প্রাথমিক শিক্ষক বনাম কর্মকর্তা
jugantor
প্রাথমিক শিক্ষক বনাম কর্মকর্তা

  মো. সিদ্দিকুর রহমান  

১৬ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক- সবাই বিভিন্নভাবে শিশুদের পরিচর্যার দায়িত্বপ্রাপ্ত। অথচ শিশুদের পরিচর্যার ভাবনা তাদের ও অন্যদের মাঝে দৃশ্যমান নয়। অনেকে মনে করেন, তারাও শিশুর মতো অবুঝ! প্রাথমিকের মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অফিস যে সমগুরুত্ব পাওয়ার কথা, এ চিন্তা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেখা যায় না। আজও দেশের অনেক বড় বড় শিক্ষিত ব্যক্তির বদ্ধমূল ধারণা প্রাথমিকের মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী। আমি স্বাধীনতার আগে থেকেই প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বাধীনতার আগে সংগঠনের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। পরবর্তীকালে স্বভাবতই পূর্ব পাকিস্তান নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়। তখন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, অনেকে মাধ্যমিক শিক্ষকদের সংগঠন মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি না লিখে শুধু বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি লিখতেন। ফলে অনেক শিক্ষিত লোকজনও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি বললে এতে প্রাথমিক শিক্ষকরাও অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করত। তখনকার সময়ে অনেকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি আন্দোলন করে বহু আর্থিক সুবিধা আদায় করেছেন। তখন ওই অর্থ শিক্ষকরা গ্রহণ করার সময় তাদের মুখে শোনা যেত- ‘অফিসের বড় কর্তা অর্থ প্রদান করেছেন!’ সংগঠনের নেতৃত্বের অবদান, নিজেদের সংগ্রাম বা সরকারের আন্তরিকতা- সবকিছু যেন বেমালুম ভুলে যেত তারা। আজ প্রাথমিকের অগণিত সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার। তারা যে ১৯৮০-৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফসল, এ বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই। তখন গুটিকয়েক থানায় একজন করে অ্যাসিটেন্ট সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুল (এএসআই) পদে থানা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ছিল।

ঢাকা শহরের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মকর্তাদের ভয়ে অস্থির। মন্ত্রী এলো, সচিব এলো এবং ডিজি এলো- এ ভয় দেখিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ভীতি সৃষ্টি করা হয়। অথচ একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করলে একটি চিরন্তন সত্য বেরিয়ে আসবে- প্রাথমিক শিক্ষকরা শিক্ষিত নাগরিকদের জনক। প্রাথমিক শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা প্রয়োজন, সব সরকারি কর্মচারীর মতো শিক্ষকরাও সরকারি কর্মচারী। প্রাথমিক শিক্ষকরাও মানুষ। মানুষের মতো বিপদ-আপদ-সমস্যা তাদের মধ্যেও বিদ্যমান। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বিঘ্নিত বা ক্ষতি করা শিক্ষক ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার অপরাধের সমতুল্য। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের শিক্ষকশূন্য রাখা আমার বিবেচনায় লাখ লাখ টাকা দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ। শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকের যেমন শিশুদের প্রতি আচার-আচরণে সহনশীল হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কর্মকর্তাদের ভাবনা থাকা উচিত শিক্ষকরাও মানুষ। সর্বোপরি সবার সম্মানিত ও পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। কর্মকর্তাদের শিক্ষকদের গাইডার ও বন্ধু হিসাবে সহযোগিতা করা উচিত, পুলিশ হিসাবে নয়। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ছে। একদিন এক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা একজন শিক্ষককে দেখা করতে বললেন। এর পরপরই আজরাইল এসে শিক্ষকের জান কবজ করতে চাইলেন। শিক্ষক আজরাইলের কাছে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য কিছু সময় প্রার্থনা করলেন! চট্টগ্রামের হাটহাজারী উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের মাহলুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিচিৎ বড়ুয়ার পরিবারের অনেকে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। পরে তারও করোনা পজিটিভ আসে। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হলে তিনি তাকে দুই দিন পরপর বিদ্যালয়ে আসতে বললেন। এ আদেশের ব্যাপারে শিক্ষক মন্তব্য করতে পারবেন না বলে সংবাদ প্রতিনিধিকে জানান। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়- প্রাথমিকের কর্মকর্তা যেন করোনার চেয়েও বড়! শিক্ষকদের নানা অসুবিধা সত্ত্বেও কর্মকর্তার হুকুম মানার বহু নজির আছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের হাজির থেকে কর্তব্য পালন করতে দেখা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষকরাও সরকারি কর্মচারী, অপরদিকে শিক্ষাগুরু- এ বোধটুকু সবার হৃদয়ে জাগ্রত হোক।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

প্রাথমিক শিক্ষক বনাম কর্মকর্তা

 মো. সিদ্দিকুর রহমান 
১৬ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক- সবাই বিভিন্নভাবে শিশুদের পরিচর্যার দায়িত্বপ্রাপ্ত। অথচ শিশুদের পরিচর্যার ভাবনা তাদের ও অন্যদের মাঝে দৃশ্যমান নয়। অনেকে মনে করেন, তারাও শিশুর মতো অবুঝ! প্রাথমিকের মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য অফিস যে সমগুরুত্ব পাওয়ার কথা, এ চিন্তা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও দেখা যায় না। আজও দেশের অনেক বড় বড় শিক্ষিত ব্যক্তির বদ্ধমূল ধারণা প্রাথমিকের মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রী। আমি স্বাধীনতার আগে থেকেই প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বাধীনতার আগে সংগঠনের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। পরবর্তীকালে স্বভাবতই পূর্ব পাকিস্তান নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ নামকরণ করা হয়। তখন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, অনেকে মাধ্যমিক শিক্ষকদের সংগঠন মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতি না লিখে শুধু বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি লিখতেন। ফলে অনেক শিক্ষিত লোকজনও বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি বললে এতে প্রাথমিক শিক্ষকরাও অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করত। তখনকার সময়ে অনেকে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি আন্দোলন করে বহু আর্থিক সুবিধা আদায় করেছেন। তখন ওই অর্থ শিক্ষকরা গ্রহণ করার সময় তাদের মুখে শোনা যেত- ‘অফিসের বড় কর্তা অর্থ প্রদান করেছেন!’ সংগঠনের নেতৃত্বের অবদান, নিজেদের সংগ্রাম বা সরকারের আন্তরিকতা- সবকিছু যেন বেমালুম ভুলে যেত তারা। আজ প্রাথমিকের অগণিত সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার। তারা যে ১৯৮০-৮১ সালে প্রাথমিক শিক্ষকদের ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফসল, এ বিষয়টি অনেকেরই জানা নেই। তখন গুটিকয়েক থানায় একজন করে অ্যাসিটেন্ট সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুল (এএসআই) পদে থানা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা ছিল।

ঢাকা শহরের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কর্মকর্তাদের ভয়ে অস্থির। মন্ত্রী এলো, সচিব এলো এবং ডিজি এলো- এ ভয় দেখিয়ে শিক্ষাঙ্গনে ভীতি সৃষ্টি করা হয়। অথচ একটু গভীরভাবে উপলব্ধি করলে একটি চিরন্তন সত্য বেরিয়ে আসবে- প্রাথমিক শিক্ষকরা শিক্ষিত নাগরিকদের জনক। প্রাথমিক শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার মনে রাখা প্রয়োজন, সব সরকারি কর্মচারীর মতো শিক্ষকরাও সরকারি কর্মচারী। প্রাথমিক শিক্ষকরাও মানুষ। মানুষের মতো বিপদ-আপদ-সমস্যা তাদের মধ্যেও বিদ্যমান। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া বিঘ্নিত বা ক্ষতি করা শিক্ষক ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার অপরাধের সমতুল্য। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের শিক্ষকশূন্য রাখা আমার বিবেচনায় লাখ লাখ টাকা দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ। শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকের যেমন শিশুদের প্রতি আচার-আচরণে সহনশীল হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কর্মকর্তাদের ভাবনা থাকা উচিত শিক্ষকরাও মানুষ। সর্বোপরি সবার সম্মানিত ও পূজনীয় ব্যক্তিত্ব। কর্মকর্তাদের শিক্ষকদের গাইডার ও বন্ধু হিসাবে সহযোগিতা করা উচিত, পুলিশ হিসাবে নয়। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ছে। একদিন এক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা একজন শিক্ষককে দেখা করতে বললেন। এর পরপরই আজরাইল এসে শিক্ষকের জান কবজ করতে চাইলেন। শিক্ষক আজরাইলের কাছে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করার জন্য কিছু সময় প্রার্থনা করলেন! চট্টগ্রামের হাটহাজারী উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের মাহলুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমিচিৎ বড়ুয়ার পরিবারের অনেকে করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। পরে তারও করোনা পজিটিভ আসে। বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হলে তিনি তাকে দুই দিন পরপর বিদ্যালয়ে আসতে বললেন। এ আদেশের ব্যাপারে শিক্ষক মন্তব্য করতে পারবেন না বলে সংবাদ প্রতিনিধিকে জানান। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়- প্রাথমিকের কর্মকর্তা যেন করোনার চেয়েও বড়! শিক্ষকদের নানা অসুবিধা সত্ত্বেও কর্মকর্তার হুকুম মানার বহু নজির আছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের হাজির থেকে কর্তব্য পালন করতে দেখা গেছে। প্রাথমিক শিক্ষকরাও সরকারি কর্মচারী, অপরদিকে শিক্ষাগুরু- এ বোধটুকু সবার হৃদয়ে জাগ্রত হোক।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : সভাপতি, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা গবেষণা পরিষদ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন