হেলাল হাফিজের বেদনাগুচ্ছ
jugantor
হেলাল হাফিজের বেদনাগুচ্ছ

  মোহাম্মদ আলী  

০৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ষাটের দশকের টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলা কবিতার ভুবনে বিজয়মিছিল নিয়ে সমবেত হলেন পরীক্ষানিরীক্ষা ও পরিমিতিবোধে বিজয়ী কবি হেলাল হাফিজ। ষাটের দশক থেকে অনাগত ভবিষ্যৎ বাদ দিলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাড়া জাগানো এই কবি ১৯৮৬ সালে যে জলে আগুন জ্বলে শিরোনামে নিজেকে মলাটবন্দি করার পরই কবিতার অঙ্গন থেকে বোধ হয় বেদনার এই রাজপুত্র ঈশ্বরী পাটুনির হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। পৈতৃক রক্তের দায়বদ্ধতা যার কবিতায়, তিনি তো ফিরবেনই। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পরে ফিরে এলেন এবং পিতৃদত্ত সেই রক্তের মহান দায়বদ্ধতার কথা পাঠককে স্মরণ করিয়ে পিতার পত্র উপস্থাপন করে অনুরাগী পাঠকদের বোঝালেন কবিতা এবং বেদনা যে তার উত্তরাধিকার-

রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।

(পিতার পত্র)

উদ্ধৃত কবিতাটি কবির পিতা খোরশেদ আলী তালুকদারের চিঠির অংশবিশেষ। নেত্রকোনার সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্কুলশিক্ষক পিতা নিজেও যে একজন কবি ছিলেন! সুতরাং যতই আড়ালে আবডালে থাকুন না কেন কবিতার কাছে যে তাকে ফিরতেই হবে। ফলে ২০১৮ সালের জন্মদিনে কথা দিয়েছিলেন যে বেঁচে থাকলে আরও একটি বই তিনি উপহার দিয়ে যাবেন। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না হচ্ছে সেই প্রতিশ্রুতির উপহার।

কবিতার রৌদ্রোজ্জ্বল উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন-‘আসবো বলেই আমি এতদিন কখনো আসিনি’। এটি কবির একটি কবিতার পঙ্ক্তি। কবি হেলাল হাফিজ আবার ফিরে এসেছেন। তবে তার পাঠকের রয়ে গেছে দীর্ঘ বিরতির এক দীর্ঘ আপসোস। এই দীর্ঘ বিরতির হতাশার কথা বহু আগে আমরা শুনি আহমদ ছফার মুখে। মারুফ রায়হানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফা স্বাধীন বাংলাদেশের কবিতায় শামসুর রাহমান ছাড়া শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখের পরে হেলাল হাফিজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। কিন্তু হেলাল হাফিজের পাঠকদের মতো তিনিও অনুযোগ তুলেন-

আর হেলাল হাফিজ নামক তরুণটির কবিতা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু সে তো লিখছে না (আহমদ ছফা রচনাবলি, উত্তরখণ্ড, সম্পাদক : নূরুল আনোয়ার, তৃতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, পৃ-৩৮৭)।

কবিতায় মানুষকে ভালোবাসার দিকে, মঙ্গলের দিকে, সুন্দরের দিকে আহ্বান করেছেন তিনি। মানুষ যদি একটু স্বচ্ছ হতে পারে, ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে ‘মানুষ’ হতে পারে, সেটাই কবির চাওয়া। আঘাত ও ভালোবাসা যুগপৎ মানুষের কাছ থেকেই এসেছে। তারপরও মানুষই তার আরাধ্য। মানুষই তার গন্তব্য-চিরকাল। ‘কবিসূত্র’ কবিতাটি আমরা একটু দেখে নিই এই ফাঁকে-

আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে

মানুষের কাছে এও তো আমার এক ধরনের ঋণ।

এমনই কপাল আমার

অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

বোহেমিয়ান হেলাল দীর্ঘ নিরীক্ষার ৩৪ বছর পরে আবারও পাঠকের সামনে এলেন ৩৪টি কবিতা নিয়ে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখে চলে গেলেন ডার্ক সাইটে। দীর্ঘ বিরতি নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সোনার বাংলায় এলেন ৫৬টি কবিতা নিয়ে। এবার দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিরতির অবসান ঘটিয়ে ৩৪টি মৌলিক অণুকবিতা নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অস্থির সময়ে বদলে যাওয়া কবিতা-পাঠকের সামনে এলেন তিনি। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না অণুকাব্যটি কবি হেলাল হাফিজের লেখা ৩৪টি কবিতা ও কবি-পিতা খোরশেদ আলী তালুকদারের লেখা কবিতাটিসহ ৩৫টি কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে। এ অণুকবিতাগুলো তিনি সামাজিক অন্তর্জালের প্রভাবে লিখেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানিয়েছেন।

ডিজিটাল অস্থির ব্যস্ত যুগের অনেক পাঠকের দীর্ঘ কবিতা পাঠের অভ্যাস ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অনেক পাঠকের হাতে অফুরন্ত সময়ও নেই বড় কবিতা পাঠ করে কাব্যক্ষুধা মেটানোর। এ ছাড়া বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের যুগোপযোগী চিন্তাভাবনাকে মাথায় রেখে কবি হেলাল হাফিজের এ অণুকবিতা লেখার প্রয়াস। তাই তো সামাজিক মায়াবী জালের ছায়াতলে বসে কবি এ অণুকবিতার রুচিবোধ তৈরির শৈল্পিক অভ্যাসটির সঙ্গে তার পাঠকের সংযোগ ঘটান বেশ সুকৌশলে। পরিবর্তন পরিবর্ধনের এই যান্ত্রিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে কবিতা-পাঠকের ধরনেরও যে পরিবর্তন আসবে তা দূরদর্শী কবি বহু আগে বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে প্রথম কাব্য যে জলে আগুন জ্বলে-তে বেশ কয়েকটি অণুকবিতা দিয়ে কবি তার কাব্যানুরাগী পাঠকদের প্রস্তুত করে তুলছিলেন।

এক্ষেত্রে আমরা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘অশ্লীল সভ্যতা’ কবিতাটির কথা বলতে পারি। দুই লাইনের কবিতা। ব্যঙ্গ আছে এই কবিতার শরীরে। বেদনা আছে কবিতার অন্তরে। সভ্যতার বামদিকের বিবৃতি আছে। মানুষ সভ্যতাকে অশ্লীল ও বিপজ্জনক করে তুলছে। যে অস্ত্র মানুষকে বাঁচাতে, তা আজ মানুষকে হত্যা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিউটনের বোমার প্রতি কবির তীব্র অনাস্থা-

নিউট্রন বোমা বোঝো/মানুষ বোঝো না?

ছোট্ট এ কবিতাটি মানুষের বিবেকের সদর দরজায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মানুষের চিন্তাসূত্রকে একটা শক্ত ধাক্কা দেয়। নিউটনের অস্ত্রের প্রতি অনাগ্রহী কবি মানবিক জাদুর এ অণুকবিতা দিয়ে মানবিক ও মনুষ্যত্বের, প্রেমের ও শিল্পের এক পৃথিবী প্রত্যাশা করেন। এ অল্পে যদি গল্পের এত ভেতরে প্রবেশ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে পারেন তা হলে বেশি বলার প্রয়োজন কী? দুই-তিন মলাটে অনুভূতির ভাব-বোধ বেঁধে ফেলার আধুনিকীকরণের নামই বেদনাকে বলেছি কেঁদো না। তাই তো অণুকবিতার কারাবাসে কবি তার কাব্যচর্চার দায়মুক্তি চাইলেন বিপুল পাঠকের কাছে।

অণুকবিতার সনাতন ধারাটি-যেমন লিমেরিক, রুবাই, ট্রিওলেট, কণিকা, তানকা, সায়েরি ইত্যাদি ছিল স্বল্পসংখ্যক পঙ্ক্তির নির্ধারিত ছকে গড়া এবং পদ্য-প্রকৃতির কবিতা। আর হাইকু, সিজো বা টুইটকু অমিল কবিতা হলেও নির্দিষ্টসংখ্যক অক্ষরের বন্ধন থেকে মুক্ত নয়। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎকে ধারণ এবং সূক্ষ্ম কিন্তু ধারালো বক্তব্য প্রকাশই এই অণুকবিতার উপজীব্য। বোধাতীত ও বোধগম্য-এই দ্বি-ধারার সম্মিলনে এ কবিতাজগতের চিন্তাচেতনা ও রহস্য ধারণ করে রাখে তার ক্ষুদ্র অবয়বে এবং পাঠককে নিয়ে যায় যে কোনো রহস্যের আবর্তে, যে কোনো ব্যাপ্ত অর্থের কাছে। প্রাজ্ঞতা ও দার্শনিক ভাবে এ কবিতা হয়ে থাকে।

পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার কবিরা অণুকবিতার চর্চা করেছেন কমবেশি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষণিকা কাব্যটিকে আমরা অণুকবিতার একটি উদাহরণ হিসাবে ধরে নিতে পারি। এ কাব্যের একটি অণুকবিতার উদাহরণ তুলে ধরা যাক-

কত বড়ো আমি কহে নকল হীরাটি,

তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।

হেলাল হাফিজ নিজেই একটা কবিতা। কবিতার সাধনায় তিনি তার দীর্ঘ জীবন ব্যয় করেছেন। বোহেমিয়ান এই কবি সঞ্চয় করেছেন মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা, বিশাল ভক্তকুলের প্রাণভরা শ্রদ্ধা। কবি বিত্তবৈভবের পেছনে হাঁটেননি, বিলাসী জীবন কাটাননি, আর দশজন মানুষের মতো সংসার গোছাননি, বরং গড়ে তুলেছেন অসংখ্য পাঠক ও ভক্ত। তার নন্দিত কাব্যসুধায় বেঁধেছেন মানুষকে আত্মিক বন্ধনে। আর তখনই তিনি নির্ভীক চিত্তে ‘সঞ্চয়’ কবিতায় বলে উঠতে পারেন-

সবাই জমায় টাকা,/আমি চাই মানুষ জমাতে।

মানুষকে যিনি জমান তিনিই তো থাকবেন তার পাঠকের মননে ও মগজে। বর্তমানে এক অস্থির টানাপোড়েনের যুগ চলছে। চারপাশে চোখ ও বিবেক মেলে তাকালে দেখা যাবে চরম অনৈতিকতা ও সামাজিক দুর্দশায় বর্তমান সমাজের মানুষ কলুষিত ও জর্জরিত। হতাশাগ্রস্ত, নষ্ট, ভ্রষ্ট এই কঠিন হৃদয়হীন সমাজের প্রতিবন্ধকতার বিপরীতে কবি হেলাল হাফিজ রাখালের বাঁশি নিয়ে ভালোবাসার আহ্বানে দাঁড়িয়ে যেতে চাইলেন এবং নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানালেন মনুষ্য গোত্রের প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দিতে-

কে আছেন?/দয়া করে আকাশকে একটু বলেন-

সে সামান্য উপরে উঠুক,/আমি দাঁড়াতে পারছি না।

কবির চাওয়া তরুণসমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভ্রান্ত এই ক্রান্তিকালের বিভেদ ভুলে কবিতার মানবিক ও শৈল্পিক আলোতে আলোকিত হবে, ভালোবাসবে স্বদেশকে, মানুষকে ও নিজেকে। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না কাব্যটির মাধ্যমে কবি অমানবিক সমাজের বিপক্ষে ভালোবাসার গান গেয়েছেন মনুষ্যত্বকে বিকশিত করার লক্ষ্যে।

তার চিন্তার জগৎ আর প্রেমানুভূতির ভুবনটিও বরাবরই ব্যতিক্রম। এ কবিতায় আছে অপ্রাপ্তির বেদনা কিন্তু নেই কোনো অভিযোগ। মাঝে মাঝে তিনি বড়ই Wistful, ইংরেজিতে Longing বলতে যা সেটি সাংঘাতিকভাবে তার ভাবকল্পে উৎকীর্ণ। ভাবকল্প আর আবেগ প্রকাশে কোনো কোনো কবিতায় কবি যেন বিদ্রোহ করেছেন; আবার সূক্ষ্মভাবে ব্যঙ্গও যেন করেছেন তার নিষ্ফল কামনাবাসনার অপূর্ণতার। ‘ভালোবাসার খালা’ কবিতাটি তেমনই অনন্য নিদর্শন। এটি আপাতদৃষ্টিতে Irreverent মনে হলেও আসলে বেশ মৌলিক একটি কবিতা। প্রেমের সুনিপুণ কারু ও চারুশিল্পী হেলাল তিমিরের সারাবেলা শুধুই নান্দনিক প্রেম ও প্রতিমার পূজাই করে গেলেন কিন্তু প্রেমের সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞীরা বারবার ছেড়ে গেছেন। পৌরুষের প্রেমে যাদের বাজাতে চেয়েছিলেন, গভীর অনুরাগে সেখানে চিরদিনই বেদনা সুর তুলেছে। বেদনার সেই গর্ভে জন্ম নিয়েছে ভীষণ লাজ-

এতো ভালোবাসা পেয়ে/ভেতরে ভীষণ লাজে

বেদনারা লাল হয়ে গেছে

এ উথালপাথাল হৃদয় নিয়ে প্রণয়জলের আগুনে পুড়ে তো সারা জীবন কোমল ও কমল হলেন। এ পোড়াদাগ মোছা যায় না, মুছতেও তিনি চাইবেন কেন; এ বিষের তাবিজ যে তিনি গলায় পরে বুকের সীমান্ত বন্ধ করে আক্ষেপের মাউথ অর্গান বাজালেন। ‘তাবিজ’ কবিতার সুরে সেই মধুর বিষের সুষমা মিলে-

এ কেমন তাবিজ করেছো সোনা,/ব্যথা তো কমে না

বিষ নামে না, নামে না।

হেলাল হাফিজের বেদনাগুচ্ছ

 মোহাম্মদ আলী 
০৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ষাটের দশকের টালমাটাল পরিস্থিতিতে বাংলা কবিতার ভুবনে বিজয়মিছিল নিয়ে সমবেত হলেন পরীক্ষানিরীক্ষা ও পরিমিতিবোধে বিজয়ী কবি হেলাল হাফিজ। ষাটের দশক থেকে অনাগত ভবিষ্যৎ বাদ দিলে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সাড়া জাগানো এই কবি ১৯৮৬ সালে যে জলে আগুন জ্বলে শিরোনামে নিজেকে মলাটবন্দি করার পরই কবিতার অঙ্গন থেকে বোধ হয় বেদনার এই রাজপুত্র ঈশ্বরী পাটুনির হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। পৈতৃক রক্তের দায়বদ্ধতা যার কবিতায়, তিনি তো ফিরবেনই। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর পরে ফিরে এলেন এবং পিতৃদত্ত সেই রক্তের মহান দায়বদ্ধতার কথা পাঠককে স্মরণ করিয়ে পিতার পত্র উপস্থাপন করে অনুরাগী পাঠকদের বোঝালেন কবিতা এবং বেদনা যে তার উত্তরাধিকার-

রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।

(পিতার পত্র)

উদ্ধৃত কবিতাটি কবির পিতা খোরশেদ আলী তালুকদারের চিঠির অংশবিশেষ। নেত্রকোনার সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্কুলশিক্ষক পিতা নিজেও যে একজন কবি ছিলেন! সুতরাং যতই আড়ালে আবডালে থাকুন না কেন কবিতার কাছে যে তাকে ফিরতেই হবে। ফলে ২০১৮ সালের জন্মদিনে কথা দিয়েছিলেন যে বেঁচে থাকলে আরও একটি বই তিনি উপহার দিয়ে যাবেন। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না হচ্ছে সেই প্রতিশ্রুতির উপহার।

কবিতার রৌদ্রোজ্জ্বল উঠোনে দাঁড়িয়ে বললেন-‘আসবো বলেই আমি এতদিন কখনো আসিনি’। এটি কবির একটি কবিতার পঙ্ক্তি। কবি হেলাল হাফিজ আবার ফিরে এসেছেন। তবে তার পাঠকের রয়ে গেছে দীর্ঘ বিরতির এক দীর্ঘ আপসোস। এই দীর্ঘ বিরতির হতাশার কথা বহু আগে আমরা শুনি আহমদ ছফার মুখে। মারুফ রায়হানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফা স্বাধীন বাংলাদেশের কবিতায় শামসুর রাহমান ছাড়া শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখের পরে হেলাল হাফিজকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। কিন্তু হেলাল হাফিজের পাঠকদের মতো তিনিও অনুযোগ তুলেন-

আর হেলাল হাফিজ নামক তরুণটির কবিতা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কিন্তু সে তো লিখছে না (আহমদ ছফা রচনাবলি, উত্তরখণ্ড, সম্পাদক : নূরুল আনোয়ার, তৃতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, পৃ-৩৮৭)।

কবিতায় মানুষকে ভালোবাসার দিকে, মঙ্গলের দিকে, সুন্দরের দিকে আহ্বান করেছেন তিনি। মানুষ যদি একটু স্বচ্ছ হতে পারে, ভালোবাসার মায়ায় জড়িয়ে ‘মানুষ’ হতে পারে, সেটাই কবির চাওয়া। আঘাত ও ভালোবাসা যুগপৎ মানুষের কাছ থেকেই এসেছে। তারপরও মানুষই তার আরাধ্য। মানুষই তার গন্তব্য-চিরকাল। ‘কবিসূত্র’ কবিতাটি আমরা একটু দেখে নিই এই ফাঁকে-

আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে

মানুষের কাছে এও তো আমার এক ধরনের ঋণ।

এমনই কপাল আমার

অপরিশোধ্য এই ঋণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।

বোহেমিয়ান হেলাল দীর্ঘ নিরীক্ষার ৩৪ বছর পরে আবারও পাঠকের সামনে এলেন ৩৪টি কবিতা নিয়ে। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লিখে চলে গেলেন ডার্ক সাইটে। দীর্ঘ বিরতি নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সোনার বাংলায় এলেন ৫৬টি কবিতা নিয়ে। এবার দীর্ঘ ৩৪ বছরের বিরতির অবসান ঘটিয়ে ৩৪টি মৌলিক অণুকবিতা নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর অস্থির সময়ে বদলে যাওয়া কবিতা-পাঠকের সামনে এলেন তিনি। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না অণুকাব্যটি কবি হেলাল হাফিজের লেখা ৩৪টি কবিতা ও কবি-পিতা খোরশেদ আলী তালুকদারের লেখা কবিতাটিসহ ৩৫টি কবিতা নিয়ে সাজানো হয়েছে। এ অণুকবিতাগুলো তিনি সামাজিক অন্তর্জালের প্রভাবে লিখেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানিয়েছেন।

ডিজিটাল অস্থির ব্যস্ত যুগের অনেক পাঠকের দীর্ঘ কবিতা পাঠের অভ্যাস ক্রমশ কমে যাচ্ছে। অনেক পাঠকের হাতে অফুরন্ত সময়ও নেই বড় কবিতা পাঠ করে কাব্যক্ষুধা মেটানোর। এ ছাড়া বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের যুগোপযোগী চিন্তাভাবনাকে মাথায় রেখে কবি হেলাল হাফিজের এ অণুকবিতা লেখার প্রয়াস। তাই তো সামাজিক মায়াবী জালের ছায়াতলে বসে কবি এ অণুকবিতার রুচিবোধ তৈরির শৈল্পিক অভ্যাসটির সঙ্গে তার পাঠকের সংযোগ ঘটান বেশ সুকৌশলে। পরিবর্তন পরিবর্ধনের এই যান্ত্রিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজে কবিতা-পাঠকের ধরনেরও যে পরিবর্তন আসবে তা দূরদর্শী কবি বহু আগে বুঝতে পেরেছিলেন। ফলে প্রথম কাব্য যে জলে আগুন জ্বলে-তে বেশ কয়েকটি অণুকবিতা দিয়ে কবি তার কাব্যানুরাগী পাঠকদের প্রস্তুত করে তুলছিলেন।

এক্ষেত্রে আমরা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘অশ্লীল সভ্যতা’ কবিতাটির কথা বলতে পারি। দুই লাইনের কবিতা। ব্যঙ্গ আছে এই কবিতার শরীরে। বেদনা আছে কবিতার অন্তরে। সভ্যতার বামদিকের বিবৃতি আছে। মানুষ সভ্যতাকে অশ্লীল ও বিপজ্জনক করে তুলছে। যে অস্ত্র মানুষকে বাঁচাতে, তা আজ মানুষকে হত্যা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিউটনের বোমার প্রতি কবির তীব্র অনাস্থা-

নিউট্রন বোমা বোঝো/মানুষ বোঝো না?

ছোট্ট এ কবিতাটি মানুষের বিবেকের সদর দরজায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মানুষের চিন্তাসূত্রকে একটা শক্ত ধাক্কা দেয়। নিউটনের অস্ত্রের প্রতি অনাগ্রহী কবি মানবিক জাদুর এ অণুকবিতা দিয়ে মানবিক ও মনুষ্যত্বের, প্রেমের ও শিল্পের এক পৃথিবী প্রত্যাশা করেন। এ অল্পে যদি গল্পের এত ভেতরে প্রবেশ করার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিতে পারেন তা হলে বেশি বলার প্রয়োজন কী? দুই-তিন মলাটে অনুভূতির ভাব-বোধ বেঁধে ফেলার আধুনিকীকরণের নামই বেদনাকে বলেছি কেঁদো না। তাই তো অণুকবিতার কারাবাসে কবি তার কাব্যচর্চার দায়মুক্তি চাইলেন বিপুল পাঠকের কাছে।

অণুকবিতার সনাতন ধারাটি-যেমন লিমেরিক, রুবাই, ট্রিওলেট, কণিকা, তানকা, সায়েরি ইত্যাদি ছিল স্বল্পসংখ্যক পঙ্ক্তির নির্ধারিত ছকে গড়া এবং পদ্য-প্রকৃতির কবিতা। আর হাইকু, সিজো বা টুইটকু অমিল কবিতা হলেও নির্দিষ্টসংখ্যক অক্ষরের বন্ধন থেকে মুক্ত নয়। ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎকে ধারণ এবং সূক্ষ্ম কিন্তু ধারালো বক্তব্য প্রকাশই এই অণুকবিতার উপজীব্য। বোধাতীত ও বোধগম্য-এই দ্বি-ধারার সম্মিলনে এ কবিতাজগতের চিন্তাচেতনা ও রহস্য ধারণ করে রাখে তার ক্ষুদ্র অবয়বে এবং পাঠককে নিয়ে যায় যে কোনো রহস্যের আবর্তে, যে কোনো ব্যাপ্ত অর্থের কাছে। প্রাজ্ঞতা ও দার্শনিক ভাবে এ কবিতা হয়ে থাকে।

পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার কবিরা অণুকবিতার চর্চা করেছেন কমবেশি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্ষণিকা কাব্যটিকে আমরা অণুকবিতার একটি উদাহরণ হিসাবে ধরে নিতে পারি। এ কাব্যের একটি অণুকবিতার উদাহরণ তুলে ধরা যাক-

কত বড়ো আমি কহে নকল হীরাটি,

তাই তো সন্দেহ করি নহ ঠিক খাঁটি।

হেলাল হাফিজ নিজেই একটা কবিতা। কবিতার সাধনায় তিনি তার দীর্ঘ জীবন ব্যয় করেছেন। বোহেমিয়ান এই কবি সঞ্চয় করেছেন মানুষের অপরিসীম ভালোবাসা, বিশাল ভক্তকুলের প্রাণভরা শ্রদ্ধা। কবি বিত্তবৈভবের পেছনে হাঁটেননি, বিলাসী জীবন কাটাননি, আর দশজন মানুষের মতো সংসার গোছাননি, বরং গড়ে তুলেছেন অসংখ্য পাঠক ও ভক্ত। তার নন্দিত কাব্যসুধায় বেঁধেছেন মানুষকে আত্মিক বন্ধনে। আর তখনই তিনি নির্ভীক চিত্তে ‘সঞ্চয়’ কবিতায় বলে উঠতে পারেন-

সবাই জমায় টাকা,/আমি চাই মানুষ জমাতে।

মানুষকে যিনি জমান তিনিই তো থাকবেন তার পাঠকের মননে ও মগজে। বর্তমানে এক অস্থির টানাপোড়েনের যুগ চলছে। চারপাশে চোখ ও বিবেক মেলে তাকালে দেখা যাবে চরম অনৈতিকতা ও সামাজিক দুর্দশায় বর্তমান সমাজের মানুষ কলুষিত ও জর্জরিত। হতাশাগ্রস্ত, নষ্ট, ভ্রষ্ট এই কঠিন হৃদয়হীন সমাজের প্রতিবন্ধকতার বিপরীতে কবি হেলাল হাফিজ রাখালের বাঁশি নিয়ে ভালোবাসার আহ্বানে দাঁড়িয়ে যেতে চাইলেন এবং নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানালেন মনুষ্য গোত্রের প্রয়োজনে হাত বাড়িয়ে দিতে-

কে আছেন?/দয়া করে আকাশকে একটু বলেন-

সে সামান্য উপরে উঠুক,/আমি দাঁড়াতে পারছি না।

কবির চাওয়া তরুণসমাজ অন্ধকারাচ্ছন্ন বিভ্রান্ত এই ক্রান্তিকালের বিভেদ ভুলে কবিতার মানবিক ও শৈল্পিক আলোতে আলোকিত হবে, ভালোবাসবে স্বদেশকে, মানুষকে ও নিজেকে। বেদনাকে বলেছি কেঁদো না কাব্যটির মাধ্যমে কবি অমানবিক সমাজের বিপক্ষে ভালোবাসার গান গেয়েছেন মনুষ্যত্বকে বিকশিত করার লক্ষ্যে।

তার চিন্তার জগৎ আর প্রেমানুভূতির ভুবনটিও বরাবরই ব্যতিক্রম। এ কবিতায় আছে অপ্রাপ্তির বেদনা কিন্তু নেই কোনো অভিযোগ। মাঝে মাঝে তিনি বড়ই Wistful, ইংরেজিতে Longing বলতে যা সেটি সাংঘাতিকভাবে তার ভাবকল্পে উৎকীর্ণ। ভাবকল্প আর আবেগ প্রকাশে কোনো কোনো কবিতায় কবি যেন বিদ্রোহ করেছেন; আবার সূক্ষ্মভাবে ব্যঙ্গও যেন করেছেন তার নিষ্ফল কামনাবাসনার অপূর্ণতার। ‘ভালোবাসার খালা’ কবিতাটি তেমনই অনন্য নিদর্শন। এটি আপাতদৃষ্টিতে Irreverent মনে হলেও আসলে বেশ মৌলিক একটি কবিতা। প্রেমের সুনিপুণ কারু ও চারুশিল্পী হেলাল তিমিরের সারাবেলা শুধুই নান্দনিক প্রেম ও প্রতিমার পূজাই করে গেলেন কিন্তু প্রেমের সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞীরা বারবার ছেড়ে গেছেন। পৌরুষের প্রেমে যাদের বাজাতে চেয়েছিলেন, গভীর অনুরাগে সেখানে চিরদিনই বেদনা সুর তুলেছে। বেদনার সেই গর্ভে জন্ম নিয়েছে ভীষণ লাজ-

এতো ভালোবাসা পেয়ে/ভেতরে ভীষণ লাজে

বেদনারা লাল হয়ে গেছে

এ উথালপাথাল হৃদয় নিয়ে প্রণয়জলের আগুনে পুড়ে তো সারা জীবন কোমল ও কমল হলেন। এ পোড়াদাগ মোছা যায় না, মুছতেও তিনি চাইবেন কেন; এ বিষের তাবিজ যে তিনি গলায় পরে বুকের সীমান্ত বন্ধ করে আক্ষেপের মাউথ অর্গান বাজালেন। ‘তাবিজ’ কবিতার সুরে সেই মধুর বিষের সুষমা মিলে-

এ কেমন তাবিজ করেছো সোনা,/ব্যথা তো কমে না

বিষ নামে না, নামে না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন