দাদুভাইয়ের স্মৃতি
jugantor
দাদুভাইয়ের স্মৃতি

  এম এ হালিম  

১২ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তারিখ ও মাস ঠিক মনে নেই। ১৯৮২ সালের কোনো একদিন বিকাল বেলা। মতিঝিলে অবজারভার ভবনে দাদুভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যখন তার কক্ষে ঢুকি, তখন বুঝতে পারি চায়ের আয়োজন চলছে (সম্ভবত যুগান্তরের বর্তমান সম্পাদক সাইফুল ভাই আর পিআইবি’র মহাপরিচালক মরহুম শাহ আলমগীর ভাইও সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন)। আমাকে দেখেই দাদুভাই কাকে যেন বললেন-‘ওকে এক কাপ চা খাইয়ে দাও’! আমার সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় নেই, কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেও আসিনি। কিন্তু ভাবখানা এমন যে আমি তার কত পুরোনো পরিচিত। ভাবলাম, এ তো দেখছি সত্যিই ‘দাদুভাই’। আমিও আপন ভেবে উত্তর দিলাম-‘শুধু চা খাব, বসব না?’ এই ছিল রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তার ছড়াগুলোই মূলত পড়তাম। ভক্ত ছিলাম তার সম্পাদনায় প্রকাশিত কিশোর বাংলার, সেই সঙ্গে চাঁদের হাটেরও।

সেদিন কতক্ষণ ছিলাম মনে নেই। তবে আলাপচারিতায় আমি যে খুব আপন হয়ে গিয়েছিলাম, সেটা খুব মনে পড়ে। আর দাদুভাইয়ের স্বভাবসুলভ ব্যবহারের কথা তো আগে থেকেই শোনা ছিল। এরপর অনিয়মিত লেখালেখির বাইরেও ঢাকা গেলে ও সুযোগ পেলে কিশোর বাংলা অফিসে দাদুভাইয়ের সঙ্গে চা খেতে হাজির হতাম কিশোর বাংলা অফিসে।

এক সময় কিশোর বাংলার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে দাদুভাই প্রথমে আজাদী এবং পরে দৈনিক জনতায় যোগ দেন। আমি তখন আমার জেলা নরসিংদী থেকে সংবাদ পাঠাতে শুরু করি, বলা চলে মফস্বল সাংবাদিকতা। দাদুভাইয়ের ইচ্ছা ছিল আমার জেলায় চাঁদের হাটের শাখা খোলার। আমাকে কয়েকবার বলেছেনও। যখনই দেখা হতো, বলতেন-‘তুমি তো আমার কাজটা করলে না।’ বোঝাতে চেষ্টা করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় কাজটি আর করতে পারিনি। এক সময় শুরু করলাম ‘পেন ফ্রেন্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি পত্রমিতালী পত্রিকা প্রকাশের কাজ। নরসিংদী থেকেই তা প্রকাশ করতাম। পত্রমিতালী পত্রিকা হলেও সেখানে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ আর ছড়ার আয়োজন রাখি। সম্ভবত প্রথম সংখ্যায় দাদুভাই একটা ছড়া দিয়েছিলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘পত্র দিতে পারো’। দাদুভাইয়ের বাসা ছিল ২০১ মধ্য বাসাবোতে, যেখানে আমি কয়েকবার গিয়েছি আড্ডা দিতে আর আমার পত্রিকার বিষয়ে পরামর্শ নিতে। আমার সংগ্রহে সে সংখ্যাটি আছে কিনা নিশ্চিত নই। তবে সেই ছড়ার শেষ পঙ্ক্তিটি আজও মনে আছে-‘মাঝ বাসাবো ২০১-এ পত্র দিতে পারো’। এই পঙ্ক্তিটি ছিল একরকম চিঠি লেখার কৌশলী আহ্বান। প্রকাশের মাসখানেক পর দাদুভাইয়ের সঙ্গে দেখা। বললেন, ‘আমি তো কেবলই চিঠি পাচ্ছি অনেকের কাছ থেকে’। আমি সেই তরুণ বয়সে ভাবলাম-হায় রে কপাল, মিতালী পত্রিকার সম্পাদক আমি আর চিঠি পাচ্ছেন কিনা প্রৌঢ় দাদুভাই, যখন পত্র প্রেরকদের অনেকেই তরুণী!

গত রোববার দুপুরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গাড়িতে কক্সবাজার ফেরার পথে অনলাইন পত্রিকায় নিউজ আপডেট দেখেই হোঁচট খেলাম। দাদুভাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। অনেক বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে ও বিদেশে অবস্থান এবং তারপর ফিরে এসে আর যোগাযোগ হয়নি, যদিও আগ্রহ হয়েছিল পুনঃযোগাযোগের। ইদানীং যুগান্তরে লিখছি, অথচ জানতাম না দাদুভাই যুগান্তরের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। এই এত বছর পর যখন জানলাম তার ঠিকানা, তখন তার আর দেখা মেলার সুযোগ নেই।

এম এ হালিম : বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালক; বর্তমানে কক্সবাজারে পপুলেশন মুভমেন্ট অপারেশনসের (রোহিঙ্গা কার্যক্রম) হেড অব অপারেশনস হিসাবে কর্মরত

halim_64@hotmail.com

দাদুভাইয়ের স্মৃতি

 এম এ হালিম 
১২ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

তারিখ ও মাস ঠিক মনে নেই। ১৯৮২ সালের কোনো একদিন বিকাল বেলা। মতিঝিলে অবজারভার ভবনে দাদুভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যখন তার কক্ষে ঢুকি, তখন বুঝতে পারি চায়ের আয়োজন চলছে (সম্ভবত যুগান্তরের বর্তমান সম্পাদক সাইফুল ভাই আর পিআইবি’র মহাপরিচালক মরহুম শাহ আলমগীর ভাইও সেই আসরে উপস্থিত ছিলেন)। আমাকে দেখেই দাদুভাই কাকে যেন বললেন-‘ওকে এক কাপ চা খাইয়ে দাও’! আমার সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় নেই, কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেও আসিনি। কিন্তু ভাবখানা এমন যে আমি তার কত পুরোনো পরিচিত। ভাবলাম, এ তো দেখছি সত্যিই ‘দাদুভাই’। আমিও আপন ভেবে উত্তর দিলাম-‘শুধু চা খাব, বসব না?’ এই ছিল রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তার ছড়াগুলোই মূলত পড়তাম। ভক্ত ছিলাম তার সম্পাদনায় প্রকাশিত কিশোর বাংলার, সেই সঙ্গে চাঁদের হাটেরও।

সেদিন কতক্ষণ ছিলাম মনে নেই। তবে আলাপচারিতায় আমি যে খুব আপন হয়ে গিয়েছিলাম, সেটা খুব মনে পড়ে। আর দাদুভাইয়ের স্বভাবসুলভ ব্যবহারের কথা তো আগে থেকেই শোনা ছিল। এরপর অনিয়মিত লেখালেখির বাইরেও ঢাকা গেলে ও সুযোগ পেলে কিশোর বাংলা অফিসে দাদুভাইয়ের সঙ্গে চা খেতে হাজির হতাম কিশোর বাংলা অফিসে।

এক সময় কিশোর বাংলার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেলে দাদুভাই প্রথমে আজাদী এবং পরে দৈনিক জনতায় যোগ দেন। আমি তখন আমার জেলা নরসিংদী থেকে সংবাদ পাঠাতে শুরু করি, বলা চলে মফস্বল সাংবাদিকতা। দাদুভাইয়ের ইচ্ছা ছিল আমার জেলায় চাঁদের হাটের শাখা খোলার। আমাকে কয়েকবার বলেছেনও। যখনই দেখা হতো, বলতেন-‘তুমি তো আমার কাজটা করলে না।’ বোঝাতে চেষ্টা করেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় কাজটি আর করতে পারিনি। এক সময় শুরু করলাম ‘পেন ফ্রেন্ড ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি পত্রমিতালী পত্রিকা প্রকাশের কাজ। নরসিংদী থেকেই তা প্রকাশ করতাম। পত্রমিতালী পত্রিকা হলেও সেখানে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ আর ছড়ার আয়োজন রাখি। সম্ভবত প্রথম সংখ্যায় দাদুভাই একটা ছড়া দিয়েছিলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘পত্র দিতে পারো’। দাদুভাইয়ের বাসা ছিল ২০১ মধ্য বাসাবোতে, যেখানে আমি কয়েকবার গিয়েছি আড্ডা দিতে আর আমার পত্রিকার বিষয়ে পরামর্শ নিতে। আমার সংগ্রহে সে সংখ্যাটি আছে কিনা নিশ্চিত নই। তবে সেই ছড়ার শেষ পঙ্ক্তিটি আজও মনে আছে-‘মাঝ বাসাবো ২০১-এ পত্র দিতে পারো’। এই পঙ্ক্তিটি ছিল একরকম চিঠি লেখার কৌশলী আহ্বান। প্রকাশের মাসখানেক পর দাদুভাইয়ের সঙ্গে দেখা। বললেন, ‘আমি তো কেবলই চিঠি পাচ্ছি অনেকের কাছ থেকে’। আমি সেই তরুণ বয়সে ভাবলাম-হায় রে কপাল, মিতালী পত্রিকার সম্পাদক আমি আর চিঠি পাচ্ছেন কিনা প্রৌঢ় দাদুভাই, যখন পত্র প্রেরকদের অনেকেই তরুণী!

গত রোববার দুপুরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে গাড়িতে কক্সবাজার ফেরার পথে অনলাইন পত্রিকায় নিউজ আপডেট দেখেই হোঁচট খেলাম। দাদুভাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। অনেক বছর তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে ও বিদেশে অবস্থান এবং তারপর ফিরে এসে আর যোগাযোগ হয়নি, যদিও আগ্রহ হয়েছিল পুনঃযোগাযোগের। ইদানীং যুগান্তরে লিখছি, অথচ জানতাম না দাদুভাই যুগান্তরের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। এই এত বছর পর যখন জানলাম তার ঠিকানা, তখন তার আর দেখা মেলার সুযোগ নেই।

এম এ হালিম : বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পরিচালক; বর্তমানে কক্সবাজারে পপুলেশন মুভমেন্ট অপারেশনসের (রোহিঙ্গা কার্যক্রম) হেড অব অপারেশনস হিসাবে কর্মরত

halim_64@hotmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন