রমা চৌধুরী

চরিত্র ও চেতনার দৃঢ়তা

  ফজলুল হক সৈকত ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রমা চৌধুরী
প্রয়াত রমা চৌধুরী, ছবি: সংগৃহীত

২ লাখ বাঙালি নারীর একজন রমা চৌধুরী। একাত্তরের নির্মমতার ইতিহাসে আমরা সংখ্যা দিয়ে রমাদের চিহ্নিত করেছি। কিন্তু চট্টগ্রামের এ রমা সংখ্যার সীমারেখায় আবদ্ধ থাকেননি।

রবিঠাকুর তার ‘রক্তকরবী’ নাটকে মানুষকে সংখ্যা দিয়ে বিবেচনার সামাজিক ধারণার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তার নির্মিত বিপ্লবী নারী চরিত্র নন্দিনী মুক্তিচেতনার প্রতীক। একালের নন্দিনী- রমা ‘পারসোনাল ডেভেলপমেন্ট’-চেতনার ভেতর দিয়ে ব্যক্তি থেকে বিরল ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন।

আমরা অবগত হয়েছি, ১৯৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধে ২ লাখ বাঙালি নারীর সম্ভ্রম লুট করেছে পাক-বাহিনী; ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। তারপর পেয়েছি স্বাধীনতা।

কিন্তু যে রমাদের শরীর-সম্ভ্রম ও সমূহ সম্ভাবনার ওপর দিয়ে নির্মিত হয়েছে এ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রভূমি, তাদের কী দিতে পেরেছি আমরা? শুধুই বিচরণের কিংবা জীবন-ধারণের স্বাধীনতাও কি পেয়েছেন তারা?

স্বীকৃতি ও সম্মানের আসনে অধিষ্ঠানের কথা না-হয় আলোচনার গোল-টেবিলে না-ই তুললাম। রাষ্ট্রযন্ত্রের শাসন-প্রশাসনে কিংবা নীতি-নির্ধারণে তাদের আসীন দেখার কল্পনা বোধহয় আজও স্বপ্নই রয়ে গেল।

ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘চট্টগ্রামের প্রথম স্নাতকোত্তর ডিগ্রিপ্রাপ্ত নারী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন বীরাঙ্গনা রমা। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে পেশায় ছিলেন স্কুল-শিক্ষক।

সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী রমা চেতনায় রুচিশীল ও প্রগতিমনা। পরবর্তীকালে তিনি সাহিত্যিক-স্বীকৃতি অর্জন করেছেন নিরন্তর সাধনায়। যুদ্ধের অব্যবহিত পরে হারিয়েছেন ২ সন্তানকে। মৃত্যুর ২০ বছর আগে হারিয়েছেন শেষ সন্তান।

শোনা যায়, দীর্ঘদিন জুতো-চপ্পল ব্যবহার করেননি তিনি। যে দেশের নর-নারী, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ একুশের প্রথম প্রহরে বুঝে-না-বুঝে খালি পায়ে শহীদ মিনারে যায়, তারা কী করে বুঝবেন, রমা চৌধুরীর চরিত্র ও চেতনার দৃঢ়তা?

যে দেশের মাটি শহীদের রক্তে ভেজা, লাখো রমণীর স্বামী-সন্তানের দেহ ধারণ করে আছে যে ভূমি, সে মাটিতে তো জুতো মাড়িয়ে বিচরণ করা চলে না! তিনি লিখেছেন- ‘যে মাটির নিচে আমার দুই দুটি সন্তান শুয়ে আছে, শুয়ে আছে লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, সে মাটিতে আমি দম্ভের সঙ্গে জুতা পায়ে চলি কি করে?’

গবেষণা-প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, পত্রসাহিত্য, কবিতা ও কথাসাহিত্য ছিল রমা চৌধুরীর সৃজনশীলতার ভুবন। তিনি ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধকালে নিজের নির্যাতনের কথা লিখেছেন।

একটি বিবরণ- ‘যখন আমাকে নির্যাতন করতে উদ্যত হল পাকসেনা, তখন জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার মা ও দুই ছেলে বারবার আকুতি করছিলেন। ছিল আমার পোষা বিড়াল কনুও।

তখন আমি মাকে আমার সন্তানদের নিয়ে সরে যেতে বলেছিলাম।’ কেবল পাক-পুরুষরা তাকে নির্যাতন করেছে, অপমান করেছে, তা-ই নয়- প্রতারিত হয়েছেন স্বামী নামক পুরুষ দ্বারাও।

নির্ভরতা আর আশ্রয়ের বদলে স্বামীর কাছ থেকে পেয়েছেন প্রবঞ্চনা এবং প্রত্যাখ্যানের যন্ত্রণা। যেখানে নারীরা অর্থনৈতিক-সামাজিকভাবে পুরুষের ওপর ভয়ঙ্কররকম নির্ভরশীল, সেখানে ভিন্ন স্রোতে জীবনতরী ভাসিয়ে টিকে থাকার যে-সংগ্রাম করেছেন এ বীরাঙ্গনা, তা আমাদের প্রচলিত-সমাজের গভীরে প্রবল চপেটাঘাত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি নিয়ে রমা লিখেছেন স্মৃতিনির্ভর ইতিহাসগ্রন্থ ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মতো দুই দিকপালের সাহিত্যচর্চা নিয়ে লিখেছেন গবেষণাগ্রন্থ- ‘ভাব-বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য’ ও ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’। ‘১০০১ দিন যাপনের পদ্য’ তার আরেকটি স্মৃতিমূলক রচনা। ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’ ও ‘অপ্রিয় বচন’ বই-এ রমা তুলে ধরেছেন বাঙালির সংস্কৃতি, সংস্কার, সামাজিক চিন্তা-বিবর্তন ও রূপান্তরের কথামালা।

তার কবিতাগ্রন্থ ‘স্বর্গে আমি যাব না’ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস আর সাধারণ ধর্মবোধের বিরুদ্ধে এক প্রবল সাহিত্যিক প্রতিবাদ। পরপারের সুখের লালসায় কখনও কাতর ছিলেন না তিনি- জাগতিক আনন্দ ও সুখের স্পর্শ পেতে চেয়েছেন প্রাতিস্বিক চেতনায়।

তার ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’ সত্যিকার অর্থেই প্রবল-প্রশ্ন-জাগানিয়া গ্রন্থ। এ কবিতা-সংকলনে আমরা পাই উত্তর-একাত্তর স্বাধীন রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ। রমা চৌধুরীর ‘নীল বেদনার খাম’ বাংলা পত্র-সাহিত্যে একটি জরুরি সংযোজন। ছোটগল্প ‘অশ্রুভেজা একটি দিন’ তার অনুভূতি-অন্বেষার আরেক দলিল।

রমার ১৮টি বই-ই প্রকাশের ভারে উজ্জ্বল। যদি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ রমা চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধ-ইতিহাস ও সাহিত্য-সম্বন্ধীয় গ্রন্থ পাঠ্য কিংবা রেফারেন্স বুক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে প্রত্যক্ষদর্শী ও জীবনবাদী মানুষের অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ ভঙ্গি।

বিপ্লবী রমা স্বাধীনতার পর ফেরি করেছেন বেতনের পরিবর্তে ‘অফিস-থেকে-পাওয়া’ পত্রিকা। নিজের লেখা বই ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করার বিরল দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন তিনি। এ-বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনও অত্যন্ত স্পষ্ট- ‘আমার কুষ্ঠিতে লেখা আছে আমি লেখ্যবৃত্তি গ্রহণ করেই জীবিকা নির্বাহ করব।

অনেকটা সে কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্যই লিখছি। আর এ ছাড়া এ অবস্থায় আমার অন্য কিছু করারও সুযোগ নেই। বাঁচতে হলে অর্থের প্রয়োজন। আমি কারও গলগ্রহ হতে কখনও পছন্দ করতাম না, এখনও করি না।’

সারাজীবন মানুষের অনুগ্রহকে, করুণাকে দু-হাতে দূরে সরিয়ে পথ চলেছেন তিনি। নিজের ভার নিজের ওপর অর্পণ করার নীতিতে তিনি অনুকরণীয় প্রভা ও প্রতিভা।

রমা চৌধুরী লিখেছেন- ‘লেখা ছিল আমার নেশা, আর বই বিক্রি করাই ছিল একমাত্র পেশা। ওই লেখা বিক্রির আয় দিয়েই আমি বহন করছিলাম আমার অনাথ আশ্রম দয়ার কুটিরের যাবতীয় ব্যয়ভার।’

জীবন-সংগ্রামী, ব্যক্তিত্বের অহমিকায় অটল রমা চৌধুরী শেষ-একাত্তরে ‘হারিকেনের আলোয়’ দেখেছেন সন্তানের জীবনাবসানের দৃশ্য।

আর স্বাধীনতা পদক কিংবা মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য প্রতীক্ষার প্রহর না-গুনে, জীবনের বেশির ভাগ সময় এ ‘আলো’ ফেরি করেছেন সমকাল ও উত্তরকালের বাঙালির জন্য। চরিত্র, চিন্তা ও চেতনা দিয়ে শঙ্কা-জর্জর প্রজন্মকে বেঁচে থাকার ব্যতিক্রমী পথ দেখিয়েছেন রমা চৌধুরী।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter