বহু লেখক তৈরি হয়েছে তার হাতে
jugantor
বহু লেখক তৈরি হয়েছে তার হাতে

  সৈয়দ আবুল মকসুদ  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকের সঙ্গে সঙ্গেই বিকশিত হয়েছে শিশু-কিশোর সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে অসংখ্য শিশু-কিশোর লেখকদের অবদানে। শিশু-কিশোরদের জন্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজগুলোতে তাদের জন্য রয়েছে ছোটদের পাতা। গড়ে উঠেছে ষাট-সত্তর বছরে বহু শিশু-কিশোর সংগঠন, আমাদের ছোটবেলায় ছিল দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল। মুকুল ফৌজের মুখপত্র ছিল মুকুল। বেগম জেব-উন নিসা আহমদ সম্পাদনা করতেন ‘খেলাঘর’। এক সময় প্রায় সব দৈনিকের শিশু-কিশোরদের পাতা ছিল, ইত্তেফাকের ‘কচি-কাঁচার আসরে’র পরিচালক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতা, ‘খেলাঘর’ বহু দিন চালিয়েছেন কবি হাবীবুর রহমান। দৈনিক পাকিস্তান যা স্বাধীনতার পরে হয় দৈনিক বাংলা, তার শিশু-কিশোরদের পাতাটি ছিল খুবই সমৃদ্ধ। সেই ‘সাত ভাই চম্পা’ চালাতেন আফলাতুন। শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসংগঠক রফিকুল হক, যিনি দাদুভাই বলেই বেশি খ্যাত। তিনি পরিচালনা করতেন সেই সময়কার বহুল প্রচারিত দৈনিক পূর্বদেশের ছোটদের পাতা চাঁদের হাট। পরবর্তীতে সম্পাদনা করেছেন কিশোর বাংলা, যা নতুন লেখক তৈরিতে রেখেছে অসামান্য অবদান।

দাদুভাই জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সারা দেশে রয়েছে তার অগণিত অনুরাগী। তার হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে বহু কবি ও লেখক-যারা এখন সুপরিচিত।

দাদুভাই শুধু সংগঠক নন, তিনি সৃষ্টিশীল মানুষ। একজন গীতিকার ও নাট্যকার হিসাবে রয়েছে বহু কাজ। তবে একজন বিশিষ্ট ছড়াকার হিসাবেই তিনি খ্যাতিমান। তার ছড়ার বই পান্তাভাতে ঘি, বর্গী এলো দেশে, আমপাতা জোড়া জোড়া প্রভৃতি শিশু-কিশোরদের খুবই জনপ্রিয়।

দাদুভাইয়ের সব ছড়া শিশুদের জন্য নয়। তার বহু ছড়ায় থাকে রাজনৈতিক ইঙ্গিত। দুঃশাসন ও সামাজিক অসঙ্গতি তিনি তুলে ধরেন তার ছড়ায়, যার রস উপভোগ করে বড়রাই। যেমন তার ‘আমি-তুমি’ ছড়াটি :

তোমার ভুবনে আলোয় ভরা

আমার শুধু রাত

স্বপ্ন আমার ছিনিয়ে নিল

তোমার কালো হাত।

হাত বাড়িয়ে দোসর খুঁজি

কাছে তো নেই কেউ,

যেই বলেছি সত্য কথা

লেলিয়ে দিলে ফেউ।

ছোটদের ভুলানো ছড়াও রয়েছে তার অজস্র। ঢাকা বিষয়ক দাদুভাইয়ের ছড়াগুলো ছোট-বড় সবাইকে আনন্দ দেয়। সমাজসচেতন ছড়াকার তিনি। ঢাকা বিষয়ক তার লিমেরিকগুলো অর্থবহ যেমন-

বুড়িয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা বাড়ছে বহর ঢাকার

চলছে নদীর বাঁটোয়ারা খেলটা অঢেল টাকার।

হায়, প্রকৃতির এই পরাজয়

নদীর বুকে রোজ জমা হয়

রাসায়নিক বর্জ্য সমেত আবর্জনা ঢাকার।

অথবা,

এক পললা বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি ছাড়া ঢাকা

নদী দেখার কষ্ট কি আর, নষ্ট করে তাকা-

এমন সুখের এ রাজধানী

মেইন সড়কে কোমরপানি

ডুব দিয়ে খুব টোকাইরা বেশ হয় সাঁতারু পাকা।

[বৃষ্টি হলেই]

লেখক ও সংগঠক হিসাবে দাদুভাইয়ের যে পরিচয় তার বাইরে রয়েছে তার আরও একটি পরিচয় এবং একজন সামাজিক মানুষ হিসাবে সেই পরিচয় সামান্য পরিচয় নয়। তিনি একজন বিনয়ী, সজ্জন ও হৃদয়বান বন্ধুবৎসল মানুষ। অনেকের মতোই তিনি অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশে বিশেষ উপস্থিত থাকা পছন্দ করেন না। সংবাদপত্রের সাময়িকী সম্পাদনা তার পেশা। সে উপলক্ষ্যে অসংখ্য লেখকের সঙ্গে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বহু নতুন লেখক তৈরি হয়েছে তার হাতে এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায়। সেটা সামান্য ভূমিকা নয়।

দাদুভাই আশি বছর পার করলেন। এখনো তিনি সক্রিয়। লেখালেখি করছেন এবং সাংগঠনিক কাজ করছেন। প্রার্থনা করি তিনি দীর্ঘায়ু হয়ে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে অব্যাহতভাবে অবদান রাখবেন।

প্রায়ত লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ রফিকুল হক দাদুভাই’র ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে এই লেখাটি লিখেছিলেন।

রফিকুল হক দাদুভাই

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৩৭

মৃত্যু ১০ অক্টোবর ২০২১

বহু লেখক তৈরি হয়েছে তার হাতে

 সৈয়দ আবুল মকসুদ 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকের সঙ্গে সঙ্গেই বিকশিত হয়েছে শিশু-কিশোর সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে অসংখ্য শিশু-কিশোর লেখকদের অবদানে। শিশু-কিশোরদের জন্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজগুলোতে তাদের জন্য রয়েছে ছোটদের পাতা। গড়ে উঠেছে ষাট-সত্তর বছরে বহু শিশু-কিশোর সংগঠন, আমাদের ছোটবেলায় ছিল দৈনিক আজাদের মুকুলের মহফিল। মুকুল ফৌজের মুখপত্র ছিল মুকুল। বেগম জেব-উন নিসা আহমদ সম্পাদনা করতেন ‘খেলাঘর’। এক সময় প্রায় সব দৈনিকের শিশু-কিশোরদের পাতা ছিল, ইত্তেফাকের ‘কচি-কাঁচার আসরে’র পরিচালক ছিলেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই। দৈনিক সংবাদের ছোটদের পাতা, ‘খেলাঘর’ বহু দিন চালিয়েছেন কবি হাবীবুর রহমান। দৈনিক পাকিস্তান যা স্বাধীনতার পরে হয় দৈনিক বাংলা, তার শিশু-কিশোরদের পাতাটি ছিল খুবই সমৃদ্ধ। সেই ‘সাত ভাই চম্পা’ চালাতেন আফলাতুন। শিশুসাহিত্যিক ও শিশুসংগঠক রফিকুল হক, যিনি দাদুভাই বলেই বেশি খ্যাত। তিনি পরিচালনা করতেন সেই সময়কার বহুল প্রচারিত দৈনিক পূর্বদেশের ছোটদের পাতা চাঁদের হাট। পরবর্তীতে সম্পাদনা করেছেন কিশোর বাংলা, যা নতুন লেখক তৈরিতে রেখেছে অসামান্য অবদান।

দাদুভাই জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘চাঁদের হাট’-এর প্রতিষ্ঠাতা। সারা দেশে রয়েছে তার অগণিত অনুরাগী। তার হাত দিয়ে তৈরি হয়েছে বহু কবি ও লেখক-যারা এখন সুপরিচিত।

দাদুভাই শুধু সংগঠক নন, তিনি সৃষ্টিশীল মানুষ। একজন গীতিকার ও নাট্যকার হিসাবে রয়েছে বহু কাজ। তবে একজন বিশিষ্ট ছড়াকার হিসাবেই তিনি খ্যাতিমান। তার ছড়ার বই পান্তাভাতে ঘি, বর্গী এলো দেশে, আমপাতা জোড়া জোড়া প্রভৃতি শিশু-কিশোরদের খুবই জনপ্রিয়।

দাদুভাইয়ের সব ছড়া শিশুদের জন্য নয়। তার বহু ছড়ায় থাকে রাজনৈতিক ইঙ্গিত। দুঃশাসন ও সামাজিক অসঙ্গতি তিনি তুলে ধরেন তার ছড়ায়, যার রস উপভোগ করে বড়রাই। যেমন তার ‘আমি-তুমি’ ছড়াটি :

তোমার ভুবনে আলোয় ভরা

আমার শুধু রাত

স্বপ্ন আমার ছিনিয়ে নিল

তোমার কালো হাত।

হাত বাড়িয়ে দোসর খুঁজি

কাছে তো নেই কেউ,

যেই বলেছি সত্য কথা

লেলিয়ে দিলে ফেউ।

ছোটদের ভুলানো ছড়াও রয়েছে তার অজস্র। ঢাকা বিষয়ক দাদুভাইয়ের ছড়াগুলো ছোট-বড় সবাইকে আনন্দ দেয়। সমাজসচেতন ছড়াকার তিনি। ঢাকা বিষয়ক তার লিমেরিকগুলো অর্থবহ যেমন-

বুড়িয়ে গেছে বুড়িগঙ্গা বাড়ছে বহর ঢাকার

চলছে নদীর বাঁটোয়ারা খেলটা অঢেল টাকার।

হায়, প্রকৃতির এই পরাজয়

নদীর বুকে রোজ জমা হয়

রাসায়নিক বর্জ্য সমেত আবর্জনা ঢাকার।

অথবা,

এক পললা বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি ছাড়া ঢাকা

নদী দেখার কষ্ট কি আর, নষ্ট করে তাকা-

এমন সুখের এ রাজধানী

মেইন সড়কে কোমরপানি

ডুব দিয়ে খুব টোকাইরা বেশ হয় সাঁতারু পাকা।

[বৃষ্টি হলেই]

লেখক ও সংগঠক হিসাবে দাদুভাইয়ের যে পরিচয় তার বাইরে রয়েছে তার আরও একটি পরিচয় এবং একজন সামাজিক মানুষ হিসাবে সেই পরিচয় সামান্য পরিচয় নয়। তিনি একজন বিনয়ী, সজ্জন ও হৃদয়বান বন্ধুবৎসল মানুষ। অনেকের মতোই তিনি অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশে বিশেষ উপস্থিত থাকা পছন্দ করেন না। সংবাদপত্রের সাময়িকী সম্পাদনা তার পেশা। সে উপলক্ষ্যে অসংখ্য লেখকের সঙ্গে তার একটি আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বহু নতুন লেখক তৈরি হয়েছে তার হাতে এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায়। সেটা সামান্য ভূমিকা নয়।

দাদুভাই আশি বছর পার করলেন। এখনো তিনি সক্রিয়। লেখালেখি করছেন এবং সাংগঠনিক কাজ করছেন। প্রার্থনা করি তিনি দীর্ঘায়ু হয়ে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে অব্যাহতভাবে অবদান রাখবেন।

প্রায়ত লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ রফিকুল হক দাদুভাই’র ৮০তম জন্মদিন উপলক্ষে এই লেখাটি লিখেছিলেন।

রফিকুল হক দাদুভাই

জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৩৭

মৃত্যু ১০ অক্টোবর ২০২১

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন