রেস
jugantor
রেস

  আনোয়ার সেলিম  

০৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

[সময়কাল : ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ থেকে শুরু]

সেদিন ফাল্গুন মাসের কোনো এক সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বিকাল আনুমানিক পাঁচটা।

হঠাৎ আমার মোবাইলে অচেনা নাম্বারে রং ফোন। রিসিভ করলাম ইতস্তত করে। ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর একটা মেয়ে কণ্ঠ। অচেনা। কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই জানতে চাইল-

আচ্ছা, আপনার কি গাড়ি আছে?

বললাম-আছে।

অচেনা একটা মেয়ের হঠাৎ উটকো প্রশ্নে আমার মধ্যে কেন জানি কোনো ভাবান্তর হলো না। খুব স্বাভাবিকভাবে কথোপকথন চালিয়ে গেলাম। যেন খুব চেনা কারও সঙ্গে কথা বলছি-

-আপনি কি নিজে ড্রাইভ করেন?

হুম।

কি গাড়ি আপনার?

-হোন্ডা ফিট

-মেক?

-২০০৪

-কী কালার?

-স্কাই ব্লু।

-আমার টয়োটা আইএসটি। এটারও মেক ২০০৪। সিলভার এ্যাশ।

-বাসা কোথায় আপনার?

-ধানমণ্ডি ছয়।

-কাজ আছে কিছু এখন?

-না।

-এক কাজ করেন

-কী?

-মানিক মিয়া এভিনিউ টিএন্ডটি অফিসের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে আসেন। কতক্ষণ লাগবে?

-বিশ মিনিট।

-আমার বাসা ইন্দিরা রোড। আমার লাগবে পাঁচ মিনিট। আমি ওখানে অপেক্ষা করব। আপনি আমার গাড়ির ঠিক পেছনে এসে থামবেন।

-আচ্ছা।

ঠিক বিশ মিনিটের মধ্যে এসে থামলাম টয়োটা গাড়িটার পেছনে।

সম্ভবত রিয়ার-ভিউ মিররে দেখছিল। থামতে না থামতে ফোন এলো।

আমরা এখন একটা রেস দেব। এয়ারপোর্টের গোল চত্বর পর্যন্ত। আপনি সামনে যান। রেস শুরু করেন।

আমি এগিয়ে গেলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাকে পাশ কাটিয়ে তীব্র বেগে তার গাড়িটা সামনে চলে গেল। বিজয় সরণির সিগন্যালে দুজনকেই থামতে হলো। আমি আগে সে পিছে। আমরা কেউ কারও চেহারা দেখছি না। এরপর আর কোনো সিগন্যালে দাঁড়াতে হয়নি। হুস করে আমার পাশ দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে মুহূর্তে উধাও! আমি রণেভঙ্গ দিলাম। কী দরকার বাবা! কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম কে জানে। শেষে না আবার জীবনটাই খোয়াতে হয়।

আমি এয়ারপোর্ট গোল চত্বরে ইউ-টার্ন নিচ্ছি। তখন ফোন এলো।

কোথায় আপনি?

-ফিনিশিং লাইন ক্রস করছি।

-ভালো ড্রাইভার তো! এ-ই গাড়ি চালান! আমি সেই কখন ফিনিশিং লাইন ক্রস করলাম! আমি রেডিসন হোটেলের সামনে পার্কিংয়ে অপেক্ষা করছি। সোজা চলে আসেন। পাশের পার্কিংটা খালি আছে।

১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি পার্ক করে নেমে দাঁড়ালাম।

নিজের গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে ত্রিভঙ দাঁড়ানো মেয়েটা। পরনে সুতি বহু-রং সালোয়ার কামিজ। লম্বায় মাঝারি। শ্যামল মসৃণ ত্বক। পাতলা অথচ শারীরিক গড়নে নিখুঁত সুন্দরী একটা মেয়ে। বয়স বড় জোর ছাব্বিশ-সাতাশ। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। সম্ভ্রান্ত রুচিশীল মার্জিত অবয়ব। চেহারা হালকা ঊর্ধ্বমুখ- যেন আকাশ দেখছে। আর আমার অস্তিত্বের পুরোটা-ই যেন দেখছে সরাসরি না তাকিয়ে। জায়গাটা বেশ নির্জন। বলল-‘রেসে তো হেরে গেলেন’। বললাম-‘হুম’।

বলল-আমার সঙ্গে আসুন। আমি হাঁটছি পাশাপাশি খুব কাছাকাছি হাতে হাত ধরে হাঁটার দূরত্বে। সে অতি সামান্য এগিয়ে যেন আমি তাকে অনুসরণ করছি।

হোটেলের লবী পেরিয়ে পুল সাইডে এসে থামল। হোটেলের পুল-সাইডটা বেশ প্রশস্ত। শান বাঁধানো চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করা। বাহারি লতানো ফুলের গাছ সীমানা দেওয়াল ঘেঁষে। পেভমেন্টে পরিপাটি সাজানো বনসাই। পুল-সাইড ক্যাফের জন্য বেতের চেয়ার টেবিল সাজানো খোলা আকাশের নিচে। এই প্রথম আমরা মুখামুখি দাঁড়িয়ে। গোধূলির শেষ সিঁদুর মায়া-রং আছড়ে পড়ছে তার মুখে। অপরূপ সুন্দর। এই প্রথম চোখাচোখি। আশপাশটা নির্জন। কেবল দূরে ইতস্তত কয়েকজন গার্ড। আর ধোপ-দুরস্ত পোশাকের দু-একজন ওয়েটার।

আমাকে বলল-জুতা জোড়া খুলবেন একটু? প্যান্টের পায়াও গুটিয়ে নিতে হবে।

এই প্রথম বিস্মিত বিব্রত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কেন?

‘পানিতে পা ভেজাব’ বলেই নিজের স্যান্ডেল জোড়া খুলে সালোয়ারের নিচটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে পুলের ধারে বসে পানিতে পা-জোড়া নামিয়ে দিল। পা দোলাতে দোলাতে গুনগুন করে কি যেন একটা গান গাইছে মেয়েটা। আমি বললাম-এভাবে পুলে পা নামিয়ে বসা কি ঠিক হচ্ছে! হোটেলের লোকজন বাধা দেবে না? বলল-না। এখানে সবাই আমাকে চেনে। আপনি না হয় আসন করে আমার পাশেই বসুন। আমি তা-ই করলাম। বেশ ইতস্তত সংকোচ নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সংকোচ কেটে গেল। মেয়েটা এত্তো স্বাভাবিক আর কেউ কিছু বলছে না দেখে। বুঝলাম এখানে তার রীতিমতো যাতায়াত আছে।

মেয়েটা গান গাইতে গাইতে পানিতে পা দুলিয়ে চলছে। আমরা পুবের দিকে মুখ করে আছি। পেছনে সূর্যের লাল আভা মিলিয়ে আসছে। সামনে বিশাল রুপালি-থালা চাঁদ গাছের আড়াল থেকে জেগে উঠছে ধীরে। আজ পূর্ণিমা। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা বলল-খুব সুন্দর না চাঁদটা? তারপর আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল-বহুদিন পর পূর্ণিমা দেখছি। আমার খুউব ভালো লাগছে। পুল আর লনের রঙিন বাতিগুলো জ্বলে উঠছে। রং আর আলো-আঁধারি মিলে মিশে সে এক মোহময় স্বপ্নিল পরিবেশ। আজ দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। বাতাসে হীমের আমেজ। প্রায় আধাঘণ্টা ওখানে বসে। কথা হয়েছে শুধু গান আর প্রকৃতি নিয়ে। কখনো গলা মিলিয়ে ‘তোমার হাওয়া হাওয়ায়.. ফাগুন হাওয়া হাওয়ায়...’।

এবার উঠা যাক। আমি আপনাকে কফি খাওয়াব।

আমরা উঠে লনের চেয়ারে বসলাম মুখোমুখি। এসপ্রেসো কফি আর ব্রাউনি অর্ডার করা হয়েছে।

মেয়েটার হাসি অসাধারণ। দাঁত উঁচা-নিচা মেয়েগুলা যখন হাসে তখন তাদের চোখ মুখের সঙ্গে যেন ভুবন হাসতে থাকে। মেয়েটা তেমন করে হাসছে সারাক্ষণ। তবে সামনাসামনি এখন দেখছি। আমার সামনে বসা দ্যুতি স্নিগ্ধ সুন্দর! কথা হচ্ছে শুধু গান কবিতা আর প্রকৃতি নিয়ে। ‘আমি কান পেতে রই...’

সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। বলল-এবার উঠতে হবে। আপনার ফোন নাম্বার আমার কাছে থাকল। রাতে কথা হবে। আবার রেস দেব। শুরুর জায়গাটায় রেস শেষ হবে।

ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে কিছু একটা লিখে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-আমার ফেসবুক আইডি। একটা অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেবেন।

শুরুর জায়গায় এসে থামলাম আমরা দুজন। যথারীতি সে আগে। আমি মিনিট দুই পরে।

ফোনে বলল-গুড বাই! থ্যাংকস ফর গিভিং মি আ ওযান্ডারফুল ইভিনিং।

এরপর মুহূর্তে উধাও! আমিও ফিরছি অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে। আমার গাড়ির ডেকে বেজে চলছে... ‘আমি কান পেতে রই...’

রাত সাড়ে ১০টা। কল এলো মেয়েটার।

‘আচ্ছা! আজকের ঘটনায় আপনি অবাক হননি’?

আমি বললাম-না। আমি সহজে অবাক হই না। আমরা সবাই সারাক্ষণই সব অবাক কাণ্ড করছি। সে সব দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাই বলে অবাক হই না। এই যে মানুষ জীব প্রকৃতি জড়-জগৎ বিশ্ব মহাবিশ্ব সবই কি অবাক বিষয় নয়!

এই রে সেরেছে! আপনি তো দেখি সে-ই রকম! দারুণ একজন মানুষ! আমাকে চিনতেন? সাহসও দেখি খুব!

কশ্চিনকালেও না। সাহস তো আপনার! আর আমাকে রোমাঞ্চকর রহস্যময়তা ভীষণ টানে।

আমার সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন না যে!

আমি জানতাম তার দরকার নেই। আমার অনাগ্রহ দেখে আপনি নিজেই জানানোর জন্য অস্থির হবেন।

আপনি ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট। আচ্ছা আপনি কি ভাবছেন আমি আপনাকে চিনতাম?

না। চিনতেন না।

তারপরও কৌতূহল দমাতে পারলেন?

ঐ যে বললাম!

গাড়িটা আমার নিজের উপার্জন দিয়ে কেনা। অল্প লোন আছে যদিও। সে জন্য এটা আমার ভীষণ প্রিয়। আমার স্বাধীনতাও বলতে পারেন। আচ্ছা আমার বয়স কত বলতে পারেন?

বড়জোর ছাব্বিশ কি সাতাশ।

আপনার অনুমান ভালো। ছাব্বিশ প্লাস। আপনার বয়স অনুমান করব?

না থাক। অনুমান করে নিজের কাছে রেখে দিন

না। বলেই ফেলি ত্রিশ-একত্রিশ?

ঠিক আছে ওই প্রসঙ্গ বাদ। আমাকে অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন?

না। একটু পর কথা শেষ হলে পাঠাব। একটা শর্ত আছে-একসেপ্ট করে যা খুশি দেখে নেবেন। চব্বিশঘণ্টা পর ডিলিট করে দেব

হিহিহি করে হেসে বলল-কেন? ঘরে বউ আছে? বলতে হবে না। ওকে। ডান (done)।

এটা সত্যি যে আপনাকে ব্যাপারটা জানাতে ইচ্ছা করছে। বলেই ফেলি। শুনুন...

আমার বিয়ের মাত্র চার মাস হলো। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সেও বাসে। কিন্তু তার একটা-ই সমস্যা। আমার গাড়ি চালানো-বিশেষ করে রেকলেস ড্রাইভিং তার খুব অপছন্দ। ছোটবেলা থেকে গাড়ি নিয়ে আমার সিরিয়াস অবসেশন। আমার জন্য কেনা খেলনা পুতুল সরিয়ে রেখে ছোট ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে খেলতে চাইতাম। এ নিয়ে আমাদের ঝগড়া লাগত। সে বলত আমি কি তোমার পুতুল নিয়ে খেলি যে তুমি আমার গাড়ি নিয়ে খেলবা! আমার খুব রাগ হতো। এটা কেমন নিয়ম ছেলেরা খেলবে গাড়ি নিয়ে আর মেয়েদের খেলনা-পুতুল। তখনই স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে আমি নিজে কাজ করে টাকা জমিয়ে একটা আসল গাড়ি কিনব। এটা এক রকম জেদ-ই বলতে পারেন। টিভিতে কার রেস দেখতাম খুব। কি এক্সাইটিং! জন্ম থেকেই বাবার নিজস্ব গাড়িতে চড়ে আসছি; কিন্তু সেটা চালানোর ইচ্ছা জানানোর দুঃসাহস হতো না। আমার চাই নিজের গাড়ি। পড়াশোনায় আমার তেমন মন ছিল না। মা বাবার ইচ্ছামতো ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে পাসকোর্সে বিএ পাস করে মাত্র বাইশ বছর বয়েসে একটা লিজিং কোম্পানির চাকরিতে ঢুকলাম। চার বছরের মধ্যেই ম্যানেজার হয়ে গেলাম। ম্যানেজমেন্ট আমার পারফরমেন্সে ভীষণ খুশি। এটা কোম্পানির রেকর্ড। আমার চাকরির জমানো টাকা আর কমিশন থেকেই গাড়িটা কেনা। এটা আমার সন্তানের মতো।

জয় আমার হাজব্যান্ড। আমার কোনো কিছু নিয়েই তার সমস্যা নেই। যত রিজার্ভেশন আমার এই গাড়ি! গত পরশু তার সঙ্গে গাড়ি নিয়ে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে এসেছি। দু’দিন হয়ে গেল। ভাবলাম সব রাগ ভুলে আমাকে নিতে চলে আসবে। এলো তো না-ই; বদ-টা একটা ফোন-কল পর্যন্ত করেনি। দু’দিন ধরে আমার মন খারাপের পারদ তুঙ্গে উঠেছে।

আজ বিকালে বড় বেশি অস্থির লাগছিল। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ফোনটা হাতে নিয়ে উল্টা-পাল্টা নাম্বারে কল করে মানুষদের জ্বালাতন করার একটা পাগলামো মাথায় ঢুকল। অপর পাশে কে ফোন ধরবে ঠেলাওয়ালা না মুদি দোকানি, টেইলার না কোচিং সেন্টার, বাচ্চা না বুড়া, ছেলে না মেয়ে, ছাগলনাইয়া না ভেড়ামারা এসব কিচ্ছু ভাবিনি। কোন টাইপের মানুষ ফোন রিসিভ করলে কি বলব তা-ও ভাবিনি। আপনি ফোনটা রিসিভ করার পর ডায়াল করা নাম্বার দেখে নিলাম। এ সিরিজের নাম্বার পোস্ট-পেইড। পুরোনো এবং সাধারণভাবে করপোরেট লোকজন ব্যবহার করে। আপনার কণ্ঠ এবং উচ্চারণ শুনে হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় কোত্থেকে যেন গাড়ি আর রেসের ব্যাপারটা চলে এলো! কিন্তু কী অবাক ব্যাপার! আমার পাগলামির সঙ্গে সব এভাবে ঠিকঠাক মিলে গেল! এক নিমিষে কথাগুলো বলে গেল মেয়েটা।

ফোন রেখে ফেসবুক নিয়ে বসলাম। তার দেওয়া আইডিতে রিকোয়েস্ট পাঠাতেই সঙ্গে সঙ্গে একসেপ্ট। বেশকিছু জমকালো বিয়ের ছবি। জুগল ছবিতে দেখলাম তার হাজব্যান্ড-দারুন সুদর্শন। দু’জনকে চমৎকার মানিয়েছে। আগের কথামতো চব্বিশ ঘণ্টা পর তাকে আনফ্রেন্ড করে দিলাম। মেয়েটার নাম নিশাত।

প্রায় আট-নয় মাস পর আরেক বিকালে হঠাৎ নিশাতের ফোন। বলল-সৌরভ, দেখছেন? আজকের বিকালটা কী অদ্ভুত সুন্দর! আমি ঘরে বন্দি। এখন মাত্র বাসার ছাদে এলাম। ইচ্ছা করছে সেদিনের মতো আবার আপনার সঙ্গে রেস দেই। যদিও সেটা হয়তো সেদিনের মতো ততো এক্সাইটিং হতো না। কিন্তু আমার ইচ্ছাটাও এখন অসাধ্য। আই অ্যাম এক্সপেক্টিং। অ্যাডভান্সড স্টেজে।

সেদিনের ফোনালাপের পর আরও সাত-আট মাস পার হয়েছে। আজ একটা শপিং সেন্টারে হঠাৎ মুখামুখি দেখা। সঙ্গে হাজব্যান্ডের কোলে প্রায় ছ’মাসের ফুটফুটে দেবশিশুর মতো ছেলে। নিশাত উচ্ছলভাবে প্রায় চিৎকার করে উঠল-‘সৌ-র-ভ’! আসো পরিচয় করিয়ে দেই। আমার হাজব্যান্ড ‘জয়’। আমার জানের টুকরা ‘দীপ’। আর ইনি হচ্ছেন ‘সৌরভ’-যার কথা তোমাকে বলেছিলাম। সেই যে একটা বিকাল সন্ধ্যার ফেল্লু রেসার। কথাটা বলার এক সেকেন্ডের ভেতর প্রদীপ নিভে যাওয়ার বিষণ্নতা নিশাতের অবয়ব গ্রাস করেছে লক্ষ করলাম। ফরমাল কুশল বিনিময়ের পর দুই পক্ষ উল্টা দুই দিকে রওনা দিয়েছি। পেছনে ফিরে তাকাতেই আবার চোখাচোখি! তার চোখে প্রগাঢ় মেঘ-ছায়া আর আমার ভেতর থেকে আসা গভীর শ্বাস। জীবনের রেস। উল্টা পথে দূরে সরে যাওয়া!

রেস

 আনোয়ার সেলিম 
০৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

[সময়কাল : ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ থেকে শুরু]

সেদিন ফাল্গুন মাসের কোনো এক সাপ্তাহিক ছুটির দিন। বিকাল আনুমানিক পাঁচটা।

হঠাৎ আমার মোবাইলে অচেনা নাম্বারে রং ফোন। রিসিভ করলাম ইতস্তত করে। ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর একটা মেয়ে কণ্ঠ। অচেনা। কোনো ধরনের ভূমিকা ছাড়াই জানতে চাইল-

আচ্ছা, আপনার কি গাড়ি আছে?

বললাম-আছে।

অচেনা একটা মেয়ের হঠাৎ উটকো প্রশ্নে আমার মধ্যে কেন জানি কোনো ভাবান্তর হলো না। খুব স্বাভাবিকভাবে কথোপকথন চালিয়ে গেলাম। যেন খুব চেনা কারও সঙ্গে কথা বলছি-

-আপনি কি নিজে ড্রাইভ করেন?

হুম।

কি গাড়ি আপনার?

-হোন্ডা ফিট

-মেক?

-২০০৪

-কী কালার?

-স্কাই ব্লু।

-আমার টয়োটা আইএসটি। এটারও মেক ২০০৪। সিলভার এ্যাশ।

-বাসা কোথায় আপনার?

-ধানমণ্ডি ছয়।

-কাজ আছে কিছু এখন?

-না।

-এক কাজ করেন

-কী?

-মানিক মিয়া এভিনিউ টিএন্ডটি অফিসের সামনে গাড়ি নিয়ে চলে আসেন। কতক্ষণ লাগবে?

-বিশ মিনিট।

-আমার বাসা ইন্দিরা রোড। আমার লাগবে পাঁচ মিনিট। আমি ওখানে অপেক্ষা করব। আপনি আমার গাড়ির ঠিক পেছনে এসে থামবেন।

-আচ্ছা।

ঠিক বিশ মিনিটের মধ্যে এসে থামলাম টয়োটা গাড়িটার পেছনে।

সম্ভবত রিয়ার-ভিউ মিররে দেখছিল। থামতে না থামতে ফোন এলো।

আমরা এখন একটা রেস দেব। এয়ারপোর্টের গোল চত্বর পর্যন্ত। আপনি সামনে যান। রেস শুরু করেন।

আমি এগিয়ে গেলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাকে পাশ কাটিয়ে তীব্র বেগে তার গাড়িটা সামনে চলে গেল। বিজয় সরণির সিগন্যালে দুজনকেই থামতে হলো। আমি আগে সে পিছে। আমরা কেউ কারও চেহারা দেখছি না। এরপর আর কোনো সিগন্যালে দাঁড়াতে হয়নি। হুস করে আমার পাশ দিয়ে প্রবল বেগে ছুটে মুহূর্তে উধাও! আমি রণেভঙ্গ দিলাম। কী দরকার বাবা! কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম কে জানে। শেষে না আবার জীবনটাই খোয়াতে হয়।

আমি এয়ারপোর্ট গোল চত্বরে ইউ-টার্ন নিচ্ছি। তখন ফোন এলো।

কোথায় আপনি?

-ফিনিশিং লাইন ক্রস করছি।

-ভালো ড্রাইভার তো! এ-ই গাড়ি চালান! আমি সেই কখন ফিনিশিং লাইন ক্রস করলাম! আমি রেডিসন হোটেলের সামনে পার্কিংয়ে অপেক্ষা করছি। সোজা চলে আসেন। পাশের পার্কিংটা খালি আছে।

১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। গাড়ি পার্ক করে নেমে দাঁড়ালাম।

নিজের গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে ত্রিভঙ দাঁড়ানো মেয়েটা। পরনে সুতি বহু-রং সালোয়ার কামিজ। লম্বায় মাঝারি। শ্যামল মসৃণ ত্বক। পাতলা অথচ শারীরিক গড়নে নিখুঁত সুন্দরী একটা মেয়ে। বয়স বড় জোর ছাব্বিশ-সাতাশ। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। সম্ভ্রান্ত রুচিশীল মার্জিত অবয়ব। চেহারা হালকা ঊর্ধ্বমুখ- যেন আকাশ দেখছে। আর আমার অস্তিত্বের পুরোটা-ই যেন দেখছে সরাসরি না তাকিয়ে। জায়গাটা বেশ নির্জন। বলল-‘রেসে তো হেরে গেলেন’। বললাম-‘হুম’।

বলল-আমার সঙ্গে আসুন। আমি হাঁটছি পাশাপাশি খুব কাছাকাছি হাতে হাত ধরে হাঁটার দূরত্বে। সে অতি সামান্য এগিয়ে যেন আমি তাকে অনুসরণ করছি।

হোটেলের লবী পেরিয়ে পুল সাইডে এসে থামল। হোটেলের পুল-সাইডটা বেশ প্রশস্ত। শান বাঁধানো চমৎকার ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করা। বাহারি লতানো ফুলের গাছ সীমানা দেওয়াল ঘেঁষে। পেভমেন্টে পরিপাটি সাজানো বনসাই। পুল-সাইড ক্যাফের জন্য বেতের চেয়ার টেবিল সাজানো খোলা আকাশের নিচে। এই প্রথম আমরা মুখামুখি দাঁড়িয়ে। গোধূলির শেষ সিঁদুর মায়া-রং আছড়ে পড়ছে তার মুখে। অপরূপ সুন্দর। এই প্রথম চোখাচোখি। আশপাশটা নির্জন। কেবল দূরে ইতস্তত কয়েকজন গার্ড। আর ধোপ-দুরস্ত পোশাকের দু-একজন ওয়েটার।

আমাকে বলল-জুতা জোড়া খুলবেন একটু? প্যান্টের পায়াও গুটিয়ে নিতে হবে।

এই প্রথম বিস্মিত বিব্রত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম-কেন?

‘পানিতে পা ভেজাব’ বলেই নিজের স্যান্ডেল জোড়া খুলে সালোয়ারের নিচটা হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে পুলের ধারে বসে পানিতে পা-জোড়া নামিয়ে দিল। পা দোলাতে দোলাতে গুনগুন করে কি যেন একটা গান গাইছে মেয়েটা। আমি বললাম-এভাবে পুলে পা নামিয়ে বসা কি ঠিক হচ্ছে! হোটেলের লোকজন বাধা দেবে না? বলল-না। এখানে সবাই আমাকে চেনে। আপনি না হয় আসন করে আমার পাশেই বসুন। আমি তা-ই করলাম। বেশ ইতস্তত সংকোচ নিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার সংকোচ কেটে গেল। মেয়েটা এত্তো স্বাভাবিক আর কেউ কিছু বলছে না দেখে। বুঝলাম এখানে তার রীতিমতো যাতায়াত আছে।

মেয়েটা গান গাইতে গাইতে পানিতে পা দুলিয়ে চলছে। আমরা পুবের দিকে মুখ করে আছি। পেছনে সূর্যের লাল আভা মিলিয়ে আসছে। সামনে বিশাল রুপালি-থালা চাঁদ গাছের আড়াল থেকে জেগে উঠছে ধীরে। আজ পূর্ণিমা। চাঁদের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা বলল-খুব সুন্দর না চাঁদটা? তারপর আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল-বহুদিন পর পূর্ণিমা দেখছি। আমার খুউব ভালো লাগছে। পুল আর লনের রঙিন বাতিগুলো জ্বলে উঠছে। রং আর আলো-আঁধারি মিলে মিশে সে এক মোহময় স্বপ্নিল পরিবেশ। আজ দুপুরে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল। বাতাসে হীমের আমেজ। প্রায় আধাঘণ্টা ওখানে বসে। কথা হয়েছে শুধু গান আর প্রকৃতি নিয়ে। কখনো গলা মিলিয়ে ‘তোমার হাওয়া হাওয়ায়.. ফাগুন হাওয়া হাওয়ায়...’।

এবার উঠা যাক। আমি আপনাকে কফি খাওয়াব।

আমরা উঠে লনের চেয়ারে বসলাম মুখোমুখি। এসপ্রেসো কফি আর ব্রাউনি অর্ডার করা হয়েছে।

মেয়েটার হাসি অসাধারণ। দাঁত উঁচা-নিচা মেয়েগুলা যখন হাসে তখন তাদের চোখ মুখের সঙ্গে যেন ভুবন হাসতে থাকে। মেয়েটা তেমন করে হাসছে সারাক্ষণ। তবে সামনাসামনি এখন দেখছি। আমার সামনে বসা দ্যুতি স্নিগ্ধ সুন্দর! কথা হচ্ছে শুধু গান কবিতা আর প্রকৃতি নিয়ে। ‘আমি কান পেতে রই...’

সন্ধ্যা সাড়ে আটটা। বলল-এবার উঠতে হবে। আপনার ফোন নাম্বার আমার কাছে থাকল। রাতে কথা হবে। আবার রেস দেব। শুরুর জায়গাটায় রেস শেষ হবে।

ব্যাগ থেকে কাগজ কলম বের করে কিছু একটা লিখে আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-আমার ফেসবুক আইডি। একটা অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেবেন।

শুরুর জায়গায় এসে থামলাম আমরা দুজন। যথারীতি সে আগে। আমি মিনিট দুই পরে।

ফোনে বলল-গুড বাই! থ্যাংকস ফর গিভিং মি আ ওযান্ডারফুল ইভিনিং।

এরপর মুহূর্তে উধাও! আমিও ফিরছি অদ্ভুত ভালো লাগা নিয়ে। আমার গাড়ির ডেকে বেজে চলছে... ‘আমি কান পেতে রই...’

রাত সাড়ে ১০টা। কল এলো মেয়েটার।

‘আচ্ছা! আজকের ঘটনায় আপনি অবাক হননি’?

আমি বললাম-না। আমি সহজে অবাক হই না। আমরা সবাই সারাক্ষণই সব অবাক কাণ্ড করছি। সে সব দেখে অভ্যস্ত হয়ে যাই বলে অবাক হই না। এই যে মানুষ জীব প্রকৃতি জড়-জগৎ বিশ্ব মহাবিশ্ব সবই কি অবাক বিষয় নয়!

এই রে সেরেছে! আপনি তো দেখি সে-ই রকম! দারুণ একজন মানুষ! আমাকে চিনতেন? সাহসও দেখি খুব!

কশ্চিনকালেও না। সাহস তো আপনার! আর আমাকে রোমাঞ্চকর রহস্যময়তা ভীষণ টানে।

আমার সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলেন না যে!

আমি জানতাম তার দরকার নেই। আমার অনাগ্রহ দেখে আপনি নিজেই জানানোর জন্য অস্থির হবেন।

আপনি ভীষণ ইন্টেলিজেন্ট। আচ্ছা আপনি কি ভাবছেন আমি আপনাকে চিনতাম?

না। চিনতেন না।

তারপরও কৌতূহল দমাতে পারলেন?

ঐ যে বললাম!

গাড়িটা আমার নিজের উপার্জন দিয়ে কেনা। অল্প লোন আছে যদিও। সে জন্য এটা আমার ভীষণ প্রিয়। আমার স্বাধীনতাও বলতে পারেন। আচ্ছা আমার বয়স কত বলতে পারেন?

বড়জোর ছাব্বিশ কি সাতাশ।

আপনার অনুমান ভালো। ছাব্বিশ প্লাস। আপনার বয়স অনুমান করব?

না থাক। অনুমান করে নিজের কাছে রেখে দিন

না। বলেই ফেলি ত্রিশ-একত্রিশ?

ঠিক আছে ওই প্রসঙ্গ বাদ। আমাকে অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছেন?

না। একটু পর কথা শেষ হলে পাঠাব। একটা শর্ত আছে-একসেপ্ট করে যা খুশি দেখে নেবেন। চব্বিশঘণ্টা পর ডিলিট করে দেব

হিহিহি করে হেসে বলল-কেন? ঘরে বউ আছে? বলতে হবে না। ওকে। ডান (done)।

এটা সত্যি যে আপনাকে ব্যাপারটা জানাতে ইচ্ছা করছে। বলেই ফেলি। শুনুন...

আমার বিয়ের মাত্র চার মাস হলো। ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সেও বাসে। কিন্তু তার একটা-ই সমস্যা। আমার গাড়ি চালানো-বিশেষ করে রেকলেস ড্রাইভিং তার খুব অপছন্দ। ছোটবেলা থেকে গাড়ি নিয়ে আমার সিরিয়াস অবসেশন। আমার জন্য কেনা খেলনা পুতুল সরিয়ে রেখে ছোট ভাইয়ের গাড়ি নিয়ে খেলতে চাইতাম। এ নিয়ে আমাদের ঝগড়া লাগত। সে বলত আমি কি তোমার পুতুল নিয়ে খেলি যে তুমি আমার গাড়ি নিয়ে খেলবা! আমার খুব রাগ হতো। এটা কেমন নিয়ম ছেলেরা খেলবে গাড়ি নিয়ে আর মেয়েদের খেলনা-পুতুল। তখনই স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে আমি নিজে কাজ করে টাকা জমিয়ে একটা আসল গাড়ি কিনব। এটা এক রকম জেদ-ই বলতে পারেন। টিভিতে কার রেস দেখতাম খুব। কি এক্সাইটিং! জন্ম থেকেই বাবার নিজস্ব গাড়িতে চড়ে আসছি; কিন্তু সেটা চালানোর ইচ্ছা জানানোর দুঃসাহস হতো না। আমার চাই নিজের গাড়ি। পড়াশোনায় আমার তেমন মন ছিল না। মা বাবার ইচ্ছামতো ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং না পড়ে পাসকোর্সে বিএ পাস করে মাত্র বাইশ বছর বয়েসে একটা লিজিং কোম্পানির চাকরিতে ঢুকলাম। চার বছরের মধ্যেই ম্যানেজার হয়ে গেলাম। ম্যানেজমেন্ট আমার পারফরমেন্সে ভীষণ খুশি। এটা কোম্পানির রেকর্ড। আমার চাকরির জমানো টাকা আর কমিশন থেকেই গাড়িটা কেনা। এটা আমার সন্তানের মতো।

জয় আমার হাজব্যান্ড। আমার কোনো কিছু নিয়েই তার সমস্যা নেই। যত রিজার্ভেশন আমার এই গাড়ি! গত পরশু তার সঙ্গে গাড়ি নিয়ে ঝগড়া করে বাপের বাড়ি চলে এসেছি। দু’দিন হয়ে গেল। ভাবলাম সব রাগ ভুলে আমাকে নিতে চলে আসবে। এলো তো না-ই; বদ-টা একটা ফোন-কল পর্যন্ত করেনি। দু’দিন ধরে আমার মন খারাপের পারদ তুঙ্গে উঠেছে।

আজ বিকালে বড় বেশি অস্থির লাগছিল। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। ফোনটা হাতে নিয়ে উল্টা-পাল্টা নাম্বারে কল করে মানুষদের জ্বালাতন করার একটা পাগলামো মাথায় ঢুকল। অপর পাশে কে ফোন ধরবে ঠেলাওয়ালা না মুদি দোকানি, টেইলার না কোচিং সেন্টার, বাচ্চা না বুড়া, ছেলে না মেয়ে, ছাগলনাইয়া না ভেড়ামারা এসব কিচ্ছু ভাবিনি। কোন টাইপের মানুষ ফোন রিসিভ করলে কি বলব তা-ও ভাবিনি। আপনি ফোনটা রিসিভ করার পর ডায়াল করা নাম্বার দেখে নিলাম। এ সিরিজের নাম্বার পোস্ট-পেইড। পুরোনো এবং সাধারণভাবে করপোরেট লোকজন ব্যবহার করে। আপনার কণ্ঠ এবং উচ্চারণ শুনে হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় কোত্থেকে যেন গাড়ি আর রেসের ব্যাপারটা চলে এলো! কিন্তু কী অবাক ব্যাপার! আমার পাগলামির সঙ্গে সব এভাবে ঠিকঠাক মিলে গেল! এক নিমিষে কথাগুলো বলে গেল মেয়েটা।

ফোন রেখে ফেসবুক নিয়ে বসলাম। তার দেওয়া আইডিতে রিকোয়েস্ট পাঠাতেই সঙ্গে সঙ্গে একসেপ্ট। বেশকিছু জমকালো বিয়ের ছবি। জুগল ছবিতে দেখলাম তার হাজব্যান্ড-দারুন সুদর্শন। দু’জনকে চমৎকার মানিয়েছে। আগের কথামতো চব্বিশ ঘণ্টা পর তাকে আনফ্রেন্ড করে দিলাম। মেয়েটার নাম নিশাত।

প্রায় আট-নয় মাস পর আরেক বিকালে হঠাৎ নিশাতের ফোন। বলল-সৌরভ, দেখছেন? আজকের বিকালটা কী অদ্ভুত সুন্দর! আমি ঘরে বন্দি। এখন মাত্র বাসার ছাদে এলাম। ইচ্ছা করছে সেদিনের মতো আবার আপনার সঙ্গে রেস দেই। যদিও সেটা হয়তো সেদিনের মতো ততো এক্সাইটিং হতো না। কিন্তু আমার ইচ্ছাটাও এখন অসাধ্য। আই অ্যাম এক্সপেক্টিং। অ্যাডভান্সড স্টেজে।

সেদিনের ফোনালাপের পর আরও সাত-আট মাস পার হয়েছে। আজ একটা শপিং সেন্টারে হঠাৎ মুখামুখি দেখা। সঙ্গে হাজব্যান্ডের কোলে প্রায় ছ’মাসের ফুটফুটে দেবশিশুর মতো ছেলে। নিশাত উচ্ছলভাবে প্রায় চিৎকার করে উঠল-‘সৌ-র-ভ’! আসো পরিচয় করিয়ে দেই। আমার হাজব্যান্ড ‘জয়’। আমার জানের টুকরা ‘দীপ’। আর ইনি হচ্ছেন ‘সৌরভ’-যার কথা তোমাকে বলেছিলাম। সেই যে একটা বিকাল সন্ধ্যার ফেল্লু রেসার। কথাটা বলার এক সেকেন্ডের ভেতর প্রদীপ নিভে যাওয়ার বিষণ্নতা নিশাতের অবয়ব গ্রাস করেছে লক্ষ করলাম। ফরমাল কুশল বিনিময়ের পর দুই পক্ষ উল্টা দুই দিকে রওনা দিয়েছি। পেছনে ফিরে তাকাতেই আবার চোখাচোখি! তার চোখে প্রগাঢ় মেঘ-ছায়া আর আমার ভেতর থেকে আসা গভীর শ্বাস। জীবনের রেস। উল্টা পথে দূরে সরে যাওয়া!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন