আল মাহমুদের অগ্রন্থিত গদ্য

‘সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য’ সম্পর্কে কিছু কথা

  সংগ্রহ ও ভূমিকা মাসুদুজ্জামান ১৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কথাসাহিত্য

এটি খুবই ছোট একটি গদ্যরচনা, কিন্তু নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। রচনাটির বিষয়, এর শিরোনাম থেকেই বোঝা যায়, সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য। সাম্প্রতিক বলতে আল মাহমুদ কোন সময়ের কথা বলছেন, সেই সময়টি চিহ্নিত করা জরুরি হয়ে পড়ে।

গদ্যটির প্রকাশকালের দিকে যদি নজর দিই তাহলে দেখব, এটি ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে ‘শিল্পতরু’ (উপদেষ্টা সম্পাদক আবদুল মান্নান সৈয়দ) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

ধরে নিতে পারি তিনি গদ্যটি লিখেছিলেন এর আগে, সম্ভবত ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে বা তার কিছুকাল আগে। অর্থাৎ আল মাহমুদ মূলত গত শতকের সত্তর-আশির দশক পর্যন্ত যারা ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখছিলেন, তাদের কথা বলেছেন।

লক্ষণীয়, এটি একেবারেই একটি স্কেচি রচনা। স্কেচি মানে তিনি একটা-দুটো বাক্যে আমাদের কথাসাহিত্যিকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। মন্তব্যগুলো এতটাই চকিত আর তাৎক্ষণিক যে, কারও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনো পূর্ণাঙ্গ ধারণা আমাদের হয় না।

প্রথমেই তিনি সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য সম্পর্কে আশার কথা বলছেন। বলছেন, সেই সময়ের গদ্যভাষায় একটি সহজাত ভঙ্গি দেখা যাচ্ছিল মাত্র। কিন্তু জীবনবোধের কথা বলতে গেলে কোনো না কোনো আদর্শের কাছে লেখকদের বশীভূত হতে হয়।

সেই সময়ের কথাসাহিত্যে সেই আদর্শের ছিল অনুপস্থিতি। যাদের মধ্যে এ আদর্শ আছে বলে মনে হয়েছে, তাদের রচনা আবার বিষয়বাহুল্যে ভরা। শিল্প হয়ে ওঠার গুণ তাতে অনুপস্থিত। কিন্তু এর পরই তিনি বলছেন, যাদের রচনায় এই শিল্পগুণ দেখা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই তরুণ লেখক।

এ তরুণরাই তার মধ্যে আশার সঞ্চার করেছেন। কিন্তু এর আগের কথাসাহিত্যিকদের কথা বলতে গিয়ে যারা সেই পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে লিখে আসছেন, তাদের মধ্যে ‘আশ্চর্য জীবনবোধের’ প্রকাশ দেখেছেন।

এখানে এসেই দেখতে পাচ্ছি, আল মাহমুদ এক ধরনের স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি শুরুতে বললেন, আগের লেখকদের মধ্যে জীবনবোধের অনুপস্থিতি দেখতে পাচ্ছেন, কিন্তু এখানে এসে বললেন তারা জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন।

পরে এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আর মাত্র দু’জন- আবু সাঈদ জুবেরী আর ইমদাদুল হক মিলন। কিন্তু পঞ্চাশ-ষাটের আগে থেকে যারা কথাসাহিত্য চর্চা করে আসছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ সক্রিয় আছেন। সক্রিয় ছিলেন না শুধু শাহেদ আলী। এদের গল্পকে তিনি মোটা দাগে ‘জীবনের সমালোচক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু জীবনের সমালোচনা তাদের লেখায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

সৈয়দ শামসুল হক সম্পর্কে পরোক্ষে বলতে চেয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লিখলেও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তার গভীর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। হাসান আজিজুল হক সম্পর্কিত মন্তব্যটি আমাদের কৌতূহল জাগায় এই কারণে যে, সেটিও স্ববিরোধিতায় আক্রান্ত।

আল মাহমুদ তাকে শুরুতেই চিহ্নিত করেছেন ‘জীবনবাদী শিল্পী’ বলে, কিন্তু এর পরপরই তার উক্তি, হাসানের গদ্য জীবনবর্ণনার উপযোগী কিনা প্রশ্ন জাগায়। শেষে আবার বলেছেন, তার কিছু গল্প ‘আমাদের জীবনবোধসম্পন্ন গদ্যের সম্পদ’। আবদুল মান্নান সৈয়দের লেখা সম্পর্কে বলেছেন একমাত্র তিনিই সাহসের সঙ্গে আধুনিক জীবনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।

কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সম্পর্কে আল মাহমুদের মন্তব্য, জীবনবাদী শিল্পী না হলেও জীবনের বিমূর্ততা তার উপজীব্য বিষয়। এ মন্তব্যটি সবচেয়ে অসতর্কতাপ্রসূত মন্তব্য বলে মনে হয়েছে। দুই-দুটি উপন্যাসে এবং তার প্রায় সব ছোটগল্পে জীবনের রূঢ় দিকগুলো যেভাবে ফুটে উঠেছে, তাকে আল মাহমুদ কী করে ‘বিমূর্ত’ রচনা বলে উল্লেখ করলেন সেটা আমার কাছে বিস্ময়ের।

মাহমুদুল হক সম্পর্কিত মন্তব্যটিও অনেকটা এ রকমই। গভীর ভাবনা জাগানিয়া মন্তব্য বলে মনে হয়নি। তিনি লিখেছেন, মাহমুদুল হক গদ্যে কবিতার কাজ করেছেন। তার মানে মাহমুদুল হকের গদ্য আসলে কবিতা! এ ধরনের গদ্য কবিদের পক্ষে রচনা করা সম্ভব হলেও ট্রাডিশনাল গদ্য লেখকদের পক্ষে রচনা করা দুরূহ বলে মনে হয়েছে আল মাহমুদের। এই মন্তব্যে পৌঁছে আমার মনে হয়েছে, আল মাহমুদ বোধহয় নিজের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তিনি কবি, তিনিই হয়তো এ ধরনের গল্প ভালো লিখেছেন। কিন্তু মাহমুদুল হকের কথাসাহিত্যের বিষয়-আশয়ও যে গভীর, সেটা তিনি উল্লেখই করেননি।

এই ছোট্ট গদ্যটি সাম্প্রতিক জীবনশিল্পীদের তাৎক্ষণিক বর্ণনা বলে আল মাহমুদ শেষ করেছেন। আসলেই তাই, এই গদ্যটি ব্যাখ্যাহীন চকিত মন্তব্যে ভরা। আমাদের সমকালীন কথাসাহিত্যের তাৎক্ষণিক অস্পষ্ট রেখাচিত্র মাত্র। গভীর আলোচনা নয়। চকিত মন্তব্য ছাড়াও এটি গভীর নয় আরও একটি কারণে, তিনি সমকালের অনেক লেখকের কথা একেবারে উল্লেখই করেননি, যারা ভালো লিখেছেন। কেন যে তিনি এরকম একটা গদ্য তখন লিখেছিলেন, সেটি তাই বিস্ময় জাগায়। তবে একটা কথা বলাই যায়, আল মাহমুদ আমাদের কথাসাহিত্য সম্পর্কে, বিশেষ করে গত শতকের আশির দশক পর্যন্ত আমাদের কথাসাহিত্য সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করতেন, তার পরিচয় এতে পাই। আর তার সেই ধারণা যে খুব গভীর ছিল না, সে কথা বলাই বাহুল্য। নিচে আল মাহমুদের লেখাটি মুদ্রিত হল।

সাম্প্রতিক কথাসাহিত্য

আল মাহমুদ

আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্যের যে অংশটি গদ্যের দ্বারা বাহিত হচ্ছে, বিশেষ করে গল্প ও উপন্যাস, তা সন্দেহ নেই যে হঠাৎ ঝলমলিয়ে ওঠা হাসির মতো। হাসির কথা বললাম, কারণ হাসি যে আনন্দ ব্যক্ত করে, যে আশায় ভরিয়ে দেয় তা কি আর অন্য কিছু পারে!

সাম্প্রতিক সাহিত্যে জীবনবোধের কথা বলতে হলে এই ঝলমলিয়ে ওঠার কথাটি আগে বলতে হবে। আনন্দে লাফিয়ে ওঠাকেই আমরা ঠিক জীবনবোধ বলতে পারি না। গদ্যভাষার একটি সহজতা সৃষ্টি হয়েছে মাত্র। জীবনবোধ অনেক বড় ব্যাপার। এর জন্য গল্প ও উপন্যাস রচয়িতাদের জীবনের বহু তরঙ্গভঙ্গ আছাড়ি-পিছাড়ি খেতে হয়। বহু উত্থানপতনে সাতার কাটতে হয়। আর জীবনের গভীরতর অর্থকে আবিষ্কার করতে কোনো না কোনো আদর্শের কাছে বশীভূত হতে হয়।

আমাদের সাম্প্রতিক সাহিত্যে এই আদর্শমুখিনতা অপেক্ষাকৃত কম। আর যাদের তা আছে বলে মনে হয় তাদের রচনা বিষয় বাহুল্যে এমন কণ্টকাকীর্ণ যে, জীবন বর্ণনার একটি ছক থাকলেও শিল্প হয়ে ওঠার সদগুণ সেখানে অনুপস্থিত।

তবুও যাদের রচনায় জীবনবোধের গভীরতা ইতিমধ্যে আমাদের স্পর্শ করার সাহস রাখে, তাদের যে অধিকাংশই বয়সে তরুণ, এটাই হল আশার কথা। পঞ্চাশ ও ষাট দশকের যারা ছোটগল্প রচনায় আশ্চর্য জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছেন, তাদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, সিরাজুদ্দিন আহমদ, সৈয়দ শামসুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও রাবেয়া খাতুনের নাম বলা যায়।

পরবর্তীকালে এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন যারা, তাদের কারও বয়সই পঁচিশ পেরোয়নি। তাদের মধ্যে আবু সাঈদ জুবেরী, ইমদাদুল হক মিলন ও বারেক আবদুল্লাহর নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। আসলে এ নামগুলো বা নামোল্লেখ বড় কথা নয়, আসল কথা হল জীবনবোধসম্পন্ন সাহিত্য রচনার গভীর চেষ্টা রয়েছে এদের মধ্যে।

এক সময় আমাদের দেশে গদ্য রচনায় যারা গভীর জীবনবোধের পরিচয় দিয়েছিলেন, যেমন শাহেদ আলী, নাজমুল আলম, মীর্জা আবদুল হাই এরা এখনও নিজেদের সক্রিয়তা ব্যক্ত করে যাচ্ছেন। যদিও শাহেদ আলীর রচনা আজকাল আর দেখা যাচ্ছে না। নাজমুল আলম গত দুুই দশক ধরে সমান সক্রিয়ভাবে ছোটগল্পে তার অবদান রেখে গেছেন। তার রচনার প্রধান বিষয় হল দারিদ্র্যে নিষ্পেষিত অবদমিত কাম। মির্জা আবদুল হাই গ্রাম্য জীবনের আবর্তে ভেঙে-পড়া মূল্যবোধগুলোর জন্য হা-হুতাশ করছেন। তাদের আমরা জীবনের সমালোচক বলতে পারি।

মুক্তিযুদ্ধকে যারা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নির্ণায়ক ঘটনা বলে মনে করে কিছু সাহিত্য রচনায় উদ্যোগী হয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক তাদের অন্যতম। তবে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সামাজিক দিক-নির্ণায়ক এ যুদ্ধের গভীর অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে উপলব্ধি না করে শুধু ঘটনা সজ্জিত করলে তা ক্ষণকালীন রচনায় পর্যবসিত হবে বলে আমার ভয়। হাসান আজিজুল হক একজন গভীর জীবনবাদী শিল্পী। তার আদর্শমুখিনতা তিনি গোপন করেন না। তবে তার গদ্যভঙ্গি জীবনবর্ণনার উপযোগী কিনা, সে প্রশ্ন না জেগে পারে না। তবু তার কিছু গল্প আমাদের জীবনবোধসম্পন্ন গদ্যের সম্পদ।

আবদুল মান্নান সৈয়দ মূলত কবি। তার ছোটগল্পে কাব্যের উপমা জীবনযাপনকে ব্যাখ্যা করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। একমাত্র মান্নানের গল্পেই আছে সাহসের সঙ্গে আধুনিক জীবনকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস জীবনবাদী শিল্পী না হলেও জীবনের একটা বিমূর্ততা তার উপজীব্য বিষয়।

মাহমুদুল হক রোমান্টিক। তিনি গদ্যে কবিতার কাজ করতে চান। এটি কবিদের গদ্য রচনায় সম্ভবপর হলেও ট্রাডিশনাল গদ্য লেখকদের পক্ষে দুরূহ ব্যাপার। এই হল সাম্প্রতিক সাহিত্যে জীবনশিল্পীদের একটি তাৎক্ষণিক বর্ণনা।

[শিল্পতরু, প্রথম বর্ষ একাদশ সংখ্যা জানুয়ারি ১৯৮৯, মাঘ ১৩৯৫]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter