শরণার্থী জীবনের লেখক
jugantor
আবদুলরাজাক গুরনাহ
শরণার্থী জীবনের লেখক

  আকেল হায়দার  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুইডিশ নোবেল কমিটি থেকে এডাম স্মিথ যখন টেলিফোনে আবদুলরাজাক গুরনাহ’কে ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার সুখকর সংবাদটি দেন তখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে পুরস্কারটি আসলেই তিনি পেয়েছেন। গুরনাহ বলেন-ঘোষণা শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল আমার সঙ্গে বুঝি মজা করা হচ্ছে! পরে নোবেল প্রাইজ ওয়েবসাইটে নিজের নাম দেখার পরও চোখে ঘোর লেগেছিল কিছুক্ষণ। তিনি বলেন নোবেল প্রাইজ অবশ্যই একটি বড় ও সম্মানজনক পুরস্কার। এবারের সাহিত্য ক্যাটাগরিতে নোবেল কমিটি তাকে নির্বাচন করেছেন এটা একজন লেখকের জন্য অনেক বড় একটা প্রাপ্তি ও অর্জন।

প্রতিবারের মতো চলতি বছরও সাহিত্যে নোবেল কে পেতে পারে এ নিয়ে সম্ভাব্য অনেকের নাম সাহিত্যবোদ্ধা ও পাঠক মহলে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু নোবেল কমিটির বিবেচনা ও বিচারে তার কোনো কিছুর সঙ্গে মিল ও সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন একজনকে তারা উপস্থাপন করেন যে প্রচলিত সব ভবিষ্যদ্বাণী উবে যায়। এইবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আলোচিত ও জনপ্রিয় সব লেখকদের নাম ডিঙিয়ে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসাবে উঠে এসেছে তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ’র নাম।

আবদুলরাজাক গুরনাহ’র জন্ম ১৯৪৮ সালের ২০ ডিসেম্বর তানজানিয়ার জানজিবার দ্বীপে। তিনি তানজানিয়ার বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। ১৯৬০-এর দশকে জানজিবার দ্বীপে বিপ্লবের সময় আট বছর বয়সে শরণার্থী হিসাবে ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জানজিবার মুক্ত হলেও আর দেশে ফিরতে পারেননি। শরণার্থী জীবনের অনুচ্ছেদ নিয়েই থিতু হন ইংল্যান্ডে। ২১ বছর বয়সে শুরু করেন সাহিত্যচর্চা। প্রথমে মাতৃভাষা সোয়াহিলিতে লেখালেখি শুরু করলেও পরবর্তীতে ইংরেজি তার রচনার প্রধান ভাষা হিসাবে উপজীব্য হয়। তার বেশিরভাগ লেখার বিষয়বস্তু শরণার্থীদের কষ্ট ও বেদনাদায়ক জীবনকে কেন্দ্র করে। ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃখ-দুর্দশা ও পীড়িত জীবনের কথা সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তিনি তার বিভিন্ন লেখায়। যা সহজেই বোধগম্য ও পাঠক হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। নোবেল কমিটির ভাষায় তার লেখার ভাষা গৎবাঁধা ঘরনায় প্রতিফলিত নয়। গুরনাহ’র উপন্যাসের বর্ণনা ও কাহিনি বিন্যাসে রয়েছে নিজস্ব ধারা ও অনন্য স্বকীয়তা।

গুরনাহ’র প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অফ ডিপার্চার’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। কতৃত্ববাদী শাসন ও ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা তারই অনবদ্য কিছু ফুটে উঠেছে তার এ রচনায়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইজ’। এ বইটির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত পান তিনি। ম্যানবুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টেও আসে বইটির নাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেকার সময়কে কেন্দ্র করে আফ্রিকান পটভূমিতে লেখা হয়েছে বইটি। গুরনাহ’র অন্যান্য জনপ্রিয় উপন্যাসের মধ্যে ‘ডিসার্শন’ ও ‘বাই দ্য সি’ উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তার দশম উপন্যাস ‘আফটার লাইভস’ ।

তার রয়েছে দশটি উপন্যাস ও দুটি ছোট গল্পের সংকলন।

উপন্যাস : মেমোরি অব ডিপার্চার (১৯৮৭), পিলগ্রিমস ওয়ে (১৯৮৮), ডটি (১৯৯০), প্যারাডাইজ (১৯৯৪), অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স (১৯৯৬), বাই দ্য সি (২০০১), ডিসার্শন (২০০৫), দ্য লাস্ট গিফট (২০১১), গ্র্যাভেল হার্ট (২০১৭), আফটারলাইভস (২০২০)

ছোটগল্প : দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অফ আবদুলরাজাক গুরনাহ (২০০৪), মাই মাদার লিভড অন আ ফার্ম ইন আফ্রিকা (২০০৬)।

আবদুলরাজাক গুরনাহ তার লেখায় ঔপনিবেশিকতার তীব্র সমালোচনা ও শরণার্থী জীবনের বিবিধ কষ্টের কথা অবলীলায় লিখেছেন ও কলোনিয়ালিজমের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাহিত্যগুণ ও মানদণ্ডের মাপকাঠি যথাস্থানেই থাকুক; একটা বিষয় হয়তো সূক্ষ্ম-সচেতন পাঠকদের দৃষ্টি থেকে অনুহ্য থাকবে। গুরনাহ ঔপনিবেশিকতার কট্টর সমালোচক হয়েও নিজে ঔপনিবেশিক জীবন কাটিয়েছেন, সাহিত্য রচনা করেছেন ঔপনিবেশিক অঞ্চলের ভাষায়, জীবনযাপন করছেন কলোনিয়ালিজমের ছত্রছায়ায় এবং সেসব বিষয়বস্তু ও উপকরণকে কেন্দ্র করে সাহিত্য লিখে নোবেল পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কলোনিয়ালিজমের যারা ধারক ও বাহক তাদের কাছ থেকে একটা উদারপন্থি মনোভাবের আভাস পাওয়া যায়। প্রতীয়মান হয় তারা তাদের অতীতের শেকলবিদ্ধ প্রথা ও আগ্রাসনের মনোভাব থেকে নিজেদের কিছুটা হলেও মুক্ত করতে পেরেছে। নিঃসন্দেহে এটি সব ধর্ম ও গোত্রের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আবদুলরাজাক গুরনাহ’র বর্তমান বয়স ৭৩ বছর। সাহিত্য বিশ্বে ১১৮তম হিসাবে তিনি চলতি বছর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের ক্যান্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্য ও পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডিজের অধ্যাপক হিসাবে কমর্রত ছিলেন এবং বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন।

উল্লেখ্য ১৯০১ সাল থেকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া শুরু হয়। গত বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন মার্কিন কবি লুইস গ্লুক।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া

আবদুলরাজাক গুরনাহ

শরণার্থী জীবনের লেখক

 আকেল হায়দার 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুইডিশ নোবেল কমিটি থেকে এডাম স্মিথ যখন টেলিফোনে আবদুলরাজাক গুরনাহ’কে ২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার সুখকর সংবাদটি দেন তখনো তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে পুরস্কারটি আসলেই তিনি পেয়েছেন। গুরনাহ বলেন-ঘোষণা শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল আমার সঙ্গে বুঝি মজা করা হচ্ছে! পরে নোবেল প্রাইজ ওয়েবসাইটে নিজের নাম দেখার পরও চোখে ঘোর লেগেছিল কিছুক্ষণ। তিনি বলেন নোবেল প্রাইজ অবশ্যই একটি বড় ও সম্মানজনক পুরস্কার। এবারের সাহিত্য ক্যাটাগরিতে নোবেল কমিটি তাকে নির্বাচন করেছেন এটা একজন লেখকের জন্য অনেক বড় একটা প্রাপ্তি ও অর্জন।

প্রতিবারের মতো চলতি বছরও সাহিত্যে নোবেল কে পেতে পারে এ নিয়ে সম্ভাব্য অনেকের নাম সাহিত্যবোদ্ধা ও পাঠক মহলে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু নোবেল কমিটির বিবেচনা ও বিচারে তার কোনো কিছুর সঙ্গে মিল ও সঙ্গতি খুঁজে পাওয়া যায়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন একজনকে তারা উপস্থাপন করেন যে প্রচলিত সব ভবিষ্যদ্বাণী উবে যায়। এইবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আলোচিত ও জনপ্রিয় সব লেখকদের নাম ডিঙিয়ে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হিসাবে উঠে এসেছে তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ’র নাম।

আবদুলরাজাক গুরনাহ’র জন্ম ১৯৪৮ সালের ২০ ডিসেম্বর তানজানিয়ার জানজিবার দ্বীপে। তিনি তানজানিয়ার বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক। ১৯৬০-এর দশকে জানজিবার দ্বীপে বিপ্লবের সময় আট বছর বয়সে শরণার্থী হিসাবে ইংল্যান্ড পাড়ি জমান। ১৯৬৩ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে জানজিবার মুক্ত হলেও আর দেশে ফিরতে পারেননি। শরণার্থী জীবনের অনুচ্ছেদ নিয়েই থিতু হন ইংল্যান্ডে। ২১ বছর বয়সে শুরু করেন সাহিত্যচর্চা। প্রথমে মাতৃভাষা সোয়াহিলিতে লেখালেখি শুরু করলেও পরবর্তীতে ইংরেজি তার রচনার প্রধান ভাষা হিসাবে উপজীব্য হয়। তার বেশিরভাগ লেখার বিষয়বস্তু শরণার্থীদের কষ্ট ও বেদনাদায়ক জীবনকে কেন্দ্র করে। ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃখ-দুর্দশা ও পীড়িত জীবনের কথা সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন তিনি তার বিভিন্ন লেখায়। যা সহজেই বোধগম্য ও পাঠক হৃদয়কে স্পর্শ করে যায়। নোবেল কমিটির ভাষায় তার লেখার ভাষা গৎবাঁধা ঘরনায় প্রতিফলিত নয়। গুরনাহ’র উপন্যাসের বর্ণনা ও কাহিনি বিন্যাসে রয়েছে নিজস্ব ধারা ও অনন্য স্বকীয়তা।

গুরনাহ’র প্রথম উপন্যাস ‘মেমোরি অফ ডিপার্চার’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। কতৃত্ববাদী শাসন ও ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার যে আপ্রাণ চেষ্টা তারই অনবদ্য কিছু ফুটে উঠেছে তার এ রচনায়। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় তার চতুর্থ উপন্যাস ‘প্যারাডাইজ’। এ বইটির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত পান তিনি। ম্যানবুকার পুরস্কারের শর্টলিস্টেও আসে বইটির নাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেকার সময়কে কেন্দ্র করে আফ্রিকান পটভূমিতে লেখা হয়েছে বইটি। গুরনাহ’র অন্যান্য জনপ্রিয় উপন্যাসের মধ্যে ‘ডিসার্শন’ ও ‘বাই দ্য সি’ উল্লেখযোগ্য। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তার দশম উপন্যাস ‘আফটার লাইভস’ ।

তার রয়েছে দশটি উপন্যাস ও দুটি ছোট গল্পের সংকলন।

উপন্যাস : মেমোরি অব ডিপার্চার (১৯৮৭), পিলগ্রিমস ওয়ে (১৯৮৮), ডটি (১৯৯০), প্যারাডাইজ (১৯৯৪), অ্যাডমায়ারিং সাইলেন্স (১৯৯৬), বাই দ্য সি (২০০১), ডিসার্শন (২০০৫), দ্য লাস্ট গিফট (২০১১), গ্র্যাভেল হার্ট (২০১৭), আফটারলাইভস (২০২০)

ছোটগল্প : দ্য কালেক্টেড স্টোরিজ অফ আবদুলরাজাক গুরনাহ (২০০৪), মাই মাদার লিভড অন আ ফার্ম ইন আফ্রিকা (২০০৬)।

আবদুলরাজাক গুরনাহ তার লেখায় ঔপনিবেশিকতার তীব্র সমালোচনা ও শরণার্থী জীবনের বিবিধ কষ্টের কথা অবলীলায় লিখেছেন ও কলোনিয়ালিজমের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সাহিত্যগুণ ও মানদণ্ডের মাপকাঠি যথাস্থানেই থাকুক; একটা বিষয় হয়তো সূক্ষ্ম-সচেতন পাঠকদের দৃষ্টি থেকে অনুহ্য থাকবে। গুরনাহ ঔপনিবেশিকতার কট্টর সমালোচক হয়েও নিজে ঔপনিবেশিক জীবন কাটিয়েছেন, সাহিত্য রচনা করেছেন ঔপনিবেশিক অঞ্চলের ভাষায়, জীবনযাপন করছেন কলোনিয়ালিজমের ছত্রছায়ায় এবং সেসব বিষয়বস্তু ও উপকরণকে কেন্দ্র করে সাহিত্য লিখে নোবেল পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে কলোনিয়ালিজমের যারা ধারক ও বাহক তাদের কাছ থেকে একটা উদারপন্থি মনোভাবের আভাস পাওয়া যায়। প্রতীয়মান হয় তারা তাদের অতীতের শেকলবিদ্ধ প্রথা ও আগ্রাসনের মনোভাব থেকে নিজেদের কিছুটা হলেও মুক্ত করতে পেরেছে। নিঃসন্দেহে এটি সব ধর্ম ও গোত্রের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য দিক। আবদুলরাজাক গুরনাহ’র বর্তমান বয়স ৭৩ বছর। সাহিত্য বিশ্বে ১১৮তম হিসাবে তিনি চলতি বছর নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের ক্যান্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি সাহিত্য ও পোস্ট-কলোনিয়াল স্টাডিজের অধ্যাপক হিসাবে কমর্রত ছিলেন এবং বর্তমানে অবসর জীবন যাপন করছেন।

উল্লেখ্য ১৯০১ সাল থেকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া শুরু হয়। গত বছর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন মার্কিন কবি লুইস গ্লুক।

তথ্যসূত্র : উইকিপিডিয়া

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন