ভয়েজেস ফ্রম চেরনোবিল

পরমাণু যুদ্ধের পরের পৃথিবী

  জাহেদ সরওয়ার ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই বহু প্রগতিশীল লেখক, শিক্ষক ও বৈজ্ঞানিকরা মিলে পরমাণু বোমা উৎপাদন বন্ধ করার জন্য দুনিয়াজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর নেতৃত্ব দেন দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল, বিজ্ঞানী নিলস বোরসহ আরও অনেক গুণীজন। কিন্তু ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তারা পেরে ওঠেননি। ওসবে কিছুই হয়নি। পরমাণুবোমা তৈরির পেছনে যাদের অবদান ছিল, তাদের মধ্যে আইনস্টাইনের পরেই পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম নিলস বোর। তিনি পরমাণু বোমার উৎপাদন বন্ধে চার্চিল ও রুজভেল্টের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দু’জনের কেউই তাতে কর্ণপাত করেননি। রুজভেল্টের মৃত্যুর পর দেখা গিয়েছিল বোরের লেখা আবেদনপত্রটি তার ডেস্কেই পড়ে আছে এবং খামের মুখ তখনও খোলা হয়নি। আর পৃথিবী এখনও ভাসছে পরমাণু ও তৎপরবর্তী আরও আধুনিক হাউড্রোজেন বোমার ওপর। এই পরমাণু বোমাবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের যে অভিজ্ঞতা সেটা রাসেল তার ‘মানুষের কি কোন ভবিষ্যৎ আছে’? নামের বইতে বিস্তারিত বয়ান করেছেন। কারণ ছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকির পরমাণুবোমার ভয়াবহতা। দ্বিতীয় পরমাণবিক বিস্ফোরণের শিকার হল বেলারুশ তথা প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল পারমাণবিক চুল্লি বিস্ফোরণের কারণে। এটির তেজস্ক্রিয়তার ভয়াবহতা বা ক্ষয়ক্ষতি ছিল আরও মারাত্মক।

সোয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচ বেলারুশের লেখক। তিনি ২০১৫ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এই বইটি চেরনোবিল দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ও জড়িয়ে থাকা অজস্র শ্রেণী-পেশার নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকার। আর এই সাক্ষাৎকারের ভেতর দিয়ে বাগ্ময় হয়ে উঠেছে পরমাণু আক্রান্ত এলাকা ও তার মানুষের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। নোবেল পুরস্কার সব সময় আলোচিত হয়েছে, সমালোচিত হয়েছে তার রাজনৈতিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। আমরা দেখেছি তলস্তয় বা দস্তইয়েভস্কিকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়নি কারণ তারা ছিলেন রাশিয়ার আত্মা। কিন্তু এন্টি সোভিয়েত আলেকজান্ডার সলোঝিনিৎসিন, ইভান বুনিন, বরিস পাস্তারনাক, জোসেফ ব্রদস্কি ও সবশেষে সোয়েতলানাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। এদের নোবেল পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বে সোভিয়েত অমানবিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। এটা একটা রাজনীতি।

বুঝলাম সোভিয়েত সমাজতন্ত্র খুব খারাপ, কিন্তু মার্কিন অধ্যুষিত গণতন্ত্র গোটা দুনিয়াজুড়ে কী করছে?

সোয়েতলানার এই বই যেন পরমাণু যুদ্ধের পরের দুনিয়ার বয়ান। সেটা ঠিক আছে, কিন্তু মাঝে মাঝে এই ইন্টারভিউগুলোর ভেতর দিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। সোয়েতলানা নিজেই বলেছেন, তিনি সমষ্টি নয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পক্ষে। আর সামষ্টিক কোনো কিছু না হলে সামগ্রিক মানুষের জীবন বদলানো যাবে না। ব্যক্তি একা অসহায়, প্রকৃতির কাছে। তবে একক ব্যক্তি পুঁজিবাদের কাছে খুব আকর্ষণীয় পণ্য। পুঁজিবাদ বলবে, মানুষ একা কোথায়? তার সঙ্গে রয়েছে অজস্র পণ্য।

‘মানুষের কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে’ বইয়ে রাসেল মন্তব্য করেছিলেন, ‘আশা করা যায় এবং এটা কোনো আকাশকুসুম আশা নয়, যে রাশিয়ার সরকার উপলব্ধি করবেন এ ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের অর্থ হবে তাদের নিজেদের এবং সেই সঙ্গে অন্য সবার ধ্বংস ডেকে আনা’। কিন্তু আমেরিকার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রেখে পৃথিবীর অন্য সব রাষ্ট্রকে পারমাণবিক অস্ত্রবিরতিকরণ এক ধরনের প্রহসন মাত্র। আর তাই এই প্রতিযোগিতা চলবেই।

যাই হোক, তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র্রে ২৬ এপ্রিল, ১৯৮৬ তারিখে সংঘটিত ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনাটি চেরনোবিলের বিপর্যয় হিসেবে পরিচিত। এই পারমাণবিক দুর্ঘটনাকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়। দুর্ঘটনার জন্য কর্তব্যরত কর্মীদেরই দায়ী করা হয়ে থাকে। কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা বন্ধ করা ছিল এবং পারমাণবিক চুল্লিটি অনুপযুক্ত অবস্থায় চালানো হচ্ছিল, যার ফলে শক্তি নির্গমন অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিল। আবার, একটি গবেষণায় বলা হয়েছে কর্মীদের রাতের শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে সার্বিক ব্যবস্থাপনাও দায়ী। এ কারণে ৩ জনকে ১০ বছরের শাস্তি প্রদান করা হয়েছিল। তবে বিস্ফোরণের পূর্বে কর্তব্যরত কর্মীরা উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারতো। তারা চুল্লিটি বন্ধ করে দিতে পারতো। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি বন্ধের এখতিয়ার তাদের ছিল না। যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চুল্লি বন্ধের নির্দেশ দিতে পারতো এত রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহসও নিযুক্ত কর্মীদের ছিল না। ফলে তাদের চোখের সামনেই দুর্ঘটনটি অনিবার্য হয়ে ওঠে। ঘটনার সময় চেরনোবিলে প্রায় ১৪ হাজার বসতি ছিল। দুর্ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই ৪ জন কর্মী মারা যান। পরবর্তীকালে ২৩৭ জন মানুষ পারমাণবিক বিকিরণের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং প্রথম তিন মাসে ৩১ জন মৃত্যুবরণ করে, যাদের অধিকাংশই উদ্ধারকর্মী। সরকারি তথ্যমতে, দুর্ঘটনার কারণে প্রায় পঞ্চাশ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ছিল ৭ লাখ শিশু। এই দুর্ঘটনার ফলে ক্ষতির পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন ডলারের সমান। বর্তমানে চেরনোবিল শহরটি পরিত্যক্ত এবং প্রায় ৫০ মাইল এলাকাজুড়ে বলতে গেলে কেউ বাস করে না।

ইতিহাসের পাতা থেকে অধ্যায়ে সোয়েতলানা বলেন, বেলারুশের জন্য এটা ছিল একটা জাতীয় দুর্যোগ পরিস্থিতি। ছোট্ট দেশ, জনসংখ্যা ১ কোটি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি যোদ্ধারা বেলারুশের ৬১৯টি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়, হত্যা করে গ্রামবাসীকে। চেরনোবিল দুর্ঘটনায় ৪৮৫টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বেলারুশের জনসংখ্যা হ্রাসের প্রধান কারণই এখানকার তেজস্ক্রিয়তা। ... বেলারুশের একটা বড় অংশ বনভূমি। শতকরা ২৬ ভাগ বনভূমি তেজস্ক্রিয় ভূমিতে পরিণত হয়। বছরের পর বছর ধরে স্বল্পমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ছে এ সব এলাকায় আর প্রতি বছরই বাড়ছে আক্রান্ত মানুষের ক্যান্সার, মানসিক প্রতিবন্ধকতা, স্নায়ু বৈকল্য ও জিনগত পরিবর্তনের হার’।... পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও রোমানিয়ায় উচ্চমাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ে ঘটনার তিনদিন পর। এরপর ধরা পড়ে উত্তর ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে। মে মাসের ৫ তারিখে পাওয়া যায় ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন ও উত্তর গ্রিসে। মে’র ৩ তারিখ ইসরাইল, কুয়েত ও তুরস্কে। তেজস্ক্রিয় অণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। ২ মে জাপানে। ৫ মে ভারত, আমেরিকা, কানাডায়। সপ্তাহ না ঘুরতেই চেরনোবিল পুরো বিশ্বেও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো।’

আসলে এটাই, পরামাণু অস্ত্রের বড় বিপদ। এটা কোনো একটা এলাকাকে ধ্বংস করবে না। না কোনো দেশ। এটা বাতাসের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে গোটা দুনিয়াজুড়ে। সোয়েতলানার সাক্ষাৎকারগুলোতে প্রায় বেলারুশের নাগরিকরাই অবাক বা বিস্মিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। কারণ পরমাণুর তেজস্ক্রিয়া সম্পর্কে তাদের তেমন ধারণা ছিল না। তাই তাদের যখন বসতি উচ্ছেদ করা হচ্ছিল তখন তারা যারপর নাই ভুল বোঝে প্রশাসনকে। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতিতে প্রশাসন কী করতে পারে? এত মানুষ এত তাড়াতাড়ি কীভাবে সরিয়ে নেয়া সম্ভব? আর তাই করতে হয়েছিল পরমাণু সংক্রমণ রোধ করতে। শত শত মানুষকে গৃহহারা জমিহারা হতে হয়েছিল। পুরো অঞ্চলে মাটি উপড়ে ফেলা হয়েছিল। সমস্ত গৃহপালিত পশু বিড়াল, দুধের গাই, খরগোশ, কুকুর হত্যা করা হয়েছিল। ছোট ছোট প্রাণীগুলো এমনিতেই মারা পড়েছিল ধুঁকে ধুঁকে। মানুষগুলোকে ফেলে যেতে হয়েছিল তাদের আপেল বন, ফসল তোলার আগে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি। এমনকি তেজস্ক্রিয়তার দরুন নিত্যব্যবহার্য পোশাকাদিও তাদের ফেলে যেতে হয়েছে।

এ যেন যুদ্ধ পরিস্থিতি কিন্তু কেউ জানে না এই যুদ্ধে তাদের শত্রু কে। পরমাণু যুদ্ধের আশংকাটাই এমন যে, একটা বোমা ফাটবে মানুষ নীরবে মরবে। শুধু মানুষ না, উদ্ভিদ, পশু, পাখি, নদী, মাছ, পানি, মাটি সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। চেরনোবিল আমাদের সেটাই দু’চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

সোয়েতলানার সাক্ষাৎকারগুলোর ভেতর দিয়ে চেরনোবিলের পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার পাশাপাশি তৎকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন প্রক্রিয়া ও শরিক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চলমান জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও তার নির্মমতার বিভিন্ন দিকও উঠে আসে। সোয়েতলানা বলেন, মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে এখানে আসছে। আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, আব আজিয়া, তাজিকিস্তান, চেচনিয়া যেখানেই যুদ্ধ চলছে সেখান থেকেই হাজারে হাজারে রুশ শরণার্থী এসে ভিড় জমাচ্ছে এখানে, এই পরিত্যক্ত ভূমিতে। পরিত্যক্ত যে সব বাড়ি ধ্বংস করা হয়নি সেখানে উঠছে শরণার্থী পরিবারগুলো। রাশিয়ার বাইরে যে প্রায় আড়াই কোটি রুশ বাস করত, তারা সব এখানে এসে ভিড় জমিয়েছে। এখানকার মাটি, পানি, বাতাস সব যে দূষিত, এ সব যে তাদের মেরে ফেলতে পারে এ কথা ওরা বিশ্বাসও করে না। ওরা আছে সেই পুরনো কিচ্ছা নিয়ে- যার মুখোমুখি হয়ে তারা এখানে এসেছে। আর তা হল- মানুষ মানুষকে গুলি করে মারছে।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.