উপন্যাস বিষয়বস্তু ও লিপিকৌশল

কাহিনীর দৃশ্যমান পৃথিবীকে দেখা হয় নায়কের চোখ দিয়ে। অনেক সময় লেখক নিজেই তা বায়ন করেন। কিন্তু এও তো ঠিক যে, নায়ক চরিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই অনেকাংশেই লেখকের আদলে গঠিত। ফিটজেরাল্ড, হেমিংওয়ে, সৈয়দ হক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের লেখায় এটা আমরা বারবার দেখেছি

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সরকার মাসুদ

বিশ্বব্যাপী উপন্যাস লেখা হচ্ছে প্রচুর। তার সংখ্যা এবং জনপ্রিয়তা বোধ হয় অতীতের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নানা দেশে যেসব নামি-দামি সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়ে থাকে তারও একটি বিরাট অংশ যায় উপন্যাসের ঝুলিতে।

আধুনিক বিশ্বে উপন্যাস রচয়িতার মার্যাদাও অনেক বেশি এতে কোনো সন্দেহ নেই। পুঁজিবাদী সমাজের ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের নানা সংকট, ঘাত-প্রতিঘাত, আবেগ-উৎকণ্ঠা, ভালো-মন্দ উপজীব্য হয়েছে উপন্যাসের।

বহু যুগ ধরে লেখকরা এই বিষয়টি নিয়েই লিখে চলেছেন। শুধু ক্ষেত্র-বিশেষে তার প্রকাশভঙ্গির রকমফের হয়েছে ও হচ্ছে। পশ্চিমা সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, উপন্যাস তার দায়িত্ব পালন করেছে। তার যা কিছু দেয়ার ছিল সে দিয়েছে। কয়েক বছর আগে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, উপন্যাসের নতুন আর কিছু বলার নেই। সব কথা বলা হয়ে গেছে।

কিন্তু উপন্যাস লেখার কাজ তো থেমে নেই, বরঞ্চ তা আরও বেগবান হয়েছে। মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা অশেষ। আর তা খুব বিচিত্রও বটে। লেখক মানুষ তার সেই সব অভিজ্ঞতাকেই বাণীরূপ দেন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী। সুতরাং অদূর ভবিষ্যতে উপন্যাসের মৃত্যু ঘটবে এমনটা মনে হয় না। নানা অসঙ্গতি ও দুর্বলতা সত্ত্বেও পুঁজিবাদী সমাজ টিকে আছে এখনও।

অতীতের একটা দৃষ্ঠান্ত আশা করি প্রসাঙ্গিক হবে। আমরা দেখেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকাকালে সেই যৌথ ব্যবস্থাধীন নিয়মের নিগড়ের মধ্যেও ব্যক্তি তার মনোভাব প্রকাশ করতে পেরেছে। অজস্র উপন্যাস রচিত হয়েছে সেখানে। তার ভেতর অনেকগুলোই বেশ ভালো মানের।

উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু মোটামুটি এক হলেও প্রতিভাবান কথাসাহিত্যিক তার বক্তব্য পেশ করার জন্য নিজের পথ খুঁজে নেন। এই কাজ তিনি এমনভাবে সম্পন্ন করেন যে, তার বলার কথাটি খুব নতুন কিছু না হলেও পাঠকের কাছে তা নতুন মনে হয়। সাহিত্যের এও এক কৌশল। আসলে কৌশলী হতে না পারলে টিকে থাকা সম্ভব নয়, কোনো ক্ষেত্রেই।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে লিপিকৌশল খাপ খাওয়ানোর ব্যাপারও আছে। আমরা যে ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজে বাস করি তার বহু কিছুই আমাদের মনপুত নয়। সেই সমাজব্যবস্থার আমরা নিন্দা বা সমালোচনা করি। আবার তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে জীবনযাপনও করি। কিন্তু যে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই যাই না কেন, আমরা কি তেমন কিছু কল্পনা করতে পারি যার সঙ্গে বাস্তবের যোগ নেই? কথাসাহিত্যিক কখনও তার প্রচ্ছন্ন কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না।

সুতরাং উপাজীব্য বিষয়বস্তুর মধ্যে মিশে থাকে তার আশা-আকাক্সক্ষা, ভাবানুভূতি ও জীবনদৃষ্টি। এ জন্য কৃতী কবিরা যেমন পরিণতমনস্ক হওয়ার পর বাকি জীবন বিভিন্ন নামে মূলত একটি কবিতাই রচনা করেন, তেমনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিকও একই ধরনের কাজ করে থাকেন।

আমরা যদি তলস্তয়, বালজাক, ডিকেন্স, শরৎচন্দ্র, গ্রাহামগ্রিন, মিলান কুল্ডেরা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যয়, অভিজিৎ সেন প্রমুখ লেখকের কাজের কথা ভাবি তাহলে দেখবো এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন নামে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আসলে একই জিনিস লিখেছেন। লেখকের মনের গঠন একটা বিরাট ব্যাপার।

এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এরকম এক বা একাধিক বিষয়বস্তু বেছে নিয়ে উপন্যাসিক কাজ করেন। এভাবে তিনি তার সৃজনী সত্তার রূপ-রঙ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হন। এ কারণেই আমরা দেখি, বড় লেখকগণ লিপিকৌশল ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর জন্যও একজন আরেকজনের থেকে কত আলাদা।

উপন্যাস লিখবার অনেক পদ্ধতি আছে। বহু লেখক নিজেই উত্তম পুরুষে গল্প বলে যান। আবার দেখা যায়, গল্পের নায়ক নিজে উত্তম পুরুষ হিসেবে কথকের ভূমিকা নেন। ঈশ্বর যেমন সব জানেন, জেনেও নিরাসক্ত তেমনি একটা দৃষ্টিভঙি ব্যবহার করেও কথাসাহিত্য রচনা সম্ভব। যেমনটা হয়েছিল তলস্তয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর বেলায়; হাসান আজিজুল হকের ‘আমৃত্যু আজীবন’ ‘জীবন ঘষে আগুন’ প্রভৃতি লেখায়। ওয়ালীউল্লাহ উপন্যাসে যে কথা এবং যেভাবে লিখেছেন ইলিয়াস তার থেকে অনেক আলাদা।

শহীদুল জহির সম্বন্ধে কি বলবো? তিনি অতীন, ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হকদের মতো ভারি ভারি থিম নিয়ে লেখেননি। কিন্তু তার ভাষাবোধ? কথাসাহিত্যের যে ভাষা তিনি আবিষ্কার করলেন তার তো জুড়ি নেই। আর এমন গল্প বলিয়ে আমরা কোথায় পাবে? এরকম আলাদা, সুখপাঠ্য ও হৃদয়গ্রাহী উপন্যাসকার গোটা বিশ্বেও কি খুব বেশি আছে, আধুনিক যুগে?

উপন্যাস তো জীবনের আলেখ্য। কাহিনীর দৃশ্যমান পৃথিবীকে দেখা হয় নায়কের চোখ দিয়ে। অনেক সময় লেখক নিজেই তা বায়ন করেন। কিন্তু এও তো ঠিক যে, নায়ক চরিত্রটি অনেক ক্ষেত্রেই অনেকাংশেই লেখকের আদলে গঠিত। ফিটজেরাল্ড, হেমিংওয়ে, সৈয়দ হক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের লেখায় এটা আমরা বারবার দেখেছি। এরা ঠিক চরিত্রপ্রধান উপন্যাস লেখেননি যেমনটা লিখেছেন তলস্তয়, ডস্টয়ভস্কি, হেনরি, জেমস, টমাস হার্ডি, শরৎচন্দ্র বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। কেউ কেউ হয়তো ‘ওন্ড ম্যান অব দ্য সি’-এর বুড়ো মাছশিকারী কিংবা স্কট ফিটজেরাল্ডের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দিস সাইড অফ প্যারাডাইস’-এর নায়কের কথা তুলতে পারেন। কিন্তু আমার মনে হয় এসব গ্রন্থে নায়ক চরিত্রের চেয়ে জীবনের পরিস্থিতির বয়ানই বেশি গুরুত্ববহ। ডিকেন্স, বালজাক, শরৎচন্দ্র, সতীনাথ, সমরেশ বসুর মতো লেখকরা উপন্যাসে গল্পকে অন্যভাবে বললেও বিষয়বস্তুকে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই গল্প কিভাবে বলা হল সেটা এদের ক্ষেত্রে গৌণ।

বাংলাদেশে দেখি, আলাউদ্দীন আল আজাদ, বুলবুল চৌধুরী, মাহমুদুল হকরা একই কাজ করেছেন। বুলবুল চৌধুরীর কথা আলাদাভাবে বলতে চাই। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আর পোড়খাওয়া নানারকম মানুষের গল্প তার উপন্যাসের প্রধান সম্পদ। এই গল্প বয়ানের জন্য তিনি বিশেষ কোনো কায়দার আশ্রয় নেন না, অর্থাৎ আঙ্গিক তার লেখার প্রধান বিষয় নয়। সেদিক থেকে তিনি একটু প্রথাগত।

কিন্তু সেটা কোনো বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয় না। বুলবুলের গল্পের ভুবন এবং কথাগদ্য নিজেই লেখকের স্বরুচিসম্মত একটা স্টাইল তৈরি করে দিয়েছে।

আমরা যদি তার ‘মরম বা খানি’, ‘তিয়াসের লিখন’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’ উপন্যাসগুলোর ভেতরে প্রবেশ করি তাহলে দেখতে পাব সেই জিনিস- জীবনের সেই অনিবার্য গল্প, বিশ্বাস্যতা ও হৃদয়গ্রাহীতা যাকে উন্নীত করেছে গড়পড়তা সাহিত্য থেকে।

জীবনকে ভাব-কল্পলোকে উন্নীত করাই হচ্ছে লেখকের কাজ। সবকালেই প্রধান উপন্যাসিকগণ এ কাজটি সূচারুভাবে সম্পন্ন করেছেন। ভূ-দৃশ্য বা গার্হস্থ্য জীবনের ছবি নয় কেবল, দৃশ্যমান বস্তুর আড়ালের বিশেষ সৌন্দর্য বের করে আনাও বড় মাপের লেখকের কাজ। তবে তাকে সার্থক করে তোলার জন্য চাই কবির চোখ ও হৃদয়।

মার্শেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস, হেনরি জেমস, মিলান কুন্ডেরা, ওরহান পামুক তাদের উপন্যাসের ভেতর দিয়ে দেখাতে পেরেছেন কিভাবে এটা করা সম্ভব। সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দীন আল আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, বুলবুল চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, কায়েস আহমেদ প্রমুখ আমাদের প্রধান কথাসাহিত্যিক।

লেখক হিসেবে তাদের প্রত্যেকের গুণপনার ধরনও আলাদা। কিন্তু ওই ‘কবির চোখ’ থাকার কারণে আলাউদ্দীন আল আজাদ বা হাসান আজিজুল হকের মতো দু’চারজন সাহিত্যিকের লেখা একটা ভিন্ন মাত্রা অর্জন করতে পেরেছে।

শৈল্পিক নৈপুণ্যের প্রশ্নে আমরা লেখকের অভিজ্ঞতা ও বাক্যপ্রয়োগের মুনশিআনার কথা বলি। যদি নিতান্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে দেখি, তাহলে যে কোনো বই বাক্যের সমষ্টি ছাড়া কিছু নয়।

কাজেই শব্দের অপপ্রয়োগ, বাক্যের অতিপ্রয়োগ এসব বিষয়ে লেখককে সচেতন হতেই হয়। সে জন্য তাকে মাতৃভাষায় পণ্ডিত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই, কিন্তু তার লাগবে সেই সাহিত্যিক কাণ্ডজ্ঞান যা থাকলে একজন কথাশিল্পী স্বাধীনতা নেয়ার সাহস দেখাতে পারেন। নতুন অর্থে পুরনো শব্দ ব্যবহার করাসহ আরও অনেক কিছু করতে পারেন, এমনকি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যাকরণকেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় তার পক্ষে।

অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে তিনজন বিদেশি লেখকের কথা বলব। এক. ডিকেন্স, দুই. বালজাক, তিন. জ্যাক লন্ডন। ডিকেন্সের বইপত্র পড়ে মনে হয়, লন্ডন শহরকে তার চেয়ে ভালো করে কেউ বুঝতে পারেননি। বালজাকের বাস্তবতাজ্ঞান এত প্রখর ছিল যে, তিনি আইনজীবী, ব্যাঙ্কার, পুলিশ, সাংবাদিকসহ বহু পেশার মানুষের মধ্যে প্রচলিত শব্দ শব্দবন্ধ অবলীলায় ব্যবহার করতে জানতেন।

অন্যদিকে যে সমস্ত ব্যতিক্রমী বিষয়কে উপজীব্য করেছেন জ্যাক লন্ডন, অসাধারণ ও অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা ছাড়া সে সবের সফল প্রয়োগ কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। স্মর্তব্য, ডিকেন্স ছিলেন সংবাদপত্রকর্মী, বালজাক উকিলের মুহুরি এবং জ্যাক লন্ডন অক্লান্ত ও দুঃসাহসী পর্যটক। অর্থাৎ এরা এমন সব কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন যাতে নানারকম মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ছিল।

ভাষা জ্ঞান এবং ভাষার সঠিক প্রয়োগের দক্ষতা অর্জনই শেষ কথা নয়। এ বিষয়ে অসাধারণত্ব প্রমাণ করার প্রয়োজন আছে বৈকি। আমরা উপন্যাস পড়বার আগে, এমনকি পড়বার সময়েও এর কলেবর নিয়েও চিন্তা করি। অনেক উপন্যাসই তাদের বিশালাকৃতির জন্য আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়। আমরা সংশয়ী হয়ে উঠি।

কিন্তু ‘যুদ্ধ ও শান্তি’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর মতো কিছু উপন্যাস পড়তে বেগ পেতে হয় না, বরঞ্চ একবার ধৈর্য ধরে খানিকটা পড়ে ফেলতে পারলে আমরা আটকে যাই সেই গ্রন্থে। বিপরীত অভিজ্ঞতাও আছে। ‘অলৌকিক জলযান’ বা ‘পার্থিব’ যতটা স্ততির সঙ্গে পড়া যায়, ‘দ্য ম্যাজিক মাউনটেন’, ‘দ্য গ্লাস বিড গেম’ বা ‘ইউলিসিস’ নিশ্চয় অত আরামের সঙ্গে পাঠ করা যায় না।

এ সব উপন্যাসে প্রযুক্ত ভাষার খেলা, ভাবের ভৈবব এবং কল্পনার বিস্তৃতির কথা মাথায় রাখলে এটা মানা যাবে যে, এ সব গ্রন্থের পাঠ ও সাধ্যমতো তা অনুধাবন করাটাও একটা সাধনার ব্যাপার। টমাস মান, হেরমান হেস, অতীন বন্দোপাধ্যায়ের মতো লেখকগণ ঢাউস উপন্যাস লিখে বিখ্যাত হয়েছেন। তুলনায় অনেক ছোট আকারের উপন্যাসও কালজয়ী হয়েছে।

অনেক কম বাক্য ও পৃষ্ঠা খরচ করেও যে কীর্তিমান হওয়া সম্ভব সেটা করে দেখিয়েছেন হেমিংওয়ে (দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি), জন স্টেইনবেক (দ্য পার্ল), আলবেয়র কামু (দ্য আউটসাইডার), আলবার্তো মোরাভিয়া (টু উমেন) প্রমুখ। এখানে তিনটি বাংলা উপন্যাসের কথা বলতে চাই। এক. ‘মহিষ কুড়ার উপকথা’, দুই. ‘আমি আরব গেরিলাদের সমর্থন করি’, তিন. ‘চাঁদের অমাবস্যা’। এই কৃশকায় গ্রন্থত্রয়ীতে যথাক্রমে অমিয়ভূষণ মজুমাদর, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যে নানামাত্রিক শক্তিমত্তা দেখাতে পেরেছেন, অসংখ্য স্থূলদেহী উপন্যাসও তা করতে পারেনি। উপন্যাসের প্রাণ এর কাহিনী। কাহিনী গড়ে ওঠে থিম ঘিরে।

আর কাহিনী জীবন্ত হয়ে ওঠে চরিত্রগুলোর সার্থক রূপায়নের ভেতর দিয়ে। বিষয়বস্তু নির্বাচন, গল্পের কাঠামো তৈরি এবং গল্প বর্ণনা, এ সবই শিক্ষণীয় বিষয়। তলস্তয়ের চরিত্র চিত্রনের কথা ভাবুন।

কতটা সজীব ও বিশ্বাস্য করে তিনি তাদের এঁকেছেন। মোপাসার গল্পের নাটকীয়তা ও পাত্র-পাত্রীদের দ্বন্দ্বময় অন্তর্ভুবনের কথাও নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি। আর দেখুন একজন মার্শেল প্রুস্ত কিভাবে সাধারণ চিন্তা থেকে ক্রমে অসাধারণ সব চরিত্র সৃষ্টি করেছেন।

অনুভূতির বর্ণনা ও বিশ্লেষণ আজকের দিনের উপন্যাসের বড় বৈশিষ্ট্য। সেই বিশ্লেষণের সঙ্গে যদি বস্তুও যুক্ত হয় তা হলে তার মূল্য বাড়ে অনেকখানি। পরিস্থিতির বা অনুভূতির বয়ানও কিন্তু অনেক রকম। প্র“স্তের সঙ্গে লরেন্সের সাদৃশ্য নেই। আবার ডিকেন্স কিংবা জর্জ এলিয়ট বালজাকের অনেক কাছাকাছি।

কিন্তু গল্প বা চরিত্রায়ন যেমনই হোক, একটা ব্যাপারে এ সব লেখকের মধ্যে খুব মিল আছে। তা হচ্ছে, আদর্শ চিন্তা ও আশা-অভিরুচি এবং বাস্তবের মধ্যে সংঘাতের ফলে মোহভঙ ও সত্যোপলব্ধি ঘটা।

তবে গ্রন্থে যাই থাকুক, একমাত্র লেখকের ব্যক্তিগত দক্ষতাই তাকে উন্নত সাহিত্যে পরিণত করতে পারে। গল্পের জাদু এমন জিনিস যে, তার সঙ্গে যদি ভাষার ঐশ্বর্য যুক্ত হয় তাহলে ‘গালিভারস ট্রাভেলস’-এর মতো আজব ঘটনাগুলোও সত্য মনে হয়।

জয়েস বাস্তবাদী শিল্পী নন। কমল কুমার মজুমদারও তাই। কিন্তু তাদেরও ভাব-কল্পনার ভিত্তি বাস্তবজীবন। উপন্যাসের শিল্পসিদ্ধির প্রশ্নে এ বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করি।