জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের কে দেখবে?
jugantor
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের কে দেখবে?

  ফাতিমা পারভীন  

৩০ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রভাব ফেলেছে জনজীবনে। সমুদ্রে, বৃক্ষে, প্রকৃতিতে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করা জনগোষ্ঠী। উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব এলাকায় বসবাস না করলে দেখা যেত না।

খুব কাছ থেকে কত মাকে বিধবা ও সন্তানহারা হতে দেখেছি। কত মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হতে দেখেছি। কত মানুষকে কৃষিজমি ও শেষ আশ্রয়স্থল হারিয়ে দিশেহারা হতে দেখেছি। দেখেছি তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হতভাগা জেলে পরিবারগুলো। জীবন-জীবিকার তাগিদে জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রায়ই প্রকৃতির রুদ্ররোষের শিকার হয়। কখনো ফিরে আসে, কখনো ফিরে আসে লাশ হয়ে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেলে না তাদের লাশ।

এভাবেই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা চলতে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় জেলেদের পরিবার, নিঃশেষ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি। মজবুত বেড়িবাঁধ না থাকায় মানুষের অনিশ্চিত জীবন কাটে পুরো উপকূলীয় এলাকায়। যে কোনো সময়, যে কোনো মুহূর্তে তলিয়ে যেতে পারে এসব এলাকা। কখনো খবরের কাগজের শিরোনামে ঠাঁই পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসীর ভাগ্যে ক্ষতিপূরণ জোটে না। গত ২৯ সেপ্টেম্বর আকস্মিক ঝড়ের কবলে বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ তিন জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলা সদর ইউনিয়নের চরলাঠিমারা এলাকায়। তাদের পরিবারে সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া নেই কোনো সম্পদ। উপজেলা পরিষদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেকের লাশ দাফনের জন্য দেওয়া হয় ২৫ হাজার টাকা ও সামান্য খাদ্য সামগ্রী।

প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের মধ্যে যখন তাদের বাড়িতে উপস্থিত হই, তখন অনুভব করেছিলাম উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষের জীবন কতটা কঠিন, কতটা অনিশ্চিত। তাদের জীবনের দুর্ভোগ ও করুণ অবস্থা লিখতে গেলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মৃত একজন জেলের একমাত্র সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম অসহায়ত্ব কাকে বলে। তার শুকনো ভেজা চোখের নোনাজলে লেপ্টে আছে কঠিন ভবিষ্যৎ। মাত্র ১৩ বছরের ছেলেটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা না নিলে ফিরতে পারে না স্বাভাবিক জীবনে। তারপরও বিধবা মায়ের এখন সে অন্ধের যষ্ঠি। মৃত আরেক জেলের বড় ছেলের বয়স ১২ বছর। সঙ্গে আছে ছোট্ট এক বোন, বিধবা মা আর দাদা-দাদি। মৃত অপর জেলের ছয় মাস বয়সি মেয়েশিশু জানে না তার জীবনে কী কঠিন নির্মমতা ঘটে গেছে। বিধবা স্ত্রীদের সম্পর্কে কিছু লেখার ভাষা খুঁজে পাই না। শুধু এতটুকু বলতে পারি-সূচনাতেই সমাপ্তি ঘটল তাদের জীবনের। এসব কথা ভাবতে গেলে একটাই প্রশ্ন মনে জাগে-এর জন্য দায়ী কে? উন্নত রাষ্ট্রগুলো, না জলবায়ুর পরিবর্তন?

ফাতিমা পারভীন : ভাইস চেয়ারম্যান, পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদ, বরগুনা

fatimaparvin2013-gmail.com

জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের কে দেখবে?

 ফাতিমা পারভীন 
৩০ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রভাব ফেলেছে জনজীবনে। সমুদ্রে, বৃক্ষে, প্রকৃতিতে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করা জনগোষ্ঠী। উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এসব এলাকায় বসবাস না করলে দেখা যেত না।

খুব কাছ থেকে কত মাকে বিধবা ও সন্তানহারা হতে দেখেছি। কত মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হতে দেখেছি। কত মানুষকে কৃষিজমি ও শেষ আশ্রয়স্থল হারিয়ে দিশেহারা হতে দেখেছি। দেখেছি তাদের বেঁচে থাকার লড়াই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হতভাগা জেলে পরিবারগুলো। জীবন-জীবিকার তাগিদে জেলেরা গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রায়ই প্রকৃতির রুদ্ররোষের শিকার হয়। কখনো ফিরে আসে, কখনো ফিরে আসে লাশ হয়ে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেলে না তাদের লাশ।

এভাবেই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা চলতে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। হঠাৎ ঝড়ের কবলে পড়ে নিঃশেষ হয়ে যায় জেলেদের পরিবার, নিঃশেষ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি। মজবুত বেড়িবাঁধ না থাকায় মানুষের অনিশ্চিত জীবন কাটে পুরো উপকূলীয় এলাকায়। যে কোনো সময়, যে কোনো মুহূর্তে তলিয়ে যেতে পারে এসব এলাকা। কখনো খবরের কাগজের শিরোনামে ঠাঁই পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলবাসীর ভাগ্যে ক্ষতিপূরণ জোটে না। গত ২৯ সেপ্টেম্বর আকস্মিক ঝড়ের কবলে বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ তিন জেলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের বাড়ি বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলা সদর ইউনিয়নের চরলাঠিমারা এলাকায়। তাদের পরিবারে সামান্য একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া নেই কোনো সম্পদ। উপজেলা পরিষদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেকের লাশ দাফনের জন্য দেওয়া হয় ২৫ হাজার টাকা ও সামান্য খাদ্য সামগ্রী।

প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাতের মধ্যে যখন তাদের বাড়িতে উপস্থিত হই, তখন অনুভব করেছিলাম উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মানুষের জীবন কতটা কঠিন, কতটা অনিশ্চিত। তাদের জীবনের দুর্ভোগ ও করুণ অবস্থা লিখতে গেলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মৃত একজন জেলের একমাত্র সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম অসহায়ত্ব কাকে বলে। তার শুকনো ভেজা চোখের নোনাজলে লেপ্টে আছে কঠিন ভবিষ্যৎ। মাত্র ১৩ বছরের ছেলেটি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।

প্রতিদিন চিকিৎসাসেবা না নিলে ফিরতে পারে না স্বাভাবিক জীবনে। তারপরও বিধবা মায়ের এখন সে অন্ধের যষ্ঠি। মৃত আরেক জেলের বড় ছেলের বয়স ১২ বছর। সঙ্গে আছে ছোট্ট এক বোন, বিধবা মা আর দাদা-দাদি। মৃত অপর জেলের ছয় মাস বয়সি মেয়েশিশু জানে না তার জীবনে কী কঠিন নির্মমতা ঘটে গেছে। বিধবা স্ত্রীদের সম্পর্কে কিছু লেখার ভাষা খুঁজে পাই না। শুধু এতটুকু বলতে পারি-সূচনাতেই সমাপ্তি ঘটল তাদের জীবনের। এসব কথা ভাবতে গেলে একটাই প্রশ্ন মনে জাগে-এর জন্য দায়ী কে? উন্নত রাষ্ট্রগুলো, না জলবায়ুর পরিবর্তন?

ফাতিমা পারভীন : ভাইস চেয়ারম্যান, পাথরঘাটা উপজেলা পরিষদ, বরগুনা

fatimaparvin2013-gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন