দেবী দুর্গা
jugantor
দেবী দুর্গা

  তারাপদ আচার্য্য  

১৫ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম একটি আধ্যাত্মিক বিষয়। ধার্মিকরা ধর্মকে তার জীবনবোধের সঙ্গে একীভূত করে, বহুত্বের রূপরেখায় কল্পনা করে থাকে। এতে তারা পরম সৃষ্টিকর্তা বা মহাশক্তিকে মানসপটে ধারণ করতে সক্ষম হন। তাদের সেই সক্ষমতায় শক্তির নামাঙ্কিত হয়। সনাতন ধর্মের অনুসারী হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বেদান্তের দর্শনকে অনুসরণ করে এ ধর্ম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়ে আসছে যুগে যুগে। আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিকে মজবুত করতে হিন্দু বৈদিক সাধকরা মহাশক্তিকে বিভিন্ন নামে সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন। তারা সাধনার গুণে মহাশক্তিকে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই মহাশক্তির ঐশ্বর্যকে দেবীরূপে চিহ্নিত করে পূজা করে আসছেন মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই। আর তাই দেবীর নানা নাম রয়েছে। দেবী দুর্গার নাম তরঙ্গ হৃদয়ে ঢেউ খেলে।

দেবী দুর্গার হাজারো নাম। তন্মধ্যে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে প্রথমেই বলা হয়েছে :

‘জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।

দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্ততে॥

(অর্গলাস্ত্রোত্র, ২)

অর্থাৎ, হে দেবী! তুমি জয়ন্তী (জয়যুক্তা), মঙ্গলা (জন্মদিনাশিনী), কালী (সর্বসংহারিণী), ভদ্রকালী (সুখপ্রদায়িনী), কপালিনী (কপাল হস্তে বিচরণকারিণী), দুর্গা (দুঃখপ্রাপ্যা), শিবা (চিৎ-স্বরূপা), ক্ষমা (করুণাময়ী), ধাত্রী (বিশ্বধারিণী), স্বাহা (দেবপোষিণী) এবং স্বধা (পিতৃতোষিণী)-রূপিণী, তোমাকে নমস্কার।

দেবীর এক নাম জয়ন্তী। অর্থাৎ তিনি বিজয়িনী। সদা-সর্বদা জয়যুক্তা। তার জয় অবধারিত। যুদ্ধে তিনি অপরাজিতা। কোনো যুদ্ধে তার পরাজয় ঘটেনি। জয় তার অবশ্যম্ভাবী। সেই জন্যই তিনি জয়ন্তী। জন্মসূত্রে জয়ন্তী ঋক্বেদের প্রধান ও শক্তিশালী এক বিরাট দেবতা ইন্দ্রের দুহিতা। দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তার পত্নীর নাম ইন্দ্রাণী। দুই পুত্র জয়ন্ত ও ঋষভ। জয়ন্তর ভগ্নী জয়ন্তী।

সুর-অসুরের যুদ্ধের সময় তার বিশেষ আবির্ভাব ঘটে। একবার দানবরা দেবতাদের কাছে যুদ্ধে হেরে যায়। তখন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য রাগে-ক্ষোভে দেবতাদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন এবং কৈলাসে গিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা করতে থাকেন। দানবরাজও মনে মনে ভাবেন, যদি শিবকে একবার তপস্যায় তুষ্ট করা যায়, তাহলে সব শক্তি করতলগত হবে। তাই দৈত্যাচার্য শুক্র সদাশিবের ধ্যানে গভীরভাবে মগ্ন হলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র গোপনসূত্রে এ খবর পেয়ে যান। কী বিপদ! মহাদেব যদি একবার দৈত্যকে বর দেন, তাহলে তাকে যুদ্ধে হারায় কার সাধ্য? না, যে কোনো প্রকারে তার এ ধ্যান ভাঙাতেই হবে! নইলে দেবতাদের রক্ষা নেই!

পুরাণে আছে দেবী দুর্গার আট মূর্তি। তাদের অষ্টনায়িকা বলা হয়। এ অষ্টনায়িকার মধ্যে দেবী জয়ন্তী হলেন চতুর্থ। আবার এই অষ্টনায়িকাকে অষ্টযোগিনীও বলা হয়। এরা হলেন যথাক্রমে-মঙ্গলা, বিজয়া, ভদ্র, জয়ন্তী, অপরাজিতা, নন্দিনী, নারসিয়হী, কৌমারী। এ ছাড়া দেবী দুর্গার অসংখ্য রূপ আছে। তার ক’টা রূপই বা আমরা কল্পনায় আনতে পারি! তার ক’টা নামই বা আমরা জানি! তিনি তো রূপে রূপে অরূপ হয়ে আছেন। সর্বভূতে সর্বরূপে সূক্ষ্মবীজাকারে তিনি ওতপ্রোতভাবে অনুস্যূত হয়ে রয়েছেন। কখনো তিনি নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্ম, আবার কখনো সগুণ সাকার হয়ে সর্ববস্তুতে শক্তিরূপে বিরাজিতা।

দেবীর নাম তরঙ্গ ভক্তকে অনুরণিত করে। আবার কল্পনার জগতে সৌম্য সূতি প্রতিভাত হয়। যে নামেই তাকে সাধনা করি না কেন, উৎসধারা এক ও অভিন্ন। তিনি জ্যোতির্ময়ী, মঙ্গলময়ী, ভক্ত কল্যাণে জগতে ভক্ত মনোবাসনায় নামের সমৃদ্ধি প্রতিভাত।

তারাপদ আচার্য্য : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

দেবী দুর্গা

 তারাপদ আচার্য্য 
১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম একটি আধ্যাত্মিক বিষয়। ধার্মিকরা ধর্মকে তার জীবনবোধের সঙ্গে একীভূত করে, বহুত্বের রূপরেখায় কল্পনা করে থাকে। এতে তারা পরম সৃষ্টিকর্তা বা মহাশক্তিকে মানসপটে ধারণ করতে সক্ষম হন। তাদের সেই সক্ষমতায় শক্তির নামাঙ্কিত হয়। সনাতন ধর্মের অনুসারী হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বেদান্তের দর্শনকে অনুসরণ করে এ ধর্ম প্রচারিত ও প্রসারিত হয়ে আসছে যুগে যুগে। আত্মবিশ্বাসের ভিত্তিকে মজবুত করতে হিন্দু বৈদিক সাধকরা মহাশক্তিকে বিভিন্ন নামে সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছেন। তারা সাধনার গুণে মহাশক্তিকে দেবীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই মহাশক্তির ঐশ্বর্যকে দেবীরূপে চিহ্নিত করে পূজা করে আসছেন মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই। আর তাই দেবীর নানা নাম রয়েছে। দেবী দুর্গার নাম তরঙ্গ হৃদয়ে ঢেউ খেলে।

দেবী দুর্গার হাজারো নাম। তন্মধ্যে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে প্রথমেই বলা হয়েছে :

‘জয়ন্তী মঙ্গলা কালী ভদ্রকালী কপালিনী।

দুর্গা শিবা ক্ষমা ধাত্রী স্বাহা স্বধা নমোহস্ততে॥

(অর্গলাস্ত্রোত্র, ২)

অর্থাৎ, হে দেবী! তুমি জয়ন্তী (জয়যুক্তা), মঙ্গলা (জন্মদিনাশিনী), কালী (সর্বসংহারিণী), ভদ্রকালী (সুখপ্রদায়িনী), কপালিনী (কপাল হস্তে বিচরণকারিণী), দুর্গা (দুঃখপ্রাপ্যা), শিবা (চিৎ-স্বরূপা), ক্ষমা (করুণাময়ী), ধাত্রী (বিশ্বধারিণী), স্বাহা (দেবপোষিণী) এবং স্বধা (পিতৃতোষিণী)-রূপিণী, তোমাকে নমস্কার।

দেবীর এক নাম জয়ন্তী। অর্থাৎ তিনি বিজয়িনী। সদা-সর্বদা জয়যুক্তা। তার জয় অবধারিত। যুদ্ধে তিনি অপরাজিতা। কোনো যুদ্ধে তার পরাজয় ঘটেনি। জয় তার অবশ্যম্ভাবী। সেই জন্যই তিনি জয়ন্তী। জন্মসূত্রে জয়ন্তী ঋক্বেদের প্রধান ও শক্তিশালী এক বিরাট দেবতা ইন্দ্রের দুহিতা। দেবরাজ ইন্দ্র ছিলেন শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। তার পত্নীর নাম ইন্দ্রাণী। দুই পুত্র জয়ন্ত ও ঋষভ। জয়ন্তর ভগ্নী জয়ন্তী।

সুর-অসুরের যুদ্ধের সময় তার বিশেষ আবির্ভাব ঘটে। একবার দানবরা দেবতাদের কাছে যুদ্ধে হেরে যায়। তখন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য রাগে-ক্ষোভে দেবতাদের প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হন এবং কৈলাসে গিয়ে দেবাদিদেব মহাদেবের আরাধনা করতে থাকেন। দানবরাজও মনে মনে ভাবেন, যদি শিবকে একবার তপস্যায় তুষ্ট করা যায়, তাহলে সব শক্তি করতলগত হবে। তাই দৈত্যাচার্য শুক্র সদাশিবের ধ্যানে গভীরভাবে মগ্ন হলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র গোপনসূত্রে এ খবর পেয়ে যান। কী বিপদ! মহাদেব যদি একবার দৈত্যকে বর দেন, তাহলে তাকে যুদ্ধে হারায় কার সাধ্য? না, যে কোনো প্রকারে তার এ ধ্যান ভাঙাতেই হবে! নইলে দেবতাদের রক্ষা নেই!

পুরাণে আছে দেবী দুর্গার আট মূর্তি। তাদের অষ্টনায়িকা বলা হয়। এ অষ্টনায়িকার মধ্যে দেবী জয়ন্তী হলেন চতুর্থ। আবার এই অষ্টনায়িকাকে অষ্টযোগিনীও বলা হয়। এরা হলেন যথাক্রমে-মঙ্গলা, বিজয়া, ভদ্র, জয়ন্তী, অপরাজিতা, নন্দিনী, নারসিয়হী, কৌমারী। এ ছাড়া দেবী দুর্গার অসংখ্য রূপ আছে। তার ক’টা রূপই বা আমরা কল্পনায় আনতে পারি! তার ক’টা নামই বা আমরা জানি! তিনি তো রূপে রূপে অরূপ হয়ে আছেন। সর্বভূতে সর্বরূপে সূক্ষ্মবীজাকারে তিনি ওতপ্রোতভাবে অনুস্যূত হয়ে রয়েছেন। কখনো তিনি নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্ম, আবার কখনো সগুণ সাকার হয়ে সর্ববস্তুতে শক্তিরূপে বিরাজিতা।

দেবীর নাম তরঙ্গ ভক্তকে অনুরণিত করে। আবার কল্পনার জগতে সৌম্য সূতি প্রতিভাত হয়। যে নামেই তাকে সাধনা করি না কেন, উৎসধারা এক ও অভিন্ন। তিনি জ্যোতির্ময়ী, মঙ্গলময়ী, ভক্ত কল্যাণে জগতে ভক্ত মনোবাসনায় নামের সমৃদ্ধি প্রতিভাত।

তারাপদ আচার্য্য : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন