দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই টেকসই অবকাঠামো
jugantor
দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই টেকসই অবকাঠামো

  মো. জিল্লুর রহমান  

১৩ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত হয়। মূলত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, খরা ইত্যাদি এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী।

প্রায় প্রতিবছরই দেশে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, মৌসুমি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। ভৌগোলিক গঠন ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে এ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি, ফসলের ক্ষতি, সম্পদহানি হয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় এক কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। খেতের ফসল, বাড়িঘর, গবাদিপশু, গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র-উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

বিশেষ করে ১৯৯১ সালের প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরই উপকূলীয় এলাকায় সবুজবেষ্টনী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং এ প্রকল্প পরবর্তীকালে ব্যাপক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

উপকূলবর্তী এলাকায় প্রচুর সাইক্লোন শেল্টারের পাশাপাশি ব্যাপক বনায়ন, বিশেষত ম্যানগ্রোভ ধরনের বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন-চার দশক আগে এ ধরনের দুর্যোগে যেখানে লাখ লাখ মানুষ মারা যেত, সেখানে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার কারণে এখন প্রাণহানির সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির তথ্যও দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি বড় সাফল্য। বিশ্বে বাংলাদেশের এই সক্ষমতা বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে চলে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করার শক্তি যেমন মানুষের নেই, তেমনি জানা নেই এ থেকে আত্মরক্ষার কৌশলও। তবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অনেক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ জন্য গণসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো অবকাঠামো নির্মাণ, উঁচু বাঁধ তৈরি। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে জনস্বার্থে আরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকে আরও টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের গৃহীত কার্যক্রম আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসনীয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের এ সাফল্য ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে হবে।

মো. জিল্লুর রহমান : ব্যাংকার ও লেখক

zrbbbp@gmail.com

দুর্যোগ মোকাবিলায় চাই টেকসই অবকাঠামো

 মো. জিল্লুর রহমান 
১৩ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত হয়। মূলত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, খরা ইত্যাদি এ দেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী।

প্রায় প্রতিবছরই দেশে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা, মৌসুমি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে। ভৌগোলিক গঠন ও বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশে এ পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি, ফসলের ক্ষতি, সম্পদহানি হয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

১৯৮৮ সালের বন্যায় প্রায় এক কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০০৭ সালে বন্যা ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। খেতের ফসল, বাড়িঘর, গবাদিপশু, গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে দেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র-উপকূলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় লাখ মানুষ। তবে দুর্যোগ মোকাবিলায় বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে।

বিশেষ করে ১৯৯১ সালের প্রলঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পরই উপকূলীয় এলাকায় সবুজবেষ্টনী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় এবং এ প্রকল্প পরবর্তীকালে ব্যাপক বনায়ন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে উপকূলবর্তী এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

উপকূলবর্তী এলাকায় প্রচুর সাইক্লোন শেল্টারের পাশাপাশি ব্যাপক বনায়ন, বিশেষত ম্যানগ্রোভ ধরনের বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন-চার দশক আগে এ ধরনের দুর্যোগে যেখানে লাখ লাখ মানুষ মারা যেত, সেখানে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতার কারণে এখন প্রাণহানির সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। দুর্যোগ মোকাবিলায় মানুষের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির তথ্যও দ্রুত সবার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যা দেশের জন্য একটি বড় সাফল্য। বিশ্বে বাংলাদেশের এই সক্ষমতা বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

প্রকৃতি তার নিজের খেয়ালে চলে। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ করার শক্তি যেমন মানুষের নেই, তেমনি জানা নেই এ থেকে আত্মরক্ষার কৌশলও। তবে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে অনেক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এ জন্য গণসচেতনতা যেমন দরকার, তেমনি দরকার ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো অবকাঠামো নির্মাণ, উঁচু বাঁধ তৈরি। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে জনস্বার্থে আরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজ বেষ্টনী তৈরি করা যেতে পারে এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাকে আরও টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের গৃহীত কার্যক্রম আজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসনীয়। দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের এ সাফল্য ভবিষ্যতেও ধরে রাখতে হবে।

মো. জিল্লুর রহমান : ব্যাংকার ও লেখক

zrbbbp@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন