যে পাখি কাঁদে

  আহমেদ বাসার ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রক্তাক্ত শরীরে কতক্ষণ পড়ে থাকা যায়? এক ঘণ্টা... দুই ঘণ্টা... সম্ভবত তিন ঘণ্টা নিথর হয়ে পড়ে আছে তিথি। এখন কি ফাগুন মাস? নাকি শীতের কোনো রাত? কোথা থেকে ভেসে আসছে এক নিঃসঙ্গ পাখির আর্র্তনাদ? পাখিটি কেঁদে যাচ্ছে... কেঁদেই যাচ্ছে। চিৎ হয়ে অনেকক্ষণ পড়ে থাকায় পিঠে যেন শিকড় গজিয়ে যাচ্ছে। সর্র্বশক্তি দিয়ে একদিকে কাত হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্র্থ হয় তিথি। নিরুপায় হয়ে হাল ছেড়ে পড়ে থাকে। এদিকে মানুষজন খুব একটা পা বাড়ায় না। একে তো পরিত্যক্ত জায়গা, তার ওপর জঙ্গলে ভরা। কে আসবে এখানে বিপদে পড়তে। তিথিও আসতে চায়নি। এখানে আসার একমুহূর্র্ত আগেও সে ধারণা করতে পারেনি এরকম একটা বিশ্রী জায়গায় এত নগ্নরূপে নিজেকে আবিষ্কার করবে। অর্র্কর সঙ্গে পহেলা বৈশাখ বেশ আঁটসাঁট করে কেটেছিল তার। রাত আটটা অবধি এদিক-সেদিক হৈ হুল্লোড় করে অর্র্ককে বিদায় জানিয়ে রিকশায় উঠেছিল। তখনও তার শরীরে জড়ানো ছিল লাল পাড় দেয়া সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ, হাতে লাল সাদা কম্বাইন্ড কালারের রেশমি চুড়ি আর গলায় মাটির রকমারি লকেট। তিন রাস্তার মোড়ে আসতেই হঠাৎ থেমে যায় রিকশার গতি। প্রথমে তিথি বুঝতেই পারেনি। আসলে সে সারাদিনের ঘটনাবলির স্মৃতিচারণের মধ্যে ডুবে ছিল। চারজন যুবক যখন তাকে টেনে হেঁচড়ে রিকশা থেকে নামায় তখন সে কিংকর্র্তব্যবিমূঢ় হয়ে কয়েকবার চিৎকার করে। কিন্তু ওরা তার মুখ চেপে ধরে পাশেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাইভেট কারে টেনে তোলে। প্রাইভেট কারটি দ্রুত চলতে থাকে। যুবকদেরই একজন চালকের আসনে বসে গাড়ি চালাতে থাকে। বাকি তিনজন পেছনে বসে তিথির মুখ চেপে ধরে রাখে। কেউবা তার হাত চেপে ধরে রাখে। কারণ তিথি খুব হাত ছোড়াছুড়ি করছিল। ঘণ্টাখানেক গাড়ি ড্রাইভ করে ওরা খুব নির্র্জন একটা জায়গায় এসে গাড়ি ব্রেক করে। একজন প্রথমে নেমে একবার চারদিক পর্র্যবেক্ষণ করে গ্রিন সিগনাল দিলে অন্যরা তিথিকে টেনে গাড়ি থেকে নামায়।

জায়গাটি তিথির কাছে একেবারেই অপরিচিত মনে হয়। আগে কখনও এদিকে এসেছে কিনা মনে করতে পারে না। অর্র্ককে নিয়ে তিথি শহরের অলিগলি চষে বেড়িয়েছে। প্রায় সব জায়গায়ই তার ভালোভাবে চেনা। অর্র্ক অবশ্য কিছুটা ভীতু প্রকৃতির। নতুন কোনো জায়গায় গেলেই আড়ষ্ট হয়ে থাকে। তিথির পীড়াপীড়িতেই বাধ্য হয়ে তাকে নানা জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। অবশ্য এই ভীতু প্রকৃতির জন্যই তিথি তাকে পছন্দ করে। তার মনে হয় এ ধরনের ছেলেকে কন্ট্রোল করা সহজ। আর অ্যাডভান্সারাস হওয়ায় তিথিকে দারুণ পছন্দ অর্র্কর। তিথি এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্র্স ফাইনাল ইয়ারে উঠেছে। সাহিত্যের ছাত্রী। তাই যথেষ্ট কল্পনাপ্রবণ আর রোম্যান্টিক প্রকৃতির। অর্র্ক একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্র্সে পড়ছে। সাহিত্যের ছাত্র না হলেও বেশ রোম্যান্টিক ও স্বাস্থ্যবান। অবশ্য তার চেয়েও বহু সুদর্র্শন ছেলে তিথির প্রণয়প্রার্র্থী ছিল। শেষ পর্র্যন্ত তিথি কেন যে তাকেই বেছে নিলো তা সে আজও ভেবে পায় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছেলের স্বপ্নের নারী হয়ে উঠেছিল তিথি। ভর্র্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সবার চোখে পড়ে গিয়েছিল। অপূর্র্ব দেহসুষমা আর লাস্যময়ী ভঙ্গি ছেলেদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। যেন শরীরে এক উত্তাল সমুদ্র নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামেও তাকে সামনের সারিতে দেখা যায়। ফলে অনেকের শত্র্রুও হয়ে উঠেছিল নিজের অজান্তে। নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় অচেনা নাম্বার থেকে তাকে বেশ কয়েকবার হুমকি দিয়ে খুদে বার্র্তাও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তিথি এসব হুমকি ধামকি থোড়াই কেয়ার করেছিল। কারণ তার কাছে মনে হয় কোনো ম্যাচির্উড পুরুষ কখনও এ ধরনের আচরণ করতে পারে না। ধর্র্ষণ এক ধরনের মানসিক ব্যাধি ছাড়া কিছু না। কখনও তা ক্ষমতার, কখনওবা নিজেকে সক্ষম প্রমাণ করার অক্ষম আস্ফালন। কিন্তু নিজের জীবনে এমন এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তাকে হতে হবে তা সে ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করতে পারেনি।

চারজন যুবক তাকে টানতে টানতে জঙ্গলভরা নির্র্জন স্থানের গভীরে নিয়ে যেতে থাকে। প্রথম দিকে কিছুটা জোরাজুরি করলেও তিথি এরপর হাল ছেড়ে দেয়। এই নির্র্জন উপত্যকায় চিৎকার করে লাভ কী? মনে মনে সে নিজেকে শক্ত করে তোলার চেষ্টা করে। একজন একটি হালকা আলোর টর্র্চ জ্বেলে পথ দেখছিল। সেই আলোতে তিথি একবার চারজনের মুখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। এতক্ষণ সে একবারের জন্যও কারও মুখের দিকে তাকায়নি। ভেতরে ঘৃণার এক আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছিল তার। এদের মুখের দিকে তাকিয়ে এবার বিস্ফোরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। তিনজনের বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশের কোঠায় আর একজন চল্লিশ পার করেছে সম্ভবত।

এদের কারও নামই সে জানতে পারেনি। প্রত্যেকে এক ধরনের সাংকেতিক নাম ব্যবহার করছে। সাংকেতিক নামগুলোও তার কাছে অদ্ভুত মনে হয়েছে। ঈগল, গোখরা, কচ্ছপ আর টাইগার। অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লোকটাকে সবাই কচ্ছপ ডাকছে। অন্য সংকেতগুলো কোনটি কার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে তা সে ঠিক আঁচ করতে পারছে না। তবে যে ছেলেটি একটু বেশি তেজী সম্ভবত তাকে টাইগার ডাকা হচ্ছে। গাড়িতে সে তিথিকে কয়েকবার কষে চড় মেরেছিল। আচরণ দেখে মনে হচ্ছে এরা বেশ পেশাদার। কারণ আনকোরা কারও পক্ষে নিজেদের পরিচয় এতক্ষণ লুকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া মুহূর্র্তের মধ্যে এরা যা করেছে তাতেও প্রমাণিত, এ কাজে এরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ।

কিন্তু তিথি কেন এদের টার্র্গেটে পরিণত হল তা সে একবার ভেবে দেখার চেষ্টা করে। কয়েকজন প্রভাবশালী ছেলের প্রেমের প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছিল, যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক সিলমারা ব্যক্তির ছত্রছায়ায় থাকে। তারা কি ঈর্র্ষান্বিত হয়ে এ কাজ করাতে পারে? নাকি অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় তাকে থামানোর জন্য এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছে কেউ? কিছুতেই সে হিসাব মেলাতে পারে না।

প্রায় আধাঘণ্টা হাঁটার পর জঙ্গলের মাঝামাঝি একটা ফাঁকা প্রশস্ত জায়গায় এনে তাকে ছুঁড়ে ফেলে ওরা। দুই হাত পেছনে গিয়ে তিথি তাল সামলাতে না পেরে চিৎ হয়ে পড়ে যায়। শরীরের ওপরের অংশ থেকে শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে প্রায় অর্র্ধনগ্ন হয়ে পড়ে তিথি। পুরো শরীর তার থরথর করে কাঁপছে। যতটা না ভয়ে তারচেয়ে বেশি ঘৃণায়। সেই তেজী টাইগার তার খুব পাশ ঘেঁষে বসে। বয়স্ক কচ্ছপ বুকের বাঁপাশ ঘেঁষে কী যেন শুঁকতে থাকে। আর বাকি দুজন দুপায়ের গোড়ালির কাছে হেলান দিয়ে বসে। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা না বলে তিথির শরীরের ওমে যেন বিশ্রাম নিতে থাকে। অনেকক্ষণ হাঁটার কারণে ওরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তিথিরও হাত-পা ভেঙে ভেঙে আসছিল। কচ্ছপ ধীরে ধীরে তিথির বুকের ওমে মুখ ডোবাতে চায়। সজোরে ধাক্কা দিয়ে তিথি তাকে সরিয়ে দেয়। তেজী টাইগার এবার বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ক্ষিপ্র হাতে তিথিকে প্রায় নগ্ন করে ফেলে। বাকিদের কাছে তখন সে রীতিমতো ময়দার বস্তার মতো হয়ে ওঠে। যেন যেভাবে খুশি সেভাবে তাকে দলা পাকানো যায়। শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে থাকে তিথি। কচ্ছপই এরপর মূল কাজটা শুরু করে মূলত। বাঁধা পেয়ে তার ভেতরে ক্রোধ আর আক্রোশ হঠাৎ বেড়ে উঠেছে। গোড়ালির কাছে বসে হঠাৎ সে মাতালের মতো আচরণ করতে থাকে। তারপাশে বসে অন্যরা ততক্ষণে একটি কাচের বোতল খুলে ডগডগ করে কী যেন পান করতে থাকে। কচ্ছপ যখন মাতালের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, অন্যরা তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তিথি সর্র্বশক্তি দিয়ে একবার চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু মুখ দিয়ে শুধু ব্যাঙের গোঙানি বেরিয়ে আসে। কচ্ছপ প্রায় আধাঘণ্টা তার ওপর পতঙ্গের মতো লেগে থাকে।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটি নিঃসঙ্গ পাখি ডেকে ওঠে। ডাকছে নাতো কাঁদছে। তিথি স্পষ্ট শুনতে পায় পাখিটি গুঙিয়ে গুঙিয়ে কাঁদছে। কিন্তু এই পশুগুলোর উন্মাদনা থামার কোনো লক্ষণ সে খুঁজে পায় না। মনে হয় তার শরীরে একের পর এক উত্তপ্ত লৌহখণ্ড বিঁধে চলেছে অনর্র্গল। পুড়ে যাচ্ছে তিথি। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে আসে অর্র্কর বিবর্র্ণ মুখ। কাল তার সঙ্গে জল-জঙ্গলের কাব্যে বেড়াতে যাওয়ার কথা। ভেসে আসে মায়ের চিন্তিত মুখ। তার জন্য নাকি আজকাল বাড়িতে পাত্রপক্ষের আনাগোনা বেড়ে চলেছে। অর্র্কর সঙ্গে সম্পর্র্কের কথা সে বাড়িতে কাউকে জানায়নি। তাই তার বিয়ে নিয়ে বাবা-মা বেশ তৎপর হয়ে উঠেছেন। মেয়ে বড় হয়েছে। কখন কী হয় এ নিয়ে তাদের চিন্তার অন্ত নেই। বাবা প্রেশারের রোগী। সামান্য কোনো দুঃসংবাদ শুনলেই তার প্রেশার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। পাখিটির কান্না প্যাঁচিয়ে প্যাঁচিয়ে ক্রমাগত আকাশমুখী হয়ে উঠেছে।

প্রায় চারঘণ্টা তাকে দুমড়ে মুচড়ে রক্তাক্ত করে তোলে পশুগুলো। শরীরের একটি রোমকূপও ওদের হিংস্র আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। সব রন্ধ্রজুড়ে ওদের দানবীয় উল্লাস টের পাচ্ছে তিথি।

ওকে খুন করবে কিনা তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে ওরা। একজন বলে- ‘রক্তক্ষরণে এমনিতেই মারা পড়বে।’ কিন্তু অন্যরা রিস্ক নিতে চায় না। তেজী টাইগার ধারালো ছোরা দিয়ে ওর পায়ের রগ কেটে দেয়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে তিথি। বুকের ভেতর অচেনা পাখিটির আর্র্তনাদ শুনতে পাচ্ছে সে। পাখিটির প্রতিটি রোমকূপ রক্তক্ষত।

যুবকেরা ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। তাদের উল্লাসধ্বনি তার কর্র্ণকুহরে সূচের মতো এসে বিঁধছে। টলমল পায়ে ওরা নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে থাকে। তিথির ভেতরের নিঃসঙ্গ পাখিটি কেঁদেই যাচ্ছে। পাখিটি কেন কাঁদছে কে জানে...

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter