সিরাজগঞ্জের সাহিত্য
jugantor
সিরাজগঞ্জ জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন
সিরাজগঞ্জের সাহিত্য

  ইসহাক খান  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্প সংস্কৃতিতে অনেককাল থেকে সিরাজগঞ্জ একটি সমৃদ্ধ জেলা। অনেক জ্ঞাণী-গুণী তাদের অনন্য সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে নিজেরা যেমন অমর হয়ে আছেন তেমনি নিজ জেলা তথা দেশ জাতিকে আগামীর স্বপ্নে উদ্ভাসিত করেছেন। দেশবরেণ্য অনেক কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও নাট্যকারের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জের পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। বাংলাদেশের জাতীয় চারনেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী। জন্মগ্রহণ করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সাবেক শিল্পমন্ত্রী আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ, গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী, আন্তর্জাতিক ফখলরবিদ ড. মাযহারুল ইসলাম। যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন। এখানে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞান সাহিত্যিক ড. আব্দুল্লাহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, বহুভাষাবিদ গোলম মুকসুদ হিলালী। বিশিষ্ট সাংবাদিক, অভিনেতা, চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী ও কামাল লোহানীর জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। সিরাজগঞ্জে জন্ম কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা এবং বাপ্পি লাহিড়ী।

সিরাজগঞ্জের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেন অনল প্রবাহে কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, কবি রজনীকান্ত সেন, সাহিত্যিক মোহাম্মাাদ বরকতুল্লাহ, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, প্রখ্যাত উপন্যাসিক ও গল্পকার মকবুলা মঞ্জুর, কবি সমুগ্র গুপ্ত, গল্পকার শহিদুল জহির, কথাসাহিত্যিক সৈয়দা ইসাবেলা, কথাসাহিত্যিক অনামিকা হক লিলি, কবি নিশাত খান ও নাট্যকার মান্নান হীরা। তারা সবাই প্রয়াত।

যারা এখনো নিরলসভাবে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য লেখক শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল খালেক, কবি মহাদেব সাহা, জুলফিকার মতিন, মোহন রায়হান, আবু হাসান শাহরিয়ার, খ ম আখতার হোসেন, শ ম শহীদুল ইসলাম, মাসুদ খান, কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান, ইমতিয়ার শামীম, ইকতিয়ার চৌধুরী, দিলারা মেসবাহ, মাযহারুল ইসলাম, সুমন্ত আসলাম, মাহফুজা হিলালী, রণজিৎ সরকার, রিপন আহসান ঋতু।

লেখক ড. আব্দুল জলিল, আলমগীর নিষাদ, মোস্তাফিজ তালুকদার, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেন, লেখক আহমেদ শাহাবুদ্দীন, প্রাবন্ধিক হাসানাত মোবারক, কবি অদ্বৈত মারুত, আওলাদ হোসেন, স্বপন কুমার মণ্ডল, ফরিদুল ইসলাম নির্জন প্রমুখ প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকরা।

সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বেশ কয়েকজন বাংলা একডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তারা হলেন, তাসাদ্দুদ খান লোহানী, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, মহাদবে সাহা, মকবুলা মঞ্জুর, সৈয়দা ইসাবেলা, মান্নান হীরা, মলয় ভৌমিক এবং ইমতিয়ার শামীম।

জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে ১৮৯০-১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর অবস্থান করেন। শাহজাদপুরের জমিদার বাড়িতে বসেই রবিঠাকুর রচনা করেন কালজয়ী গ্রন্থ ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘সোনার তরী’। এ ছাড়া রবিঠাকুর শাহজাদপুরের মাটিতে বসে রচনা করেন তার অনন্য সাধারণ গল্প ‘পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি’ প্রভৃতি কালজয়ী গল্প। রবিঠাকুরের স্মৃতি নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি। ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে শাহজাপুরে রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে প্রতি বছর তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ও আবৃত্তিকারের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ করে এ অনুষ্ঠান বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসনে তত্ত্ববধানে একটি সমৃদ্ধ স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। যেখানে প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের সমৃদ্ধ কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি নবীন লেখকদের লেখাও প্রকাশিত হয়ে থাকে।

১৯৩২ সালে ৫ ও ৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের নাট্য ভবনে [পরে যার নাম হয় পৌর মিলনায়তন এবং বর্তমানে ভাসানী মিলনায়তন] ‘বঙ্গীয় মুসিলম তরুণ সম্মেলনে’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। সেদিন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিনও এসেছিলেন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন ‘আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া প্রথম অভাব অনুভব করিতেছি, আমাদের মহানুভব নেতা বাংলার তরুণ মুসলিমের প্রথম অগ্রদূত, তারুণ্যের নিশান, বর্দার মওলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের কথা। সিরাজগঞ্জের শিরাজীর সঙ্গে বাংলার সিরাজ, বাংলার প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। যাহার ‘অনল প্রবাহ’সম বাণীর গৈরিক নিঃশ্রাব জ্বালাময়ী ধারা মেঘ-নিরন্ধ্র গগণে অপরিমাণ জ্যোতি সঞ্চার করিয়াছিল, নিদ্রাতুর বঙ্গদেশ উন্মাদ আবেগ লইয়া মাতিয়া উঠিয়াছিল। ‘অনল প্রবাহের’ সেই অমর কবির কণ্ঠস্বর বাণীকুঞ্জে আর শুনিতে পাইব না। আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, মনীষী, দেশ প্রেমিকের কথাই বারবার মনে হইতেছে। এ যেন হজ্ব করিতে আসিয়া কাবা শরিফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া। সভাপতির ভাষণে কবি কাজী নজরুল যে বক্তব্য প্রদান করেন তারই অংশ বিশেষ ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধ।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও একাধিকবার সিরাজগঞ্জে এসেছিলেন। জসীমউদ্দীন বলেন-‘হঠাৎ করে ময়মনসিংহ যাইবার পথে সিরাজী সাহেবের বাড়িতে অতিথি হইলাম। সিরাজী সাহেব খুব আন্তরিকতার সহিত আমাকে গ্রহণ করিলেন। পরবর্তীতে আমার কবর কবিতা দেখে তিনি এতই খুশি হন যে, মিষ্টি এনে আমার মুখে তুলে দিলেন। আমার জীবনে আমি এত আদর আর কোথাও পাই নাই।’

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কনফারেন্সে যোগ দিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিরাজগঞ্জে আসেন। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাহ্মসমাজের মহাসম্মেলনে যোগ দিতে মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু সিরাজগঞ্জে পদার্পণ করেন। ১৯২৪ সালে সিরাজগঞ্জে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস পরিচালিত স্বারাজ পার্টির এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে অনুমোদিত হয় বিখ্যাত হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট। ১৯৪০ সালে সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে যেসব বরেণ্য ব্যক্তি পদার্পণ করেছিলেন তারা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন, আবুল হাশিম, মাওলানা আকরম খাঁ, আব্দুল গাফফার খান, আব্দুল কাইয়ূম খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং ফাতিমা জিন্নাহ প্রমুখ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে সিরাজগঞ্জের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়ক সংক্ষেপে এসএস রোড। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামেও একটি সড়ক আছে। যার নাম এসবি ফজলুল হক রোড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার সিরাজগঞ্জে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘মুজিব সড়ক’।

এ ছাড়া আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক সিরাজগঞ্জ সাহিত্যাঙ্গন সচল রেখেছেন দীর্ঘদিন। তাদের মধ্যে কবি মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান খান, কবি আজিজুর রহমান সওদাগর দাদু ভাই। সমসাময়িক সময়ে সাহিত্য সক্রিয় ছিলেন কবি আনছার আলী খান, কবি আযকারুল হক, ডা. মতিয়ার রহমান, ডা. ওয়ালিউল ইসলাম, অ্যাডভোকেট রফিক উল আজিজ, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান খাঁ, শ্রী কমল গুণ, ইঞ্জিনিয়ার নওশাঁদ আলী, ম. মামুন, টি এম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।

চল্লিশের দশকের আলোচিত কবি ছিলেন কবি চৌধুরী ওসমান। যিনি একাধারে কবি, ছড়াকার ও সৌখিন চিত্রশিল্পী ছিলেন। চৌধুরী ওসমান কাজী নজরুল ইসলামের একটি পেন্সিল স্কেচ অঙ্কন করে কাজী নজরুল ইসলামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম তা দেখে মুগ্ধ হয়ে চৌধুরী ওসমানকে পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন ‘তোমার মৌন ছবিতে ফুটুক কবির চপল ছন্দ, তোমার তুলির কালিতে উঠুক কুহু ও কেকার দ্বন্দ্ব।’

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের মীর বেলায়েত হোসেন ফিরোজী (১৮৮৭-১৯৭৩), কবি কাজেম রহমতী (১৮৯০-১৯৫০), শেখ আব্দুল গফুর জালালী (১৮৯০-১৯৫৯), খায়রুন্নেছা (১৮৯০-১৯১২), হেমেন্দ্র লাল রায় (১৮৯৩-১৯৩৫), সত্যেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী (১৮৯৬), ইউনুস উদ্দিন মল্লিক (১৮৯৩-১৯৬৩), আবুল মনসুর এলাহী বকস (১৮৯৬), পরিমল কুমার গোস্বামী (১৮৯৭), হৃষিকেশ চট্টপার্য (১৮৯৮-১৯৬৪), আবু লোহানী (১৮৯৬-১৯৩৯), কবি রইস উদ্দীন আহম্মদ (১৯০০-১৯৭৬), কবি এম, সরফদার আলী (১৯০২), পল্লী কবি আব্দুর রহমান (১৮৯৬), ফররুখ শিয়া (১৯১৫) মাওলানা মুহম্মদ নসীম উদ্দিন (১৯১৬-৭১৯৫), কবি ইজার উদ্দিন আহমেদ (১৯১৮-১৯৭৭), উপেন্দ্রনাথ অধিকারী (১৯১৯), জহির বিন কুদ্দুস (১৯২১-১৯৬৩), আবু তাহের রোকনী (১৯২২), এম শাহজাহান আলী (১৯২৫), নুর জাহান বেগম (১৯২৫), শাহজাহান সিদ্দিকী (১৯২৫-১৯৭৭), কবি আব্দুর রশীদ (১৮৯০-১৯৪৫) খোন্দকার মোঃ ইলিয়াস (১৯২৬), ডক্টর গোলাম সাকলায়েন (১৯২৮), মীর আবুল হোসেন (১৯৩১), খন্দকার আব্দুর রহিম (১৯৩৩), নূরজাহান মযহার প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক সাহিত্য ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে দেশ বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন।

সিরাজগঞ্জে এখনো যারা সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় আছেন তারা হলেন-কবি এস এম এ হাফিজ, আশরাফ খান, এস, এম স্বর্ণকমল, জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশা, ডা. মাসুম সরকার, ডা. আতিক, মাহবুবে খোদা-টুটুল, প্রতিক মাহমুদ, সাকিব শাকিল, জুয়েল আলভী, স্বপন রেকা, এস মুকুল আহমেদ, হাদিউল হৃদয়, গাজী শুকুর মাহমুদ, আসাদুল্লা মুক্তা, চৌধুরী শাহরিয়ার মঈন, অধ্যাপিক আখিরা জিনাত মহাল স্বপ্না, কবি হাছান রেজা মানিক, শামসুল ইসলাম পলাশ, ডা. নুরুন্নবি, মুস্তাফিজুর রহমান, নুরুন্নবি খান জুয়েল, নাজমুল খান, এইচ এম সরোয়ার্দী, খ ম ইকরামুল্লাহ, নজরুল ইসলাম, আদিত্য আনাম, হাসাইন হীরা, আব্দুল জুয়েল, আব্দুল লতিফ সরকার, পারভেজ আহসান, উপমা তালুকদার, মালেক মোস্তাকিম, সৌমিক হাসান, মানিক চাঁদ, তরুণ সান্যাল, গল্পকার আলতাফ হোসেন, আসাদ খান, কাওছার আহমেদ জয়, মেহেদী বান্না, রোকসানা আক্তার, আরিফুর রহমান, হাসান নাজমুল, রূপম আহমেদ মঈন, ইয়ার খান, নীল মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, হোসনে আরা শেলী, বাবু খান, নাট্যকার শেখ হান্নান, তাহমিনা শিল্পী কলি, গৌতম সাহা, করুণা রানী সাহা, আখতার উদ্দিন মানিক, মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ, কামরুল ইসলাম ঝড়ো, নুরে জান্নাত, জেসমিন শিকদার গিনি, ড. আয়েশা বেগম, সাবিত্রী সাহা সহ আরও অনেকে।

সাইফুল ইসলাম ছড়াকার হিসাবে সুপরিচিত। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখালেখিতে সক্রিয় আছেন। তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘উনিশ মে’ বেশ সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখি করছেন তরুণ লেখক মাহফুজুর রহমান। যার লেখা ‘চড়িয়া শিকা গণহত্যা’ এবং ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ, সিরাজগঞ্জ জেলা’ গ্রন্থদ্বয় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম’র লেখা ‘রক্তে জেগে ওঠে; মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, সিরাজগঞ্জ’ গ্রন্থটি সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থ।

সিরাজগঞ্জের দৈনিক পত্রিকাগুলো কবি সাহিত্যিকদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে দৈনিক যুগের কথা, দৈনিক কলম সৈনিক, দৈনিক যমুনা প্রবাহ, দৈনিক সিরাজগঞ্জ বার্তা প্রভৃতি পত্রিকাগুলো স্থানীয় কবি সাহিত্যিকদের কবিতা গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি ‘আবেগ’ এবং ‘প্রসূন’ নামক দুটি সাহিত্যবিষয়ক ছোট কাগজ নিয়মিত প্রকাশিত হয়। উল্লাপাড়া কবিতা পরিষদের তত্ত্ববধানে ডা. সাইফুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘চাঁদের হাট’ নামে একটি যৌথ গ্রন্থ নিয়মিত প্রতি বছরে প্রকাশিত হয়।

‘মাসিক আশালতা’ সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরে ঘোড়াচড়া গ্রামের চন্দ্র মোহন সেন। তারপর দীর্ঘদিন কোনো পত্রিকা প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সম্পাদনায় ‘নূর’ ও ‘প্রতিনিধি’ নামক দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মাওলানা আব্দুল জুব্বার রোকনী সম্পাদনায় ‘মাসিক তাজকীর’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। ১৯৩৫ সালে মহকুমার প্রশাসনে তত্ত্বাবধানে ‘পল্লী প্রদীপ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তৎকালে সিরাজগঞ্জ থেকে মাসিক সেবক, সাপ্তাহিক জেহাদ, মাসিক নয়া জামানা, সাপ্তাহিক যুগের দাবি, মাসিক দেশের নাম, মুসাফির, সাপ্তাহিক সমকাল, সাপ্তাহিক কৃষাণ, সাপ্তাহিক জনপদ, আমিরুল ইসলাম মুকুল সম্পাদিত স্বাধীনতার পর প্রথম সাহিত্য মাসিক ‘প্রতিভা’ প্রকাশিত হতো।

১৯৬৩ সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ‘মাসিক যমুনা’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকাটি সাহিত্য অঙ্গনে বেশ সমাদৃত হয়েছিল এবং আনুমানিক ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। ‘মাসিক যমুনা’ পত্রিকায় তরুণ লেখকদের লেখা নিয়ে একটি পাতা প্রকাশিত হতো। যার নাম ছিল ‘যমুনায় তারার মেলা’। তখন সিরাজগঞ্জে সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান উৎস ও অনুপ্রেরণা ছিল ‘মাসিক যমুনা’।

পত্রিকার পাশাপাশি বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন সিরাজগঞ্জে সক্রিয় ছিল। তন্মধ্যে যমুনা সাহিত্য গোষ্ঠী (১৯৬৩-১৯৮০), সিরাজগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ (১৯৮৪-১৯৯৫), সিরাজগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ (১৯৮০-১৯৯৫), বাংলাদেশ কবিতা ক্লাব (১৯৯৫-২০০১৫), কবিতা ক্লাব, সিরাজগঞ্জ (২০০০-২০১০), কবি ও কবিতা পরিষদ (২০১২), বিশ্ব বাংলা সাহিত্য পরিষদ (২০১৫), গাঙচিল সিরাজগঞ্জ শাখা (২০১২), যমুনা নন্দিনী পাঠচক্র (১৯৯০), অনিকেত সাহিত্য গোষ্ঠী (১৯৯০), তরুণ সাহিত্য গোষ্ঠী (২০১০) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আবেগ পাঠচক্র সিরাজগঞ্জ, প্রসুন সাহিত্য সংসদ ও বিষ্যুদবারের আড্ডাসহ বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন এখনো যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে।

সহযোগিতায়- আশরাফ খান ও ফরিদুল ইসলাম নির্জন

সিরাজগঞ্জ জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন

সিরাজগঞ্জের সাহিত্য

 ইসহাক খান 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্প সংস্কৃতিতে অনেককাল থেকে সিরাজগঞ্জ একটি সমৃদ্ধ জেলা। অনেক জ্ঞাণী-গুণী তাদের অনন্য সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে নিজেরা যেমন অমর হয়ে আছেন তেমনি নিজ জেলা তথা দেশ জাতিকে আগামীর স্বপ্নে উদ্ভাসিত করেছেন। দেশবরেণ্য অনেক কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, সাংবাদিক ও নাট্যকারের জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জের পুণ্যভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। বাংলাদেশের জাতীয় চারনেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী। জন্মগ্রহণ করেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সাবেক শিল্পমন্ত্রী আব্দুল্লাহ-আল-মাহমুদ, গণিত সম্রাট যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী, আন্তর্জাতিক ফখলরবিদ ড. মাযহারুল ইসলাম। যিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বাংলা একাডেমির প্রথম মহাপরিচালক ছিলেন। এখানে জন্মগ্রহণ করেন বিজ্ঞান সাহিত্যিক ড. আব্দুল্লাহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, বহুভাষাবিদ গোলম মুকসুদ হিলালী। বিশিষ্ট সাংবাদিক, অভিনেতা, চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী ও কামাল লোহানীর জন্মভূমি সিরাজগঞ্জ। সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অন্তর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন। সিরাজগঞ্জে জন্ম কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা এবং বাপ্পি লাহিড়ী।

সিরাজগঞ্জের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেন অনল প্রবাহে কবি সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, কবি রজনীকান্ত সেন, সাহিত্যিক মোহাম্মাাদ বরকতুল্লাহ, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, প্রখ্যাত উপন্যাসিক ও গল্পকার মকবুলা মঞ্জুর, কবি সমুগ্র গুপ্ত, গল্পকার শহিদুল জহির, কথাসাহিত্যিক সৈয়দা ইসাবেলা, কথাসাহিত্যিক অনামিকা হক লিলি, কবি নিশাত খান ও নাট্যকার মান্নান হীরা। তারা সবাই প্রয়াত।

যারা এখনো নিরলসভাবে সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য লেখক শিক্ষাবিদ ড. আব্দুল খালেক, কবি মহাদেব সাহা, জুলফিকার মতিন, মোহন রায়হান, আবু হাসান শাহরিয়ার, খ ম আখতার হোসেন, শ ম শহীদুল ইসলাম, মাসুদ খান, কথাসাহিত্যিক ইসহাক খান, ইমতিয়ার শামীম, ইকতিয়ার চৌধুরী, দিলারা মেসবাহ, মাযহারুল ইসলাম, সুমন্ত আসলাম, মাহফুজা হিলালী, রণজিৎ সরকার, রিপন আহসান ঋতু।

লেখক ড. আব্দুল জলিল, আলমগীর নিষাদ, মোস্তাফিজ তালুকদার, নাট্যকার মলয় ভৌমিক, মির্জা সাখাওয়াৎ হোসেন, লেখক আহমেদ শাহাবুদ্দীন, প্রাবন্ধিক হাসানাত মোবারক, কবি অদ্বৈত মারুত, আওলাদ হোসেন, স্বপন কুমার মণ্ডল, ফরিদুল ইসলাম নির্জন প্রমুখ প্রথিতযশা কবি সাহিত্যিকরা।

সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বেশ কয়েকজন বাংলা একডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। তারা হলেন, তাসাদ্দুদ খান লোহানী, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, মহাদবে সাহা, মকবুলা মঞ্জুর, সৈয়দা ইসাবেলা, মান্নান হীরা, মলয় ভৌমিক এবং ইমতিয়ার শামীম।

জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে ১৮৯০-১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর অবস্থান করেন। শাহজাদপুরের জমিদার বাড়িতে বসেই রবিঠাকুর রচনা করেন কালজয়ী গ্রন্থ ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘সোনার তরী’। এ ছাড়া রবিঠাকুর শাহজাদপুরের মাটিতে বসে রচনা করেন তার অনন্য সাধারণ গল্প ‘পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, ব্যবধান, তারাপ্রসন্নের কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ক্ষুধিত পাষাণ, অতিথি’ প্রভৃতি কালজয়ী গল্প। রবিঠাকুরের স্মৃতি নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র কাচারি বাড়ি। ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে শাহজাপুরে রবীন্দ্র কাচারি বাড়িতে প্রতি বছর তিন দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী ও আবৃত্তিকারের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ করে এ অনুষ্ঠান বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে জেলা প্রশাসনে তত্ত্ববধানে একটি সমৃদ্ধ স্মরণিকা প্রকাশিত হয়। যেখানে প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের সমৃদ্ধ কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি নবীন লেখকদের লেখাও প্রকাশিত হয়ে থাকে।

১৯৩২ সালে ৫ ও ৬ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের নাট্য ভবনে [পরে যার নাম হয় পৌর মিলনায়তন এবং বর্তমানে ভাসানী মিলনায়তন] ‘বঙ্গীয় মুসিলম তরুণ সম্মেলনে’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। সেদিন কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিনও এসেছিলেন। দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে কাজী নজরুল ইসলাম বলেন ‘আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া প্রথম অভাব অনুভব করিতেছি, আমাদের মহানুভব নেতা বাংলার তরুণ মুসলিমের প্রথম অগ্রদূত, তারুণ্যের নিশান, বর্দার মওলানা সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী সাহেবের কথা। সিরাজগঞ্জের শিরাজীর সঙ্গে বাংলার সিরাজ, বাংলার প্রদীপ নিভিয়া গিয়াছে। যাহার ‘অনল প্রবাহ’সম বাণীর গৈরিক নিঃশ্রাব জ্বালাময়ী ধারা মেঘ-নিরন্ধ্র গগণে অপরিমাণ জ্যোতি সঞ্চার করিয়াছিল, নিদ্রাতুর বঙ্গদেশ উন্মাদ আবেগ লইয়া মাতিয়া উঠিয়াছিল। ‘অনল প্রবাহের’ সেই অমর কবির কণ্ঠস্বর বাণীকুঞ্জে আর শুনিতে পাইব না। আজ সিরাজগঞ্জে আসিয়া সেই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, মনীষী, দেশ প্রেমিকের কথাই বারবার মনে হইতেছে। এ যেন হজ্ব করিতে আসিয়া কাবা শরিফ না দেখিয়া ফিরিয়া যাওয়া। সভাপতির ভাষণে কবি কাজী নজরুল যে বক্তব্য প্রদান করেন তারই অংশ বিশেষ ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধ।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীনও একাধিকবার সিরাজগঞ্জে এসেছিলেন। জসীমউদ্দীন বলেন-‘হঠাৎ করে ময়মনসিংহ যাইবার পথে সিরাজী সাহেবের বাড়িতে অতিথি হইলাম। সিরাজী সাহেব খুব আন্তরিকতার সহিত আমাকে গ্রহণ করিলেন। পরবর্তীতে আমার কবর কবিতা দেখে তিনি এতই খুশি হন যে, মিষ্টি এনে আমার মুখে তুলে দিলেন। আমার জীবনে আমি এত আদর আর কোথাও পাই নাই।’

১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের কনফারেন্সে যোগ দিতে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিরাজগঞ্জে আসেন। ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাহ্মসমাজের মহাসম্মেলনে যোগ দিতে মহাত্মা গান্ধী ও নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসু সিরাজগঞ্জে পদার্পণ করেন। ১৯২৪ সালে সিরাজগঞ্জে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস পরিচালিত স্বারাজ পার্টির এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে অনুমোদিত হয় বিখ্যাত হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট। ১৯৪০ সালে সিরাজগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক।

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে যেসব বরেণ্য ব্যক্তি পদার্পণ করেছিলেন তারা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, লিয়াকত আলী খান, খাজা নাজিমুদ্দিন, আবুল হাশিম, মাওলানা আকরম খাঁ, আব্দুল গাফফার খান, আব্দুল কাইয়ূম খান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং ফাতিমা জিন্নাহ প্রমুখ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে সিরাজগঞ্জের একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী সড়ক সংক্ষেপে এসএস রোড। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামেও একটি সড়ক আছে। যার নাম এসবি ফজলুল হক রোড। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাধিকবার সিরাজগঞ্জে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মরণে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘মুজিব সড়ক’।

এ ছাড়া আরও অনেক কবি-সাহিত্যিক সিরাজগঞ্জ সাহিত্যাঙ্গন সচল রেখেছেন দীর্ঘদিন। তাদের মধ্যে কবি মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান খান, কবি আজিজুর রহমান সওদাগর দাদু ভাই। সমসাময়িক সময়ে সাহিত্য সক্রিয় ছিলেন কবি আনছার আলী খান, কবি আযকারুল হক, ডা. মতিয়ার রহমান, ডা. ওয়ালিউল ইসলাম, অ্যাডভোকেট রফিক উল আজিজ, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান খাঁ, শ্রী কমল গুণ, ইঞ্জিনিয়ার নওশাঁদ আলী, ম. মামুন, টি এম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।

চল্লিশের দশকের আলোচিত কবি ছিলেন কবি চৌধুরী ওসমান। যিনি একাধারে কবি, ছড়াকার ও সৌখিন চিত্রশিল্পী ছিলেন। চৌধুরী ওসমান কাজী নজরুল ইসলামের একটি পেন্সিল স্কেচ অঙ্কন করে কাজী নজরুল ইসলামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম তা দেখে মুগ্ধ হয়ে চৌধুরী ওসমানকে পত্র প্রেরণ করেন। পত্রে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন ‘তোমার মৌন ছবিতে ফুটুক কবির চপল ছন্দ, তোমার তুলির কালিতে উঠুক কুহু ও কেকার দ্বন্দ্ব।’

এ ছাড়া সিরাজগঞ্জের মীর বেলায়েত হোসেন ফিরোজী (১৮৮৭-১৯৭৩), কবি কাজেম রহমতী (১৮৯০-১৯৫০), শেখ আব্দুল গফুর জালালী (১৮৯০-১৯৫৯), খায়রুন্নেছা (১৮৯০-১৯১২), হেমেন্দ্র লাল রায় (১৮৯৩-১৯৩৫), সত্যেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী (১৮৯৬), ইউনুস উদ্দিন মল্লিক (১৮৯৩-১৯৬৩), আবুল মনসুর এলাহী বকস (১৮৯৬), পরিমল কুমার গোস্বামী (১৮৯৭), হৃষিকেশ চট্টপার্য (১৮৯৮-১৯৬৪), আবু লোহানী (১৮৯৬-১৯৩৯), কবি রইস উদ্দীন আহম্মদ (১৯০০-১৯৭৬), কবি এম, সরফদার আলী (১৯০২), পল্লী কবি আব্দুর রহমান (১৮৯৬), ফররুখ শিয়া (১৯১৫) মাওলানা মুহম্মদ নসীম উদ্দিন (১৯১৬-৭১৯৫), কবি ইজার উদ্দিন আহমেদ (১৯১৮-১৯৭৭), উপেন্দ্রনাথ অধিকারী (১৯১৯), জহির বিন কুদ্দুস (১৯২১-১৯৬৩), আবু তাহের রোকনী (১৯২২), এম শাহজাহান আলী (১৯২৫), নুর জাহান বেগম (১৯২৫), শাহজাহান সিদ্দিকী (১৯২৫-১৯৭৭), কবি আব্দুর রশীদ (১৮৯০-১৯৪৫) খোন্দকার মোঃ ইলিয়াস (১৯২৬), ডক্টর গোলাম সাকলায়েন (১৯২৮), মীর আবুল হোসেন (১৯৩১), খন্দকার আব্দুর রহিম (১৯৩৩), নূরজাহান মযহার প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক সাহিত্য ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে দেশ বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন।

সিরাজগঞ্জে এখনো যারা সাহিত্যচর্চায় সক্রিয় আছেন তারা হলেন-কবি এস এম এ হাফিজ, আশরাফ খান, এস, এম স্বর্ণকমল, জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশা, ডা. মাসুম সরকার, ডা. আতিক, মাহবুবে খোদা-টুটুল, প্রতিক মাহমুদ, সাকিব শাকিল, জুয়েল আলভী, স্বপন রেকা, এস মুকুল আহমেদ, হাদিউল হৃদয়, গাজী শুকুর মাহমুদ, আসাদুল্লা মুক্তা, চৌধুরী শাহরিয়ার মঈন, অধ্যাপিক আখিরা জিনাত মহাল স্বপ্না, কবি হাছান রেজা মানিক, শামসুল ইসলাম পলাশ, ডা. নুরুন্নবি, মুস্তাফিজুর রহমান, নুরুন্নবি খান জুয়েল, নাজমুল খান, এইচ এম সরোয়ার্দী, খ ম ইকরামুল্লাহ, নজরুল ইসলাম, আদিত্য আনাম, হাসাইন হীরা, আব্দুল জুয়েল, আব্দুল লতিফ সরকার, পারভেজ আহসান, উপমা তালুকদার, মালেক মোস্তাকিম, সৌমিক হাসান, মানিক চাঁদ, তরুণ সান্যাল, গল্পকার আলতাফ হোসেন, আসাদ খান, কাওছার আহমেদ জয়, মেহেদী বান্না, রোকসানা আক্তার, আরিফুর রহমান, হাসান নাজমুল, রূপম আহমেদ মঈন, ইয়ার খান, নীল মুহম্মদ জাহাঙ্গীর, হোসনে আরা শেলী, বাবু খান, নাট্যকার শেখ হান্নান, তাহমিনা শিল্পী কলি, গৌতম সাহা, করুণা রানী সাহা, আখতার উদ্দিন মানিক, মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ, কামরুল ইসলাম ঝড়ো, নুরে জান্নাত, জেসমিন শিকদার গিনি, ড. আয়েশা বেগম, সাবিত্রী সাহা সহ আরও অনেকে।

সাইফুল ইসলাম ছড়াকার হিসাবে সুপরিচিত। বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখালেখিতে সক্রিয় আছেন। তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘উনিশ মে’ বেশ সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যা নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখি করছেন তরুণ লেখক মাহফুজুর রহমান। যার লেখা ‘চড়িয়া শিকা গণহত্যা’ এবং ‘গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ, সিরাজগঞ্জ জেলা’ গ্রন্থদ্বয় সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। কথাসাহিত্যিক ইমতিয়ার শামীম’র লেখা ‘রক্তে জেগে ওঠে; মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস, সিরাজগঞ্জ’ গ্রন্থটি সিরাজগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থ।

সিরাজগঞ্জের দৈনিক পত্রিকাগুলো কবি সাহিত্যিকদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। সিরাজগঞ্জ থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোর মধ্যে দৈনিক যুগের কথা, দৈনিক কলম সৈনিক, দৈনিক যমুনা প্রবাহ, দৈনিক সিরাজগঞ্জ বার্তা প্রভৃতি পত্রিকাগুলো স্থানীয় কবি সাহিত্যিকদের কবিতা গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যচর্চার গতিকে ত্বরান্বিত করেছে। দৈনিক পত্রিকার পাশাপাশি ‘আবেগ’ এবং ‘প্রসূন’ নামক দুটি সাহিত্যবিষয়ক ছোট কাগজ নিয়মিত প্রকাশিত হয়। উল্লাপাড়া কবিতা পরিষদের তত্ত্ববধানে ডা. সাইফুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘চাঁদের হাট’ নামে একটি যৌথ গ্রন্থ নিয়মিত প্রতি বছরে প্রকাশিত হয়।

‘মাসিক আশালতা’ সিরাজগঞ্জ জেলার সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা। ওই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সিরাজগঞ্জ শহরের অদূরে ঘোড়াচড়া গ্রামের চন্দ্র মোহন সেন। তারপর দীর্ঘদিন কোনো পত্রিকা প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী সম্পাদনায় ‘নূর’ ও ‘প্রতিনিধি’ নামক দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মাওলানা আব্দুল জুব্বার রোকনী সম্পাদনায় ‘মাসিক তাজকীর’ পত্রিকা প্রকাশিত হতো। ১৯৩৫ সালে মহকুমার প্রশাসনে তত্ত্বাবধানে ‘পল্লী প্রদীপ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তৎকালে সিরাজগঞ্জ থেকে মাসিক সেবক, সাপ্তাহিক জেহাদ, মাসিক নয়া জামানা, সাপ্তাহিক যুগের দাবি, মাসিক দেশের নাম, মুসাফির, সাপ্তাহিক সমকাল, সাপ্তাহিক কৃষাণ, সাপ্তাহিক জনপদ, আমিরুল ইসলাম মুকুল সম্পাদিত স্বাধীনতার পর প্রথম সাহিত্য মাসিক ‘প্রতিভা’ প্রকাশিত হতো।

১৯৬৩ সালে সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ‘মাসিক যমুনা’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকাটি সাহিত্য অঙ্গনে বেশ সমাদৃত হয়েছিল এবং আনুমানিক ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। ‘মাসিক যমুনা’ পত্রিকায় তরুণ লেখকদের লেখা নিয়ে একটি পাতা প্রকাশিত হতো। যার নাম ছিল ‘যমুনায় তারার মেলা’। তখন সিরাজগঞ্জে সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান উৎস ও অনুপ্রেরণা ছিল ‘মাসিক যমুনা’।

পত্রিকার পাশাপাশি বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন সিরাজগঞ্জে সক্রিয় ছিল। তন্মধ্যে যমুনা সাহিত্য গোষ্ঠী (১৯৬৩-১৯৮০), সিরাজগঞ্জ সাহিত্য পরিষদ (১৯৮৪-১৯৯৫), সিরাজগঞ্জ সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদ (১৯৮০-১৯৯৫), বাংলাদেশ কবিতা ক্লাব (১৯৯৫-২০০১৫), কবিতা ক্লাব, সিরাজগঞ্জ (২০০০-২০১০), কবি ও কবিতা পরিষদ (২০১২), বিশ্ব বাংলা সাহিত্য পরিষদ (২০১৫), গাঙচিল সিরাজগঞ্জ শাখা (২০১২), যমুনা নন্দিনী পাঠচক্র (১৯৯০), অনিকেত সাহিত্য গোষ্ঠী (১৯৯০), তরুণ সাহিত্য গোষ্ঠী (২০১০) প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া আবেগ পাঠচক্র সিরাজগঞ্জ, প্রসুন সাহিত্য সংসদ ও বিষ্যুদবারের আড্ডাসহ বেশ কিছু সাহিত্য সংগঠন এখনো যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে।

সহযোগিতায়- আশরাফ খান ও ফরিদুল ইসলাম নির্জন

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : প্রান্তছোঁয়া আকাশ

০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৩ ডিসেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
০৫ নভেম্বর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১
২৯ অক্টোবর, ২০২১