্চার সুযোগ পেত। ছোট থেকেই সাহিত্য সৃজনে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগ পেলে তারাই খ্যাতিমান সাহিত্যিক বা লেখক হিসাবে প্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে পেত।

উত্তরণের জন্য দরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার আন্তরিক উদ্যোগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, ফরম পূরণে ম্যাগাজিনের জন্য অর্থ আদায় করা হলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে তা অন্য খাতে ব্যয়ের কথা শোনা যায়। তা যেন ম্যাগাজিন প্রকাশের কাজেই ব্যয় হয় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে তাগিদ দেওয়া, ম্যাগাজিন প্রকাশে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ প্রদান, প্রকাশ না করলে সে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা হলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আগের মতো স্কুল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে।

বর্তমান সাহিত্যে কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পাচ্ছে। কোন বিষয়গুলো বেশি প্রাধান্য পাওয়া উচিত?

: বর্তমান সময়ে জীবনের নানা বিষয়ই প্রাধান্য পাচ্ছে। জীবন, জীবিকা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, জীবনের চলমান জটিলতা, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, করোনায় মানবিক বিপর্যয় সবই সাহিত্যে দৃশ্যমান। জীবন জিজ্ঞাসা, সমাজে আস্থার যে সংকট, সংশয় তা নিয়েও লিখছেন অনেকে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আশা ভঙ্গের বেদনা প্রসঙ্গও বাদ যায়নি।

আমার মনে হয় যে বিষয়ে মানুষের মঙ্গল সাধিত হয়, সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়, ভবিষ্যৎ স্বস্তিময় হয় এমন বিষয় প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

আমাদের বর্তমান সাহিত্যে প্রকৃতি মানুষ জীবনের কতটা নিজস্ব সৌন্দর্যে বহমান, কতটা বিকৃতির শিকার? কী করণে হচ্ছে?

: বর্তমান সাহিত্যে প্রকৃতির শোভা, সৌন্দর্য যথাযথ তুলে ধরছেন লেখকরা। যাতে বাংলাদেশের যে রূপলাবণ্য তা প্রস্ফুট হচ্ছে। তবে দুর্যোগের ধ্বংসলীলায় বিধ্বস্ত প্রকৃতিও তুলে ধরেন সাহিত্যিকরা। এটাই বাস্তবতা। তবে কল্পনানির্ভরতায় ‘সিমেন্টের রাস্তায় গরু ঘাস খায়’-এমন চিত্র কতটা বাস্তব তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে, বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরতে প্রকৃতি ও জীবনকে বিকৃত করার বিষয়টিও ভিন্ন ভাবনার জন্ম দেয়। এ জন্য দরকার প্রকৃতির প্রকৃত রূপেরই চিত্রায়ণ।

প্রযুক্তির ব্যবহার সাহিত্যের জন্য কতটা ভালো, কতটা মন্দ?

: প্রযুক্তির আশ্রয় মন্দ কিছু নয়। ই-বুক, ই-পেপারসহ সৃজনশীল বহুকিছুই প্রযুক্তির অবদান। তাই প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েই অব্যাহত রাখতে হবে সৃজনশীলতা। শুধু লক্ষ রাখতে হবে, সচেতন থাকতে হবে যেন প্রযুক্তির অপব্যবহার না হয় বর্তমান রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কেমন? কেমন হওয়া উচিত?

: শাসক আর শাসিত-অতীতের মতো এমন ধারণা এখন নেই। দলগত আদর্শের বিভাজনে অনেক বিষয়ে সংশয় থাকলেও বাস্তবতা হলো বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পর্ক নিকটবর্র্তী। রাষ্ট্র যারা চালান তারা জনগণের দ্বারা ক্ষমতায়িত তাই তাদের জনগণের কল্যাণে কাজ করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন বঞ্চিত না হয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান, সংস্কৃতি, বিচারসহ সব বিষয়ে সমান অধিকার পায় সে বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এমন জনবান্ধব, অসাম্প্রদায়িক, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রই প্রত্যাশা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : প্রান্তছোঁয়া আকাশ

০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১