প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রেড ও পদমর্যাদা প্রসঙ্গ
jugantor
প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রেড ও পদমর্যাদা প্রসঙ্গ

  কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম  

২৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার রায় হয়েছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে, যা খুবই ইতিবাচক এবং শিক্ষক সমাজের জন্য সুসংবাদ। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হলো প্রধান শিক্ষকদের। অন্যদিকে, দেশে প্রায় তিন লাখেরও বেশি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই স্নাতক-স্নাতকোত্তর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন। তাদের বেতন বৈষম্য রয়েই গেছে। ১৩তম গ্রেড প্রদানে সেই বৈষম্যের নিরসন হয়নি। তাদের দাবি ছিল প্রধান শিক্ষকদের পরের স্কেলে বেতন পাওয়ার। অথচ সেটা হয়নি। করোনা মহামারির আগে ঢাকায় শহিদ মিনারে মহাসমাবেশ করতে চাইলেও সেখানে তাদের যেতে দেওয়া হয়নি। উলটো বিক্ষোভ-প্রতিবাদে হেনস্তা ও লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন শিক্ষকরা। এর আগে ১১তম গ্রেডে বেতনস্কেল দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল সহকারী শিক্ষকদের। সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু শিক্ষক নেতার লোভ-লালসাও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বেতন বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষক হিসাবেই তারা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখেন। অথচ মানুন কিংবা না মানুন, বিদ্যালয়ে ক্লাস ও অন্যান্য কাজকর্মে সহকারী শিক্ষকরাই অনেক বেশি শ্রম দিয়ে থাকেন। এমনিতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশন হয় না অনেক সহকারী শিক্ষকের। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে অবসরে যান। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়। বাড়ানো হয় নানা সুযোগ-সুবিধা। ভিত্তি দুর্বল বা সুদৃঢ় না হলে যেমন দালানের কাঠামো নড়বড়ে হতে পারে, তেমনি জীবনের শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন সঠিকভাবে না হলে পুরো শিক্ষাজীবনও সুদৃঢ় হবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। দেওয়া হচ্ছে পুরো সেট নতুন বই, উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, নানা ধরনের শিক্ষাসামগ্রীসহ অনেক কিছু। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। দক্ষ ও চৌকশ কর্মকর্তাও নিয়োগ পেয়েছেন, পাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে। এত কিছুর পরও প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারিকরণের কারণে দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে চাকরিরত রয়েছেন লাখ লাখ শিক্ষক। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে ঢালাওভাবে সরকারি করার বিষয়ে শিক্ষাবিদ, গবেষকসহ অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন। প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়ার রায় হলেও সহকারী শিক্ষকরা থাকছেন তৃতীয়তেই। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চতর তথা ১০/১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করার সহকারী শিক্ষকদের চাওয়া অবিলম্বে মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই। উপযুক্ত সম্মানী থেকে আর কতদিন শিক্ষকদের বঞ্চিত করা হবে? এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস রুটিন, বার্ষিক ছুটির তালিকাসহ (যেখানে জাতীয় দিবসগুলোও সংযুক্ত) নানা বিষয়ে অসামঞ্জস্য বিদ্যমান রয়ে গেছে। এসব সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডে বেতনস্কেল নির্ধারণ এবং দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাসহ পদোন্নতি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

khalednizamt@gmail.com

প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রেড ও পদমর্যাদা প্রসঙ্গ

 কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম 
২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা দেওয়ার রায় হয়েছে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে, যা খুবই ইতিবাচক এবং শিক্ষক সমাজের জন্য সুসংবাদ। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হলো প্রধান শিক্ষকদের। অন্যদিকে, দেশে প্রায় তিন লাখেরও বেশি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই স্নাতক-স্নাতকোত্তর শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন। তাদের বেতন বৈষম্য রয়েই গেছে। ১৩তম গ্রেড প্রদানে সেই বৈষম্যের নিরসন হয়নি। তাদের দাবি ছিল প্রধান শিক্ষকদের পরের স্কেলে বেতন পাওয়ার। অথচ সেটা হয়নি। করোনা মহামারির আগে ঢাকায় শহিদ মিনারে মহাসমাবেশ করতে চাইলেও সেখানে তাদের যেতে দেওয়া হয়নি। উলটো বিক্ষোভ-প্রতিবাদে হেনস্তা ও লাঠিপেটার শিকার হয়েছেন শিক্ষকরা। এর আগে ১১তম গ্রেডে বেতনস্কেল দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল সহকারী শিক্ষকদের। সেই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি। কিছু শিক্ষক নেতার লোভ-লালসাও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। বেতন বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষক হিসাবেই তারা দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখেন। অথচ মানুন কিংবা না মানুন, বিদ্যালয়ে ক্লাস ও অন্যান্য কাজকর্মে সহকারী শিক্ষকরাই অনেক বেশি শ্রম দিয়ে থাকেন। এমনিতে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রধান শিক্ষক পদে প্রমোশন হয় না অনেক সহকারী শিক্ষকের। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে অবসরে যান। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়। বাড়ানো হয় নানা সুযোগ-সুবিধা। ভিত্তি দুর্বল বা সুদৃঢ় না হলে যেমন দালানের কাঠামো নড়বড়ে হতে পারে, তেমনি জীবনের শুরুতেই প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন সঠিকভাবে না হলে পুরো শিক্ষাজীবনও সুদৃঢ় হবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব সর্বাধিক। বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। দেওয়া হচ্ছে পুরো সেট নতুন বই, উপবৃত্তি, মিড ডে মিল, নানা ধরনের শিক্ষাসামগ্রীসহ অনেক কিছু। পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষকদের নতুন ও আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। দক্ষ ও চৌকশ কর্মকর্তাও নিয়োগ পেয়েছেন, পাচ্ছেন প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে। এত কিছুর পরও প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য কোনোভাবেই দূর হচ্ছে না। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারিকরণের কারণে দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষকদের চাকরি সরকারি হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে চাকরিরত রয়েছেন লাখ লাখ শিক্ষক। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোকে ঢালাওভাবে সরকারি করার বিষয়ে শিক্ষাবিদ, গবেষকসহ অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন। প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়ার রায় হলেও সহকারী শিক্ষকরা থাকছেন তৃতীয়তেই। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য নিরসনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। উচ্চতর তথা ১০/১১তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করার সহকারী শিক্ষকদের চাওয়া অবিলম্বে মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাই। উপযুক্ত সম্মানী থেকে আর কতদিন শিক্ষকদের বঞ্চিত করা হবে? এদিকে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস রুটিন, বার্ষিক ছুটির তালিকাসহ (যেখানে জাতীয় দিবসগুলোও সংযুক্ত) নানা বিষয়ে অসামঞ্জস্য বিদ্যমান রয়ে গেছে। এসব সমস্যা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেডে বেতনস্কেল নির্ধারণ এবং দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদাসহ পদোন্নতি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

কাজী আবু মোহাম্মদ খালেদ নিজাম : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

khalednizamt@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন