বিমা শিল্পের পথিকৃৎ ও শিল্পবোদ্ধা
jugantor
স্মরণ
বিমা শিল্পের পথিকৃৎ ও শিল্পবোদ্ধা

  ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী  

১৭ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বিমা শিল্পের পথিকৃৎ এম এ সামাদ একজন বড় মাপের সাহিত্য ও শিল্পবোদ্ধাও ছিলেন। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন একজন সৎ মানুষ। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন-এ যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয় এই তো সেদিনও যেন ফোনে সামাদ ভাই এবং তার স্ত্রী সিলেট গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে একদা আমার সহকর্মী ফওজিয়া সামাদের (লুসি) সঙ্গে কথা বলেছি। এমন প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় আমি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলাম। মৃত্যুকালে তার বয়স যদিও ছিল অশীতিপর, তবু মনে-মননে, কর্মক্ষেত্রে, সবার সঙ্গে কথায় ও আচরণে ছিলেন সবুজ-সজীব তরুণ। দেশে বিমা শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, সহৃদয় সমাজকর্মী, সাহিত্য-বোদ্ধা, সহজ-সুন্দর-মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী সামাদ ভাইয়ের পুণ্যাত্মার শান্তি হোক-আজ মৃত্যুদিবসে এই প্রার্থনা করি পরম করুণাময়ের কাছে। আমি লুসিকে শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত আমার ছড়ার বই ‘আমপাতা জামপাতা’ দিয়েছিলাম। বইটি সামাদ ভাই লুসির কাছ থেকে নিয়ে পড়েন এবং বইটি সম্পর্কে তার মনোভাব লিখে জানান। এতে শিশুতোষ ছড়ার শিক্ষণীয় দিকও তুলে ধরেন। আমি তাকে প্রত্যুত্তরে একটি চিঠি লিখেছিলাম। আমাদের দুটি পত্র ছাপা হয়েছিল ‘অনন্যা’ পাক্ষিক পত্রিকায়। সামাদ ভাই তার লেখা ‘শনিবারের ছুটি’ বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে কয়েক ছত্র লিখেছিলাম। তার একাংশ কালের যাত্রাপথে বিবর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজের নানা প্রেক্ষিত ও স্বরূপ প্রকাশ করে এবং ঐতিহাসিক চরিত্র চিত্রণ করে। সেই সঙ্গে কিছু কিছু প্রশ্ন ও কিছু কিছু সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে লেখক তার জীবনের অনেক মূল্যবান অভিজ্ঞতা আমাদের উপহার দিয়েছেন। এ এক আশ্চর্য বই, যা মনে ঘা দেয়, যুক্তি খোঁজে তথ্যের সমারোহে। জীবনের ধ্যান-ধারণাকে খতিয়ে দেখতে বলে।

সাহিত্য ও শিল্পবোদ্ধা সামাদ ভাই তার সম্পাদিত ‘জানা অজানা রবীন্দ্রনাথ’ বইটিও আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের অনেক গানের উৎসমূলেই রয়েছে কবির ব্যক্তিজীবনের শোক-দুঃখ-বিচ্ছেদের করুণ স্মৃতি। তবু কবি কত অনায়াস-প্রত্যয়ে উচ্চারণ করেন : ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই-/কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথাও বিচ্ছেদ নাই।’ আমাদের শোক-বিহ্বল অন্তরে এই গানের বাণী প্রাণে আনে এক প্রশান্তির পরমতা। বইটি আকারে বড় নয়, কিন্তু বিষয়-বৈদগ্ধ্যে অপরিমেয়।

১৯৪৫ সালে সামাদ ভাই নয়াদিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক ও বাংলা অনুবাদক ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকার রেডিও পাকিস্তানে এসে যোগদান করেন। পরে তিনি আত্মনিয়োগ করেন বিমা শিল্পে। আমাদের সমাজে সৎ মানুষের বড় অভাব। বিদগ্ধ, বিনম্র ব্যক্তিত্বের সঙ্গ কদাচিৎ মেলে। সামাদ ভাইয়ের মতো একজন পুরোপুরি খাঁটি মানুষের প্রয়াণে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। সামাজিকভাবেও সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী : প্রয়াত শিক্ষাবিদ ও লেখক

স্মরণ

বিমা শিল্পের পথিকৃৎ ও শিল্পবোদ্ধা

 ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী 
১৭ অক্টোবর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে বিমা শিল্পের পথিকৃৎ এম এ সামাদ একজন বড় মাপের সাহিত্য ও শিল্পবোদ্ধাও ছিলেন। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন একজন সৎ মানুষ। তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন-এ যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয় এই তো সেদিনও যেন ফোনে সামাদ ভাই এবং তার স্ত্রী সিলেট গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলে একদা আমার সহকর্মী ফওজিয়া সামাদের (লুসি) সঙ্গে কথা বলেছি। এমন প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথায় আমি মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলাম। মৃত্যুকালে তার বয়স যদিও ছিল অশীতিপর, তবু মনে-মননে, কর্মক্ষেত্রে, সবার সঙ্গে কথায় ও আচরণে ছিলেন সবুজ-সজীব তরুণ। দেশে বিমা শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ, সহৃদয় সমাজকর্মী, সাহিত্য-বোদ্ধা, সহজ-সুন্দর-মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী সামাদ ভাইয়ের পুণ্যাত্মার শান্তি হোক-আজ মৃত্যুদিবসে এই প্রার্থনা করি পরম করুণাময়ের কাছে। আমি লুসিকে শিশু একাডেমি থেকে প্রকাশিত আমার ছড়ার বই ‘আমপাতা জামপাতা’ দিয়েছিলাম। বইটি সামাদ ভাই লুসির কাছ থেকে নিয়ে পড়েন এবং বইটি সম্পর্কে তার মনোভাব লিখে জানান। এতে শিশুতোষ ছড়ার শিক্ষণীয় দিকও তুলে ধরেন। আমি তাকে প্রত্যুত্তরে একটি চিঠি লিখেছিলাম। আমাদের দুটি পত্র ছাপা হয়েছিল ‘অনন্যা’ পাক্ষিক পত্রিকায়। সামাদ ভাই তার লেখা ‘শনিবারের ছুটি’ বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়ে কয়েক ছত্র লিখেছিলাম। তার একাংশ কালের যাত্রাপথে বিবর্তমান রাষ্ট্র ও সমাজের নানা প্রেক্ষিত ও স্বরূপ প্রকাশ করে এবং ঐতিহাসিক চরিত্র চিত্রণ করে। সেই সঙ্গে কিছু কিছু প্রশ্ন ও কিছু কিছু সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে লেখক তার জীবনের অনেক মূল্যবান অভিজ্ঞতা আমাদের উপহার দিয়েছেন। এ এক আশ্চর্য বই, যা মনে ঘা দেয়, যুক্তি খোঁজে তথ্যের সমারোহে। জীবনের ধ্যান-ধারণাকে খতিয়ে দেখতে বলে।

সাহিত্য ও শিল্পবোদ্ধা সামাদ ভাই তার সম্পাদিত ‘জানা অজানা রবীন্দ্রনাথ’ বইটিও আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রসংগীতের অনেক গানের উৎসমূলেই রয়েছে কবির ব্যক্তিজীবনের শোক-দুঃখ-বিচ্ছেদের করুণ স্মৃতি। তবু কবি কত অনায়াস-প্রত্যয়ে উচ্চারণ করেন : ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যতদূরে আমি ধাই-/কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথাও বিচ্ছেদ নাই।’ আমাদের শোক-বিহ্বল অন্তরে এই গানের বাণী প্রাণে আনে এক প্রশান্তির পরমতা। বইটি আকারে বড় নয়, কিন্তু বিষয়-বৈদগ্ধ্যে অপরিমেয়।

১৯৪৫ সালে সামাদ ভাই নয়াদিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঘোষক ও বাংলা অনুবাদক ছিলেন। দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকার রেডিও পাকিস্তানে এসে যোগদান করেন। পরে তিনি আত্মনিয়োগ করেন বিমা শিল্পে। আমাদের সমাজে সৎ মানুষের বড় অভাব। বিদগ্ধ, বিনম্র ব্যক্তিত্বের সঙ্গ কদাচিৎ মেলে। সামাদ ভাইয়ের মতো একজন পুরোপুরি খাঁটি মানুষের প্রয়াণে দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ হওয়ার নয়। সামাজিকভাবেও সৃষ্টি হয়েছে শূন্যতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী : প্রয়াত শিক্ষাবিদ ও লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন