সাক্ষাৎকার

সবাইকে নদী বাঁচানোর জন্য সচেতন করতে হবে : আহমদ রফিক

আমাদের দেশকে চির সবুজের দেশ এবং নদীমাতৃক দেশ বলা হতো, অথচ এ অবিস্মরণীয় দুটি স্বীকৃতি আমাদের দেশ অবহেলায় হারাতে বসেছে। সবুজ এবং নদী দুটো দূষিত এবং হারিয়ে যাচ্ছে। বৃক্ষ এবং নদী লেখক সাহিত্যিকদের লেখার একটি অন্যতম উপজীব্য তাই সাধারণ মানুষ তো বটেই লেখক সাহিত্যিকদের সচেতন হতে হবে। সে সঙ্গে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। সবাইকে নদী বাঁচানোর জন্য সচেতন করতে হবে। আর আমরা যারা শহরে থাকি সবার বাড়ির বারান্দায় এবং ছাদে গাছ লাগতে পারি

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সবাইকে নদী বাঁচানোর জন্য সচেতন করতে হবে : আহমদ রফিক
কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক আহমদ রফিক। ছবি: যুগান্তর

ব্যক্তিজীবনে চিকিৎসক হলেও আহমদ রফিক একইসঙ্গে কবি-প্রাবন্ধিক-গবেষক। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক। ছাত্র জীবনে তিনি বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এখনও সে ধারার রাজনীতি করছেন।

আগামী ১২ সেপ্টেম্বর এ গুণী মানুষটি ৯০ অতিক্রম করে ৯১ বছরে পদার্পণ করবেন। সম্প্রতি তার ইস্কাটনের বাস ভবনে সাহিত্য রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন হাসান সাইদুল। সেই আলোচনার অংশবিশেষ তুলে ধরা হল।

যুগান্তর: জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে গেল এ অনুভূতি কেমন?

আহমদ রফিক: জীবন থেকে একটা বছর চলে গেল এ নিয়ে চিন্তা থাকে। গেল বছর কেমন কাটল। সামনের দিনগুলো বা কেমনে কাটাব এ চিন্তাই থাকে। জন্মদিনে উৎসব করার বিষয়টা আমার কাছে জরুরি মনে হয় না।

যুগান্তর: আপনার ছোটবেলার কিছু স্মৃতির কথা জানতে পারি?

আহমদ রফিক: আমার বাবা খুব ছোট বেলায় মারা গিয়েছিলেন। মা সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন অনেক সময়। তাই নির্জনে আমার সময় কাটত। খুব শান্তশিষ্ট ছিলাম। তেমন দুরন্তপনা ছিলাম না। ছেলেবেলায় আমি নজরুলের কবিতার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম।

স্কুল জীবন থেকেই দুটো জিনিস আমার মধ্যে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। রাজনীতি এবং সাহিত্য। রাজনীতি মানে মুসলিম লীগের রাজনীতি নয়, বামপন্থী জাতীয়তাবাদের রাজনীতি। আমি কবিতায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর রাজনীতিতে সুভাষচন্দ্র বসুতে প্রভাবিত ছিলাম।

যুগান্তর: সাহিত্যিকদের লেখার অন্যতম উপজীব্য হল চির সবুজ গাছ ও নদী, যা আমাদের দেশে ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে

আহমদ রফিক: একেবারই সত্যি কথা। আসলে এমন প্রশ্ন কেউ করেনি আগে। আমাদের দেশকে চির সবুজের দেশ এবং নদীমাতৃক দেশ বলা হতো, অথচ এ অবিস্মরণীয় দুটি স্বীকৃতি আমাদের দেশ অবহেলায় হারাতে বসেছে। সবুজ এবং নদী দুটো দূষিত এবং হারিয়ে যাচ্ছে।

বৃক্ষ এবং নদী লেখক সাহিত্যিকদের লেখার একটি অন্যতম উপজীব্য তাই সাধারণ মানুষ তো বটেই লেখক সাহিত্যিকদের সচেতন হতে হবে। সে সঙ্গে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। সবাইকে নদী বাঁচানোর জন্য সচেতন করতে হবে। আর আমরা যারা শহরে থাকি সবার বাড়ির বারান্দায় এবং ছাদে গাছ লাগতে পারি। প্রকৃত অর্থে নিজকে সচেতন করতে হবে আগে।

যুগান্তর: ভাষা আন্দোলনে কীভাবে জড়ালেন?

আহমদ রফিক: স্কুলজীবন থেকে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। সে সময় ছাত্র জীবনে বাম রাজনীতি করেছি। ৪৭ সালে কলেজ জীবনেও তাই। এরপর ৪৯ সালে ঢাকায় এসে স্বভাবতই সব গণআন্দোলনের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছি। এবং সেই ধারাবাহিকতায় ভাষা আন্দোলনে যোগদান।

যুগান্তর: বাংলাবাসীরা ভাষার মাস, বিজয় দিবস স্বাধীনতা দিবস কেন খ্রিস্টীয় সালে পালন করা হল?

আহমদ রফিক: আসলে এটা একটি চিন্তার বিষয়। আগেও আমি বলেছি। অফিসিয়ালি এবং তৎকালীন সময়ে শিক্ষিতজনরা ইংরেজি মাসে দিন গুণতো। মানে খ্রিস্টীয় সাল ব্যবহার করত।

বাংলা মাস মানে আষাঢ় শ্রাবণ ইত্যাদি মাসগুলো গ্রামের মানুষ ব্যবহার করত এখনও তারা বাংলা মাসই ব্যবহার করে থাকেন। শহরে বা যারা উচ্চ শিক্ষিত তাদের অনেকেই বাংলা সাল ও মাসের নাম জানে না। প্রকৃত অর্থে এভাবেই ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস পালন করা হল। একই ধারায় ২৬ মার্চ ১৬ই ডিসেম্বর পালন করা হয়।

যুগান্তর: বাংলা ভাষার সাবর্জনীনতা নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই

আহমদ রফিক: এখনও সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলিত হয়নি। ৫২ সালে আমরা তিনটি স্লোগান করি। এক. রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, দুই. রাজবন্দিদের ফেরত চাই আর তিন. সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার। প্রথম মানে রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, আমরা তা অর্জন করতে পেরেছি। পরের দুটি স্লোগান অনুযায়ী আমরা অর্জন করতে পারিনি।

যুগান্তর: বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষা নিয়ে আপনার অভিমত কি?

আহমদ রফিক: আমাদের দেশে সংবিধানে আছে রাষ্ট্রভাষা বাংলা। অথচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত কোথাও বাংলা ভাষার সঠিক স্থান নেই। বিদেশি ভাষার ব্যবহারই বেশি।

সত্যিকার অর্থে এখন আর ভাষা সম্পর্কে আমাদের মমত্ববোধ বা দায়িত্ববোধ নেই। আমাদের দেশে বাংলা ভাষা উচ্চারণের ক্ষেত্রেও আছে অসঙ্গতি। বাংলা ভাষার পরিবর্তে ইংরেজির ব্যবহার বেড়েছে। বাংলা ভাষার প্রতি যে আমাদের ভালোবাসা থাকা দরকার সেটির বড় অভাব এখন। বাচ্চাদের বিদেশি ভাষা শেখার প্রতি এক প্রকার চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।

ক্রমশ ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। অন্য প্রতিষ্ঠানের কথা বাদই দিলাম আমাদের দেশে যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেগুলোতেও উচ্চ শিক্ষায় নেই বাংলার ব্যবহার। মেডিকেলে পড়তে হলে ইংরেজিই বাধ্যতামূলক। সবক্ষেত্রে বাংলা ভাষা অবহেলিত।

যুগান্তর: ৪৭ এ দেশ ভাগ, ৫২ ভাষা আন্দোলন এবং ৭১ পূর্ব বাংলা সাহিত্যের সব লেখক সাহিত্যিকরা বলা চলে একজোট ছিল। লেখার উপজীব্যও ছিল প্রায় অভিন্ন। এখন কি সেই অবস্থা আছে?

আহমদ রফিক: তা তো স্পষ্টই। ৪৭ সালে ৫২ ভাষা আন্দোলনকালে সব লেখক সাহিত্যিকদের লক্ষ্য ছিল ভাষা ও স্বাধীনতা। সবার সম্মিলিতভাবে দেশের জন্য কাজ করেছে। দেশের জন্য তখন ক্ষ্যাত-খামারে থাকা লোক যুদ্ধ করেছে।

স্কুল শিক্ষক, লেখক সাহিত্যিকরা কাজ করেছে। কিন্তু ৭১এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাহিত্যিকরা ভাগ হতে লাগল তার কারণও আছে। সবাই এখন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে আমি আমি একটা ভাব পরিলক্ষিত। সবাই নিজের চিন্তা করছে। এখন এমনও শোনা যায় যে, কে বড় কবি কে ছোট কবি। কে ভালো কে মন্দ।

এখন অনেকইে শাসক দলের কাছে নিজের বিবেককে অর্পণ করছে। যার ফলে এখন আর লেখক-সাহিত্যিকদের মাঝে কোনো ঐক্য নেই। এর ফলও কিন্তু ভালো না। আমরা প্রতিনিয়ত তা দেখছি।

যুগান্তর: পৃথিবীতে ব্যবহার না করার ফলে অনেক ভাষা প্রায়ই বিলুপ্ত, আপনার কি মনে হয় একটা সময় বাংলা ভাষার অবস্থাও তাই হবে?

আহমদ রফিক: অসম্ভব! যত দিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততদিন বাংলা ভাষার ব্যবহার থাকবে। পৃথিবীতে একটি মাত্র ভাষা, ‘বাংলা’ যা রক্ষা করতে মানুষ জীবন দিয়েছে। যে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে, সে ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। হয়তো বিদেশি কিছু শব্দ বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। মানুষ সে শব্দগুলোকে বাংলা থেকে আলাদা করতে পারবে না।

যুগান্তর: আমার তো মনে হয় শিক্ষিতরাই বর্তমানে বাংলা ভাষাকে কলুষিত করছে, আপনার কি মনে হয়?

আহমদ রফিক: ইংরেজির প্রাধান্য সর্বত্র বর্তমানে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এটা অকল্পনীয় ছিল। এ সমস্যা প্রধানত শিক্ষিত শ্রেণীকে ঘিরে। অথচ গ্রামের মানুষ বাংলা সন তারিখ থেকে শুরু করে সবকিছুই বাংলায় সম্পন্ন করতে অভ্যস্ত।

কিন্তু ব্যাপক অশিক্ষার কারণে তারা সমাজে নিয়ন্ত্রক শক্তি নয়। বরং শিক্ষিত শ্রেণী ও ধনিক শ্রেণী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতিগত প্রতিনিধিত্ব করছে। কিন্তু বাংলা ভাষা ঠিকই আজও সার্বজনীন হল না।

যুগান্তর: তরুণ প্রজন্মকে কীভাবে বাংলা ভাষার প্রতি আকৃষ্ট করা যায়?

আহমদ রফিক: রাষ্ট্রভাষাকে জাতীয় ভাষা এবং জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারলে মাতৃভাষার এ আবেগের ফুলজুড়ি ও স্লোগান দিয়ে কোনো লাভ হবে না। আকাশ সংস্কৃতি, অপসংস্কৃতি ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বাংলাদেশি এবং বাংলা ভাষাকে দুর্বল করছে।

বিশ্ব সংস্কৃতি, সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট পুঁজি, বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্য একই সঙ্গে ভোগবাদী সমাজের আদর্শ মিলে এমন একটা অবস্থানে পৌঁছেছে যে আমাদের নিজস্ব আদর্শ ঐতিহ্য এখন বিসর্জন দেয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এ প্রভাব থেকে নতুন, তরুণ প্রজন্ম ও আমরা যদি মুক্ত হতে না পারি এবং খাটি স্বদেশ ও মাতৃভাষা প্রেম নতুন ও তরুণ

প্রজন্মের মধ্যে যদি চর্চা না হয় তাহলে এ থেকে মুক্তি লাভ হবে না।

যুগান্তর: বাংলা ভাষাকে জীবিকার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়?

আহমদ রফিক: বিদেশি ভাষা জানলে এখন বড় বড় কোম্পানি এবং বিদেশে চাকরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যার ফলে নতুন প্রজন্ম এখন বাধ্য হয়ে বিদেশি ভাষাই শিখছে। আর এটাই হচ্ছে জীবিকার ভাষা। আজ যদি সব জায়াগায় বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক হতো কর্মসংস্থানগুলোতে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক হতো তবে এমন হতো না।

যুগান্তর: তরুণ প্রজন্মের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

আহমদ রফিক: একমাত্র তরুণরাই তো সে দিন জেগে উঠেছিল? ৫২ এর ভাষা আন্দোলন তো করেছিল ছাত্ররা। ১৪৪ ধারা তো মন্ত্রী এমপিরা ভঙ্গ করেনি, ছাত্ররাই করেছিল। সত্যিকার অর্থে সংস্কৃতি এবং রাজনীতি দুই অঙ্গনেই একমাত্র তরুণদের উপরই আমি ভরসা পাই। তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে রাজনীতির সুস্থতা এবং শুদ্ধতা নিয়ে।

ছাত্র রাজনীতির বিরোধী নই কিন্তু তাই বলে ছাত্র রাজনীতির নামে গুন্ডামি, টেন্ডারবাজি, মাস্তানি, খুন, নির্যাতন চালাবে তা কোনোভাবেই হতে পারে না। সুস্থ রাজনীতি করতে হবে। চিন্তাশীল, মননশীল তারুণ্যের মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে। পঞ্চাশের দশকে আমরা রাজনীতিটাকে প্রাধান্য দিয়েছিলাম তেমনি আজকের তরুণ সমাজগঠনে কাজ করবে তবে তা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter